২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এখন দেশে সবাই-ই শিল্পী, শ্রোতা নেই

  • -ফাহমিদা নবী

নামটা ‘সাদা-কালো’ কেন?

ফাহমিদা নবী : ‘সাদা কালো’ নামে একটা গান আছে এ্যালবামে। আমি আসলে নামটা লিরিক থেকেই দিয়েছি। এজন্যই দিয়েছি যে, মানুষের জীবনে সাদা-কালোটা একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেখানে রং ভরতে হয়। সাদাতে রং ভরা যায়, কালোতে রং ভরা যায়। গানগুলো হচ্ছে আমার রং। আর সাদা-কালো হলো মানুষের মন।

এই এ্যালবামে এমন কিছু আছে কি যেটা আপনার আগের কোন এ্যালবামে ছিল না?

ফাহমিদা নবী : না। আমি সবসময়ই একটা ধারা পোষণ করি। এই এ্যালবামের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, শান আসলে আমাকে নিয়ে খুব চিন্তা করেছে। আমি কী ধরনের গান গাই, কী ধরনের গান আমার কাছ থেকে শ্রোতারা চায়Ñ এটা ও জরিপ করেছে। এ্যালবামে নানা ধরনেরই গান আছে। কিন্তু মেলোডি প্রধানই সব।

এখন ভাল গান করার চেয়ে হিট গান করার জন্য কিন্তু শিল্পীরা বেশি ব্যস্ত। এতে কি শিল্পীসত্তা নষ্ট হচ্ছে না?

ফাহমিদা নবী : আমি তাদের কথা বলতে পারব না। আমি তো এই জায়গাটাতেই নেই! আমার চিন্তার জায়গা যেমন ছিল, তেমনই আছে। কারণ, আমারও কিছু শ্রোতা তৈরি হয়েছে। হয়ত সেটা খুবই কম। ২০ জনই ধরলাম। আমার তো এই ২০ জনকেই সার্ভ করতে হবে। ওরা আমার নিরেট শ্রোতা। আমি সব সময়ই চিন্তা করি, ওরা আমার কাছ থেকে যেটা আশা করে, আমি যেন সেটাই দিতে পারি। একটা অডিও এ্যালবাম যখন আমরা করি, তখন চিন্তা করতে হয়, মানুষ কিন্তু শুনবে। সেই শোনার জায়গাটায় মানুষ কি সারক্ষণ শুধু দেখে দেখে; শোনে? কখনও কখনও মানুষ শুধু শোনে। তারপর সেই গানটার মধ্যে হারিয়ে যায়।

একটা গান পরিপূর্ণ হতে হলে কি জরুরী খুব?

ফাহমিদা নবী : এটা দলবদ্ধ কাজ। আগে যেমন হতো, তেমন। তখন গীতিকার, শিল্পী, সঙ্গীতায়োজক একসঙ্গে বসত। আলাপ করত। হোমওয়ার্ক করত। এখন এই হোমওয়ার্কেরই ভীষণ অভাব আমাদের।

এ্যালবামের কাজ কতদূর?

ফাহমিদা নবী : গানগুলোতে কণ্ঠ দেয়া হয়ে গেছে। এখন শুধু কিছু সংশোধন বাকি। আমরা দুই-তিন দিন বসলেই বোধহয় হয়ে যাবে কাজটা। ঈদে এ্যালবামটি প্রকাশ করার চেষ্টায়ই আছি। দেখা যাক...

ষাট-সত্তর দশকের বাংলা গান আর এখনকার বাংলা গানের মধ্যে তো বৈশিষ্ট্যগত ব্যাপক পার্থক্য। এই পার্থক্যগুলো বাংলা গানের ভবিষ্যতের জন্য কতটুকু ইতিবাচক?

ফাহমিদা নবী : সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুরই পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তনশীলতা খুব সাধারণ একটা প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াকে তো অস্বীকার করার উপায় নেই! যতই আমার ভাল লাগুক পুরনো গান, তার সঙ্গে সঙ্গে নতুন গানের চাহিদাও বাড়তে থাকবে।

কিন্তু বিষয়টা যদি এরকম হয়Ñ আমাদের বাংলা গানের যে নিজস্ব ধারা আছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন করতে গিয়ে সেটাও যদি পাল্টে যায়! তাহলে?

ফাহমিদা নবী : পাল্টানোর গল্প কোনদিনও সফল হয় না। কোন কিছু পাল্টায় না আসলে। রূপান্তর হয়। সুতরাং যে এরকম পাল্টাতে চাইবে, তার সেটা স্থায়ী হবে না। আমাদের বাংলা গান কিন্তু আলাদা। আমরা যদি হিন্দি গানের সঙ্গে বাংলা গানের তুলনা করি, তাহলে কিন্তু বাংলা গান অবক্ষয়ের দিকেই চলে যাবে।

প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এর অপব্যবহারও প্রচুর হচ্ছে। যেমন, অটোটিউনার ব্যবহার। কেন হচ্ছে এসব?

ফাহমিদা নবী : সবারই যে গান গাইতে ইচ্ছে করে! সবাই গান গাবে কেন? শিল্পকর্ম অনেক কঠিন কাজ। সোনামুখী সুইয়ে সুতা ভরার মতো অনেকটা। সবাই সব করতে পারবে না। একটা দেশে শ্রোতা বেশি থাকবে, শিল্পী থাকবে কম। এটাই স্বাভাবিক। অথচ এখন আমাদের দেশে সবাই-ই শিল্পী। শ্রোতা নেই। এত শিল্পী যেখানে, সেখানে তো অটোটিউনার ব্যবহার হবেই! এখন মানুষ ওসবেই অভ্যস্ত হচ্ছে। ওভাবে শুনতে শুনতে সবার কান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ মানুষ ভাবছে ওটাই ঠিক।

এখন যে অবস্থা সঙ্গীতাঙ্গনের, এখনও কি সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে নেয়ার অবকাশ আছে বাংলাদেশে?

ফাহমিদা নবী : না। কয়েকদিন পর আরও কেমন হবে পরিস্থিতি, আমি জানি না আসলে। কোন শিল্পী খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকতে পারবে কিনা, এটাই সংশয়ের।

সবারই তাহলে পাশাপাশি অন্য কিছু করতে হবে!

ফাহমিদা নবী : হ্যাঁ... নতুবা সম্ভবই না স্বাভাবিক জীবন যাপন। কারণ, আয়োজকরা শুধু ভাবে যে, ঠিক আছে, কোনমতে একটা কিছু করে দিলেই হলো। ইন্ডিয়া থেকে তো এও আসছেই! শিল্পী হলো বাইরের দেশের শিল্পী। দেশের শিল্পী হচ্ছে লোকাল শিল্পী। ওদের যে কোন একটা অনুষ্ঠান করতে দিলেই হলো। কিন্তু নিজেকে সম্মান না করলে যে অন্যেও আমাকে সম্মান করবে না, এটা ভাবে না কেউ। এটা আয়োজকদেরই ভাবতে হবে। শ্রোতার কোন দোষ নেই। ওদের যা দেয়া হয়, ওরা তাই-ই নেয়। সত্যি কথা বলতে কী, গত ঈদে অনেক শ্রোতা খুব দুঃখ পেয়েছে। ফেসবুকে আমার ইনবক্স ভরে গেছে। আমাদের কোন লাইভ ছিল না। কিন্তু সবাই-ই খুব আশা করেছেÑ ঈদের সময় আমাদের লাইভ দেখবে, গান শুনবে।

অথচ ঠিকই লাইভে এমন কিছু শিল্পীকেও ডাকা হয়, যারা গান গাওয়ার মতোই যোগ্যতা রাখে না। লাইভে তো নয়ই!

ফাহমিদা নবী : এটা কিন্তু অসংখ্য শ্রোতারও কথা। আমি ঠিক জানি না কেন হচ্ছে এমন। কোন লাইভে আমাদের কেন ডাকেনি। চ্যানেলগুলোই সব জানে। শ্রোতারা চাচ্ছে যেখানে, সেখানে আমাদের কেন দেখতে পেল না তারা! কেন? এটা অনেক বড় প্রশ্ন।