২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাফল্যের নেপথ্যে ‘টিম-কম্বিনেশন’

  • সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ

এ কথা বলার অপেক্ষাই রাখে না যে, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সম্প্রতি পারফর্মেন্সে, বিশেষ করে একদিনের ক্রিকেটের গত এক বছরের ফলাফলে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ যারপরনাই খুশি। যদিও সে খুশির যথেষ্ট কারণও আছে। বাংলাদেশের মানুষের খুশির উপলক্ষ খুবই কম মেলে। একমাত্র ক্রিকেট ছাড়া আর বড় কোন গেমসের আন্তর্জাতিক আসরে খেলার সৌভাগ্য বাংলাদেশের কমই মেলে। সেদিক দিয়ে ক্রিকেটই এগিয়ে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে সব আসরে খেলেছে। কেবলমাত্র যে ক্রিকেটে বিশ্বকাপে খেলেছে তাই নয়, দুই বার শেষ আটে খেলার অনবদ্য গৌরবও অর্জন করেছে। এটা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন। যদিও এই অর্জনটা একদিনে আসেনি। এ জন্য বাংলাদেশের মানুষকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ৪০ বছরেরও বেশি সময়। পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক কঠিন পথ ও পাহাড়-পর্বত। সে পথে মিশে আছে অনেক খেলোয়াড়ে ঘাম। সহ্য করতে হয়েছে অনেক পরাজয়ের জ্বালা। সেসব পরাজয়ের হাত ধরেই আজ বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে বিজয়ের পথে। সে দিনের সেসব মানুষগুলোর স্বপ্নের দল আজকের বাংলাদেশ দল।

বলা যায় গত একটা বছর বাংলাদেশের ক্রিকেটের সুবর্ণকাল। বাংলাদেশের ক্রিকেট এই এক বছরে অনেক সাফল্য পেয়েছে। আর সে সাফল্যে এগিয়ে আছে একদিনের ক্রিকেট। এশিয়া কাপে অতটা ভাল করতে না পারলেও একদিনের ক্রিকেটে হোম সিরিজে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আগে জিম্বাবুইয়ে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জিতে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অভাবনীয় সাফল্যের পর পাকিস্তান, ভারত ও দ. আফ্রিকার বিপক্ষে আবার সিরিজ জয় বাংলাদেশের কেবল র‌্যাঙ্কিংয়েরই উন্নতি হয়েছে তাই নয়, বাংলাদেশকেও নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। এখন বাংলাদেশকে যে কোন দল সমীহ করে, সম্মানের চোখে দেখে। এক সময় ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে যাদের বাংলাদেশকে নিয়ে ব্যাঙ্গ-বিদ্রƒপ করাটাই অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল এখন তারাও বাংলাদেশের প্রশংসায় উচ্চকিত। মশগুল না হয়ে তো উপায় নেই। বাংলাদেশের ধারাবাহিক সাফল্যই তাদের ভোল পাল্টাতে, মুখ বন্ধ করতে বাধ্য করেছে। খেলা দিয়েই বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা তাদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে।

আগেই বলেছি বাংলাদেশের গত এক বছরের ধারাবাহিক সাফল্য বিস্ময়কর। এরই মধ্যে অনেকেই বাংলাদেশ দলের এই ধারাবাহিক জয়ের নেপথ্য কারণ খুঁজতে শুরু করেছেন। চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। নানা মুনির নানা মতে এখন মুখরিত বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন। তা যে শুধুমাত্র ক্রীড়াঙ্গনেই সীমাবদ্ধ আছে তা নয়। ছড়িয়ে পড়েছে চায়ের দোকান, অফিস, বন্ধুদের আড্ডায়ও। অনেকে এ নিয়ে অনেক গল্পও ফেদে ফেলছেন। অনেক গল্পের নৌকা আকাশেও উড়ছে। তবে যে যাই বলুক, বদলে যাওয়া এই বাংলাদেশের নেপথ্যে কিছু কারণ তো নিশ্চয় রয়েছে। এ নিয়ে ক্রীড়ামোদি পাঠকেরও কৌতূহলেরও কমতি নেই। ক্রীড়ামোদি পাঠকের কৌতূহল নিবৃত্তির লক্ষ্যে অনেকের সঙ্গে কথা বলে আমার যেটা মনে হয়েছে সেগুলোই এখানে তুলে ধরছি।

প্রথমে শুরু করতে হয় বাংলাদেশ দলের কোচিং স্টাফ নিয়ে। দলের প্রধান কোন চন্দ্রিকা হাতুরাসিংহের কথা দিয়েই শুরু করি। বাংলাদেশ এই প্রথমবার এমন একজন কোচ পেয়েছে যিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বোঝেন, ক্রিকেটের গভীরে যেতে পারেন। ঝিনুক খুঁজে খুঁজে যেমন মুক্তা বের করতে হয় তেমনি তিনিও খুঁজে খুঁজে ঠিক রতœটিকে তুলে আনতে পারেন। আজকের মুস্তাফিজ তারই খুঁজে বের করা এক রতœ। তিনি বুঝতে পারেন কাকে দিয়ে কাকে ঘায়েল করতে হবে। যুদ্ধে যেমন সঠিক সময়ে সঠিক অস্ত্র প্রয়োগ করতে হয় তেমনি তিনিও জানেন কোন সময়ে কোন অস্ত্রটি প্রয়োগ করতে হবে। কোন দলের বিপক্ষে চার পেসার লাগবে, কোন দলের বিপক্ষে চার স্পিনার লাগবে এ তারই চিন্তার ফসল। শুধু যে বোলিংয়ে তাই নয়। ব্যাটিংয়েও কখন কাকে নামাতে হবে সেটাও তাকে ভাবতে হয়। এর আগে বাংলাদেশের এমন পরিকল্পিত ক্রিকেট খুব কমই দেখা গেছে। তার সঙ্গে আছে কোচিং স্টাফ (বোলিং কোচ, ফিল্ডিং কোচ, ফিজিও), দলের ম্যানেজার, অধিনায়কসহ পুরো টিম ম্যানেজমেন্ট। আর ক্রিকেটের যে কোন সিদ্ধান্ত নেয় এই টিম ম্যানেজমেন্ট। ফলে সবার মতের ভিত্তিতে নেয়া সিদ্ধান্ত ভাল ফলই বয়ে আনে। এর আগে এমনটা খুব একটা হতো না। আগে দলের ডিসিশন মেকার থাকতেন একজন বা দু’জন। তারাই দলের যাবতীয় সিদ্ধান্তের ধারক-বাহক ছিলেন। দলের এই সাফল্যের জন্য দলের প্রধান কোচ চন্দ্রিকা হাতুরাসিংহে ও কোচিং স্টাফসহ এই টিম ম্যানেজমেন্টকে ধন্যবাদ দিতেই হবে।

এরপর অতি অবশ্যই আসে অধিনায়কের প্রসঙ্গ। বিশেষ করে ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ খ্যাত মাশরাফি বিন মর্তুজা ইনজুরি কাটিয়ে আবার যখন একদিনের ক্রিকেটের অধিনায়কের দায়িত্ব নিলেন তার পর থেকেই বাংলাদেশ দলের চেহারাই পাল্টে গেছে। এখন দলে আর কোন কোন্দল নেই, ছোট-বড় ভেদাভেদ নেই; সবার ভাবনা একটাই কীভাবে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। সে লক্ষ্যেই সবাই নিজের সেরাটা দিয়ে দলের জয়ে ভূমিকা রাখছে। আগে বাংলাদেশ দলে যেটা খুব কমই দেখা গেছে। দলের ভাল ফলাফলের নেপথ্যে এটাও একটা কারণ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে টিম স্পিরিট বা টিম কম্বিনেশন। এখন বাংলাদেশ দল একটি ঐক্যবদ্ধ দল। দলে কোন ভেদাভেদ, কলহ, মতবিরোধ, কোন্দল, দলাদলি আছে বলে শোনা যায় না। আর সেটা নেই বলেই সকলে মন-প্রাণ উজাড় করে খেলতে পারছে। কে ক্যাপ্টেন কে ক্যাপ্টেন নয় সেটা নিয়ে কেউ দল পাকাচ্ছে না। সেটি বাংলাদেশ কেন, যে কোন দলের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। আর এই প্রাপ্তিই বাংলাদেশকে এতদূর নিয়ে এসেছে এবং এটি যদি ধরে রাখতে পারে তাহলে আরও অনেকদূর নিয়ে যেতে পারবে বলে অনেকের ধারণা। এই কোচিং স্টাফ, এই অধিনায়ক এবং এই দল ও দলের টিম কম্বিনেশন যদি আগামী বিশ্বকাপ পর্যন্ত ধরে রাখা যায় তাহলে শেষ হাসি হাসাটা বোধকরি আমাদের জন্য অসম্ভব হবে বলে মনে হয় না।