১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রবীর সিকদারকে গ্রেফতারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কলমসৈনিক সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে সারাদেশে প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। প্রথমবারের মতো কোন সাংবাদিককে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় গ্রেফতারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিবাদকারীরা। মানহানির মামলা কেবল ব্যক্তির নিজেকে দায়ের করতে হয় এমন দাবি করে তারা বলেছেন, মন্ত্রীর হয়ে তার পক্ষে পিপির মামলা করার কোন বৈধতা নেই। মানহানির মামলা কেবল ব্যক্তির নিজেকেই করতে হবে বা হয়। সাংবাদিকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ প্রবীর সিকদারের মুক্তির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, প্রবীর সিকদারের লেখা ‘আমার বোন শেখ হাসিনা’ বইটিতে যেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একবার হাত বুলান। একই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রবীর সিকদারকে নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করে তারা বলেছেন, বইটি পড়ার পর যদি মনে হয় তিনি অপরাধী, তাহলে প্রধানমন্ত্রী নিজেই যেন ওই বইটি বাজেয়াফত করেন। আইসিটি এ্যাক্টেও ৫৭ ধারা নামক কালো আইনটি বাতিলের দাবি জানিয়ে সাংবাদিকসহ নানা পেশাজীবী মানুষ বলেছেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলার অর্থ হচ্ছে সাংবাদিকদের বাকরুদ্ধ করে দেয়ার অপচেষ্টা! মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগ সরকার এমন কাজ করতে পারে না। সরকারকে উল্টো পথে না হাঁটার পরামর্শও দিয়েছেন অনেকে।

রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সম্মুখে সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ ও সভাসমাবেশ করেছে সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষ। ‘বিক্ষুব্ধ সাংবাদিক সমাজ’ ব্যানারে মানববন্ধন ও সমাবেশে অংশ নেন গণজাগরণ মঞ্চের একাংশ, ব্লগার এ্যান্ড অন লাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক (বোয়ান), বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী, গৌরব-৭১, প্রাণের-৭১সহ বিভিন্ন সংগঠন। তারা গণঅনশনের হুমকি দিয়ে বলেন, সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে আগামীকাল বুধবার বেলা ১১টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত জাতীয় প্রেসক্লাবের সম্মুখে প্রতীকী গণঅনশন পালন করা হবে।

অন্যদিকে সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্ট-সিপিজে সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সংগঠনের এশিয়া বিভাগের প্রোগ্রাম রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট সুমিত গালহোত্রা সোমবার এক বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার পাশাপাশি তাকে হুমকি দেয়ার অভিযোগ তদন্তের জন্য আমরা কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হুমকি পাওয়ার কথা প্রকাশ করায় এভাবে সাংবাদিককে জেলে পাঠানো হলে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থার ‘আরও অবনতি’ ঘটবে।

এছাড়াও দেশের ভেতরে সর্বত্র প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। ফেসবুকে ‘তুলোধুনো’ হওয়ার মতো অবস্থা! গ্রেফতারের প্রতিবাদে তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন সংগঠন সভা ও সমাবেশ করেছে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভও চলছে। প্রবীর সিকদারকে গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সাংবাদিক মঞ্চ। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ফরিদপুরে আইসিটি আইনে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন ঢাকায় কর্মরত সাংবাদিকদের এ সংগঠন। একই দাবি জানিয়ে প্রবীণ এ সাংবাদিকের মুক্তি দাবি করেছে গাজীপুরের শ্রীপুর সাংবাদিক সমিতি (শ্রীউসাস)। বরগুনার সাংবাদিকরাও একই দাবিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে। রাজশাহীতে তার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে ফরিদপুরের সাংবাদিক সমাজ কোন এক অদ্ভুদ কারণে এখনও রয়েছেন নিশ্চুপ!

অন্যদিকে একাত্তরেরর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি অবিলম্বে প্রবীর সিকদারের মুক্তি দাবি করেছে। নির্মূল কমিটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রবীর সিকদার যদি তথ্যপ্রযুক্তি আইনে কোন অপরাধ করে থাকেন, তার জন্য মামলা হতে পারে। যে বিষয় নিয়ে তিনি লিখেছেন সে বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। তবে তারা এও বলছেন যে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের এহেন অপব্যবহার এ ক্ষেত্রে সরকারের অর্জনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া ॥ এদিকে সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে গ্রেফতারের পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী কর্তৃক তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, এটা প্রবীর সিকদারে পাগলামো। এমন মন্তব্যের পর অন্য মন্ত্রীরাও মুখ খুলতে শুরু করেছেন। প্রবীর সিকদারের গ্রেফতারের পর ‘আর শান্ত থাকার পরিস্থিতি নেই’ এমন মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। একটি বেসরকারী টেলিভিশনকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, ‘অঙ্গ হারানো একজন মানুষকে হাতকড়া দিয়ে নিয়ে যাওয়া, তার ছবি প্রকাশ করা, এত তড়িঘড়ি করে রিমান্ডে নেয়া স্বাভাবিক মনে হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাকে হাতকড়া পরিয়ে রাতের আঁধারেই ফরিদপুর নিয়ে যেতে হলো? এত এফিশিয়েন্ট হয়ে গেল পলিশ, ডিবি? এসব ঘটনার পর কোন বিবেকবান মানুষের আর শান্ত হয়ে থাকার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য তার। তিনি আরও বলেন, ‘সাংবাদিক, সাংবাদিতা একটি প্রতিষ্ঠান। আমি মনে করি একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের এভাবে দাঁড়ানো উচিত নয়।’

তথমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও প্রবীর সিকদারকে গ্রেফতারের ঘটনা দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এখন তার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মনে করি। তিনি যাতে নিশ্চিতভাবে আইনী সুরক্ষা পান, সেজন্য তথ্য মন্ত্রণালয় কাজ করবে। নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষ নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে সুনাম অর্জনকারী বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন রয়েছেন নিশ্চুপ। গ্রেফতার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলব না। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রয়েছেন গ্রেফতারের পক্ষেই। তিনি বলেছেন, এক ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

অন্যদিকে শহীদ পরিবারের সন্তান প্রবীণ সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের গ্রেফতারের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছেন সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনি বলেন, আমরা এর আগেও দলের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়েছি। এখনও বলছি অবিলম্বে মক্তি দেয়া হোক প্রবীণ এ সাংবাদিককে।

তবে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল কোন ক্রমেই সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আইনের ওই ধারা বাতিলের প্রশ্নই ওঠে না। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশারফ হোসেন সোমবার বিবিসির এক সাক্ষাতকারে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রবীর সিকদারের ‘পাগলামি’ বলে আখ্যা দেয়ার পরই মন্ত্রিপরিষদের অন্য সদস্যরাও প্রতিক্রিয়া দিতে শুরু করেছেন।

প্রসঙ্গত ‘আমার জীবন শঙ্কা তথা মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী থাকবেন’ শিরোনামে একটি স্ট্যাটাসে জনকণ্ঠে কর্মরত থাকা অবস্থায় ‘সেই রাজাকার’ শিরোনামে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশকারী এ সংবাদিক লিখেছিলেন, ‘আমি খুব স্পষ্ট করেই বলছি, নিচের ব্যক্তিবর্গ আমার জীবন শঙ্কা তথা মৃত্যুর জন্য দায়ী থাকবেন : ১. এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি, ২. রাজাকার নুলা মুসা ওরফে ড. মুসা বিন শমসের, ৩. ফাঁসির দ-াদেশপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী বাচ্চু রাজাকার ওরফে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং এই তিন জনের অনুসারী-সহযোগীরা।’ আর এ স্ট্যাটাসের কারণেই তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।