১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তৎপরতা অশুভই

দেশে বর্তমানে এমন কী পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে যে, সংবিধান সংশোধন করতে হবে এবং তা হতে হবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য। ভাবটা যেন, এখন সেই ভারসাম্য নেই। এজন্য সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের জজবা তুলছেন, সংবিধান বিষয়ে যারা অজ্ঞ এবং সেই পরিচয় তাদের বক্তব্যেই মেলে। গত শতকের নব্বই সালের তিন জোটের রূপরেখানুযায়ী দেশে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তন এনে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। ১৯৯১ সালে এজন্য সংবিধান সংশোধন করা হয় সর্বসম্মতভাবে। এতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নির্ধারণ করা আছে। এমনকি কার্যক্রমও নির্ধারিত। সংসদীয় পদ্ধতি চালুর পর বর্তমানে পঞ্চম সংসদ চলছে। সংসদে কখনও আলোচনা হয়নি বা নোটিসও আসেনি উভয়ের ক্ষমতায় ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে বলে। কিংবা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে প্রদানের প্রসঙ্গও নয়। কারণ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে এমন কোন বিরোধ দেখা দেয়নি যে, এখন ক্ষমতা পরিবর্তন করতে হবে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়াতে গেলে এই পদে সরাসরি নির্বাচন হতে হবে। তেমনি চালু হবে দ্বৈত শাসন। এ দেশের সংসদই নির্বাচন করে রাষ্ট্রপতি, যা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত। আজ হঠাৎ করে সংবিধান সংশোধনের জন্য বৈঠক করা, গণমাধ্যমে আওয়াজ তোলাÑ এসব করছেন কারা? ওনাদের সাকিন, মৌজা, ঠিকুজির হদিস খুঁজলে দেখা যাবে, এরা নিজেরাই গণতন্ত্রের চর্চা করেন না। এমনকি একেকজন একই প্রতিষ্ঠানে কুড়ি বছরের বেশি স্বপদে বহাল থেকে দ-মু-ের কর্তা বনে আছেন। কেউ একাত্তরে পাকিস্তানীদের সহযোগী ছিলেন। কেউ আইয়ুব-মোনেমের ছাত্র সংগঠনে সম্পৃক্ত থেকে তাদের চিন্তাধারায় উজ্জীবিত, কেউ এনজিওর অর্থে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন, কেউ পাকিস্তান যুগের সিএসপিÑইত্যাকার নানাজনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ১৩ সদস্যের উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ হঠাৎ হাওয়ার মতো ঝটিকা বেরিয়ে এসে নয়া এক ফর্মুলা হাজির করলেন বলা নেই, কওয়া নেই, এক মতবাদ। সম্ভবত অনেক গবেষণা, অনুসন্ধান, আলাপ-আলোচনা চালিয়ে আবিষ্কার করলেন ‘সংসদীয় পদ্ধতি নয়, রাষ্ট্রপতি শাসন’ চালু করা দরকার। তাতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত বাড়বে। আর এতে তাদের কেল্লা ফতে হবে। অতএব, দাবি তুললেন এই ‘আনলাকি থার্টিনরা, করো হে সংবিধান সংশোধন। আর তা করার জন্য করো হে সংস্কার কমিশন।’ সেই কমিশনে নিজেরাও থাকবেন কিনা তা না বললেও প্রকাশ ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছেন; তাদের মতবাদ সামনে রেখে সংস্কার করতে হবে। হয়ত কমিটি কাদের নিয়ে হবে সে নির্দেশনাও দেবেন। এরা অনেকটা ঘোড়া ডিঙ্গিয়ে ঘাস খাওয়ার ঢংয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ বনে গেছেন। অথচ তাদের জানা সঙ্গত যে, সংবিধান নিয়ে নাড়াচাড়া, সংশোধন করার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে, জাতীয় সংসদ। সুতরাং তারা তাদের অলীক স্বপ্নে পাওয়া মতবাদ নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হতে পারেন এবং নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদে দাবি তুলতেই পারেন। হওয়া তো উচিত তাই। কিংবা তারা পারেন বর্তমান সাংসদদের প্রভাবিত করে সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল পেশের জন্য তৎপরতা চালাতে। কিন্তু তারা কি আদৌ তা চান? একবাক্যে বলা যায়, ‘না’। তারা চান রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পদকে একদিকে বিতর্কিত করা, সংবিধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং অপরদিকে বিএনপি-জামায়াত জোটের জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদী হিসেবে জনমনে চিহ্নিত হয়ে থাকা বিষয়টি মুছে দিতে। তাই পেট্রোলবোমা মেরে জীবন্ত মানুষ হত্যাকারীদের সঙ্গে শেখ হাসিনাকে বৈঠক করতে দাবি জানান তারা। জঙ্গীবাদকে নির্মূল নয় বরং জঙ্গী নেত্রীকে সমাজ জীবনে, রাজনৈতিক জীবনে পুনর্প্রতিষ্ঠিত করতে তাদের এই অপতৎপরতা। এদের উদ্দেশ্য মহৎ, এ কথা কোনভাবেই বলা যায় না এদের অতীত ভূমিকার কারণে। গত জানুয়ারি থেকে খালেদা-জামায়াত জোট যখন জীবন্ত মানুষ হত্যা শুরু করে, তখন এই উদ্বিগ্ন নাগরিকদের আবির্ভাব। তারা ১৩ জনের কমিটি গঠন করে তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন চান। কিন্তু গণমাধ্যমে সমালোচিত হওয়ার পর আত্মগোপনে যান। এখন আবার নতুন করে আবির্ভূত হয়েছেন তারা। অনির্বাচিত সরকার গঠন এবং তা দীর্ঘমেয়াদে প্রলম্বিত করাই তাদের লক্ষ্য। যেমনটা উদ্দিন শাসনকালে ড. কামাল হোসেনরা চেয়েছিলেন। সেই পথ ধরে আনলাকি থার্টিনরা জনসমক্ষে হাজির হয়েছেন নয়া তত্ত্ব নিয়ে। তাদের এই অশুভ তৎপরতা জনরোষে বিলীন হবেই। দেশ ও জাতির স্বার্থে এদের অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ সঙ্গত।