২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

২১ আগস্ট ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতা

  • সুভাষ সিংহ রায়

২১ আগস্ট ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতা। ১৫ আগস্টের বিচার করা যাবে না- এভাবে আইন করা হয়েছিল। এ রকম নিকৃষ্ট ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে আর একটিও ঘটেনি। ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্টে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের সংবাদ শুনে সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ড (ডরষষু ইৎধহফঃ) মন্তব্য করেছিলেন, ‘শেখ মুজিবকে হত্যার পর বাঙালী জাতিকে আর বিশ্বাস করা যায় না। ‘আবার ২১ আগস্টে আইভি রহমানসহ ২৪ জনকে হত্যা করার পর নিজামী-খালেদা সরকার বলেছিল, শেখ হাসিনা ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিল। এমনকি থানায় মামলা পর্যন্ত নিতে নিষেধ করা হয়েছিল। প্রয়াত আবদুল জলিলসহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ রমনা থেকে মতিঝিল থানা পর্যন্ত সারাদিন লেফ্ট-রাইট করেছিলেন। জামায়াত-বিএনপি সরকারের মদদপুষ্ট হায়নারা শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। খালেদা-নিজামী সরকারের উপমন্ত্রী পিন্টু এই হত্যাকা-ের মূল হোতাদের একজন। কিন্তু এখনও আড়ালে রয়ে গেছে সব খলনায়ক। এই হত্যাকা-ের সঙ্গে যারা জড়িত সকল খুনীকে খুঁজে বের করতে হবে। ২৫০ পুলিশ সদস্য সেদিন এই জনসভায় নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। কিভাবে হত্যাকারীরা পালিয়ে গেল? এক পুলিশ সদস্য আহত হলো না! রহস্যটা কী? এখনও সেই পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ চাকরিতে আছে। তাদের প্রত্যেককে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে। কোন্ নরপিশাচরা সেদিন আলামতগুলো নষ্ট করেছে, তাদের খুঁজে বের করা খুব কঠিন কাজ হবে না। কোন্ পুলিশ সদস্যরা সেদিন হত্যাকারীদের ওপর গুলি না ছুড়ে আহতদের ওপর গুলি কিংবা টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করেছে! ইচ্ছা থাকলে আর মাথার বুদ্ধি খাটালে এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত সকল পুলিশ সদস্যকে খুঁজে বের করা যায়। গত ২১ আগস্টের আলোচনায় স্পষ্ট করে বলেছেন জামায়াত-বিএনপির মহারথীরা এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। ২০০৫ সালের ২১ আগস্টের আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেছেন, খালেদা জিয়া হত্যাকারী পিন্টুকে সমর্থন করেন। তার প্রমাণ তার ভাইকে তিনি ছাত্রদলের সভাপতি বানিয়েছেন। পাঠকদের স্মরণে আছে নিশ্চয়, সেই সময় খালেদা জিয়া, মান্নান ভূঁইয়া, খন্দকার মোশাররফ সাহেবরা জজ মিয়া নাটকের কত ফিরিস্তি না দিয়েছেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের প্রশ্নোত্তরপর্বে বাংলাদেশের ২১ আগস্টের নারকীয় গ্রেনেড হামলা নিয়ে আলোচনা এবং নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়। অথচ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে এ নিয়ে কোন আলোচনা করতে দেয়া হয়নি। গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন এই ২১ আগস্টের হত্যাকা- নিয়ে ছলচাতুরি করেছে। হামলা ও হত্যার আলামত নষ্ট করার পর শেখ হাসিনার বাসভবনে গেছে তদন্তের নামে বেয়াদবি করতে। শেখ হাসিনার বুলেটপ্রুফ গাড়িতে গ্রেনেডের স্পিøন্টার লেগেছে না গুলির চিহ্ন রয়েছে তা দেখার জন্য। এটা থেকে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, হত্যাকারীরা সরকারের নিয়োজিত এজেন্ট ছিল। গোটা দেশের বিবেকবান মানুষ এই হত্যার নিন্দা জানিয়েছিল।

২.

শেখ হাসিনা বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু মৃত্যুভয়ে তিনি পিছিয়ে যাননি। যেহেতু আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনায় রয়েছে, তাই এখনই সময় এই হত্যাকা-ের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা। আওয়ামী লীগের একটা নিজস্ব ইনটেলিজেন্স সংস্থা থাকা দরকার। আর সব সময় মনে রাখা দরকার, এই সরকারের সময়ে যেন কোন ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটতে না পারে। না ঘটার সব প্রস্তুতি যেমন নেয়া দরকার, তেমনি ঘটলে কতদূর তা মোকাবেলা করা যাবে, তারও প্রস্তুতি থাকা একান্ত প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের প্রতিটি কর্মীর মনে রাখতে হবে, শেখ হাসিনার জীবন সবার আগে। ১১ জানুয়ারির পর প্রমাণিত হয়েছে, শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগ কতটা গতিহীন এবং ছন্দবিহীন। এতদিনে এটুকু প্রমাণিত হয়েছে যে, শেখ হাসিনার জীবন কর্মবহুল ও বৈচিত্র্যে ভরপুর। এখন এটা শুধু একটি নামই নয়, এটা একটি প্রতিষ্ঠান।

শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাত্র পাঁচ দিন আগে অর্থাৎ ১৯৮১ সালের ১১ মে ‘নিউজউইক’-এর সেই সাক্ষাতকারে স্পষ্ট করে বলতে পেরেছিলেন, ‘আমার একটা জিদ রয়েছে, সেটা হলো দেশকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে আসা। হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি দিয়ে আমি বুঝি যে, জনগণের ভাগ্যকে পরিবর্তন করে দিতে পারে যে অর্থনৈতিক উন্নতি তা আসতে পারে কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্য থেকেই।’ রাজনীতির আসল সত্যটি তিনি একেবারে শুরুতেই ধরতে পেরেছিলেন। তাই তো তিনি বলতে পারেন, ‘আমার রাজনীতি হচ্ছে জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করা। আমরা তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করতে চাই, যেখানে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র জনগণ এক মানবেতর জীবনযাপন করে।’

১৯৯৭ সালের ৪ জুলাই জাপানের বিখ্যাত ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয় শেখ হাসিনাকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লজ ডিগ্রী প্রদান করে। ডিগ্রী প্রদান অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমি এমন একটি দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি, যে দেশের জন্য আমার পিতা, আমাদের মহান নেতা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অশ্রুপাত করেছেন, ঘাম ঝরিয়েছেন ও বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। ব্যক্তিগত সকল কিছু জলাঞ্জলি দিয়ে আমি এখন আমার দেশের কোটি কোটি মানুষের সঙ্গে একই কণ্ঠে উচ্চারণ করিÑ আমাদের কাছে গণতন্ত্রের চেয়ে বড় কোন আদর্শ নেই। গণতন্ত্রের জন্য স্বাধীনতার চেয়ে বড় কোন ভিত্তি নেই এবং আইনের শাসন ছাড়া স্বাধীনতার জন্য বড় কোন গ্যারান্টি নেই।’

গত ১৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্মরণসভায় স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে অনেক চেষ্টা হয়েছে তার নাম মুছে ফেলার। খুনীরা নীতিহীন, আর্দশহীন, দিকনির্দেশনাহীন একটি বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিল। খুনীরা শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি, তারা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধান ও আদর্শকে হত্যা করতে চেয়েছিল।’ আমরা সবাই ভাল করেই বুঝতে পারি, যে হত্যা ও ক্যুর রাজনীতি বঙ্গবন্ধুর ঘাতকরা ও তাদের মদদদাতারা শুরু করেছিল, তা এখনও অব্যাহত আছে। তাদের এখন একমাত্র টার্গেট শেখ হাসিনা। হত্যাকারীদের অনুসারীরা এখনও আমাদের আশপাশে আছে। প্রশাসনযন্ত্রের মধ্যে ঘাপটি মেরে আছে। আওয়ামী লীগকে বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল দিয়ে তা প্রতিহত করতে হবে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে অনেক খারাপ মানুষ সম্পৃক্ত ছিল। সেই সময়কার জামায়াত-বিএনপি জোট সরকারের প্রশাসনযন্ত্র থেকে শুরু করে তাদের রাজনৈতিক সদস্যরা সরাসরি জড়িত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটা অংশ এই ঘাতকদের হামলায় সহায়তা এবং প্রটেকশন দিয়েছে। সেদিনকার জনসভায় দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে খুব সহজেই এই ঘটনার মূল হোতাদের আবিষ্কার করা যাবে। সেদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে একেবারে নেতৃত্বহীন করতে চেয়েছিল। তারপরও আইভি রহমানসহ এতগুলো রাজনৈতিক কর্মীর জীবন প্রদীপ নিভে গেল। এখনও অসংখ্য মানুষ গ্রেনেডের স্পিøন্টার শরীরে নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যার কান কোনদিন ঠিক হওয়ার নয়। হয়ত সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে যেখানে উন্নত প্রযুক্তি আছে, সেখানে নিতে পারলে অপেক্ষাকৃত ভাল চিকিৎসা সম্ভব ছিল। কিছুটা হলেও ভাল অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যার জিদ ছিল, তিনি সব আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে কিছুতেই বিদেশে যাবেন না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শরীরে অসংখ্য স্পিøন্টার, প্রতি মুহূর্তের যন্ত্রণা তাঁকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তাই পুলিশবাহিনীর যারা এই জঘন্য হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাদের তিনি খুঁজে বের করতে পারবেন। এখনও এই ঘাতকরা শেখ হাসিনার দিকে তাক করে আছে। এদের সমূলে উৎপাটনের এখনই সময়। শেখ হাসিনার ওপর হামলার অর্থ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার শেষ আশ্রয়ের ওপর আক্রমণ। পক্ষ-বিপক্ষ সব মহলই স্বীকার করবেন, শেখ হাসিনা বাঙালীর স্বাধীনতা ও জাতীয়তাবাদের এখন শব্দব্রহ্ম। লোকায়ত বাংলার ইহজাগতিকতার বীজমন্ত্র। কেউ এটা বুঝে তাঁর পক্ষে থাকে; আবার কেউবা এটা জেনেই বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তাই ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতা।

svuassingho@gmail.com