২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সেই দিনের স্মৃতি এখনও তাদের তাড়িত করে, বেঁচে থেকেও যেন মৃত

  • ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলারও উপযুক্ত বিচার প্রত্যাশা

এমদাদুল হক তুহিন ॥ ‘সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন ছিল আমার। সে জীবন তো এখন আর নেই! খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়। শরীরে এখনও দেড় হাজারের অধিক স্পিøন্টার রয়ে গেছে। সমাজের জন্য কিছু করার স্বপ্ন ছিল আমার। সাধ্য থাকা সত্ত্বেও এখন আর সে কাজগুলো করতে পারছি না। কে দেবে আমাদের সেই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন?’- ভয়াল বিভীষিকাময় রক্তাক্ত ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন সংরক্ষিত মহিলা-১৩ আসনের সংসদ সদস্য নাসিমা ফেরদৌসী। শুধু তিনি নন, সেদিন আহত চার শ’ জনের কেউ আর ফিরে আসেননি স্বাভাবিক জীবনে। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার রাতে আহতের শিরা-উপশিরায়ও জেগে ওঠে ব্যথা। মাসের নির্দিষ্ট কিছু রাতে চলে আসে জ্বর। স্বাভাবিক নয়, রক্তাক্ত সেই বিকেলের ব্যথা হয়েই ওই জ্বর আসে। তবু এখনও কেউ কেউ স্বপ্ন দেখেন উন্নত চিকিৎসার। বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউয়ে রক্তাক্ত সেই বিকেলে গুরুতর আহত হওয়া সিরাজুল ইসলাম রাড়ো বলেন, ‘জানি এ যন্ত্রণা নিয়েই বাঁচতে হবে। শুনেছি জার্মানিতে উন্নত চিকিৎসা হয়। ১০ থেকে ২০টি অপারেশন করা হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সম্ভব নয়, তবু উন্নত চিকিৎসা হোক এটা একান্ত কাম্য।’

আওয়ামী লাীগের পক্ষ থেকে সভানেত্রী শেখ হাসিনা প্রায় সবারই উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। চিকিৎসার জন্য এখনও সহায়তা পান অনেকে। তবে অঙ্কের হিসাবে তা নগণ্য। উপর সারির অনেকেই মাসিক সাহায্য পেলেও সাহায্য বঞ্চিত অনেকে, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় অফিসের অফিস সহকারী বিটু বিশ্বাসও সে দলে। তবে নিয়মিত সাহায্য সহযোগিতা পাচ্ছেন এমন অনেকেই আছেন। সাহায্য-সহযোগিতা ও চিকিৎসার কথা বাদ দিলেও প্রায় ১০ বছরেও বিন্দুমাত্র কমেনি সেই কষ্ট। আজও রক্তাক্ত হয়ে ওঠে আহতদের হৃদয়।

জনকণ্ঠের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নাসিমা ফেরদৌসী এমপি বলেন, ‘২১ আগস্ট, ২০০৪। সন্ত্রাস ও সারাদেশে বোমা হামলার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের প্রতিবাদী সমাবেশ। শনিবারের পড়ন্ত বিকেল। জননেত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলবেন। নেত্রী মাইক্রোফোনটা কারও হাতে তুলে দেবেন। একটি দৈনিকের একজন ফটো সাংবাদিক বলছিলেন, আপা একটু দাঁড়ান, আমার ছবি নেয়া হয়নি, একটা ছবি নিয়ে নিই। তখন আইভি আপার সঙ্গে আমিও মঞ্চে। এর মধ্যেই বিকট এক শব্দ। বিরাট আগুনের দলা। মঞ্চ ছিটকে নিচে পড়ে গেলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘আইভি আপা আমার উদ্দেশে ‘মা’ বলে চিৎকার করছিলেন। তখন মনে হচ্ছিল আপাকে ধরি। কিন্তু সেই শক্তি আমার নেই। তবু উঠে বসি। নিজেকে টেনে সরানোর চেষ্টা করি। এরই মধ্যে আরেকটি গ্রেনেড এসে পড়ে নেত্রীর ওপর। সেই গ্রেনেডে আমার একটি পা উড়ে যায়। স্পিøন্টার ঢুকে যায় পেটের ভেতর। নিজের পা’টা টেনে ধরি। তাকিয়ে দেখি চারদিকে লাশ আর লাশ।’ নাসিমা ফেরদৌসী বলেন, ‘ক্ষতবিক্ষত অবস্থায়ও মনে হচ্ছিল জননেত্রী শেখ হাসিনা কী বেঁচে আছেন? তাকিয়ে দেখি নেত্রীকে মানবপ্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। তারপর... তারপর..। আর কিছু মনে নেই! একসময় নিজেকে লাশের ট্রাকে আবিষ্কার করি। আর ঠিক তখনই বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার করে উঠি।’ কথাগুলো বলার সময় মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের এ নেত্রীর চোখের কোণে অজান্তেই ছলছল করে উঠতে দেখা যায় পানি। কিছুটা থামলেন তিনি।

আবার বলতেই শুরু করলেন, ‘আইভি আপার কেটেছিল, আমার পাও কাটার জন্য নেয়া হয়েছিল। আমার সন্তানরা তা দেয়নি। মাননীয় দেশনেত্রী শেখ হাসিনা উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। সেই সুবাধে পা দুটি এখনও আমার সঙ্গে আছে। আমাকে সংসদ সদস্য করা হয়েছে। আমার দ্বারা সমাজের উন্নয়নে আরও অনেক কাজ করার কথা ছিল। সে কাজ তো আর করতে পারছি না। আজও দেড় হাজার স্পিøন্টার শরীর বয়ে বেড়াচ্ছে। কে দেবে আমাদের সুস্থ জীবন?’ তিনি আবারও শুরু করলেন, ‘এ যন্ত্রণা তো শেষ হওয়ার নয়, শেষ হচ্ছে না। সেদিনকার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করা। জঙ্গী ও চারদলীয় জোট একত্রিত হয়ে হত্যার মিশনে নেমেছিল। আল্লাহ্ তার অশেষ রহমতের চাদর দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন মাননীয় নেত্রীকে!’ তিনি বলতে থাকেন, ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ও ২০০৪-এর ২১ আগস্ট একই সূত্রে গাঁথা। শেখ হাসিনা আহত সবার খোঁজখবর রাখেন। আমাদের সুস্থ ও সুন্দর জীবন ছিল, সে জীবন তো আর নেই!’ ঘটনার সময় নাসিমা ফেরদৌসী তখনও সংসদ সদস্য হননি, মহানগরের নেত্রী ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রায় ৪০০ মহিলা নেত্রী জড়ো হয়েছিলেন ওই সমাবেশে। এক সময়কার ঢাকা মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এখনকার সংরক্ষিত মহিলা আসন-১৩ এর সংসদ সদস্য। মহিলাদের উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন। ব্যক্তিগতভাবে নারী ফোরাম নামক একটি সংগঠনের পাশে থেকে অসহায় মানুষের সেবায় নিয়োজিত আছেন। তবু তার কষ্টের শেষ নেই, অসহায়ত্ব কাজ করে নিজের অজান্তেই।

বুধবার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে একান্তে কথা হয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মী আবদুর রাজ্জাক বিটু বিশ্বাসের সঙ্গে। ভয়াল রক্তাক্ত আগস্টের পূর্বাপর সময়েও আওয়ামী লীগ অফিসের অফিস সহকারী হিসাবে কাজ করছেন। আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ অফিস সহকারী বিটু বিশ্বাস জনকণ্ঠকে বলেন, নেত্রী তখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন। ব্যানার নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছি। ঠিক তখনই মুহুর্মুহু গ্রেনেড হামলা। দূর থেকে চিল্লিয়ে নেত্রীকে দোয়া পড়তে বলছিলাম। সেদিন আমরা যারা বেঁচে গিয়েছি, তবু যেন বেঁচে থেকেও বেঁচে নেই। শরীরে অসহ্য রকমের ব্যথা। শরীরের নানা অঙ্গ প্রত্যঙ্গে গ্রেনেডের স্পিøন্টার। বিটু বলেন, ‘অমাবস্যা ও পূর্ণিমার রাতে সমস্ত শরীরে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। রাতে জ্বর এসে যায়। তখন শরীর ম্যাসেজ করাতে হয়। সে ব্যথা কোনক্রমেই বুঝানো সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে চিকিৎসার জন্য দুবার অর্থ সাহায্য দেয়া হয়েছিল। প্রথমবার ২০ হাজার ও পরের বার ১ লাখ টাকা।’ মাসিক কোন সাহায্য পান কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, না কোন মাসিক সাহায্য পান না। নেতারা যা দেন তা দিয়েই চলে। তবে ওই অফিসে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৈরি করা সেদিনকার ঘটনায় শহীদ ও গুরুতর আহতদের নিয়ে বইয়ের একটি কপিই পাওয়া গেল। জানা যায়, একটি বইই অবশিষ্ট রয়েছে। বাকি সব বই নষ্ট হয়ে গেছে। যেন অনেকটা অবহেলা ও অযতœ। তবে লিস্টে থাকা নিজের নাম খুব যতœ সহকারে দেখাচ্ছিলেন বিটু।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ২৯ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রাডোও গুরুতর আহত হয়েছিলেন সেদিন। জামা খুললে বুকের মধ্যে এখনও স্পষ্টভাবে স্পিøন্টার দেখা যায়। চিকিৎসার ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, ২ বার চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু স্পিøন্টার বের করা সম্ভব হয় নি। ১০ থেকে ২০ টা অপারেশন করলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব নয়। চিকিৎসকরাও শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন এত অপারেশন করতে গিয়ে ভুলক্রমে কোন রগ কেটে গেলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে আসবে। আবেগতাড়িত অশ্রুসজল কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, এ ব্যথা নিয়েই বাঁচতে হবে। তবে জার্মানিতে উন্নত চিকিৎসা দেয়া হয় বলে শুনেছি। এই জ্বালা যন্ত্রণা থেকে একটু স্বাভাবিকভাবে বাঁচার জন্য খুব ইচ্ছে করে উন্নত চিকিৎসা দেয়া হোক। সাহায্য নয়, বরং তিনি চান উন্নত চিকিৎসা। তিনি বলেন, কোন মাসিক ভাতা পান না। আর তা দিয়েই কি হবে। চাই উন্নত চিকিৎসা।

ঘড়ির কাঁটায় তখন ৫টা ২২ মিনিটি। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে বক্তৃতা শেষ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তার হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে সামনের দিকে এগোচ্ছিলেন। ট্রাকের ওপর স্থাপিত অস্থায়ী মঞ্চ থেকে নামার সিঁড়ির প্রায় কাছে চলে আসেন। মুহূর্তেই শুরু হয় বৃষ্টির মতো গ্রেনেড হামলা। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে থাকে একে একে। জীবন্ত মানুষগুলো লাশ হয়ে যেতে লাগল। রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারদিক। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে শরীরের অংশবিশেষ। ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফোরণে মৃত্যুপুরীতে রূপ নেয় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। মূল লক্ষ্য ছিলেন সেদিনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিষয়টি নেতারা বুঝতে পেরে তৈরি করেন মানবপ্রাচীর। নেতা ও দেহরক্ষীদের আত্মত্যাগে ও সৃষ্টিকর্তার রহমতে অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচেন শেখ হাসিনা, তবে কানে এখনও সমস্যা রয়ে গেছে। সেদিনকার ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন। সেদিনের সেই ভয়াল হামলায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী আইভি রহমান, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব) মাহবুবুর রশীদ, আবুল কালাম আজাদ, রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদার, আতিক সরকার, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারি, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, বেলাল হোসেন, মামুন মৃধা, রতন শিকদার, লিটন মুনশী, হাসিনা মমতাজ রিনা, সুফিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), মোশতাক আহমেদ সেন্টু, মোহাম্মদ হানিফ, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মোমেন আলী, এম শামসুদ্দিন এবং ইসাহাক মিয়া।

সেদিন গুরুতর আহত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, আমির হোসেন আমু, আব্দুর রাজ্জাক, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের, এ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, মোহাম্মদ হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নজরুল ইসলাম বাবু, আওলাদ হোসেন, সাঈদ খোকন, মাহবুবা আখতার, এ্যাডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজল, নাসিমা ফেরদৌসী, শাহিদা তারেক দীপ্তি, রাশেদা আখতার রুমা, হামিদা খানম মনি, ইঞ্জিনিয়ার সেলিম, রুমা ইসলাম, কাজী মোয়াজ্জেম হোসেইন ও মামুন। পরবর্তী সময়ে ঢাকার সাবেক মেয়র হানিফ শরীরে অসংখ্য স্পিøন্টার নিয়ে জীবনের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

সেদিনের ঘটনায় আহত চারশ’ জনের কেউ এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেননি। সবার শরীরেই কমবেশি রয়ে গেছে স্পিøন্টার। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে সবাইকে। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবেও চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে ব্যথা ও যন্ত্রণা কমেনি বিন্দুমাত্র। বরং সময়ে অসময়ে বেড়ে যায় ক্রমে ক্রমে। নিহতের স্বজনদের মতো আহতরাও প্রত্যাশা করেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মতো একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলারও সঠিক বিচার পাবে দেশবাসী।