২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শিশুদের নিউমোনিয়া ও রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা চিকিৎসায় নতুন পদ্ধতি

  • আইসিডিডিআরবির গবেষণায় সাফল্য

নিখিল মানখিন ॥ এবার শিশুদের দুটি জটিল রোগ নিরাময়ে স্বল্প খরচে নতুন উপকরণ উদ্ভাবন করেছে পৃথিবীর অন্যতম স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবি। এই মেডিক্যাল উপকরণটির নাম ‘বাবল সিপাপ (কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার)’। এটি মারাত্মক নিউমোনিয়া ও হাইপোক্সিমিয়ায় (রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা) আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় অক্সিজেন সঞ্চালন এবং কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত চিকিৎসা ব্যবস্থার চেয়ে এটি অধিক কার্যকর। আর হাইপোক্সিমিয়া নিরাময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে এটিই প্রথম কোন কার্যকর বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি যা গবেষণায় প্রমাণিত। উন্নত বিশ্বে অনেক আগে থেকেই এটি ১ মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে আসছে। কিন্তু স্বল্প-আয়ের বা উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি কতটা কার্যকর হতে পারে তা জানা ছিল না। বাবল সিপাপের জন্য যান্ত্রিক রেসপিরেটর লাগে, যা ব্যয়বহুল এবং স্বল্প-আয়ের দেশগুলোর হাসপাতালে ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। স্বল্প খরচে ‘বাবল সিপাপ’ উদ্ভাবিত হওয়ায় এই বাধা দূর হবে বলে দাবি করেছেন আইসিডিডিআর’বি এর বৈজ্ঞানিকরা।

আইসিডিডিআরবি জানায়, বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যৌথভাবে কম খরচের এবং সহজ-প্রাপ্য উপকরণ, যেমন ব্যবহৃত শ্যাম্পুর বোতল, মানসম্মত অক্সিজেন সঞ্চালন নল ইত্যাদি দিয়ে তৈরি কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যবহার করার একটি বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন এবং এর কার্যকরিতা যাচাই করেন।

গবেষণাটির ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি নিবন্ধ চিকিৎসা বিজ্ঞানের শীর্ষ জার্নাল ‘ল্যানসেট’ এ বুধবার প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় এটি প্রতীয়মান হয়, যে বাবল সিপাপ (কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশার) মারাত্মক নিউমোনিয়া ও হাইপোক্সিমিয়া চিকিৎসায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত স্ট্যান্ডার্ড লো-ফ্লো অক্সিজেন থেরাপির থেকে মৃত্যু ও চিকিৎসা ব্যর্থতার হার উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে সক্ষম। কম খরচের এবং সহজপ্রাপ্য উপাদান দিয়ে তৈরি পদ্ধতিটির কার্যকারিতা রিয়েল লাইফ সেটিং (জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে)-এ যাচাইয়ের জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে এবং সফলতা প্রমাণিত হলে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় এটি ব্যবহারের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এ্যান্টিবায়োটিক এবং লো-ফ্লো অক্সিজেন ব্যবহারের পরও নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে নিউমোনিয়া-আক্রান্ত শিশুমৃত্যুর হার প্রায় ১০ শতাংশ, যা অগ্রহণযোগ্য। এক্ষেত্রে, বাবল সিপাপ একটি ভাল সমাধান হতে পারে।

আইসিডিডিআর’বি এর গবেষকরা আরও জানান, বিভিন্ন দেশে অক্সিজেন সঞ্চালন এবং কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসে বিভিন্ন ধরনের সহজলভ্য সার্কিট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও কোন উন্নয়নশীল দেশে একমাত্র আইসিডিডিআরবি’র রেনডমাইজড কন্ট্রোলড ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল গবেষণাই কম খরচে নির্মিত সার্কিটের মাধ্যমে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যু ও চিকিৎসা-ব্যর্থতার হার কমাতে এটি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। উল্লেখ্য, কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়ার পর মারাত্মক নিউমোনিয়া এবং হাইপোক্সিমিয়া আক্রান্ত ছোট শিশুদের চিকিৎসায় আইসিডিডিআরবি হাসপাতালে এটি সফলভাবে স্ট্যান্ডার্ড অব কেয়ারের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

আইসিডিডিআরবি গবেষক ড. চিশতী জনকণ্ঠকে জানান, আরও গবেষণার পর ঢাকাসহ বাংলাদেশের অন্যান্য হাসপাতালে বাবল সিপাপের কার্যকর ব্যবহারের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা যেতে পারে। যেহেতু এটি সহজেই এবং সহজপ্রাপ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি করা সম্ভব, সেহেতু এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, যেসব দেশে নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যু বেশি, যেমন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলো, সেখানে এই উদ্ভাবন খুব উপযোগী হবে। পৃথিবীতে শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া যে কোন একক কারণের চেয়ে অধিক দায়ী এবং নিম্ন ও মধ্যম-আয়ের দেশগুলোই এক্ষেত্রে সর্বাধিক ভুক্তভোগী।

এদিকে, শিশু বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৪ অনুযায়ী পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে উপনীত হয়েছে। বিশ্বের যে ছয়টি মাত্র দেশ ১৯৯০ সালের তুলনায় বর্তমান শিশুমৃত্যুর হার দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ তার অন্যতম। তবে এখনও পাঁচ বছরের কমবয়সী অনেক শিশু প্রতিরোধযোগ্য ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার কারণে মারা যায়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে শিশুমৃত্যু ও অসুস্থতার একটি প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক নিরীক্ষা অনুযায়ী এখনও বিশ্বব্যাপী শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। শিশুমৃত্যুর শতকরা ১৭ ভাগ বা ১১ লাখ মৃত্যুর জন্য নিউমোনিয়াই দায়ী। এসব মৃত্যুর শিকার শিশুদের ৮০ শতাংশের বয়সই দুই বছরের নিচে। নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যুর বেশিরভাগই ঘটে উন্নয়নশীল দেশে। শতকরা ৭৫ ভাগই ঘটে মাত্র ১৫টি দেশে। বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের মৃত্যুর শতকরা ২৫ ভাগই নিউমোনিয়ার কারণে হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক এ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১১-এর তথ্য অনুযায়ী, যেসব শিশুর মধ্যে নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা যায় তার মাত্র ৩৫ শতাংশ মানসম্মত চিকিৎসা কেন্দ্র বা দক্ষ চিকিৎসকের চিকিৎসা পেয়েছে, ৪৬ শতাংশ শিশু অদক্ষ চিকিৎসকের কাছে সেবা নিয়েছে এবং ১৭ শতাংশ শিশু কোন চিকিৎসাই পায় না। এছাড়া যেসব অভ্যাস নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে যেমন ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ পান, ছয় মাস পূরণ হওয়ার পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি বয়স অনুসারে পারিবারিক বাড়তি খাবার খাওয়ানো, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, বায়ুদূষণ কমানো ইত্যাদি দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশে তেমনভাবে প্রচলিত নয়। ফলে এসব দেশে শিশুমৃত্যুর হার আরও বেশি। আর রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা দেখা দিলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেতেই থাকে। তখন মানুষ খুব সহজেই এ্যানিমিয়া, হার্ট ফেইলুরসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে।