২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রফতানিতে যুক্ত হচ্ছে চামড়াজাত পণ্য

এম শাহজাহান ॥ দুনিয়া সেরা চামড়ার পাদুকা তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে। বিক্রি হয় ডলারে। ইউরোপ-আমেরিকার সেরা ব্র্যান্ডের পাদুকার শো’রুমগুলোতে থরে থরে সাজানো জুতাগুলো এখন তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশেই। গার্মেন্টসের পর রফতানিতে এবার দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে চামড়া ও চামড়াজাতপণ্য। উৎপাদিত পাকা চামড়ার ৫০ ভাগ ব্যবহার হচ্ছে অভ্যন্তরীণ মার্কেটে। এ শিল্পের বিদেশী উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের পরবর্তী গন্তব্য হচ্ছে বংলাদেশ। এ কারণে পাদুকা শিল্পে বাড়ছে যৌথ বিনিয়োগ। এ শিল্প বিকাশে পর্যাপ্ত চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, জুতা তৈরির জন্য যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ও রফতানিতে নগদ সহায়তা দিয়েছে সরকার। চামড়া শিল্প উন্নয়নে রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্প নগরী গড়ে তুলতে আগামী বছরের মার্চ মাসের মধ্যে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তরের তাগিদ দিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব উদ্যোগের ফলে রফতানি বাণিজ্যে চামড়া শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাচ্ছে।

জানা গেছে, চামড়া শিল্পের ৯০ শতাংশ কাঁচামাল দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। পাদুকা ও অন্যান্য পণ্য তৈরিতে উৎপাদিত পাকা চামড়ার মাত্র ৫০ শতাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে। ওই হিসেবে চামড়ার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকাশিল্পের প্রসার পাঁচ গুণ বাড়ানো সম্ভব। রফতানিতে চামড়া শিল্পের অবস্থান এখন দ্বিতীয়।

জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে লেদার গুডস এ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স এ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের উপদেষ্টা হাজী বেলাল হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, প্রতিবছর পাদুকা শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ছে। আশার খবর হলো, বিদেশীরা এ শিল্পে বিনিয়োগে উৎসাহিত হচ্ছেন। তিনি বলেন, এরই মধ্যে অন্তত ৫৫টি প্রতিষ্ঠান যৌথ বিনিয়োগের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। শুধু তাই নয়, জুতা প্রস্তুতকারী দেশ চীন এখন বিশ্ববাজার থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে। আর আমাদের দেশ এখন বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগ পাওয়ার জন্য। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বিশ্ব পাদুকা শিল্পে নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ।

এদিকে, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১২-১৩ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছিল ৫৬ কোটি ১০ লাখ ডলার। অন্যদিকে পাদুকা রফতানি থেকে আয় হয়েছে ৪১ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ ওই সময় দেশের সার্বিক চামড়া খাতের রফতানি আয় হয় ৯৮ কোটি ডলারের কিছু বেশি। আর গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও চামড়ার জুতা বিদেশে পাঠিয়ে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ১২৯ কোটি ডলার। অর্থাৎ রফতানি প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরেও এই ধারা অব্যাহত থাকে।

বাংলাদেশের চামড়া শিল্প পোশাক খাতের চেয়েও এগিয়ে আছে বলে মনে করেন এ খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ ট্যানার্স এ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, বেশির ভাগ ট্যানারি মালিকের পাদুকা শিল্পের কারখানা রয়েছে। এখন ফিনিশড লেদারের চেয়ে আমরা পাদুকা রফতানির বিষয়টি ভাবছি। এজন্য এ শিল্পে নতুন উদ্যোক্তারাও এগিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, গার্মেন্টস শিল্পের চেয়ে পাদুকা শিল্প ভাল অবস্থায় রয়েছে। এমন মসৃণ গ্রেইনের চামড়া আর কোথাও নেই। পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা শুরুতে বিদেশী অর্ডার পেতেন কিন্তু ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ছিল না। কিন্তু চামড়া শিল্পের ক্ষেত্রে র ম্যাটেরিয়াল বা কাঁচা চামড়া, প্রক্রিয়াকরণের কারখানা প্রচুর রয়েছে। অর্থাৎ চামড়ার জুতা তৈরির সব ধরনের সুবিধাই দেশে রয়েছে। তৈরি হচ্ছে দুনিয়া সেরা পণ্য।

জানা গেছে, চামড়ার জুতা উৎপাদনকারী প্রধান দেশ চীন, ভিয়তেনাম এবং ব্রাজিল এ খাত থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। এ কারণে গার্মেন্টস শিল্পের পর চামড়া শিল্পেই এখন বিদেশি বিনিয়োগ আসার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত। লেদারখাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশে বর্তমানে ১১৫টি রফতানিমুখী কারখানায় চামড়ার পাদুকা তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে এপেক্স, এফবি, পিকার্ড বাংলাদেশ, জেনিস, আকিজ, আরএমএম বেঙ্গল এবং বে’র রয়েছে নিজস্ব ট্যানারি ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। এর বাইরে শুধু চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে এমন কারখানার সংখ্যা ২০৭টি। বিশ্বে পাদুকা বাজারে বাংলাদেশ তুলনামূলক নতুন হলেও কাঁচা চামড়া রফতানি করে আসছে প্রায় চার দশক ধরে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কাঁচা চামড়া বা ওয়েট ব্লু-লেদার এবং প্রক্রিয়াজাত করা চামড়া ক্রাস্ট লেদার রফতানি হতো বেশি। আর এখন বেশি রফতানি হয় ফিনিশড লেদার।

জানা গেছে, পাদুকা রফতানির ক্ষেত্রে ১ লাখ ডলারের বেশি রফতানিতে সরকার ১৫ শতাংশ নগদ সহায়তা দিচ্ছে। পাশাপাশি আছে ট্যাক্স হলিডে সুবিধা। জুতার তলা, জুতা বানানোর আঠাসহ ছোটখাটো অন্যান্য সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে।

জানা গেছে, বিশ্ব সেরা জুতা তৈরির কারণে প্রতিবছর বাড়ছে পাদুকা রফতানি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশে পাদুকা রফতানিতে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা রয়েছে। বিশ্বখ্যাত অনেক জুতা বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের জন্যই এখন পাদুকা তৈরি করছে দেশীয় একাধিক প্রতিষ্ঠান। এ প্রসঙ্গে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান শুভাশিষ বসু জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের প্রধান ছ’টি রফতানি খাতের মধ্যে অন্যতম চামড়া শিল্প। বর্তমানে এ খাতের শতভাগ উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বিশে^ চামড়া শিল্পের ২১৪ বিলিয়ন ডলারের বাজারে বাংলাদেশ থেকে ০.৫ শতাংশের মতো মাত্র রফতানি হচ্ছে। তবে পরিকল্পিত রোডম্যাপ তৈরি ও তা বাস্তবায়ন করা গেলে দেশে পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলা সম্ভব হবে এবং বাড়বে রফতানি বাজারও। তিনি বলেন, বর্তমানে চামড়া শিল্পে ২২০টি ট্যানারী চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে ৩ হাজার ৫০০ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং ১১০টি মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প জড়িত রয়েছে।