২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিআইডির সেই তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হিমাগারে

সিআইডির সেই তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হিমাগারে

গাফফার খান চৌধুরী ॥ আতঙ্কে রয়েছেন বহুল আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্তের নামে জজ মিয়া নাটকের সেই জজ মিয়া ও তার পরিবার। ক্ষমতার পালাবদলে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় গেলে জজ মিয়া পরিবার নানা ঝামেলায় পড়তে পারে বলে সিআইডির কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জজ মিয়া ও তার মাসহ পরিবারের সদস্যরা। যদিও সরকারের তরফ থেকে জজ মিয়া ও তার পরিবারকে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জজ মিয়া ও তার পরিবার আতঙ্কে থাকলেও জজ মিয়া নাটকের জন্ম দেয়া সেই তিন সিআইডি কর্মকর্তা জামিনে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে মামলা তদন্তের নামে জজ মিয়া নাটক সাজানোর অভিযোগে দায়েরকৃত মামলাটির তদন্ত হিমাগারে চলে গেছে। মামলাটির আলোর মুখ দেখার আর কোন সম্ভাবনা নেই। তিন সিআইডি কর্মকর্তাকে একুশে আগস্টের মূল মামলায় আসামি করা হয়েছে। এ জন্য তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাটির তদন্ত অযৌক্তিক বলে জানিয়েছেন সিআইডির উর্ধতন কর্মকর্তারা। এজন্য মামলাটির তদন্ত থেমে আছে।

সিআইডি সূত্র বলছে, সিআইডির সেই আলোচিত তিন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদেও জজ মিয়া নাটক ও শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতাদের হত্যার মিশন বাস্তবায়নে হাওয়া ভবন মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করার নানা কাহিনী প্রকাশ পেয়েছে। হামলার বিষয়টি বিএনপি ও জামায়াতের হাইকমান্ড জানত। ২০০০ সালের ২০ ও ২৩ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় সমাবেশের কাছে বিশাল আকারের বোমা পুঁতে রেখে শেখ হাসিনাকে দুই দফায় হত্যার মিশন ব্যর্থ হয়। এরপর শেখ হাসিনাকে নিশ্চিতভাবে হত্যা করতেই পাকিস্তান থেকে উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক হিসেবে সারা দুনিয়ায় পরিচিত সে দেশেরই তৈরি আর্জেস-৮৪ মডেলের প্রায় ২শ’ গ্রেনেডের একটি চালান আনা হয়েছিল। দুই কার্টনে ১০০টি করে ২০০টি গ্রেনেড আনা হয়েছিল। এক কার্টন পাকিস্তানের নাগরিক মজিদ বাট ও বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাইজুদ্দিনের মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীরের মুজাহিদদের দেয়া হয়। অপর চালানটি বাংলাদেশে রাখা হয়। এর মধ্যে কিছু একুশে আগস্টে ব্যবহার করা হয়। পরবর্তীতে অব্যবহৃত থাকা গ্রেনেডের মধ্যে ৭৬টি উদ্ধার হয়।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে দলটিকে নেতৃত্বশূন্য করার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। হামলায় ২৪ জন নিহত ও ৫ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। এ ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে রাজধানীর মতিঝিল থানায় পৃথক দু’টি মামলা হয়। এ নিয়ে সারাবিশ্বে ঝড় বইতে থাকে।

তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি হিসেবে বর্তমানে কারাবন্দী লুৎফুজ্জামান বাবর তড়িঘড়ি করে মামলা দুটি সিআইডিতে পাঠিয়ে দেন। এরপর মামলা তদন্তের নামে শুরু হয় স্মরণকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রহসন। প্রথম দফায় মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় বিএনপি-জামায়াতের আশীর্বাদপুষ্ট সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমানকে। তদন্তের দায়িত্ব পেয়েই তিনি ঢাকার ৫৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার মোখলেছুর রহমান, শৈবাল সাহা পার্থ, আব্বাস, গুলশান থানার এক ব্যবসায়ী হত্যা মামলার আসামি দুই ভায়রা আবুল হাশেম রানা ও শফিকুল ইসলামসহ ২০ জনকে আটক করে গ্রেনেড হামলা মামলায় গ্রেফতার দেখান। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে দুই ভায়রা ২০০৫ সালের ১০ জুলাই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পুলিশের হাতে অস্ত্রসহ ধরা পড়েন। মুন্সী আতিকের তদন্ত নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রশ্ন তুললে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুর রশীদকে দায়িত্ব দেয়া হয়। আব্দুর রশিদ ও ঢাকা মেট্রোর ওই সময়ে দায়িত্বে থাকা স্পেশাল সুপারভাইজার (এসএস) এসপি রুহুল আমিন মামলা তদন্তের সার্বিক দায়িত্ব পালন করেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তা হামলাকারীদের গ্রেফতারের পরিবর্তে জজ মিয়া নাটকের অবতারণা করেন। ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে জজ মিয়াকে গ্রেফতার করে সিআইডি। তাকে সোজা মালিবাগ সিআইডি অফিসে নেয়া হয়। দরিদ্র পরিবারের সন্তান জজ মিয়া। সামান্য দিনমজুর। জজ মিয়ার পুরো পরিবারকে আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়ার লোভ দেখায় সিআইডি। প্রথমদিকে সিআইডির প্রস্তাবে রাজি হয়নি জজ মিয়া। এরপর জজ মিয়ার ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। সিআইডির কথামতো না চললে জজ মিয়াকে খুনের মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হবে। ফলে সারাজীবন জেলের অন্ধকারে থাকতে হবে। এ জীবনে আলোর মুখ দেখা হবে না। এমন ভয় দেখানো হয় জজ মিয়াকে। সর্বশেষ এতেও রাজি না হলে জজ মিয়াকে চোখ বেঁধে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে নিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যার প্রস্তুতি নেয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে যায় জজ মিয়া। শেষ পর্যন্ত উপায়ন্তর না দেখে জজ মিয়া সিআইডির কথামতো রাজি হয়। রাজি হওয়ার পর জজ মিয়ার পরিবারকে আজীবন ভরণপোষণ দেয়া হবে বলে সিআইডির তিন কর্মকর্তা জজ মিয়াকে প্রতিশ্রুতি দেন। এমনকি এমন প্রতিশ্রুতি জজ মিয়ার পরিবারের সদস্যদের দেন সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এমন চাপের মুখে জজ মিয়াকে আদালতে গ্রেনেড হামলার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে বাধ্য করেন আলোচিত তিন সিআইডি কর্মকর্তা।

আর গুলশান থানায় ব্যবসায়ী হত্যা মামলায় অস্ত্রসহ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেফতারকৃত দুই ভায়রা শফিকুল ইসলাম ও আবুল হাশেম রানাকেও ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকি দিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে বাধ্য করেন সিআইডির আলোচিত তিন কর্মকর্তা। এমন জবানবন্দীকে পুঁজি করেই ২০০৪ সালের ২ অক্টোবর ১৫ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে ১১ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশীট দাখিলের অনুমতি চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চার্জশীটের অনুলিপি দেয় সিআইডি।

মামলার তদন্ত নিয়ে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে বরাবরই অভিযোগ করা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মামলাটির পুনর্তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবীরকে। তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে তদন্তের নামে জজ মিয়া নাটক সাজানোর এমন চাঞ্চল্যকর কাহিনীসহ সব অজানা তথ্য।

সিআইডি সূত্র বলছে, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় সমাবেশে বোমা পুঁতে রেখে শেখ হাসিনাকে হত্যার মিশন ব্যর্থ হওয়ার পর শেখ হাসিনাকে নিশ্চিতভাবে হত্যা করতেই পাকিস্তান থেকে আর্জেস গ্রেনেড আনা হয়েছিল, যা পাকিস্তানের তৈরি অধিক উচ্চমাত্রা বিস্ফোরক বলে পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি গ্রেনেড ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর এক খুনীর সেলের সামনে থেকে কারা কর্তৃপক্ষ ও লালবাগ থানা পুলিশ উদ্ধার করে। শেখ হাসিনা গ্রেনেড হামলায় মারা গেলে গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কারাগারের মূল ফটক উড়িয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ১১ জুন ২২ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশীট দাখিল করা হয়। আর ২০০৯ সালের ৩০ মার্চ তদন্তের নামে জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার দায়ে মামলাটির চার্জশীট দাখিলকারী কর্মকর্তা সিআইডির জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবীর বাদী হয়ে রাজধানীর পল্টন থানায় সিআইডির সাবেক ওই ৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। দায়েরকৃত ওই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহ, জোরপূর্বক জজ মিয়া, আবুল হাশেম রানা ও শফিকুল ইসলামকে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে বাধ্য করাসহ মামলার আলামত নষ্টের অভিযোগ আনা হয়। এ মামলাটি সিআইডির জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার রওনকুল হক চৌধুরী তদন্ত করেন।

তদন্তের ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের ৭ এপ্রিল গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়া জজ মিয়া, আবুল হাশেম রানা ও শফিকুল ইসলাম, জজ মিয়ার মা জোবেদা বেগম, বোন খুরশীদা বেগম, ভাই আবুল হোসেন, রাজধানীর ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার মোখলেছুর রহমান, শৈবাল সাহা পার্থ, আরিফ, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী গ্রহণকারী দুই বিচারক শফিক আনোয়ার ও জাহাঙ্গীর আলম এবং সিআইডির তিন কর্মকর্তার জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। সিআইডিকে দেয়া জবানবন্দীতে জজ মিয়া নাটক সাজানোর কাহিনীর বর্ণনা করেন।

সিআইডির একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, মামলা তদন্তের ধারাবাহিকতায় সিআইডির সেই আলোচিত তিন কর্মকর্তাকেও জিজ্ঞাসাবাদে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জিজ্ঞাসাবাদে হাওয়া ভবন শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতাদের হত্যার মিশন বাস্তবায়নের মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করেছে বলে জানা গেছে। হামলার বিষয়টি বিএনপি ও জামায়াতের হাইকমান্ড জানত। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনাকে দুই দফায় হত্যার মিশন ব্যর্থ হওয়ার পর পাকিস্তান থেকে আর্জেস গ্রেনেড আনা হয়। গ্রেনেড আনার মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেছে পাকিস্তানের নাগরিক মজিদ বাট ও বিএনপির সাবেক মন্ত্রী এ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাইজুদ্দিন।

এ ব্যাপারে একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার প্রথম দফার চার্জশীট দাখিলকারী সিআইডির জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবীর জনকণ্ঠকে বলেন, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনার অংশ। বিষয়টি তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের শীর্ষ পর্যায়ের অনেকেরই জানা ছিল। শেখ হাসিনাকে নিশ্চিতভাবে হত্যা করতেই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক আর্জেস গ্রেনেড আনা হয়েছিল। আর গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিতকারীরাও নানাভাবে সুবিধা নিয়েছেন। বর্তমানে ওই তিন সিআইডি কর্মকর্তা জামিনে রয়েছেন। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সিআইডির তিন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। এজন্য গ্রেনেড হামলা মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে জজ মিয়া নাটক সাজানোর দায়ে দায়েরকৃত মামলাটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।