১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হতাহতদের পরিবার ভুলতে পারেনি ॥ দুঃসহ স্মৃতি

  • ২১ আগস্ট ট্র্যাজেডি

নিজস্ব সংবাদদাতা, মাদারীপুর, ২০ আগস্ট ॥ ভয়াবহ ২১ আগস্ট ট্র্যাজেডি শুক্রবার। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত শেখ হাসিনার সমাবেশে বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় মাদারীপুরের ৪ নিহতের পরিবারের সদস্যরা ভাল নেই। এসব পরিবারে শোকের ছায়া এখনও কাটেনি। একই ঘটনায় আহতরা পঙ্গুত্ব নিয়ে দুঃসহ জীবন কাটাচ্ছে। এখনও তাদের সে দিনের নারকীয় স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায়। দীর্ঘ ১১ বছর পার হলেও সে দিনের দুঃসহ স্মৃতি আজও বয়ে বেড়াচ্ছে তারা। ২০১২ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে নিহত ও আহত পরিবারগুলো প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত থেকে ১০ লাখ টাকা করে অনুদান পেলেও এলাকার কেউ আর তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।

বর্বরোচিত এ গ্রেনেড হামলায় নিহত শ্রমিক নেতা নাসিরউদ্দিন ছিল আওয়ামী লীগের অন্ধ ভক্ত। তাই আওয়ামী লীগের মিছিল, মিটিং বা সমাবেশ হলে তাকে কেউ বেঁধে রাখতে পারতো না। মিছিল-মিটিং-এর আগে থাকতো, সেøাগান দিত। শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে সেই প্রতিবাদী কণ্ঠ আর শোনা যায় না।

নাসিরের বড় ছেলে মাহাবুব হোসেন জানান, বাবার উপার্জনেই চলতো সংসার। বাবার মৃত্যুর পর টাকার অভাবে আমাদের লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোন কোনদিন আধপেটা আবার কোনদিন খাবারই জোটেনি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দিয়েছেন। এখন সেই টাকার লভ্যাংশ দিয়ে আমার মা, আমি আর আমার ভাই নাজমুলকে নিয়ে কোনরকম বেঁচে আছি। আমি এখন ঢাকার বাংলা কলেজে বিএ পড়ছি, আমার ভাই কালকিনি উপজেলার কয়ারিয়া স্কুলে পড়ে। মাহাবুব দুঃখ করে বলেন, রাজনীতির জন্য যে জীবন উৎসর্গ করল সেই রাজনীতিকরা আমাদের কোন খবর রাখেন না। তাদের নামে কোন স্মরণসভাও হয় না এলাকায়।

বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় নিহত রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের চানপট্টি গ্রামে যুবলীগ নেতা লিটন মুন্সি। লিটন মুন্সির মেয়ে মিথিলার বয়স এখন ১১। পিতার মৃত্যুর তিন বছর পর বিয়ে হয়েছে অন্যত্র। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকার অনুদান, লিটনের মা ও মেয়ের মধ্যে পাঁচ লাখ করে বিতরণ করে দেয়া হয়। বাবার পক্ষ থেকে এটিই তার শেষ পাওনা। মিথিলা এখন মা-এর সাথে থাকে। এদিকে লিটনের ছোট বোন ইসমত আরা বলেন, ‘বাবা, মা আর আমরা দু’ভাই-বোন ছিলাম এ সংসারের সদস্য। বাবা-মা’র বয়স হয়ে গেছে। কোন কাজ করার ক্ষমতা নেই। যেটুকু জমি-জিরাত আছে, তার উৎপাদিত ফসলেই আমাদের চালিয়ে নিতে হয়। এ ছাড়া আর কোন উপায়ও নেই আমাদের। ২০১৩ সালে যখন চেক গ্রহণ করেন আমার মা, তখন প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আপনার সন্তান গেছে, দুঃখ করবেন না। আমরা আছি।

গ্রেনেড হামালায় নিহত অপর যুবলীগ নেতা মোস্তাক আহাম্মেদ ওরফে কালা সেন্টু। তার বাড়ি কালকিনি উপজেলার ক্রোকিরচর। সে বরিশালের মুলাদি নানা বাড়িতে বড় হয়েছে। এ কারণেই তার লাশ মুলাদিতেই দাফন করা হয় সে সময়। কথা হয় সেন্টুর স্ত্রী আইরিন সুলতানার সঙ্গে। তিনি এখন ঢাকার মার্কেন্টাইল ব্যাংকে চাকরি করেন। এক মেয়ে আফসানা আহমেদ হৃদিকে (১২) নিয়ে ঢাকায় থাকেন। তিনি বলেন, ‘এমন দুঃখজনক স্মৃতি কি ভোলা যায়, না মুছে যায়। মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় থাকি। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকার অনুদান পেয়েছিলাম। সে সম্বল আর চাকরি থেকে যা পাই, তা দিয়েই মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভাবছি’।

গ্রেনেড হামলায় অন্যদের মধ্যে নিহত সুফিয়া বেগমের বাড়ি রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ি ইউনিয়নের মহিষমারি গ্রামে। ওই দিন মহিলা নেতৃবৃন্দের সঙ্গে প্রথম সারিতেই ছিলেন সুফিয়া বেগম। চঞ্চলা ও উদ্যমী এই সুফিয়া সপরিবারে ঢাকায় থাকতেন। নিহত হবার পর তাকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

কালকিনি পৌরসভার বিভাগদি গ্রামের মোহাম্মদ আলী হাওলাদারের ছেলে হালান হাওলাদারের একটি পা গ্রেনেড হামলায় নষ্ট হয়ে গেছে। আজীবন পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে তাকে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছিলেন হালান। এখন সে ঢাকা ঘুরে ঘুরে মুরগির ব্যবসা করে।

ভৈরবে নাজিম

নিজস্ব সংবাদদাতা, ভৈরব থেকে জানান, গ্রেনেড হামলায় ভৈরবের যুবলীগ নেতা নাজমুল হাসান নাজিম বোমার স্পিøন্টার শরীরে বহন করে যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন। ঘাতকদের গ্রেনেড নাজিমের একটি পা ও একটি হাত পঙ্গু করেছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা সে দিনের হামলায় আহতদের উন্নত ও সু-চিকিৎসার জন্য ভারতের পিয়ারলেস হাসপাতালে পাঠান। আহত নাজিমুদ্দীনও ভারতে চিকিৎসা নেন। কিন্তু পুরোপুরি ভাল হননি।

কালকিনির ছাইদুল

নিজস্ব সংবাদদাত, কালকিনি (মাদারীপুর) থেকে জানান, দিন গড়িয়ে রাত আসে, কিন্তু ঘুম তো দু’চোখে আসে না। কারণ ঘুমালে দু’চোখে ভেসে আসে সেই ২১ আগস্টের ভয়াল চিত্র। তখন আর ঠিক থাকতে পারি না ভয়ে শরীরটা শক্ত হয়ে যায়। ভয়ে চিৎকার করে উঠি। আর বলতে থাকি কে আছ আমাকে বাঁচাও... বাঁচাও। কথাগুলো বললেন মাদারীপুরের কালকিনি পৌর এলাকার চড় ঝাইতলা গ্রামের দিনমজুর অহেদ আলী সরদারের ছেলে ছাইদুল সরদার। তার সংসারে রয়েছে তিন ভাই ও এক বোন। ছাইদুল সবার ছোট। তিনি আওয়ামী লীগের টানে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকা পল্টন ময়দানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহাসমাবেশে যোগদান করেন। সেখানে সেই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার শিকার হয়ে হারিয়ে ফেলেন বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি। ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায় তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। তিনি অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেননি। এখন বিনা চিকিৎসায় কাটছে তার দিন। ছাইদুল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দ্বারে-দ্বারে ঘুরে পাননি কোন সাহায্য সহযোগিতা।