১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আইএসের পাতা ফাঁদে যে কারণে পশ্চিমা মেধাবী তরুণীরা পা দিচ্ছে

  • জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ মেয়েদের নতুন স্বপ্ন দেখিয়ে জঙ্গী বানানো হচ্ছে

নাজনীন আখতার ॥ পারিবারিক আবহে বীতশ্রদ্ধ, জীবন নিয়ে হতাশ, নতুন কিছু করার স্বপ্নে বিভোর পশ্চিমা বিশ্বের মেধাবী কিশোরীরা জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএসের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে। আইএসের নতুন শক্তিতে তারা ‘জিহাদী পরিণত হতে যাচ্ছে। মেধার দিক দিয়ে আইএসের অনেক পুরুষ কর্মীদের চেয়েও অনেক বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন ওই মেয়েরা। সম্প্রতি ইরাক ও সিরিয়ায় ভ্রমণ করা ৪ হাজার পশ্চিমা নাগরিকদের মধ্যে সাড়ে ৫ শ’য়েরও বেশি নারী ও কিশোরী জঙ্গী সংগঠন আইএসে যোগ দিয়েছে।

১৭ আগস্ট দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, বসনিয়া, আফগানিস্তান ও ইরাকে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার নামে লড়াইয়ে এতদিন পর্যন্ত শুধু পুরুষরাই যোদ্ধা হিসেবে আইএসে যোগ দিত। ওই যুদ্ধক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। কিন্তু সম্প্রতি নারীদেরও বিশেষ করে কমবয়সী মেয়েদের যোগ দেয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রয়েছেন পশ্চিমা দেশের নাগরিক। নানাভাবে কিশোরীদের আইএস প্রলুব্ধ করে সংগঠনে যুক্ত করছে। বিশ্বদখলে আইএসের নৃশংসতায় যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে ওই নারীদের বেশিরভাগকে স্ত্রী, মা, নিয়োগকর্মী এবং কখনও কখনও অনলাইন সহিংসতার চিয়ারলিডার্সের ভূমিকাতেই বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে গত ফেব্রুয়ারিতে লন্ডন থেকে তিন কিশোরীর সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগ দেয়ার ঘটনাও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়।

তিন কিশোরীর একজন খাদিজা সুলতানা বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্তও তার মা জানত না বিষয়টি। ফেব্রুয়ারি মাসে স্কুলের ছুটিতে ১৬ বছরের খাদিজা তার এক বন্ধু ও ভাগ্নির সঙ্গে নাচানাচি, দুষ্টুমি করছিল। বাবা-মারা যাওয়ার পর খাদিজা তার মায়ের একদম বাধ্য মেয়েতে পরিণত হয়। বাসা ছেড়ে যাওয়ার আগের দিন নিজের রুম ছেড়ে রাতে মায়ের সঙ্গে শুয়েছিল খাদিজা। সকালে লাইব্রেরিতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়। বিকেল সাড়ে চারটায় ফেরার কথা থাকলেও সাড়ে পাঁচটায়ও মধ্যেও যখন খাদিজা ফিরে আসেনি তখনই মায়ের দুশ্চিন্তা শুরু হয়। খাদিজার সেলফোনে তার বড় বোন হালিমা খানম মেসেজ পাঠিয়ে কোন জবাব পান না। লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখেন সেখানে খাদিজা নেই। স্কুলেও নেই। পরে তাদের মা রুমে গিয়ে খাদিজার ওয়ার্ডরোব খুলে দেখতে পান কাপড় চোপড়ও নেই, প্রয়োজনীয় বেশ কিছু জিনিস নেই, দুটো ব্যাগও নেই। তার বোঝার বাকি থাকে না ধীরে ধীরে সব কিছু গুছিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে খাদিজা। পরদিন পুলিশে রিপোর্ট করেন মেয়ের নিরুদ্দেশের। পুলিশের ধারণা, খাদিজা দুই বান্ধবীর সঙ্গে তুরস্ক বেড়াতে গেছে। খাদিজার বোন জানায়, তার মনে একবারও উঁকি দেয়নি সিরিয়ার কথা। পরে তারা নিউজে দেখে জানতে পারেন খাদিজা সিরিয়ায় গেছে। নিউজে গ্রেইনি সিকিউরিটি ক্যামেরা ফুটেজে দেখানো হয়েছিল, খাদিজা তার ১৫ বছর বয়সী দুই বান্ধবী শামীমা বেগম ও আমিরা আবাসির সঙ্গে ধীরে ধীরে বিমানবন্দরের সিকিউরিটি পার হচ্ছে। তারা তুরস্কের একটি বিমানে করে প্রথমে ইস্তাম্বুল এবং পরে বাসে করে সিরিয়া পৌঁছায়। ওই তিন কিশোরী রীতিমতো পরিকল্পনা করে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় তাদেরই এক বন্ধু। যে ইতোমধ্যে ইসলামিক স্টেটের দখলে থাকা অঞ্চল ঘুরে গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়লগের প্রতিবেদন ও ডেটাবেজ অনুসারে, আইএসে যোগ দেয়া বেশিরভাগ নারীই অবিবাহিত ও কমবয়সী। ২০ বছরের কম বয়সী মেয়ের সংখ্যাই বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সী মেয়েটির বয়স মাত্র ১৩ বছর। আর্থসামাজিক অবস্থান, গোত্র ও জাতীয়তার দিক দিয়ে তারা ভিন্ন ভিন্ন। তবে তাদের বেশিরভাগই মেধার দিক দিয়ে অসাধারণ। প্রায় প্রত্যেকেই আইএসের অনেক পুরুষ কর্মীর চেয়ে বেশি পড়ুয়া ও মেধাবী।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই মেয়েদের উপস্থিতি আইএসের পুরুষ যোদ্ধাদের চেয়েও বেশি হুমকি হতে পারে পশ্চিমা বিশ্বের জন্য। তাদের মধ্যে কমসংখ্যক নিহত হতে পারে, বেশিসংখ্যক যুদ্ধে স্বামীহারা হতে পারে, এক ধরনের দীক্ষা ও তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে তারা নিজের ঘরে ফিরে আসার চেষ্টা করতে পারে। ইনস্টিটিউট ফর স্ট্রাটেজিক ডায়ালগ অনুসারে তাদের প্রতি চারজন নারীর একজন বিধবা। তবে ওই নারীরা আইএসের কৌশলগত সম্পদ হয়ে থাকলেও তারা পশ্চিমা বিশ্বের সন্ত্রাসবাদ দমনের বিষয়ে খুব কমই কাজের জন্য বিবেচিত হয়ে থাকে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রীনের বাসিন্দা তিন কিশোরী তাদের মেধার জন্য বেথনাল গ্রীন একাডেমির শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রশংসা পেত সব সময়। স্কুলের বেশিরভাগ মেয়েই তাদের মতো হতে চাইত। চকলেট রঙের সোজা চুল ও ভারি রিমের চশমা পরিহিত খাদিজা ওই একাডেমির প্রচ- মেধাবী শিক্ষার্থীদের একজন ছিল। বাড়ি ছাড়ার কয়েক সপ্তাহ আগেও খাদিজার শিক্ষিকার পাঠানো একটি প্রশংসাসূচক চিঠি তার বেডরুমে ঝুলতে দেখা গেছে। সেই চিঠিতে লেখা ছিল, ‘ইংরেজী ভাষায় তুমি তোমার টার্গেটের চেয়েও ভাল ফল করেছ, এটা কঠোর পরিশ্রম করার জন্য হয়েছে।’

খাদিজার বন্ধু আমিরা একজন তারকা এ্যাথলেট এবং খুব ভাল বক্তা, বিতার্কিক। সে ছিল স্থানীয় পাঠাগারের একজন নিয়মিত পাঠক। বুভুক্ষের মতো সে বই পড়ত। তার নিরুদ্দেশের পর পুলিশ তার বইয়ের তালিকা দেখে জানতে পারে সে বিদ্রোহমূলক বই পড়ত।

পুলিশী তদন্তে বলা হয়, আইএসে যোগ দেয়া তিন কিশোরী তাদের মেধার জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। আর এটাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। তারা যে উজ্জ্বল ভবিষ্যত ছেড়ে কালো অধ্যায়ের দিকে মোড় নিচ্ছে তা কেউ অনুমানই করতে পারেনি। তাদের আচরণে বেশ পরিবর্তন এসেছিল। অথচ বাবা-মা ভেবেছিলেন এটা বয়োসন্ধিকালীন স্বাভাবিক পরিবর্তন। হঠাৎ করেই তারা স্কুলের হোমওয়ার্ক ঠিকভাবে করছিল না, এরপরও তাদের মেধার ওপর আস্থা থাকায় শিক্ষকরা সেকথা তাদের বাবা-মাকে কখনও জানাননি।

কমবয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অন্য ধরনের কিছুতে বেশি আর্কষণও আইএসের মতো জঙ্গী সংগঠনে যোগ দেয়ার বিষয়ে উপলক্ষ হিসেবে কাজ করছে। ইংল্যান্ডে গত কয়েক বছরে ছেলে মেয়েদের মধ্যে একে অপরের কাছে আকর্ষণীয় হওয়া বা সমাজে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের মাপকাঠি কাজ করছে। স্কুল পড়ুয়াদের কাছে বিশেষ করে মুসলিম মেয়েদের মধ্যে ওই ছেলেটিই সবচেয়ে জনপ্রিয় যে নিয়মিত নামাজ পড়ে। ওই ছেলেটিই বেশি আর্কষণীয় যার দাঁড়ি আছে। পূর্ব লন্ডনের বাসিন্দা ২২ বছরের জোহরা কাদির তেমনটাই বললেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক কয়েক বছরে এ ধরনের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। আগে মেয়েরা তেমন ছেলেকেই পছন্দ করত যে দেখতে সুন্দর। আজকাল মুসলিম মেয়েরা নামাজী ছেলেদের বেশি পছন্দ করে। এমন কী যে মেয়েটি নিয়মিত ধর্ম চর্চা করে না সেও নামাজী ছেলে পছন্দ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বেথনাল গ্রীনের কিছু সারিবদ্ধ বাড়িতে রক্ষণশীল মুসলিম পরিবার বসবাস করে। ওই পরিবারগুলোতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মেয়ে সদস্যদের মুখ অচেনা হয়ে যাচ্ছে। তারা যেন আর পরিবারের কড়া গ-ির ঐতিহ্য মেনে নিতে চায় না। পারিবারিক আবহ থেকে মুক্তি পেতে চায় মেয়েগুলো। ওই পরিবারগুলোর অনেক মেয়ের কিশোরী অবস্থায় বিয়ে হয়ে যায়। খাদিজার বোন হালিমার বয়স ৩২ বছর। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল। অর্থাৎ খাদিজার চেয়ে এক বছর বেশি বয়সে বিয়ে হয় তার। নতুন প্রজন্মের কিশোরীর মধ্যে পরিবারের এ ধরনের ঐতিহ্যকে ভেঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

আর এ বিষয়গুলোকেই কাজে লাগাচ্ছে আইএস। ওই মেয়েদের স্বপ্ন, ভোগান্তি আর হতাশা চিহ্নিত করে নিজেদের দলে টানতে খুব সূক্ষ্মভাবে তাদের পথ দেখাচ্ছে আইএস। এই মেয়েরা বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পেছনের কারণ হিসেবে তুলে ধরে যে, তারা ন্যায়নীতিহীন এ সমাজ থেকে পালাতে চায়। খুঁজে বেড়াতে চায় ধর্মের গুণাবলী ও এর আসল অর্থ।

আমিরা ইংল্যান্ড ছাড়ার নয়দিন পর এক টুইটার বার্তায় লেখে, ‘আমি এই ধরনের এক সময়ে বাস করতে পছন্দ করি না।’

ওই তিন কিশোরীর আইনজীবী তাসনিমে আকুনজি বলেন, খেলাফত প্রতিষ্ঠার নামে আইএসে যোগ দিতে যাওয়া কিশোরীদের মূল ভাবনাটা হলো তারা নিজের লক্ষ্যকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। এই মেয়েরা অত্যন্ত আধুনিক শিক্ষার্থী। যখন কেউ সবার থেকে আধুনিক ভাবা শুরু করে নিজেকে তখন সে ভাবে সে যে কোন কিছু করতে পারে।

সিরিয়ায় পৌঁছানোর পর খাদিজা ইন্সটাগ্রাম চ্যাটিংয়ে প্রথমেই জানায়, সে শুধু বিয়ে করার জন্যই আসেনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ভিন্ন ভিন্ন মেয়ে নিয়ে আইএস একটি প্রোফাইল অনুমোদন করেছে। তাদের মুসলিম হিসেবে অন্য চোখে দেখা হয়। অমুসলিম আখ্যা দিয়ে যেভাবে ইয়াজিদি গোষ্ঠীর মেয়েদের ধর্ষণ করা হয় এবং যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হয়, ওই মেয়েদের তা থেকে ভিন্নভাবে দেখা হয়। পশ্চিমা বিশ্ব থেকে আসা খাদিজাদের মতো মেয়েদের জন্য একটি ম্যারেজ ব্যুরোও পরিচালনা করা হয়। চলতি বছর আইএসের মিডিয়া শাখা একটি ইশতেহার প্রকাশ করেছে যে, মেয়েরা ১৫ বছর বয়সে তাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করতে পারবে। আর তারা ৯ বছর বয়স থেকেই বিয়ে করতে পারবে। পাশাপাশি আইএসে প্রবেশ করা নারীদের সম্মানিত হিসাবেও প্রশংসা করা হয়।

আইএসের স্বঘোষিত খলিফা আবু বকর আল-বাগদাদী ইরাকী বংশোদ্ভূত এক জার্মান তরুণীকে তার তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করেছেন। ওই স্ত্রীকে খেলাফতের নারী বিষয়ক ইস্যু দেখাশোনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।