১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মাংসের বাজার ॥ গরু আমদানি না রফতানি

  • ড. আর এম দেবনাথ

সামনে কোরবানির ঈদ। ইতোমধ্যেই এই উপলক্ষে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে নানা প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সড়ক ও পরিবহনমন্ত্রী বলেছেন বড় বড় রাস্তা অর্থাৎ জাতীয় সড়কে পরিবহনের কোন অসুবিধা হতে পারে এমন জায়গায় গরুর হাট বসতে দেয়া হবে না। ঢাকা শহরের দুই কর্পোরেশন বর্জ্য নিষ্কাশনের নানা পথের কথা ভাবছে বলে খবর ছাপা হয়েছে। কোরবানির হাটের ইজারা নিয়ে অগ্রিম বিবাদে নানা জায়গায় নানা বিবাদ ঘটছে। এত সবের মধ্যে সবচেয়ে বড় কথা যা, তা হচ্ছে পশুর সরবরাহ, সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে গরুর আমদানি। বেশকিছু দিন যাবতই খবর হচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ‘গরু আসা’ বন্ধ রয়েছে। সামান্য ছিটেফোঁটা যা আসে তা যৎসামান্য। ভারতের বর্তমান ‘বিজেপি’ সরকার গরুর ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তারা ‘গরু রফতানি’ বিরোধী। বস্তুত সে দেশে গরু একটি রাজনৈতিক ইস্যু। তাদের গরু বাংলাদেশে আসলেও অসুবিধা, না আসলেও অসুবিধা। আবার অনেকের ধারণা এই গরু ‘আমদানি-রফতানি’ বা চোরাচালানের জন্যই সীমান্তে নানা ধরনের অঘটন ঘটে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। কারণ গরু ভারত সরকারীভাবে রফতানি করে না, বাংলাদেশ তা সরকারীভাবে আমদানি করে না। বহু বছরের ব্যবধানে গরু ব্যবসার জন্য একটা কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এটা চোরাচালানভিত্তিক ব্যবসা। চোরাচালানিরা এই ব্যবসা সংঘটন করে। এই জাতের ব্যবসায়ীরা দুই দেশেই আছে। তাদের মধ্যে মাঝে মাঝে সংঘর্ষ বাধে। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটে নানা ধরনের অঘটন। কূটনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এই হচ্ছে বেসরকারীভাবে ‘গরুর ব্যবসা’র এক সমস্যা। দ্বিতীয় সমস্যাটা ভারতের- সেটা ধর্মীয়। তৃতীয় সমস্যাটি অর্থনৈতিক এবং তা উভয় দেশের। যেহেতু গরু সরকারীভাবে আমদানি-রফতানি হয় না, অতএব উভয় সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। এই প্রেক্ষাপটেই ভারত থেকে গরু ‘আমদানি’ বা আসা বন্ধ রয়েছে। এর একটা অন্যদিকও আছে। সে দিকটা হচ্ছে ‘হুন্ডি’ ব্যবসা। যেহেতু গরু ‘আমদানি-রফতানি’ সরকারীভাবে ‘ঋণপত্র’ (এলসি) খুলে হয় না অতএব এর দায়-দেনা পরিশোধ হয় ‘হুন্ডিতে’ যা আইনত নিষিদ্ধ এবং দ-নীয়। বলাবাহুল্য, গরু ‘আমদানি’ বন্ধ থাকায় সেই ‘হুন্ডি’ ব্যবসায় একটা ‘টান’ পড়ার কথা এবং তা হয়েছেও। এসবই বিচার-বিশ্লেষণের কথা। সবচেয়ে বড় কথা গরুর সরবরাহে বড় রকমের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর ফল বাংলাদেশের ভোক্তা ভুগছেন। বাজারে অনেকদিন যাবতই গরুর মাংসের দাম চড়া। গরুর মাংস পুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মূল্য কম থাকায় অর্থাৎ খাসি বা মুরগির মাংসের তুলনায় গরুর মাংসের মূল্য কম থাকায় সাধারণ মধ্যবিত্ত নয় শুধু গরিব মানুষও একটু-আধটু মাংস মুখে দিতে পারত। এখন এই সহজলভ্য পুষ্টি প্রাপ্তিতেও সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যবিত্ত উচ্চ দামে গরুর মাংস ক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে। মজা হচ্ছে ‘সহানুভূতিশীল’ মূল্যবৃদ্ধি বলে একটা কথা আছে। গরুর মাংসের দাম বাড়লে খাসি, মুরগি ও মাছের দামেও তার আছর পড়বে এবং পড়েছেও তাই। এই মুহূর্তের সমস্যা অবশ্য কোরবানির ঈদকে নিয়ে। কিছুদিনের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য কোরবানির ঈদে পশু আমদানি কম হলে তার কী প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে বাজারে এবং অর্থনীতিতে। যদি কোরবানির ঈদে গরুর আমদানি অনেকাংশে কম হয় তাহলে তার বড় প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে চামড়ার বাজারে। চামড়া আমাদের একটা রফতানি পণ্য। আমাদের দেশে চামড়াভিত্তিক শিল্পও গড়ে উঠছে। সরকার চামড়া শিল্পের উন্নয়নের জন্য এই শিল্পকে বেশ খাতির করে কথা বলে। সাভারে চামড়ানগরী গড়ে উঠছে। জিগাতলার আশপাশ অঞ্চল থেকে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তরিত হওয়ার কথা। সবারই ধারণা চামড়া শিল্পের ভবিষ্যত সম্ভাবনা প্রচুর। দেখা যাচ্ছে ব্যাংকে ব্যাংকে সম্ভাব্য জুতা প্রস্তুতকারীদের ভিড়। এই মুহূর্তে বাজারে বিদেশী জুতায় সয়লাব। গত ঈদের বাজারেও দেখেছি চীনা জুতার দাপট। দামে সস্তা, দেখতে ভারি সুন্দর। ভাবতে অবাক লাগে চামড়ার দেশ বাংলাদেশে চীনারা চামড়াজাত দ্রব্যের বাজারও দখল করে ফেলছে। ইতালীওয়ালারাও তো আছেই। মানুষ পাগল ওইসব দেশের জুতা ও চামড়া সামগ্রী কেনার জন্য। সামান্য একটা ঘড়ির বেল্ট সেটাও চীনা। দোকানে দোকানে চীনা বেল্ট, বাংলাদেশী কোন ঘড়ির বেল্ট নেই। অথচ দু’তিন বছর আগেও বাজারে তা ছিল। অথচ আমাকে একজন বলল বাংলাদেশের চামড়া ভাল। কিন্তু ডিজাইনের অভাবে আমরা পেরে উঠছি না। বহুদিন ধরে বাজারে চলছে বাটার জুতা। সেই কবে থেকে? গ্রাম-গঞ্জে পর্যন্ত বাটার জুতা। প্রায় একই ফ্যাশনের জুতা বাটার। তাই মানুষ কিনছে। ইদানীং দেখা যাচ্ছে কিছু কিছু বাংলাদেশী ম্যানুফেকচারের জুতা বাজারে আসছে। মন্দ নয়! তাদের জুতাও এখন বেশ চলে। আমি শুনেছি গত ঈদে বাংলাদেশে তৈরি জুতা বেশ বিক্রি হয়েছে। কম কথা নয়। সর্বগ্রাসী চীনা পণ্যের এই জমানায় বাংলাদেশের ম্যানুফেকচারাররা জুতার মার্কেটে অন্তত টিকে আছে। এই প্রেক্ষাপটেই অনেকের মধ্যে এখন জুতার কারখানা করার একটা নতুন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এ সবে অবশ্য ভয়ও হয়। বাঙালী তো আবার ‘আতিশয্যের’ জাতি। যে যখন যেটাকে নিয়ে পরে তখন সেটার বারোটা বাজিয়ে ছাড়ে। কেউ একটা নতুন ব্যবসার সন্ধান পেল, আর কথা নেই, সবাই ঝাঁপ দিয়ে পড়ল সেটাতে। তা পড়ুক যদি বড় বাজার থাকে। ছোট বাজারে পড়লে তো বিপদ। এটা যাতে না হয়। অবশ্য তা দেখার একটা কর্তৃপক্ষ থাকা দরকার যারা এর উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করবে। নিয়ন্ত্রণহীন উন্নয়ন সবার জন্যই ক্ষতিকর। প্রশ্ন করছিলাম একজনকে এই বাজার সম্ভাবনাকে কিভাবে কাজে লাগানো যায় সেই সম্পর্কে, বিশেষ কর গরু-ছাগল সরবরাহের ঘাটতি পরিস্থিতিতে। নানা উত্তর পাওয়া যায় এর ওপর।

অনেকেই গরুর ওপর ভারতীয় নিষেধাজ্ঞায় বেশ আতঙ্কিত, বেশ কিছুটা ক্ষুব্ধও বটে। তারা বলেন, ওরা গরু দিয়ে কী করবে? খাবেও না দেবেও না। এতে আমাদের অভিমান হতে পারে। অভিমানে আমরা ইলিশ নাও দিতে পারি। ইলিশ না দেয়াটা আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। ইলিশ, পদ্মার ইলিশ আমাদের মাছ। এটা খাব, না রফতানি করব, না ভারতে পাঠাবÑ এটা আমাদের সিদ্ধান্ত। সেখানে ভারতীয়দের কিছুই করার নেই। বড়জোর মনকষাকষি থাকতে পারে। একইভাবে ভারত গরু না দিলে আমাদের কিছু করার নেই। তারা তা ফেলে দেবে, না অন্যকিছু করবে সেটা তাদের ব্যাপার। ওখানে আমাদের কিছু বলার নেই। অভিমান করা যেতে পারে। আমি বিশ্বাস করি বাণিজ্যে ও ব্যবসাতে খাতিরের জায়গা কম। কারণ এটা চলে ব্যবসায়িক ভিত্তিতে। লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে।

পোষালে ব্যবসা হবে, না পোষালে হবে না। যা হবে তা ক্রেতা-বিক্রেতার পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে। কিন্তু যে জিনিসটা দেশ হিসেবে আমরা পারি তা হচ্ছে সক্ষমতা তৈরি করা। যেমন এই মুহূর্তে আমাদের গরু নেই বা কম আছে। তার উৎপাদন বাড়াতে পারি। আমরা সঙ্কটকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে পারি। একটা উদাহরণ দিই, এটা গত শতাব্দীর। পাকিস্তানের জন্মের পর। তখন কোরীয় যুদ্ধ চলছে। এর ফলে এক ধরনের ‘বুম’ হয়–বাজারের স্ফীতি। পাটের দাম ভীষণ বেড়ে যায়। আমাদের তখন প্রচুর কাঁচা পাট। মিল কম। আদমজী মিল হয়েছে। বিশাল মিল (এখন হাওয়া) এখনকার মতো এত শত শত মিল ছিল না। পাটকল ছিল কলকাতায়, হাওড়ায় এবং কলকাতার আশপাশ অঞ্চলে, গঙ্গার তীর ঘেঁষে। তাদের দরকার কাঁচা পাট। এটা ওদের নেই ১৯৪৭ সালের পূর্বের অবস্থা ছিল কাঁচা পাট আমাদের, পাটের কল পশ্চিম বঙ্গীয়দের। পার্টিশনের (১৯৪৭) পর পশ্চিমবঙ্গ বিপদে- পাটের জোগানোর জন্য তারা আমাদের ওপর নির্ভরশীল। কারণ পশ্চিমবঙ্গে পাট হয় না, যা হয় তা দিয়ে ওদের কাজ হয় না। এমন একটা পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সময় পাকিস্তান সরকার ভারতকে ‘শিক্ষা’ দেয়ার জন্য পাট রফতানি বন্ধ করে দেয়। অন্য জায়গায় পাটের বড় বাজার সৃষ্টি হয়েছে। প্রচুর দাম পাওয়া যাচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্কের কথা না ভেবে রাজনৈতিকভাবে স্থির করা হয়- পাট রফতানি বন্ধ। ভারত পড়ল বিপদে- তাদের কাঁচা পাট নেই। ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা ওদের! এই পরিস্থিতির ফল দুটো : সাময়িক এবং দীর্ঘমেয়াদি। সাময়িক ভারতের প্রচুর ক্ষতি হলো। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে তারা লাভবান। ভারত এখন আমাদের চেয়ে বেশি কাঁচা পাট উৎপাদন করে। রফতানিও বেশি। তারা করেছে কী- ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার পর যে সব কৃষক তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তান’ থেকে ভারতে চলে যায় তাদের কাজে লাগায় পাট চাষে। ফরিদপুর, ময়মনসিংহের পাটচাষীরা সেখানে গিয়ে পাট চাষ শুরু করল যেমন টাঙ্গাইলের ‘নেতাদের’ উৎপাতে যে সমস্ত তাঁতী ভারতের নবদ্বীপে গেছে তারা এখন ‘টাঙ্গাইলের শাড়ি’ তৈরি করে নবদ্বীপে। পরিস্থিতি মানুষকে ‘মানুষ’ করে, মানুষ বদলায়, নতুন বৃত্তি ধরে, পুরনো বৃত্তিকে আধুনিক করে।

ওপরের উদাহরণ থেকে কী শিক্ষা পেলাম? শিক্ষা একটাই। ভারত গরু দেবে না, না দিক। আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে গরুর খামারের সংখ্যা বাড়াতে মনোযোগ দেয়া দরকার এখুনি। টার্গেট : পরনির্ভরশীলতা হ্রাস। সাময়িক অসুবিধা যা হচ্ছে হোক।

আবার অন্যদিকও আছে। প্রতিবছর গরুর খামারিরা অভিযোগ করেন, তারা ভারতীয় চোরাচালানকৃত গরুর জন্য ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের গরুর খরচ বেশি অথচ বাজার দর কম। এখন সুযোগ এসেছে। খামারিরা দুটো পয়সা বেশি পাক সামনের ঈদে। সবাই উৎসাহিত হবে গরুর খামার করতে। লাভ হবে আরেকটা। দুধও পাওয়া যাবে। বছরে হাজার কোটি টাকারও বেশি দুধ আমদানি হয়। সেটা বন্ধ হবে। সরকারকে বলব গরুর সঙ্গে সঙ্গে মাছ ও ফল-ফলাদির উৎপাদনে সর্বশক্তি নিয়োগে করতে। ইতোমধ্যে একটি কাগজে দেখলাম খুবই ভাল খবর। পদ্মার চরে গরুর খামার হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল জাতের গরু প্রজনন করাচ্ছে। সেই গরুর বাজার হবে মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ী ও সরকার বাংলাদেশ থেকে গরু নিতে উৎসাহ দেখিয়েছে। প্রশ্ন গরু জ্যান্ত রফতানি হবে, না প্রক্রিয়াজাত মাংস রফতানি হবে। সুবর্ণ সুযোগ। গরু, খাসি, হাঁস-মুরগি, মাছ ও ফলের উৎপাদনে মনোযোগী হওয়া দরকার। বিনিয়োগ বাড়ান এই খাতে। অফুরন্ত সম্ভাবনা এখানে। সঙ্কটকে সম্ভাবনায় পরিণত করুন। ভারতের গরুর ওপর নির্ভরশীলতা কমুক- সীমান্ত সমস্যা কমবে, চোরাচালান কমবে, ‘হুন্ডি’ ব্যবসা ‘চাঙ্গে’ উঠবে।

লেখক : ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট ও

সাবেক শিক্ষক ঢাবি