২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চতুর্মুখী চাপের পরও জামায়াত ছাড়ছে না বিএনপি

  • যুদ্ধাপরাধীদের দলই এখনও মূল ভরসা

শরীফুল ইসলাম ॥ চতুর্মুখী চাপ থাকার পরও জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ছে না বিএনপি। ভোটের রাজনীতি ও রাজপথে আন্দোলনে শক্তি প্রদর্শনের স্বার্থের কারণে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতকে সবসময় কাছে চায় বিএনপি হাইকমান্ড। বিগত ৫ বছর রাজপথের বিভিন্ন কর্মসূচীতে বিএনপি নেতাকর্মীদের তেমন অংশগ্রহণ না থাকলেও জামায়াতের নেতাকর্মীরাই ছিল বেশি সক্রিয়। এ কারণেই রাজনীতিতে জামায়াতই এখন বিএনপির মূল ভরসা।

এদিকে টানা ৯২ দিনের আন্দোলন কর্মসূচী ব্যর্থ হওয়ার পর বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে ঘরে বাইরে চাপ সৃষ্টি হলেও দলীয় হাইকমান্ড ছিলেন অনড় অবস্থানে। আর এ বিষয়টি দলীয় নেতাকর্মীসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষকে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য ১২ আগস্ট ২০ দলীয় জোটের বৈঠক ডেকে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বলেন, ২০ দলীয় জোটে জামায়াত আছে এবং থাকবে। পরদিন জামায়াতের সিলেট শাখার আমির গ্রেফতার হওয়ার পর নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেয় বিএনপি। সম্প্রতি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও বর্তমানে বিকল্প ধারার সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে আবার বিএনপিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন দলীয় হাইকমান্ড। কিন্তু বি চৌধুরী জামায়াতকে জোটে রাখলে বিএনপিতে ফিরে আসবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। এ খবর শুনে বিএনপির ওপর নাখোশ হয় জামায়াত। পরে সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ না করার সিদ্ধান্তেই অটল থাকেন খালেদা জিয়া।

উল্লেখ্য, ৭ জুন সোনারগাঁও হোটেলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাত করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এ সময় নরেন্দ্র মোদি তার দেশ মৌলবাদের পক্ষে নয় উল্লেখ করে খালেদা জিয়াকে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করার পরামর্শ দেন বলে মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়। আর এ প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিএনপি আসলেই জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ছে কি না এমন প্রশ্ন দেখা দেয়। অবশ্য এর আগেও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কোন কোন দেশের কূটনীতিকরা বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু ভোট ও জোটের কথা বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি সে পরামর্শ গ্রহণ করেনি।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করতে অনেক আশা নিয়েই দলের আরও ৫ সিনিয়র নেতাকে নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করতে যান বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির পরামর্শ অনুসারে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করা সম্ভব নয় বলেই বিএনপি হাইকমান্ড ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের কার্যক্রম নিয়ে আর অগ্রসর হচ্ছে না। এমনকি মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাতকালে কি কথা হয়েছে সে ব্যাপারে দলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কেউ মুখ খুলছে না। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে নরেন্দ্র মোদির সফরকে ইতিবাচক বললেও জামায়াতের পক্ষ থেকে নেতিবাচক বলা হয়েছে। বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করার কথা বলার কারণেই মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের দিনেই বিবৃতি দিয়ে জামায়াত দুই দেশের মধ্যে হওয়া চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছে।

এদিকে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত রেখেই প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে ভিন্ন কোন কৌশলে সম্পর্কোন্নয়ন করা যায় কি না সে পথ খুঁজছে বিএনপি হাইকমান্ড। এরই অংশ হিসেবে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ভারতে সফরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ মাসের শেষের দিকে খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এরপরই তিনি ভারত সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি জোরদার করবেন বলে জানা গেছে। তবে তার পক্ষ হয়ে দলের ক’জন সিনিয়র নেতা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে খালেদা জিয়ার ভারত সফরের প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছেন।

টানা অবরোধ কর্মসূচী ব্যর্থ হওয়ার পর বিএনপির বেশ ক’জন সিনিয়র নেতা প্রকাশ্যেই জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের ব্যাপারে নিজ নিজ মতামত তুলে ধরেছেন। তবে তাদের ডেকে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ধমক দেয়ার পর আর কেউ এ ব্যাপারে ‘টুঁ শব্দ’ করেনি। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপি নেতাকর্মীদের ফাঁস হওয়া নানা কথোপকথনেও স্পষ্ট যে, জামায়াত ও ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকায় আপত্তি আছে দলের কোন কোন নেতাদের মধ্যে। তবে খালেদা জিয়াকে এ নিয়ে বলার ক্ষমতা নেই বলে হতাশার কথাও জানিয়েছেন তারা। এছাড়া খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করতে চান না বলে এ নিয়ে দলের অন্য নেতারা খুব একটা মাথা ঘামাতে চাচ্ছেন না।

এ ব্যাপারে বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহল থেকে চাপ থাকার পরও দলের হাইকমান্ড ভোট ও জোটের রাজনীতির কথা বিবেচনা করে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করতে চাচ্ছেন না। কারণ আন্দোলন-সংগ্রামসহ বিভিন্ন কর্মসূচীতে আগের মতো বিএনপির সব নেতাকর্মী সক্রিয় নেই। কিন্তু জোটগত এমনকি বিএনপিরও রাজপথে কোন কর্মসূচী থাকলে জামায়াতের অনেক নেতাকর্মী সেখানে সক্রিয় অবস্থান করে কর্মসূচী সফলের চেষ্টা করে। এছাড়া সারাদেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনে জামায়াতের একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। বিশেষ করে ৮-১০টি জেলায় রাজনৈতিকভাবে জামায়াত বিএনপির চেয়েও শক্তিশালী। তাই ভোটের রাজনীতিকে বিবেচনায় নিলে বিএনপি জামায়াতকে দূরে ঠেলে দিতে পারে না।

এর আগে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর চারদলীয় জোটের শরিকদল বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি অংশ জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করার দাবি করে। বিশেষ করে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা দলের পরাজয়ের জন্য জামায়াতকে দায়ী করে চারদলীয় জোট থেকে এ দলকে বাদ দেয়ার জোর দাবি জানায়। জামায়াতের তৃণমূল নেতাকর্মীরাও এ নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য পাল্টা বিএনপিকে দায়ী করে। এ পরিস্থিতিতে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে কিছুটা আস্থার সঙ্কট দেখা দেয়। পারস্পরিক অবিশ্বাসসহ ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে দীর্ঘ দেড় বছর পর ২০১০ সালের ৪ জুন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৮ দলীয় জোট গঠন করার পর আবার জামায়াতকে নিয়ে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচী পালন শুরু করে বিএনপি। পরে আরও ২টি দলকে নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট গঠন করা হয়। এরপর তারা জোটগতভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলন কর্মসূচী পালন করে। তবে সর্বশেষ আন্দোলন কর্মসূচীতে পেট্রোলবোমা নাশকতার মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকেও জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের ব্যাপারে বিএনপির ওপর চাপ আসে। কিন্তু বিএনপি তখন বিষয়টি আমলে নেয়নি। বরং জামায়াতের পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে সরকারবিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা করার কৌশল গ্রহণ করে। ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে তাদের আস্থা অর্জন করে ৫ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিজয়ের ফসল ঘরে তুলতে সক্ষম হয় বিএনপি। কিন্তু দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর বিএনপি যখন এ নির্বাচনকে অগণতান্ত্রিক বলে অবিলম্বে সকল দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি করে তখন আবার নতুন করে বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে জামায়াত ছাড়ার বিষয়ে চাপ বাড়ে। কিন্তু জামায়াত ছাড়েনি বিএনপি। বরং তখন জামায়াতকে নিয়েই সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার করার চেষ্টা করে।

বিএনপির নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকেই এখন বলাবলি করা হচ্ছে দশম জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে এবং এ বছর টানা ৩ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সরকারবিরোধী আন্দোলনে সারাদেশে যে সহিংসতা হয়েছে তার বেশির ভাগই করেছে জামায়াত কর্মীরা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ব্যানারে আন্দোলন কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে জামায়াত সারাদেশে তা-ব চালিয়ে জানমালের যে ক্ষয়-ক্ষতি করেছে তার দায় বিএনপি এড়াতে পারছে না। কারণ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নির্দেশেই জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা আন্দোলন কর্মসূচী পালন করেছে। এত তা-ব চালিয়েও আন্দোলন সফল করতে না পেরে উল্টো বিএনপিই রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় পড়েছে। যে কারণে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রভাবশালী মাধ্যম থেকে বিএনপির ওপর চাপ আসছে। এছাড়া এই নেতিবাচক আন্দোলনের কারণেই বিএনপি এখন স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মসূচী পালনেও পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রসঙ্গত ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০০০ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট গঠন করা হয়। এতে স্থান পায় জামায়াত, বিজেপি ও ইসলামী ঐক্যজোট। সে নির্বাচনে বিজয়ের পর জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে বিএনপি। জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে মন্ত্রিত্ব দেয়া হয়। এ নিয়ে তখনই বিএনপির মুক্তিযোদ্ধা নেতারা অসন্তোষ প্রকাশ করলেও এক পর্যায়ে দলের স্বার্থে চুপ হয়ে যায় তারা। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জামায়াতসহ চারদলীয় জোটের শরিকদের নিয়ে নির্বাচন করে বিএনপি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়লাভ করে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বধীন মহাজোট সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচারে সোচ্চার হওয়ায় জামায়াত রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় পড়ে। তবে বিএনপি প্রকাশ্যে না হলেও তলে তলে জামায়াতকে সাহস যোগায়। পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে বিভিন্নভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধিতাও করে দলটি। দলের কোন কোন নেতা জামায়াতের পক্ষ হয়ে এই ইস্যুতে বিদ্রোহী মনোভাব প্রকাশ করে। এ বিষয়টিকেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশ ও সংস্থা ভাল চোখে দেখেনি। এ কারণেই বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের কাছে বিএনপি কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, জামায়াত কোন নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল নয়। তাই রাজনৈতিক কৌশলের কারণে জামায়াতকে ২০ দলীয় জোটে রাখা হয়েছে। যদিও বিভিন্ন মহল থেকে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের কথা বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে। তবে আপাতত জামায়াতকে দূরে সরিয়ে দেয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। তবে ভবিষ্যতে কি হবে তা সময়ই বলে দেবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, ২০ দলীয় জোট একটি বিশাল রাজনৈতিক জোট। এ জোটের প্রতিটি দলের নিজ নিজ আদর্শ রয়েছে। নিজ নিজ আদর্শ ঠিক রেখেই সবাই জোটের রাজনীতি করে। এতে দোষের কিছু নেই।