২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এরা, কারাগারেই পাঁচ শ’

  • দেশে অবৈধ বিদেশী নাগরিক দুই লাখ;###;এদের মাধ্যমে অর্থও পাচার হচ্ছে;###;ডাটাবেজ তৈরি ও ভিসা কড়াকড়ির উদ্যোগ

তৌহিদুর রহমান ॥ সুদানের নাগরিক মেফেজা জিয়েন আলেক্সান্ডার ও উকান্ডার বেনকো বাংলাদেশে থেকে জাল ডলার তৈরি করতেন। গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর তাদের দু’জনকে চট্টগ্রামের একটি বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশের জন্য তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে পুলিশ। প্রায় ১০ মাস মামলা চলার পরে গত ২৮ জুলাই এই দুই অবৈধ নাগরিককে কারাদ- দিয়েছে চট্টগ্রামের একটি আদালত। মেফেজা জিয়েন ও উকান্ডা বেনকোর মতো অনেক অবৈধ বিদেশী নাগরিকই বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। এদের অনেকেই আবার জেলে রয়েছেন। তবে এসব অবৈধ বিদেশী নাগরিকদের বিষয়ে ধীরে ধীরে কঠোর হচ্ছে সরকার।

বর্তমানে প্রায় দুই লাখ অবৈধ বিদেশী নাগরিক বাংলাদেশে বসবাস করছেন। বিভিন্ন সময়ে এসব নাগরিক নানা ধরনের অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছেন। এছাড়া এসব অবৈধ বিদেশীদের আয় করা অর্থ অবৈধভাবেই বিদেশে পাচার হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে সকল বিদেশী নাগরিকদের শনাক্তের লক্ষ্যে একটি ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এছাড়া আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য এখন ভিসা কড়াকড়ি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান জনকণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশে কিছু বিদেশী নাগরিক আছেন, আইনের ভাষায় তারা অবৈধ। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এসব নাগরিকের বিষয়ে অনেক তথ্য উঠে এসেছে। এমনও দেখা গেছে কোন কোন বিদেশী নাগরিক এদেশে এসেছিলেন তিন মাসের জন্য, তবে এক বছর হয়ে যাওয়ার পরেও তারা ফেরত যাননি। আবার এদেশে থাকার জন্য তারা যৌক্তিক কারণও দেখাতে পারেন না। সেক্ষেত্রে এসব বিদেশী নাগরিককে তাদের দেশে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করি। এছাড়া এসব বিদেশী নাগরিকের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থাও নেয়া হয়।

৫০২ অবৈধ বিদেশী নাগরিক কারাগারে ॥ চলতি মাসের ১১ আগস্ট পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী দেশের কারাগারে ৫০২ জন অবৈধ বিদেশী নাগরিক আটক রয়েছেন। আটককৃত বিদেশী নাগরিকদের মধ্যে মিয়ানমারের সর্বাধিক নাগরিক রয়েছে। দেশের বিভিন্ন কারাগারে মিয়ানমারের রয়েছে ২৩৭ জন নাগরিক। মিয়ানমারের পরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশের কারাগারে আটক রয়েছেন। ভারতের রয়েছে ২০২ জন নাগরিক। এছাড়া পাকিস্তানের রয়েছে ৪৪ জন, তানজানিয়ার তিন জন, নাইজিরিয়ার ১০ জন, মালয়েশিয়ার একজন, ক্যামেরুনের তিন জন, পেরুর একজন ও আলজেরিয়ার একজন।

অবৈধ বিদেশী নাগরিক প্রায় দুই লাখ ॥ বাংলাদেশে অবৈধ বিদেশী নাগরিকের সংখ্যার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, এই সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এর বাইরে আরও প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। এদিকে বিনিয়োগ বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ হাজার ১৮৩ জন বিদেশী নাগরিক বৈধভাবে কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশে বাণিজ্যিক খাতে বিদেশী কোম্পানির শাখা, লিয়াজোঁ ও প্রতিনিধি অফিস এবং স্থানীয়ভাবে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ৪ হাজার ৩২৯ জন বিদেশী কর্মীর জন্য নতুন কর্মানুমতি দেয়া হয়েছে। আরও ৪ হাজার ৬০৯ জন বিদেশ কর্মীর অনুকূলে কর্মানুমতির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া ৩৫০ জন বিদেশ কর্মীর কর্মানুমতি পত্র বাতিল করা হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ভারত, চীন, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন্স, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া, ডেনমার্ক এবং স্পেনের বিদেশী কর্মীরা শিল্প এবং বাণিজ্যিক খাতে কর্মরত রয়েছেন।

ঠেকানো যাচ্ছে না আফ্রিকানদের ॥ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অনেক নাগরিকই অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তবে আফ্রিকার এসব দেশের নাগরিকরা যেন সহজেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে ইতোমধ্যেই সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এসব দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য আগমনী ভিসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আবার আফ্রিকার অনেক দেশ থেকে বিশ্ব ইজতেমার সময় বাংলাদেশে আসেন। এসব নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে থেকে যান। আফ্রিকার অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশের জীবনমান উন্নত হওয়ায় এসব দেশের নাগরিকরা বাংলাদেশকে বেছে নেন। সে কারণে এসব দেশের নাগরিকদের দেখা মেলে।

যেসব দেশের অবৈধ নাগরিক ॥ বাংলাদেশে অবস্থানকারী অবৈধ বিদেশী নাগরিকদের মধ্যে অধিকাংশই ক্যামেরুন, পাকিস্তান, ফিলিপিন্স, নাইজিরিয়া, ঘানা, কঙ্গো, লিবিয়া, আফগানিস্তান, সুদান, তাঞ্জানিয়া, উগান্ডা ও শ্রীলঙ্কার নাগরিক। ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও এসব বিদেশী অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাস করছেন। এরই মধ্যে এদের অনেককেই ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নির্ধারিত সময়ের জন্য ভিসা নিয়ে বিদেশী এসব নাগরিক এখানে এলেও মেয়াদ শেষে তারা ফিরে যাচ্ছেন না। নতুন করে ভিসার জন্য আবেদনও করছেন না। আবার ঠিকানা পরিবর্তন করায় এসব বিদেশীকে খুঁজেও পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার প্রায় বিশ হাজার অবৈধ নাগরিক রয়েছেন। এসব নাগরিকরা দেশের বিভিন্ন পোশাক শিল্প কারখানায় কাজ করছেন।

আয়কর ফাঁকি ॥ অবৈধ বিদেশীরা বাংলাদেশের সরকারকে কোন রকম ভ্যাট বা কর দেন না। অথচ তারা সাধারণ নাগরিকের চেয়েও অধিক সুবিধা ভোগ করছেন। শুধু তাই নয়, এদেশে অবৈধভাবে টাকা উপার্জন করে তারা নিজ নিজ দেশে পাঠাচ্ছেন। সাধারণত হুন্ডির মাধ্যমেই তারা নিজ নিজ দেশে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। গত বছর প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে বিদেশী নাগরিকদের কর ফাঁকি ঠেকানোর উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সে নির্দেশনা দেয়ার পরে বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আবার একই সঙ্গে একটি ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ওয়ার্ক পারমিট বাধ্যতামূলক হলেও মানা হচ্ছে না ॥ বাংলাদেশে বিদেশী নাগরিকদের কর্মসংস্থানের জন্য ওয়ার্ক পারমিট বাধ্যতামূলক। বেসরকারী খাতের কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান যদি কোন বিদেশী নাগরিককে নিয়োগ দিতে চায়, তাহলে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্ধারিত ফরমে আগেই আবেদন করতে হয়। এই আবেদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কর্তৃক স্বীকৃত দেশের নাগরিক, অনুমোদিত শিল্প-প্রতিষ্ঠান, ১৮ বছরের উর্ধে বয়স হতে হবে। যেসব কাজের জন্য স্থানীয় বিশেষজ্ঞ পাওয়া যায় না, সেসব কাজেই বিদেশীদের নিয়োগ দেয়া যাবে। এছাড়া সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাসহ বিদেশী কর্মচারীর সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগের বেশি হতে পারবে না। একজন বিদেশী নাগরিকের নিয়োগ প্রাথমিকভাবে দু’বছরের জন্য বিবেচিত হবে। তবে পরবর্তীতে সন্তোষজনক হওয়ার ভিত্তিতে বাড়ানো হতে পারে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র নিতে হবে।

জড়িয়ে পড়ছেন নানা অপরাধে ॥ বিভিন্ন দেশ থেকে ভ্রমণ, ছাত্র ও ব্যবসায়িক ভিসা নিয়ে বিদেশীরা এদেশে এসে প্রতারণাসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। ব্যবসায়িক ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসে থাইল্যান্ডের তরুণীদের অনেকেই রাজধানীর অভিজাত এলাকার নামী-দামী হোটেল, ম্যাসেজ পার্লার ও স্পা সেন্টারে কাজ করছেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও এখানে অবস্থান করায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন থাই তরুণীকে আটক করে থাইল্যান্ডে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আবার সম্প্রতি ক্যামেরুনের বেশ কয়েকজন নাগরিককে গ্রেফতার করে তাদের কাছ থেকে জাল ডলার ও ডলার তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতারেও সুফল নেই ॥ বিদেশীদের গ্রেফতারের পর তাদের জন্য কোনো অভিবাসন সেন্টার নেই। এছাড়া সরকারি আর্থিক কোনো বরাদ্দ না থাকায় অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাসকারী বিদেশী নাগরিকদের বিরুদ্ধে আটক অভিযান জোরদার করাও সম্ভব হচ্ছে না। অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাসকারী যেকোনো বিদেশী নাগরিক মাত্র ছয় হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে ছাড়া পেতে পারেন। তারা ছাড়া পেয়ে নিজ নিজ দেশে গিয়ে আবারও এ দেশে আসার সুযোগ পান। এসব কারণে এদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েও তেমন কোনো সুফল পাওয়া যায় না।

আগমনী ভিসার সুযোগ নিচ্ছে বিদেশীরা ॥ বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে আগমনী ভিসার সুযোগ নিচ্ছে বিদেশীরা। যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই, সেসব দেশের নাগরিকরা বাংলাদেশে ত্রিশ দিনের আগমনী ভিসা (অন এ্যারাইভাল ভিসা) পেয়ে থাকেন। সর্বশেষ ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেই পরিপত্র অনুযায়ী যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই, সেসব দেশের নাগরিকদের আগমনী ভিসা দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এই পরিপত্র অনুযায়ী শুধু চারটি দেশের জন্য ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি করা হয়েছে। এই চারটি দেশ হলো- ইরাক, আফগানিস্তান, সুদান ও আলজিরিয়া।

বিদেশীদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ ॥ বাংলাদেশে বিদেশীরা আসার পরে তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার থেকে একটি নতুন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। হোটেল-মোটেলে বিদেশীদের অবস্থান সংক্রান্ত এই নীতিমালা অনুযায়ী বিদেশীদের সার্বিক পর্যবেক্ষণে রাখতে হোটেল, মোটেল ও রেস্টহাউস এবং পুলিশ ও র‌্যাবকে নানা ধরনের তথ্য রাখতে হবে। এসব তথ্যের মধ্যে রয়েছে-হোটেল, মোটেল ও রেস্টহাউসে আগমনকারী বিদেশীর নাম, বাবার নাম, ঠিকানা, নিজ দেশের স্থায়ী ঠিকানা, চাকরি করলে তার বিস্তারিত তথ্য, ই-মেইল ঠিকানা ও ফোন নম্বর, জন্ম তারিখ, পাসপোর্টের ফটোকপি, ভ্রমণের উদ্দেশ্য, স্থানীয় গাইড বা কন্ট্রাক্ট ব্যক্তির নাম, ঠিকানা এবং স্থানীয় আমন্ত্রণকারীর পূর্ণ পরিচয় ও পাসপোর্ট নম্বর রাখতে হবে। কেউ এসব তথ্য না রাখলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।