২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গুদাম ভর্তি পচা চাল

  • রামুতে ৪৩ টন জব্দ

স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার ॥ কক্সবাজারে খাদ্য বিভাগের অভ্যন্তরে চাল ক্রয়ের নামে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারী টাকা লুটপাট চালাতে খাদ্য কর্মকর্তা ও এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ চাল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে নিম্নমানের চাল ক্রয় করে গুদাম ভর্তি করে চলছে। জেলার রামুতে ৪৩ টন নিম্নমানের চালসহ দুটি ট্রাক জব্দ করেছে জেলা প্রশাসন। বুধবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সোহাগ চন্দ্র সাহার নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে চাল বোঝাই গাড়ি দুটি জব্দ করা হয়। খাদ্যশস্য ক্রয়সংক্রান্ত নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কক্সবাজারের স্থানীয় বাজার থেকে চাল না কিনে উত্তরাঞ্চল থেকে নিম্নমানের চাল ক্রয়ের অভিযোগে এসব চাল জব্দ করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। জেলা প্রশাসক মোঃ আলী হোসেন জানিয়েছেন- খাদ্যশষ্য ক্রয়ের ব্যাপারে সরকারের নিয়মের বাইরে এক কদমও পা দেয়া হবে না। তিনি জানান, রামুতে জব্দ করা চালের প্রকৃত মালিক পাওয়া যায়নি। তবে খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, কক্সবাজার জেলা খাদ্য বিভাগে সরকারের খাদ্য শস্য সংগ্রহ কার্যক্রমের আওতায় চাল ক্রয়ে ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ চলে আসছে বেশ কিছুদিন ধরে। খাদ্য বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নিম্নমানের চাল কম দামে ক্রয় করে তা উচ্চ মূল্যে জেলার ৬টি খাদ্য গুদামে সরবরাহ করছে। ইতোমধ্যে প্রায় চার হাজার মেট্রিক টন চাল খাদ্য গুদামে মজুদ করে সিন্ডিকেট সদস্যরা হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকা। সচেতন মহল জানান, নিম্নমানের চালসহ ২টি ট্রাক জব্দের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে কক্সবাজারে চাল ক্রয়ের নামে আসলে কি ঘটছে।

কক্সবাজার খাদ্য বিভাগের অভ্যন্তরে চাল ক্রয়ের নামে দুর্নীতির খবর পেয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক বুধবার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটি তৎক্ষণাৎ কাজ শুরু করে দেয়। দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে পঁচা চাল কম দামে এনে একেবারে ফ্রি স্টাইলে রামুতে সরকারী গুদামে গুদাম ভর্তি করার খবর পেয়ে তদন্ত টিম ছুটে যান সেখানে। ম্যাজিস্ট্রেট সোহাগ চন্দ্র সাহার নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে হাতেনাতে জব্দ করা হয় ২টি ট্রাক বোঝাই ৪৩ মে.টন পঁচা চাল। জানা গেছে, সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে কৃষকের উৎপাদনে ভর্তুকি দিয়ে বাজার দামের চেয়ে বেশি মূল্যে চাল ক্রয়। নিয়ম রয়েছে, খাদ্য বিভাগ সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে চাল কিনে সরকারী গুদামে মজুদ করবে। কিন্তু সরকারের মহৎ এ উদ্দেশ্যটি কৃষকদের কাছে পৌঁছতে দেয়নি কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও অসাধু ব্যবসায়ীরা। মিল মালিক ও চালের আড়তদারগণ কৃষকদের কোন তথ্য জানতে না দিয়ে উত্তরাঞ্চল থেকে কম টাকায় নিম্নমানের চাল কিনে এনে সরকারী গুদাম ভরে দিয়েছে। এতে একদিকে কৃষকের বস্তাভর্তি ধান মিলারদের গুদামে স্তূপ হয়ে পড়ে রয়েছে। অপরদিকে কৃষকরাই বঞ্চিত হয়েছে সরকারের দেয়া ভর্তুকি থেকে। সূত্র জানিয়েছে, বোরো (আতপ) চাল সংগ্রহ কার্যক্রমের আওতায় রামু উপজেলায় ৩ হাজার ৭৬ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে খাদ্য বিভাগ। প্রতি কেজি ৩১ টাকা দামে স্থানীয় ৮টি রাইচ মিল থেকে মান অনুযায়ী এসব চাল ক্রয় করে খাদ্য গুদামে সংগ্রহ করার কথা ছিল। কিন্তু জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ তানভীর হোসেনের যোগসাজশে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও রামু খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কক্সবাজারের তাজরেজা ফ্লাওয়ার মিলের ম্যানেজার সাগর-রফিক ও শহরের চাল বাজারের এসবি এন্টারপ্রাইজের বুলবুল মিলে সিন্ডিকেট করে নিম্নমানের পঁচা চাল কিনে বেশি দামে দেখিয়ে আত্মসাত করা হয়েছে সরকারের কয়েক কোটি টাকা। সিন্ডিকেটটি খাদ্য শস্য সংগ্রহ নীতিমালা লঙ্ঘন করে উত্তরাঞ্চলের বগুড়া, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকার চালের মোকাম থেকে প্রতি কেজি ২০-২১ টাকা দামের নি¤œমানের চাল ক্রয় করে তা ৩১ টাকা দামে রামু খাদ্য গুদামে সরবরাহ করছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বুধবার বিকেলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের নির্দেশে নিবার্হী ম্যাজিস্ট্রেট সোহাগ চন্দ্র সাহা রামু খাদ্য গুদামে অভিযান চালান। সেখান থেকে ঢাকা মেট্রো-ট-১৮-৬৬২৭ ও যশোর-ট-১১-২৬৮৮ নম্বরের দুটি ট্রাক থেকে ৪৩ মেট্রিক টন চালসহ গাড়ি দুটি জব্দ করা হয়। এসব ট্রাক বগুড়া ও ময়মনসিংহ থেকে আনা হয় বলে চালকরা জানিয়েছেন। বগুড়া থেকে আনা ঢাকা মেট্রো-ট-১৮-৬৬২৭ গাড়ির চালক ওবায়দুর রহমান জানান, রামু খাদ্য গুদামের জন্য বগুড়া থেকে ২৩ টন চাল নিয়ে আসা হয়। ময়মনসিংহ থেকে আসা যশোর-ট-১১-২৬৮৮ নম্বরের গাড়ির চালক মনিরুল ইসলাম জানান, ২০ টন চাল নিয়ে রামু খাদ্য গুদামে আসি।

কিন্তু চাল খালাসে দেরি হওয়ায় ধরা পড়ি। রামু উপজেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় গত ১২-১৩ দিন ধরে ভিন্ন এলাকার চাল এভাবে এনে গুদাম ভর্তি করা হলেও রামু উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযান পরিচালনাকারী জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সোহাগ চন্দ্র সাহা জানান, অভিযান চালিয়ে অবৈধ চাল ভর্তি দুটি ট্রাক জব্দ করা হয়েছে। এগুলোর মালিকানা উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ তানভীর হোসেন এ ঘটনা নিয়ে প্রথমে রহস্যজনক কথাবার্তা বললেও পরে ঘটনার তদন্ত চলছে বলে জানান। জেলা প্রশাসক মোঃ আলী হোসেন বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর অনিয়ম তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর চাল ভর্তি দুটি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনার ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ওদিকে উখিয়াতেও চাল ক্রয়ের নামে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কোটবাজারের ৩টি এবং উখিয়ার ৫-৬টি চাল মিলে উত্তরবঙ্গের চাল এনে বস্তা ভরে সরকারী গুদামে সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় ব্যক্তিও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।