২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শঙ্কায় সালমাদের পাকিস্তান সফর!

  • রোকসানা বেগম

পাকিস্তানে একের পর এক হামলায় আগেই বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেটারদের পাকিস্তান সফর নিয়ে ছিল দ্বিধাদ্বন্দ্ব। এবার তা শঙ্কায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তান গ্রেট ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরাম থেকে শুরু করে সরকারী পর্যায়ের উপর মহলের কর্মকর্তার যে হামলা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেটাররা কিভাবে থাকেন নিরাপদ? আর তাই এ সফর যে ঝুলে গেছে, তা বোঝাই যাচ্ছে।

একটি সম্ভাবনা অবশ্য ছিল। মহিলা ক্রিকেটারদের অনুশীলন ক্যাম্প যখন চলছিল, তখন বিসিবি থেকে জানা গিয়েছিল করাচি নয়, লাহোরে সালমা খাতুনদের খেলাতে চায় বিসিবি। যদি এরমধ্যে বড় ধরনের কোন জঙ্গী হামলা না হতো, তাহলে হয়ত ৩১ আগস্টই পাকিস্তান উড়াল দিত মহিলা ক্রিকেটাররা। কিন্তু সেই সম্ভাবনা এখন আর না থাকার মতোই। সরকার মহল থেকেও তো সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার ব্যাপার আছে।

সূচী অনুযায়ী আগস্টের ৩১ থেকে সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ পর্যন্ত বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দলের পাক সফরের কথা রয়েছে। পাকিস্তান মহিলা ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ও একটি টি২০ ম্যাচ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু সেই ২০১২ সাল থেকে যে হয় ছেলে, নয়ত মেয়ে, নয়ত বয়সভিত্তিক দলকে পাকিস্তানে খেলতে পাঠানোর চেষ্টা চালাচ্ছে বিসিবি, তা এবারও ভেস্তে যেতে পারে। এবারও যে সেই জীবন ঝুঁকি আছে।

বিসিবি’র প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন আগেই বলেছেন, ‘আমরা পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে খেলার ভেন্যু বদলানোর ব্যাপারটি জানিয়েছি। তারা করাচিতে সিরিজটি খেলার ব্যাপারে আগেই জানিয়েছিল। তবে আমি মনে করি লাহোরও অন্য একটি ভেন্যু হতে পারে। পাকিস্তানের সার্বিক নিরাপত্তা দেখতে শীঘ্রই একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর চেষ্টা করছে বিসিবি।’ সেই চেষ্টায় এখনও সাফল্যই ঠিকমত মিলছে না। সিরিজ হবে কখন?

পাকিস্তান সফর হোক না হোক, সালমা, পান্না, ফারজানা, রুমানা, জাহানারারা কিন্তু থেমে নেই। অনুশীলন করেই চলেছেন। অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ও নবেম্বর-ডিসেম্বরে টি২০ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে খেলার জন্য যে প্রস্তুত হতে হচ্ছে। প্রাথমিক দলে থাকা সালমা খাতুন, রিতু মণি, জাহানারা আলম, লিলি রানী বিশ্বাস, ফারজানা হক পিংকি, তিথী রানী সরকার, রুমানা আহমেদ, শামিমা সুলতানা (উইকেটরক্ষক), লতা ম ল, শারমিন সুলতানা, আয়েশা রহমান শুকতারা, রুবাইয়া হায়দার, পান্না ঘোষ, নিগার সুলতানা (উইকেটরক্ষক), শায়লা শারমিন, তাজিয়া আক্তার, ফাহিমা খাতুন, নাহিদা আক্তার, নাজহাত তাসনিয়া (উইকেটরক্ষক), শরিফা খাতুন, শারমিন আক্তার শুপ্তা, সুমনা আক্তার, সানজিদা ইসলাম, সুরাইয়া আজমিন, খাদিজাতুল কুবরা ও জান্নাতুল ফেরদৌসরা পুরোদমে তাই ফিটনেস ক্যাম্প করে গেছেন। এদের থেকেই এখন সেরা ১৫ জন ঘোষণা করা হবে। মূল স্কোয়াড নিয়ে ক্যাম্প শুরু হবে আজ।

এ বছরের অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে আসবে দক্ষিণ আফ্রিকা মহিলা ক্রিকেট দল। সফরে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৫টি ওয়ানডে ও ৩টি টি২০ ম্যাচ খেলবে সফরকারীরা। কক্সবাজারের শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, বিকেএসপি ও সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচগুলো। হোম সিরিজের পর নবেম্বরের শেষের দিকে ২০১৬ সালের টি২০ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব খেলতে ব্যাংকক যাবে বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দল। পাকিস্তানে যাওয়া হবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই। তবে এ সফর কিন্তু সবার ভেতরই কাজ করছে। ক্রিকেটারদের মধ্যে সার্বক্ষণিক পাকিস্তান সফর নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। কখন পাকিস্তানে হামলা হচ্ছে। কারা মারা যাচ্ছে। সব খবর রাখছে। যদি পাকিস্তানে যেতেই হয়, জীবন ঝুঁকি নিয়েই যে যেতে হবে।

বাংলাদেশের প্রধান কোচ শ্রীলঙ্কান চ্যাম্পিকা গামাগে বলেছেন, ‘আমরা ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছি। কন্ডিশনিং ক্যাম্পে এখন ক্রিকেটারদের ফিটনেস টেস্ট চলছে। আমি এই দল নিয়ে সন্তুষ্ট। সিনিয়র খেলোয়াড়দের পাশাপাশি জুনিয়র খেলোয়াড়দের এখানে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ক্রিকেটাররা অনেকদিন খেলার বাইরে ছিল। তাই এখানে ফিটনেসের ব্যাপারটাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।’ গামাগের কাছে পাকিস্তান কেন কোথাও যেতে সমস্যা নেই। পেশাদার কোচ। যেখানে বিসিবি সিরিজ আয়োজন করবে, সেখানেই যাবেন গামাগে। তবে ক্রিকেটারদের মাঝে আছে পাকিস্তান সফর নিয়ে ভয়। অধিনায়ক সালমা খাতুনই যেমন বলেছেন, ‘ভয় তো আছেই। সাধারণ মানুষেরও ভয় কাজ করে, আমাদের তো করবেই।’ এরপরও বলছেন, ‘বিসিবি বললে যেতে হবেই।’

তাদের ভেতর এ ভয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে সম্প্রতি ওয়াসিম আকরামের ওপর হামলা। সালমা যেমন জানালেন, ‘ওয়াসিম আকরামের মতো ক্রিকেটারের ওপর হামলা হয়েছে কিছুদিন আগে। তাতে বোঝাই যাচ্ছে সেখানকার নিরাপত্তার অবস্থা কেমন। আমরা আশা করছি বিসিবিও ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেবে।’ ভিনদেশী কোচ গামাগেও শেষপর্যন্ত বলেছেন, ‘বিসিবি নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেবে। কারণ কিছুদিন আগেও ওয়াসিম আকরামের ওপর হামলা হয়েছে।’ ওয়াসিম আকরাম কেন, পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক যে দলই খেলতে যায়, তাদের ওপরই হামলা হয়। ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের ওপর জঙ্গী হামলা হয়। এরপর প্রায় ৬ বছর টেস্ট খেলুড়ে কোন দলই পাকিস্তানে সিরিজ খেলতে যায়নি। অবশেষে জিম্বাবুইয়ে গিয়েছে। কিন্তু তারাও বিপত্তির মধ্যেই পড়েছিল। জিম্বাবুইয়েকে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল’ নিরাপত্তাই দেয়া হয়েছিল। বুলেট প্রুফ গাড়িতে হোটেল থেকে মাঠ, মাঠ থেকে হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপরও যখন সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে চলে, এমন সময় লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের বাইরে আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়। ক্রিকেটারদের ওপর কোন আঘাত আসেনি। তবে হামলায় একজন সাব-ইন্সপেক্টরসহ ২ জন নিহত হন। এরপর জিম্বাবুইয়ে ক্রিকেটাররা তৃতীয় ওয়ানডের আগে আর মাঠেই যায়নি। সিরিজ শেষ করেই নিজ দেশ চলে যায়। তবে এ হামলা আবারও বিশ্ব ক্রিকেটকে পাকিস্তানে যাওয়া নিয়ে ভাবিয়ে তোলে।

সেই লাহোরেই বিসিবি চাচ্ছে বাংলাদেশের মহিলা ক্রিকেটাররা পাকিস্তান মহিলা ক্রিকেটারদের সঙ্গে সিরিজ খেলুক। সরকারের গ্রীনসিগনেল পেলেই নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক দল পাঠানো হবে। বাংলাদেশের একটি ক্রিকেট দলকে পাকিস্তান সফরে নিতে কয়েক বছর ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। এক্ষেত্রে বারবারই প্রধান বাধা হয়ে এসেছে দেশটির নিরাপত্তা ইস্যু। যা এখনও বিদ্যমান। যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক থাকে তাহলে বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দলকে পাকিস্তানে পাঠানোর চেষ্টা করছে বিসিবি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলে পাকিস্তান সফরের আগে সেখানে পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে বিসিবি। এমনটিই জানিয়েছিলেন বিসিবির মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস। তিনি জানান, ‘আমরা আমাদের মেয়েদের কোনভাবেই ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেব না। নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক দলের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সবকিছু চূড়ান্ত করা হবে। এ মাসের মাঝামাঝি সময় নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক দল আমরা পাঠাব। যদি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেয় তাহলেই পাকিস্তানে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক দল যাবে।’ এরআগেও ২০১২ সালে একবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক দল পাকিস্তানে গেছে। কিন্তু সেবার আর সিরিজটি হয়নি। এবার দেখা যাক, সালমাদের সফর ঝুঁকিপূর্ণ পাকিস্তানে হয় কি না। এখন পর্যন্ত যে অবস্থা, তাতে শঙ্কায় আছে এ সফর।