২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘একটা বিশ্বকাপ জিততে পারলে দারুণ হতো’

  • মোঃ নুরুজ্জামান

প্রশ্ন ॥ ক্যারিয়ারে এত এত প্রাপ্তি আপনার, তবু বিদায় বেলায় কোন অপূর্ণতা-হতাশা কাজ করে?

সাঙ্গাকারা ॥ একটা ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিততে পারলে দারুণ হতো। দুবার ফাইনাল খেলেও (২০০৭ ও ২০১১) পারিনি। দেশের বাইরে আরও কিছু টেস্ট জিততে পারলে ভাল লাগত; বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে। ইংল্যান্ডকে তাদের মাটিতে হারানোর স্বপ্নটা অবশ্য পূরণ হয়েছে গত বছর। আমার ক্যারিয়ারের সেরা সিরিজ সেটি। আরও অনেক কিছুই আছে, পেলে ভাল লাগত। কিন্তু খেলাটাই এমন, সব পাওয়া সম্ভব হয় না। প্রত্যেকের জীবনে আক্ষেপ-হতাশা থাকবে এটা স্বাভাবিক। জীবনের অংশ। তার মানে এই নয় যে, বছরে পর বছর সেটা ভেবে কষ্ট পেতে হবে। যা পেতে পারতেন, তা নয় বরং যা পেয়েছেন সেটি নিয়েই সুখী হতে হয়।

প্রশ্ন ॥ একটু যদি বুঝিয়ে বলেন...

সাঙ্গাকারা ॥ চাইলে অনায়াশে আরও কয়েক বছর, অন্তত দুই বছর চালিয়ে যেতে পারতাম। তাতে কম করে ১০০০ রান যোগ হতো। অবশ্যই ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের মালিক বনে যেতে পারতাম। গড়তে পারতাম সর্বোচ্চ ডাবল সেঞ্চুরিসহ আরও দারুণ কিছু রেকর্ড, হয়ে যেত ৪০টির বেশি টেস্ট সেঞ্চুরিও। এসব ভাবলে আপনার ভেতরে একধরনের লোভ কাজ করবে। কিন্তু ক্রিকেট এমন এক খেলা যেখানে ব্যক্তিগত লোভের স্থান নেই। সবার আগে দেশ। দেশের প্রয়োজনে নিজেকে উজার করে দিয়েছি, যা পেয়েছি তা নিয়ে সন্তুষ্ট আমি। এখন তরুণদের উঠে আসার সময়। বাবার সঙ্গে আলোচনা করলাম, বুঝলাম অবসরের পর আরও একটা জীবন আছে।

প্রশ্ন ॥ শ্রীলঙ্কা দলে প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আপনি কতটা সুখী?

সাঙ্গাকারা ॥ ক্যারিয়ার নিয়েই গর্বিত আমি। সচেয়ে বেশি গর্বিত শ্রীঙ্কার হয়ে খেলতে পেরে। এমন একটি দল যেখানে অর্জুনা রানাতুঙ্গা, সনাথ জয়সুরিয়া, মুত্তিয়া মুরলিধরনের মতো কিংবদন্তির জন্ম হয়েছে। ছিল চামিন্দা ভাস, রঙ্গনা হেরাথÑ ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটা দলকে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি। এটা খুবই সৌভাগ্যের। দেশের জার্সি পরে মাঠে প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে খুশি আমি। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়, গত বছর বাংলাদেশে টি২০ বিশ্বকাপ জয় অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। তার সঙ্গে কি ওয়ানডের তুলনা চলে? দুটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেও যে শিরোপা ছোঁয়া হয়নি!

প্রশ্ন ॥ অবসরের সিদ্ধান্ত নেয়াটা কি সহজ ছিল?

সাঙ্গাকারা ॥ কয়েক বছর আগের ঘটনা, বাবা একদিন ডেকে বললেন, অবসর নিয়ে ভাবা উচিত। আমি তো অবাক, বলে কি! বয়স ৩২-৩৩, খেলাটা দারুণ উপভোগ করছি, ব্যাটে রান আসছে, আর বাবা কি না অবসর নিয়ে ভাবতে বলছেন। নিজেকে প্রশ্ন করলাম, আমি কি যথেষ্ট ভাল খেলছি না? উত্তর পেতে দেরি হলো না। ২০১২-২০১৩ মৌসুমে যখন ইনজুরিতে পরলাম, উত্তরটা নিজেই পেয়ে গেলাম। দীর্ঘদিন খেলার ধকল কিভাবে শরীরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে তা টের পেতে শুরু করলাম। মনে বাজল, বাবা হয়ত ঠিকই বলেছেন! মাঝে আরও কয়েক বছর কেটে গেল। বোর্ড ও ভক্তদের উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়াটা সহজ ছিল না। কিন্তু এটাই সত্য।

প্রশ্ন ॥ কিন্তু শ্রীলঙ্কান বোর্ড (এসএলসি) এবং দেশের মানুষ চাইছিল আপনি আরও কিছুদিন খেলে যান...

সাঙ্গাকারা ॥ আগের নির্বাচক কমিটির সঙ্গে কথা হয়েছিল। আমি চেয়েছিলাম, গত বিশ্বকাপ শেষেই বিদায় নিতে। কিন্তু তারা চেয়েছিল, আরও কিছুদিন টেস্ট খেলে যাই। আমি তাদের বলেছিলাম, আমার পক্ষে আর দুই ভাগে দুটি করে টেস্ট খেলাই সম্ভব (পাকিস্তানের বিপক্ষে ছিল দুটি, চলতি ভারত সিরিজে দুটি)। আমার অন্য জায়গায় বাধ্যবাধকতা আছে (সারের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেটে)। আমি তাদের বলেছিলাম, এটা সম্ভব হলে চালিয়ে যেতে পারি, নইলে কোন সমস্যা নেই। বিশ্বকাপ শেষেই অবসর নেব। তারা রাজি হয়েছিলেন। এজন্যই দুই সিরিজে দুটি করে টেস্ট খেলা। মুত্তিয়া মুরলিধরনের কথা খুব মনে পড়ে...।

প্রশ্ন ॥ সেটা কি রকম?

সাঙ্গাকারা ॥ ২০১০ সালে মুরলির শেষ টেস্টে আমিই অধিনায়ক ছিলাম। জীবনের শেষ ম্যাচে ৮ উইকেট নিয়ে ৮০০ শিকারের বিরল কীর্তি গড়েছিল ও। অনুরোধ জানিয়েছিলাম, এমন ফর্ম নিয়ে আরও কিছুদিন খেলে গেলে হয় না? দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সে বলেছিল, এভাবে ম্যাচ প্রতি ৮টি করে উইকেট পেলে সাড়ে ৮শ’ বা ৯শ’ উইকেট হতেও খুব বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, একটা সময় তোমাকে ‘গুডবাই’ বলতেই হবে, পরিবার ও দেশের জন্য মঙ্গলজনক হয় আমাকে সেটাই করতে হবে। নতুনরা উঠে আসবে, তারা দীর্ঘদিন দেশের সেবা করবে, তাদের সেই সুযোগটা তো আমাকেই করে দিতে হবে। ওর কথগুলো আমাকে সেদিন খুব ভাবিয়ে তুলেছিল। এখন বাবা ঠিক সেটিই বললেন, জীবনে নিজের প্রপ্তি নিয়ে তৃপ্ত হওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।