১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ নিথর হলো শুধু তার বরণ কালো বলে

কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ নিথর হলো শুধু তার বরণ কালো বলে

নাজনীন আখতার ॥ “জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষটা আজ অনেক দূরে সরে যাচ্ছে শুধু আজ এই অস্তিত্ব আবিষ্কারের নেশায়। আমি দেখতে একটু না বেশ কৃষ্ণবর্ণ। গায়ের কৃষ্ণবর্ণ রং এর মতো ক্ষেত্র বিশেষ ইগো/অহংকার বা হিংসেটা একটু বেশিই আমার। অপমান বা অবহেলা ঠিক হজম হয় না আমার। এই অহংকারের স্বীকারই আজ। আমার বন্ধু, লাইফ পার্টনার দিনে অন্তত ইদানিং একবার আমাকে মনে করিয়ে দেয় ওকে সম্মান/কেয়ার করি না। কি অদ্ভুত এটা আমাকে বিষিয়ে তুলেছে এমন কেন হবে? কেন ওকে আমি সম্মান করব না। আমি তোমাকে অনেক সম্মান করি বন্ধু, তুমি নিতে পার না বা বলা যায় বোঝ না বা বোঝাতে পারি না।”

ফেসবুকের পাতায় পাতায় ঘুরছে সুমির এ মর্মস্পর্শী নোট। তবে ফেসবুকের মাধ্যমে সুমির এ কষ্ট যখন অন্যের হৃদয় স্পর্শ করছে তখন কারুরই কিছু করার নেই দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া। সুমির মাথায় হাত রেখে দুটি কথা বলে তার কষ্ট কমানোর অসম্ভব ইচ্ছাটাই এখন কুরে কুরে খাচ্ছে সবাইকে। সত্যিই এটা অসম্ভব এক ইচ্ছা। কারণ সুমি আর নেই। ৪৪ দিন পেরিয়ে গেছে সুমির চিরতরে চলে যাওয়া। প্রতিদিনের জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস থেকে মুক্তি পেতে নিজেই বিদায় জানিয়েছেন এ পৃথিবীকে। সবচেয়ে কাছের মানুষ নিজের স্বামীকে বোঝাতে পারেননি কতটা ভালবাসেন। অন্য এক নারীর সঙ্গে সুমনের পরকীয়া মেনে নিতে পারেননি। উল্টো সংসার ভাঙ্গার দায় সুমন তার ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজের অপরাধ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ খুঁজেছেন। সুমির নোটের পাতায় পাতায় উঠে এসেছে সেই চিত্রই। সুমির পরিবার থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, কালো বলে সুমিকে তার শ্বশুর বাড়ি থেকে অপমান করা হতো। এমন কী তার সন্তান কালো হবে, কৃশকায় হবে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা হতো সুমিকে। এক বন্ধুর সঙ্গে ফেসবুক চ্যাটিংয়ের স্ক্রীন শট থেকে দেখা যায়, প্রচ- হতাশা প্রকাশ করে সুমি লিখেছে,‘ জানি না রে আমার কী হবে, কী পাপ করছিলাম বা তোর ভাইকে কোন দিক দিয়ে আমি ঠকাইছি যে এমন দিন আসলো আমার লাইফে’।

সুমি মিরপুরের মনিপুর স্কুলের অংকন শিক্ষিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ৫ জুলাই মনিপুরে ভাড়া বাসায় শাম্মী আক্তার সুমির (৩০) ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সে সময় সুমির স্বামী হাবিবুর রহমান সুমন (৩০) বাসায় ছিলেন না। চার বছর আগে ২০১১ সালে তাদের বিয়ে হয়। প্রেমের বিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করার আগেই কোচিং সেন্টারে ক্লাস করার সময় থেকে ২০০৩ সালে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সুমির বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়ায়। আর সুমনের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দির পূজারভাঙ্গায়। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সুমন বড়। ছোট ভাই সুজন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। আর বোন মুনিরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষিক। ৩ ভাই ৪ বোনের মধ্যে সুমি সবার ছোট। সুমি চারুকলা থেকে প্রথম শ্রেণীতে মাস্টার্স পাস করলেও সুমন অনার্স পাস করে সেখানে আর পড়েননি।

আত্মহত্যার দিন ৫ জুলাই রাতে মিরপুর থানায় সুমির বড় বোন সেলিনা বেগম বাদী হয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারী হিসেবে সুমনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার ১০ দিন পর ১৫ জুলাই সুমনকে দাউদকান্দি থেকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে এক দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। সুমন এখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছে। সিএমএম আদালত সর্বশেষ ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার ষষ্ঠবারের মতো সুমনের জামিন আবেদন নাকচ করে দেন। জানা গেছে, বিয়ের পর প্রথমে নাখালপাড়ায় সুমনের দুই ভাইবোনের সঙ্গে সুমন ও সুমির সংসার শুরু হয়। পরে তারা নাখালপাড়ায় আলাদা বাসা ভাড়া করে বসবাস শুরু করেন। ঘটনার তিন মাস আগে তারা মনিপুর এলাকায় বাসা ভাড়া করেন। সুমি শুরুতে অভিনেত্রী আফসানা মিমির প্রতিষ্ঠানে কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে এবং সুমন একটি বিজ্ঞাপন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। দুইজনই মঞ্চ নাটকে কাজ করতেন।

সুমনের বাবা আইনজীবী আব্দুল মান্নান জনকণ্ঠকে বলেন, আয় ভাল থাকায় নাখালপাড়ায় তারা ২৪ হাজার টাকার বাসা ভাড়া করেছিল। পরে তারা সিদ্ধান্ত নেয় জমানো টাকা থেকে সুমন পড়াশোনা করবে আর সুমি চাকরি করবে। সে লক্ষ্যে সুমন মিরপুরে ফিল্ম এ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হয়। তবে তাদের টাকা দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ায় সুমি মনিপুর স্কুলে চাকরি নেয়। সেখানেই ১০ হাজার টাকায় একটি বাসা ভাড়া করে। তিনি বলেন, প্রথম দুই মাসের ভাড়া আমি দিয়েছি। তাদের চার বছরের সংসার জীবনে কোন ধরনের অশান্তির খবরও কখনও শুনিনি। তবে সুমি অনেক জেদি মেয়ে ছিল। সেই ধরনের কোন জেদ থেকেই আত্মহত্যা করতে পারে। তিনি তার ছেলে বা তার পরিবারের সঙ্গে সুমির কোন সমস্যা ছিল না বলে দাবি করেন। তিনি অভিযোগ করেন, সুমির ভাইবোনের সঙ্গে কোন মনোমানিল্য থেকে এ ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ তাদের পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল নয়।

সুমনের বাবা বলেন, ঘটনার মাত্র তিনদিন আগে সুমন ইনস্টিটিউট থেকে ভারতে স্টাডি ট্যুর শেষ করে দেশে ফিরে আসেন। এরপর কুমিল্লায় বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যান। কুমিল্লায় থাকা অবস্থায় সুমি আত্মহত্যা করেছে। সুমির পরিবারের দাবি অনুযায়ী সুমিকে তারা কালো হিসেবে কখনও খারাপ ব্যবহার করেননি বলে জানান তিনি। আব্দুল মান্নান বলেন, সুমিকে কালো বলা বা তার গর্ভের সন্তান নষ্ট করা এসব কিছুই আমরা করিনি। আর সুমনের কোন পরকীয়া নেই বলেও দাবি করেন। তিনি বলেন, চারুকলার ছেলেমেয়েরা বেপরোয়া চলাচল করে। একজন আরেকজনের সঙ্গে ফ্রি মেশে। তাই বলে সুমনের কোন পরকীয়া নেই।

এদিকে সুমির নোটবুক ও বন্ধুদের সঙ্গে ফেসবুক চ্যাটিংয়ের স্ক্রীনশট থেকে সুমনের টিনটিন নামে এক মেয়ের সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্ক স্পষ্ট উঠে এসেছে। ফারহানা নাসরিন স্বাতী নামের একজনের সঙ্গে চ্যাটিং স্ক্রীন শটে দেখা গেছে সুমি লিখেছেন, ‘ তোর ভাইয়ের প্রেম হয়েছে টিনটিন নামের এক মেয়ের সাথে...এটা নিয়ে ঝামেলা।’ গত বছরের ২১ জুলাইয়ের ওই চ্যাটিংয়ে দেখা গেছে, সুমি আরও লিখেছেন, ‘গত দুই মাস ধরে আমাদের প্রবলেম চলছে, কাল ওই মেয়ের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বেড়ায়, ডিনার করে বাড়ি আসেনি, ফোনও বন্ধ রাখছে’... ‘ওই মেয়ে ফোন বা এসএমএস দিতেই ডিলিট করে দেয়, আর বলে কোন যোগাযোগ নেই, অথচ চারুকলা থেকে জুনিয়ররা বলে ওরা এক সঙ্গে আছে, তোর ভাই এক সেকেন্ডের জন্যও ফোন হাতছাড়া করে না, ফোন নিয়ে বাথরুমেও যায়।’ আরও লিখেছেন, ‘কারণ আমি কখনও তাকে ঠকাইনি, তো আমি কেন ঠকব, আমি ভাল থাকতে চাই, ওকে চাই, আমি ওয়েট করি ওর কামব্যাকের জন্য, সেটা কতদিন সেটা সে জানায় না, কিন্তু এটা কিভাবে পসিবল আমি দিনের পর দিন ঠকবো আবার ওয়েটও করব, আমি নত হয়েছি বলেই একসঙ্গে থাকা, নতুবা আরও এক মাস আগেই আমরা আলাদা হতাম, কিন্তু এখন আর পারছি না।’ এরপর চলতি বছরের ৩০ মার্চ একই ব্যক্তির সঙ্গে চ্যাটিং এ সুমি লিখেছেন, ‘আমি বোধহয় আর পারব না তোর ভাইয়ের সঙ্গে থাকতে, সেও থাকতে চায় না’।

ছেলে এবং নিজেদের রক্ষার জন্যই সুমনের বাবা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছেন বলে দাবি করেন সুমির বড় ভাই আব্দুস সোবহান বাচ্চু। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, সুমনের সঙ্গে সুমির অশান্তি শুরুর বিষয়টি সুমনের পরিবার খুব ভালভাবেই জানতেন। এক বন্ধুর সঙ্গে ফেসবুক চ্যাটিংয়ে এ নিয়ে সুমির দীর্ঘ আলোচনার স্ক্রিন শটও আছে। সুমনের পরকীয়ার তথ্যও আছে। সুমনের মা সুমির বোন সুখির কাছে ঘটনার দিনও বলেছেন যে, সুমি তাকে বলেছে ‘আমি তাহলে আপনাদের ছেড়ে চলেই যাই। আমাকে বরিশালে পৌঁছে দিয়েন’। বাচ্চু জনকণ্ঠকে আরও বলেন, সুমি তার বন্ধু এবং বোনকেও বলেছে সন্তান কালো হবে এমন ব্যঙ্গ বিদ্রƒপ করে শ্বশুর বাড়ি। তাকে চারবার গর্ভের সন্তান নষ্ট করতে বাধ্য করা হয়। এছাড়া সুমনের টিনটিন নামে একজন নারীর সঙ্গে পরকীয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রচ- বিমর্ষ থাকতেন সুমি। এ নিয়ে বন্ধুদের কাছে অনেক আক্ষেপ করেছেন। একদিন চারুকলার গেটে টিনটিনের সঙ্গে সুমি অনেক ঝগড়া করেন এবং এক পর্যায়ে টিনটিনকে চড়ও মারেন। এ ব্যাপারে সুমি সুমনের মায়ের হস্তক্ষেপও কামনা করেন। জাবাবে সুমনের মা তাকে বলেন, ‘অনেক মহিলা ক্লায়েন্টের সঙ্গে তোমার শ্বশুর দরজা লাগিয়ে কথা বলেন। বিষয়টি প্রথম প্রথম আমার খারাপ লাগত। পরে মেনে নিয়েছি। তুমিও সুমনের সঙ্গে অন্য মেয়ের সম্পর্ক মেনে নাও। সময়েই সব ঠিক হয়ে যাবে।’

সুমির বড় ভাই আব্দুস সোবহান বাচ্চু আরও বলেন, সুমি কখনই নিজেকে কৃশকায় বা কৃষ্ণবর্ণের মনে করত না। মেধায়, মননে, যোগ্যতায়, সৃজনশীলতায় সে আর পাঁচ জনের চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না। এটা সুমিকে যারা দেখেছেন সবাই বিনাবাক্যে সম্মত হয়ে থাকবেন। সেই সুমিটার মাথার মধ্যে সে কৃশকায় তাই তার বেবি হলে সেও কৃশকায় হবে, রোগা হবে। সুমি কৃষ্ণবর্ণের তাই সুমির বেবি হলে সেও কালো হবে। এই রং নাম্বার ঢুকিয়ে দিয়েছিল বছরের পর বছর ধরে নিরবধি, নিরলসভাবে, নিকৃষ্ট পন্থায়, নিচুমানের এই সুমনের গোটা পরিবার। সুমনের পরিবারের সদস্যরা মাঝে মাঝেই বলত, সুমনের বেবি প্রয়োজন হলো কোথাও থেকে ফর্সা ও স্বাস্থ্যবান বেবি দত্তক নেবে। সুমির গর্ভের সম্ভাব্য কালো ও রোগা বেবি তাদের চাই না। আর তাই, সুমির ইচ্ছার বিরুদ্ধে চার চারবার ভ্রƒণ হত্যা করেছে। ওর বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাকে হত্যা করেছে সুমনের গোটা পরিবার মিলে। হয়ত আজ সুমির একটা বেবি থাকলে, সেই অকলংক মুখের দিকে চেয়ে সুমি এমন সিদ্ধান্ত কখনই নিতে পারত না। আমাদের দুর্ভাগ্য, সুমিটা বেঁচে থাকা অবস্থায় ওর জীবনের এই অন্ধকার দিকগুলোকে আমাদের দেখতে দেয়নি। নিজের অন্ধকার আড়াল করতে গিয়ে আমাদের গোটা পরিবারকে অন্ধকারে ঠেলে দিল...!!

তিনি বলেন, ভাবতে অবাক লাগে, একে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যপীঠ। তাও চারুকলা অনুষদ। যেখানে সর্বদাই মানব জীবনের, সমাজের যত্ত অনাচার, অন্ধকার, কুসংস্কারের প্রথা ভাঙ্গায় লিপ্ত টগবগে ক্ষ্যাপা সব স্বপ্নভুখ প্রাণ। সেখানে এই সুমনের মতো লম্পট, বর্ণচোরা, বর্ণবাদী বহুগামী, সমকামী নর্দমার কীট এলো কী ভাবে? তিনি জানান, তার মা জানে সুমি আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু বাবা তা জানে না। বাবাকে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন সুমি।

নোটবুকে সুমি লিখেছেন, ‘...আমি নিজেকে এক জড় বস্তুর স্থানে নিয়ে এসেছি সুমনের জীবনে। আমি প্রবলেম ছাড়া আর কিছুই ছিলাম না ওর জীবনে এটা এতদিনে বুঝতে পারলাম। কষ্টে বুকটা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে...।’ মা হওয়ার তীব্র ইচ্ছার কথা প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘মা হতে চাই আমি...কি হাস্যকর এইসব ভাবি আমি...আমার যে কখনও মা হওয়া হবে না...’। লেখায় সুমি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বহুবার এমআর করানোর ফলে বন্ধ্যাত্বের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সুমনের সমকামিতার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘নতুর বছরটা খুব বড় একটা পণ দিয়ে শুরু করতে যাচ্ছি, আর কখনও সুমনের পারসোনাল মানে ওর সমকামিতা নিয়ে কথা বলব না বা কষ্ট পাব না এবং আর কাউকে আমার কষ্টের কথা বলব না, নিজের মধ্যে এক বিশাল চাকা তৈরি করে নেব কষ্টের, যেন একদিন বুক ফেটে মরে যাই।’