২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ কা’বা শরীফ

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

বিশ্ব মানবসভ্যতার ইতিহাসে আরব দেশের মক্কা মুকাররমায় অবস্থিত কা’বাগৃহ সর্বপ্রাচীন ইবাদতগাহ্। এটা বায়তুল্লাহ বা আল্লাহ্্র ঘর। এই ঘর নির্মাণের ইতিহাস থেকে জানা যায় মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম ‘আলায়হিস্্ সালাম ও আদি মাতা হযরত হাওয়া আলায়হাস্্ সালামকে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেয়া হলে হযরত আদম আলায়হিস্্ সালাম বর্তমান শ্রীলঙ্কার একটি পাহাড়চূড়ায় এসে পড়েন এবং হযরত হাওয়া আলায়হাস্্ সালাম এসে পড়েন লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত জেদ্দায়। প্রায় সাড়ে তিন শ’ বছর তাঁরা নিঃসঙ্গ থেকে তওবা-ইস্্তিগ্্ফার করতে থাকেন। অতঃপর আল্লাহ্্ জাল্লা শানুহু তওবা কবুল করেন। সুদীর্ঘকাল পর তাঁরা মক্কা মুকাররমা থেকে প্রায় ৯ মাইল পূর্বে একটি পাহাড়চূড়ায় এসে মিলিত হন। পরবর্তীকালে এই পাহাড়টি আরাফাত পাহাড় এবং এর সংলগ্ন বিস্তীর্ণ প্রান্তর আরাফাত ময়দান নামে অভিহিত হয়। বর্তমানে এই পাহাড়ের নাম হয় জাবালে রহমত। প্রতি বছর ৯ জিলহজ তারিখে আরাফাত ময়দানে হজের সর্বপ্রধান অনুষ্ঠান হয়।

সে যাক, হযরত আদম (আ) ও হযরত হাওয়া (আ) এখানে মিলিত হয়ে তিন মাইল পশ্চিমে অবস্থিত একটি পর্বতঘেরা স্থানে এসে রাত্রিযাপন করেন। এই স্থানটির নাম হয়ে যায় মুযদালিফা। সকালে তাঁরা ৬ মাইল পশ্চিমে এসে বসবাস করতে থাকেন। এই স্থানটির নাম বাক্কা বা মক্কা। হযরত আদম আলায়হিস্্ সালাম জান্নাতে থাকাকালে সপ্তম আসমানে অবস্থিত ফেরেশতাদের কিবলা বায়তুল মা’মুর দেখেছিলেন। তিনি ওই রকম একটি ইবাদতগাহের জন্য দু’আ করেন। আল্লাহ্্র নির্দেশে কয়েকজন ফেরেশতা যমীনে একটি গৃহের ভিত্তি স্থাপন করেন। হযরত আদম (আ) ও হাওয়া আলায়হাস্্ সালাম ওই ভিত্তির উপর পাথর গেঁথে একটি ঘর তুলে সেখানে ইবাদত করতে থাকেন এবং এই ঘর তওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করতেন। তাঁদের সন্তান-সন্ততিগণও এই ঘর প্রদক্ষিণ করতেন। হযরত ইদ্্রীস (আ), হযরত নূহ (আ)-ও এ ঘর প্রদক্ষিণ করেছেন। হযরত নূহ আলায়হিস সালামের সময়কার মহাপ্লাবনে এ ঘর একটি স্তূপে পরিণত হয়, দীর্ঘকাল পর হযরত ইব্্রাহীম আলায়হিস্্ সালাম আল্লাহ্্র নির্দেশে তাঁর মিসরীয় বিবি হযরত হাজেরা আলায়হাস্্ সালাম ও তাঁদের সদ্যজাত পুত্র হযরত ইস্্মা’ঈল (আ)-কে ওই বিরানভূমিতে ওই স্তূপের পাশে রেখে তাঁর স্বদেশ ফিলিস্তিনে চলে যান। মাঝেমধ্যে তিনি ফিলিস্তিন থেকে এখানে এসে স্ত্রী-সন্তানের খোঁজখবর নিয়ে যেতেন। হযরত ইস্মা’ঈল আলাইহিস সালাম কিশোর বয়সে উন্নীত হলে একদিন হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস সালাম মক্কা মুকাররমায় এসে দেখতে পান তাঁর ছেলেকে ইস্মা’ঈল (আ) যমযম কূপের নিকট একটি যয়তুন গাছের ছায়ায় বসে শিকারের জন্য তীর পাথরে ঘষে ধারালো করছেন। আব্বাকে দেখে তিনি আনন্দে উল্লসিত হয়ে জড়িয়ে ধরেন। হযরত ইব্রাহীম (আ) ছেলেক বলেন, বেটা! আল্লাহ্ আমাকে একটি ঘর তুলতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই বলে তিনি অদূরে থাকা লাল রংয়ের স্তূপ দেখিয়ে বলেন ঘরের স্থান ওইখানটি। পিতা-পুত্র ওই স্থানটি খনন করতেই কা’বা শরীফের ভিত্তি বের হয়ে পড়ে। তখন হযরত ইস্মা’ইল (আ) পাথর সংগ্রহ করে অনেন আর হযরত ইব্রাহীম (আ) ভিত্তির উপর পাতর গাঁথতে থাকেন। তিনি একটি পাথরের উপর দাঁড়িয়ে পাথর গাঁথেন। দেয়াল উঁচু হতে লাগলে লিফ্টের মতো পাথর উপরে উঠতে থাকে। হযরত হাজেরা আলায়হাস সালামও এই ঘর নির্মাণে সহযোগিতা করেন। যে পাথরখ-টির উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইব্্রাহীম (আ) দেয়াল গাঁথার কাজ করছিলেন, সেই পাথরখ-ের উপর তাঁর পায়ের ছাপ পড়ে যায় যা মাকামে ইব্রাহীম নামে পরিচিত হয়। সেই মাকামে ইব্রাহীম অতিযতেœর সঙ্গে কা’বা শরীফের পূর্বপার্শ্বে এখনও একটি স্বর্ণ নির্মিত খাঁচায় সংরক্ষিত আছে। আল্লাহ্ জাল্লাহ শানুহু ইরশাদ করেন : আর যখন ইব্রাহীম ও ইসমাইল কা’বাঘরের দেয়াল তুলছিল তখন তাঁরা বলেছিল : হে আমাদের রব! আমাদের এই কাজ কবুল করো, নিশ্চয় তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা (সূরা বাকারা : আয়াত ১২৭)। আরও ইরশাদ হয়েছে : যখন কা’বাগৃহকে মানবজাতির মিলনকেন্দ্র ও নিরাপত্তাস্থল করেছিলাম এবং বলেছিলাম : তোমরা মাকামে ইব্রাহীমকে সালাতের স্থান রূপে গ্রহণ করো এবং ইব্রাহীম ও ইস্মা’ঈলকে তওয়াফকারী, ইতিকাফকারী, রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য আমার ঘরকে পবিত্র রাখতে আদেশ করেছিলাম (সূরা বাকারা, আয়াত ১২৫)।

আল্লাহ্র ঘর পুনর্ণিমিত হলে আল্লাহ জাল্লাহ শানুহু ইরশাদ করেন : যখন আমি ইব্রাহীমের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম সেই গৃহের স্থান তখন বলেছিলাম : আমার সঙ্গে কোন শরিক স্থির করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রেখো তাদের জন্য, যারা তওয়াফ করে এবং যারা কিয়াম করে, রুকু করে ও সিজদা করে এবং মানুষের নিকট হজের ঘোষণা দিয়ে দাও। ওরা তোমাদের নিকট আসবে উটের পিঠে চড়ে, ওরা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে (সূরা হজ : আয়াত ২৬, ২৭, ২৮)। আল্লাহ্র নির্দেশে হযরত ইব্রাহীম (আ) নিকটের আবু কুবায়েস পাহাড়ে উঠে দরাজকণ্ঠে হজের ঘোষণা প্রদান করলেন। তখন থেকে জিলহজ মাসে হজ করতে লোকজন আসতে থাকে কিন্তু কালক্রমে হজে বহু কুসংস্কার অনুপ্রবেশ করে এমনকি এখানে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপিত হয়। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে হজের বিধান লাভ করেন। আল্লাহ জাল্লাহ শানুহু ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ইবাদতগৃহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা তো বাক্কায়, তা বরকতময় ও বিশ্ব জগতের দিশারী, তাতে অনেক নিদর্শন রয়েছে, রয়েছে মাকামে ইব্রাহীম। আর যে কেউ সেখানে প্রবেশ করে সে নিরাপদ। আর আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে সেই সব মানুষের জন্য এই গৃহের হজ করা অবশ্য কর্তব্য যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে (সূরা আল ইমরান, আয়াত ৯৬-৯৭) হজের হুকুম নাযিল হওয়ার বছরে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হযরত আবূ বকর সিদ্দিক রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহুর নেতৃত্বে ৩০০ জনের এক হজ কাফেলা হজ পালনের জন্য মক্কা মুকাররমায় প্রেরণ করেন। এই হজের সময় হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহুকেও প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মক্কায় প্রেরণ করেন সূরা তওবার কয়েকখানা আয়াতে কারীমা পড়ে শোনানোর জন্য। সেই আয়াতসমূহের ২৮তম আয়াতে আল্লাহ জাল্লাহ শানুহু ইরশাদ করেন : ওহে তোমরা যারা ইমান এনেছো! মুশরিকরা তো অপবিত্র (নাজাসুন), এই বছরের পরে তারা যেন মসজিদুল হারামের নিকট না আসে (সূরা তওবা : আয়াত ২৮)। এর পরের বছর ১ লাখ ৪০ হাজার সাহাবী নিয়ে হযরত মুহম্মদ (স) হজ পালন করতে গমন করেন। এটা ছিল তাঁর জীবনের প্রথম এবং শেষ হজ। এটা বিদায় হজ এবং ইসলামের হজ নামে পরিচিত। এই হজের খুতবা শেষে আল্লাহ জাল্লাহ শানুহু ওহী নাযিল করেন। ইরশাদ হয়েছে : আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম (সূরা মায়িদা : আয়াত ৩)।

লেখক : পীরসাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ

উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা),

সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ