২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গুলশান-বনানী লেকের দখল দূষণ থামছেই না

  • পানিতেও অক্সিজেনের মাত্রা অনেক কম

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানীর অভিজাত এলাকা বলে পরিচিত গুলশান লেকের পানিতেও এখন অক্সিজেনের মাত্রা অনেক কমে গেছে। এছাড়াও দখল দূষণে লেকটির আয়তন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। শতকোটি টাকা ব্যয়ের পরও গুলশান-বনানী লেকের দূষণ-দখল অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেছে পরিবেশ সংগঠন পবা।

বুধবার সংগঠনের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক দূষণের প্রাপ্ত ফলাফল ও দখল-ভরাটের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ২শ’ একর আয়তনের দুটি লেকের প্রায় ২০ স্থানের পানি পরীক্ষা করে দেখা গেছে অক্সিজেনের মাত্রা অনেক নিচে নেমে এসেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ ভূপৃষ্ঠস্থ পানির মানমাত্রা মৎস্য চাষে ব্যবহার্য এবং বিনোদনমূলক কার্যে ব্যবহার্য প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন ৫ বা তদুর্ধ ও পিএইচ ৬.৫-৮.৫ থাকতে হবে।

অথচ গুলশান লেকে পানি পরীক্ষায় ফলাফলে দেখা যায় গুলশান ১ ব্রিজের নিচে লেকের পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ রয়েছে প্রতি লিটারে ০.২৫-১.৪৪ মিলিলিটার। গুলশান ১ এর ৮ নম্বর রোড এলাকায় ০.৪৭-২.৪৯, ১৩ নম্বর রোডে ০.২৩-৪.৫৯, টিভি গেট ১নং ঘাট এলাকায় ০.২৭-৪.৫১, বাদলের ঘাট এলাকায় ০.২৪-৩.৯৮, আমজাদের ঘাট এলাকায় ০.৭৬-৪.০৯, গুলশান-বনানী সংযোগ সেতু এলাকায় ০.৬৬-৪.৭৬, এয়ারটেল অফিসের সামনে ০.৪৪-২.৪৪, গুলশান-২ এর ১৮ নম্বর রোডে ১.১৪-২.৬৩ মিলিগ্রাম। গুলশান-বারিধারা লেকের গুলশান ১, ১৩৫ নম্বর রোড় এলাকায় ১.১৯-৪.৬৬, বাড্ডা হাইস্কুল এলাকায় ০.৭৫-৫.২৩, গুদারা ঘাট এলাকায় ০.৫২-৫.২৪, ৭নং রোডের মাথায় ০.২৯-১.১৭, উত্তর বাড্ডা মধ্য রাস্তায় ০.২৫-৪.০৬, শাহজাদপুর ১.৩৯-৩.৯৮, বিশতলা বিল্ডিংয়ের বিপরীত পাশে ১.১০-৪.৯৫, গুলশান ২ ব্রিজের নিচে ০.৯৯-৩.০০, গুলশান নার্সারি এলাকায় ২.১৫-৩.৯০, কালাচানপুর ড্রেনের মুখে ০.২৫-০.৪০) মিলিগ্রাম। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় রাজউক ১৯৬১ সালে গুলশান মডেল টাউন প্রকল্প গ্রহণ করে। একই সময়ে বনানী-বারিধারা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্প দুটিতে দুটি লেক রয়েছে। একটি হচ্ছে বনানী মডেল টাউন ও গুলশান মডেল টাউনের মধ্যে। অপরটি গুলশান মডেল টাউন ও বারিধারা মডেল টাউনের মধ্যে। লেক দুটির আয়তন ২০০ একর। এর শতকরা ৬০ ভাগ হচ্ছে গুলশান বারিধারা লেক এবং ৪০ ভাগ হচ্ছে গুলশান বনানী লেক।

সংবাদ সম্মেলনে পবার নির্বাহী পরিচালক ও পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক আব্দুস সোবাহান বলেন, সংগঠনের পক্ষ থেকে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে গুলশান লেকের পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন ও পিএইচ নিয়মিতভাবে পরীক্ষা এবং দখল ও ভরাট পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে। পর্যবেক্ষণকালে দেখা যায় যে, বনানী, গুলশান, বারিধারা, বাড্ডা, কালাচানপুর এলাকার গৃহস্থালী বর্জ্য, পুরাতন বিল্ডিংয়ের ভাঙ্গা অংশ, বিল্ডিং মেরামত ও পুনঃসংস্কার থেকে সৃষ্ট বর্জ্য লেকে ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। এছাড়াও গাছ লাগিয়ে, নার্সারি গড়ে তুলে, চায়ের দোকান দিয়ে, বাঁশের ঘর ও আধা পাকা ঘর তুলে দখল করা হচ্ছে। করাইল বস্তি এলাকায় ভরাট ও দখলের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। অনেক কাঁচা ল্যাট্রিন রয়েছে ও বস্তি এলাকার পয়ঃবর্জ্য সরাসরি লেকে ফেলা হচ্ছে। বনানী, গুলশান, বারিধারা, বাড্ডা, কালাচানপুর এলাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনের কোন ব্যবস্থা নেই। পয়ঃবর্জ্য সেপটিক ট্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধনের নিয়ম থাকলেও এসব এলাকার বাড়ির মালিকগণ তাদের পয়ঃবর্জ্য লেকে ফেলছেন। শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অপরিশোধিত বর্জ্যও লেকে ফেলা হচ্ছে। পর্যবেক্ষণকালে লেকে প্রচুর পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য এবং মরা মাছ ভাসতে দেখা যায়।

তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে সরকারী ও বেসরকারীভাবে দখল ও ভরাটের ফলে লেক দুটির আয়তন কমে অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে পয়ঃবর্জ্য, গৃহস্থালী বর্জ্য, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্য এবং শিল্প বর্জ্য ফেলার ফলে লেক দুটি অত্যন্ত দূষিত হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর অভিজাত এলাকা হিসেবে খ্যাত গুলশানের লেকটি কখনও সরবে, কখনও নীরবে ক্ষতির শিকার হচ্ছে। দখল দূষণের কাছে পরাজয় মানছে জলাশয়টি। দিনের পর দিন এর দুই পাড় অবৈধ দখলের কারণে মূল লেকটি সঙ্কুচিত হয়েছে। দুই পাড়ের অধিবাসীদের অনেকেই গৃহস্থালী বর্জ্য ফেলে লেকটি প্রায় একটি ভাগাড় বা নর্দমায় পরিণত করে চলেছেন। বাসাবাড়ি থেকে লেক ও লেক পাড়ে ময়লা-আবর্জনা প্রতিনিয়ত ফেলা হচ্ছে। বাসাবাড়ির ময়লাসহ বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীর প্লাস্টিক মোড়ক ও বোতলে ভরপুর হচ্ছে লেক। এসব বর্জ্যে পানি স্বাভাবিক রংও হারিয়ে ফেলেছে।