২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফুটবলার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব

  • জাহিদ রহমান

শুধু রাজনীতির মাঠ নয়, খেলার মাঠেও এক আকর্ষণীয় চরিত্র ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তারুণ্যে রাজপথে মিছিল আর পরিপূর্ণ রাজনীতিক হওয়ার আগে তিনি অন্য দশ কিশোরের মতো খেলার মাঠকেই বেশি ভালবাসতেন। আর তাই প্রিয় ফুটবল নিয়ে দুরন্তপনায় মেতে উঠতেন। কৈশোরে ফুটবলার হিসেবে তাঁর খ্যাতির কোন ঘাটতি ছিল না। প্রতিযোগিতামূলত ফুটবল আসরের তিনি নিয়মিত এক কুশীলব ছিলেন। ভাল ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে কৈশোরে পুরস্কারও তিনি পেয়েছেন। স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর খেলাধুলার প্রতি যার পর নেই তার ভালবাসা ছিল। খেলোয়াড়রা তাঁর সামনে পড়লেই দারুণ অনুপ্রেরণায় বলে উঠতেন- ‘ভাল খেলতে হবে কিন্তু। দেশের মান রাখতে হবে।’

নিজে খেলতেন বলে ফুটবল খেলাকেই বেশি পছন্দ করতেন বঙ্গবন্ধু। অনেকেই শুনে অবাকও হতে পারেন- বঙ্গবন্ধু নিজ অঞ্চল গোপালগঞ্জ এবং ঢাকা শহরে রীতিমতো প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলেছেন। গোপালগঞ্জে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়াকালীন সময় থেকেই তিনি ফুটবল ও ভলিবল খেলতেন। তৎকালীন মহকুমা টিমেও খেলার রেকর্ড রয়েছে তার। ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট অনেকেই এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি সর্বশেষ ঐতিহ্যবাহী ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের হয়ে দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবল লীগে খেলেছেন। আর এ কারণেই তাই আজীবন এই ক্লাবটির সাঙ্গে তাঁর ছিল একেবারে নাড়ির সম্পর্ক। ওয়ান্ডারার্স ক্লাব সূত্রে জানা গেছে তিনি এই ক্লাবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তবে পরবর্তীতে তিনি কলকাতা চলে গেলে আর মাঠে খেলতে নামেননি। ফুটবল এবং অপরাপর খেলাধুলার প্রতি যে তাঁর প্রচ- অনুরাগ ছিল তা আরও ভালভাবে বুঝা যায় নিজ সন্তান শেখ কামালকে খেলাধুলার সাঙ্গে শুধু সম্পৃক্ত করা নয়, তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেও সহযোগিতা করা। আজকের জনপ্রিয় ক্লাব আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামাল হলেও মূল স্পিরিট ছিলেন বঙ্গবন্ধু নিজে। আর এ জন্যই দেখা গেছে শেখ কামাল তাঁর বন্ধু এবং ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে নিয়ে যখনই দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে আধুনিক রূপ দিতে কিছু করতে চেয়েছেন তখনই তা নির্বিবাদে সমর্থন দিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু।

এাঁই তো সত্য বঙ্গবন্ধুর দর্শনকে সামনে রেখেই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করতে সে সময় একদল স্বাধীনতাকামী ফুটবলার গড়ে তুলেছিলেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। একাত্তরের বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছেতেই ৭২ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে আয়োজন করা হয়েছিল একটি প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচের। যেখানে মুজিবনগর একাদশ নামে মূলত স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল অংশগ্রহণ করেছিল। এ দলে ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু, শেখ আশরাফ আলী, কাজী সালাউদ্দিনসহ অন্যরা। অন্যদিকে যে সব খেলোয়াড়রা দেশে থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অংশ নিয়েছিলেন তাদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল প্রেসিডেন্ট একাদশ। এ দলে মনোয়ার হোসেন নান্নু, গোলাম সারওয়ার টিপুসহ অন্য ফুটবলাররা ছিলেন। প্রাক্তন ফুটবলার শেখ আশরাফ আলী জানান, ঢাকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এ ম্যাচ সরাসরি উপভোগ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিনসহ অন্যান্য নেতারা। এ ম্যাচে তাদের মুজিবনগর একাদশ হেরে যায় প্রেসিডেন্ট একাদশের কাছে। শেখ আশরাফ আরও জানান, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকাকালীন বাংলাদেশ ফুটবল দল যতবার দেশের বাইরে খেলতে গেছে ততবারই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পুরো দল দেখা করে এসেছে। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে তারা আর্শীবাদ নিয়েছে। শেখ আশরাফ বলেন, উনার সঙ্গে দেখা করতে গেলেই উনি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আমাদের বলতেন, ‘ভাল করে খেলবি, স্বাধীন দেশের মান-সম্মান যেন থাকে। আমি কিন্তু খেলাধুলার সব খবর রাখছি।’ বঙ্গবন্ধুর ক্রীড়া সংশ্লিষ্টতা নিয়ে দারুণ এক তথ্য দেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু। তিনি বলেন বঙ্গবন্ধু কৈশোরে, তারুণ্যে ফুটবল খেলতেন বলে ফুটবলারদের খুব ভালবাসতেন। আর স্মৃতিশক্তি প্রখর থাকার কারণে তিনি সবার কথা মনে রাখতে পারতেন। ৫৫ সালের দিকে রাজনৈতিক কাজে শেখ মুজিবুর রহমান একবার বরিশালের মঠবাড়িয়াতে যান। জাকারিয়া পিন্টু তখন মঠবাড়িয়া স্কুলের ক্লাস সেভেনের ছাত্র। ফুটবল খেলা তার দারুণ নেশা। ওই সময় শেখ মুজিবুর রহমানের সৌজন্যে মঠবাড়িয়া হাইস্কুলের সঙ্গে স্থানীয় অফিসার্স ক্লাবের মধ্যে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। জাকারিয়া পিন্টু জানান তিনি স্কুলের পক্ষে অংশ নিয়ে দু’দুটি গোল করে অফিসার্স ক্লাবের পরাজয় ত্বরান্বিত করেন। খেলা শেষে বঙ্গবন্ধু তাঁকে কাছে ডেকে খেলার প্রশংসা করে মাথায় হাত বুলাতে থাকেন এবং তাঁর বাবা ক্যাপ্টেন নাজিমউদ্দিনকে ডেকে বলেন, ছেলেকে যেন সে ফুটবল খেলতে আরও উৎসাহিত করে। জাকারিয়া পিন্টু বলেন, ’৭৩ সালে বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দল দেশের বাইরে প্রথম মালয়েশিয়াতে অনুষ্ঠিত মারদেকা কাপ ফুটবলে অংশ নেয়ার প্রাক্কালে পুরো ফুটবল দল গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যান। এ সময় এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। জাকারিয়া পিন্টু বঙ্গবন্ধুকে দেখে সালাম দিতেই তিনি চিন্তে পারেন এবং বলেন, ‘তোকে বলেছিলাম না তুই বড় ফুটবলার হবি’। জাকারিয়া পিন্টুর মতে, বঙ্গবন্ধু কৈশোরে নিজে ফুটবল খেলতেন বলে ফুটবল খেলাটা খুব পছন্দ করতেন। আর তাই বাইরে খেলতে যাওয়ার আগে উনার সঙ্গে দেখা করতে গেলেই উনি বলতেন, তোরা অবশ্যই ভাল করে খেলবি। মারদেকাতে যাওয়ার আগেও তিনি একই কথা বলেন।

প্রাক্তন ফুটবলার শেখ আশরাফ আলী আরেকটি চমকে দেয়ার মতো তথ্যের যোগান দেন। বলেনÑ ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ এবং শেখ মুজিব এই দুটি নাম সমার্থক হয়ে গিয়েছিল। বাইরের অনেক দেশের মানুষ বাংলাদেশের নাম ঠিকমতো না জানলেও কেবলই নেতা শেখ মুজিবের নাম জানত। আর এ কারণেই দেখেছি ’৭৩ সালে প্রথম যেদিন আমরা কুয়ালালামপুর স্টেডিয়ামে খেলতে নামি সেদিন স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ আর শেখ মুজিব বলে চিৎকার করছে। সে ছিল এক অপূর্ব দৃশ্য। সদ্য স্বাধীন দেশ আর সেই দেশের নেতাকে সেদিন স্টেডিয়ামে আসা সাধারণ দর্শকরা যেভাবে অভিনন্দিত করেছিল তা ভোলার নয়। আসলে বঙ্গবন্ধু নামটি এমনই-‘যার অস্তিত্ব শুধু রাজনৈতিক ময়দান নয়, দেশের বাইরের ফুটবল ময়দানেও স্বচক্ষে দেখেছি। মানুষটি অসম্ভব রকম অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল’।

yahidrahman67@gmail.com