২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নজরুলের প্রেম ও গান

  • তৌফিক অপু

রৌদ্রোজ্জ্বল ঝড়া দিনের শেষে আধো আলো ছায়ার গোধূলি যেন মনে রঙ ছড়ায়। ধীরে ধীরে শান্ত হতে থাকা পরিবেশ মৃদু বাতাস আরও বেশি মনকে আন্দোলিত করে তোলে। এমনই মায়া ভরা গ্রামীণ পরিবেশে ভেসে আসা বাঁশির সুরে মন হারিয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। এমনই এক ঘটনার মধ্য দিয়ে জীবনে প্রথম প্রেমের সূত্রপাত ঘটে সাম্যবাদের কবি কাজী নজরুল ইসলামের। ঘটনাবহুল জীবনে নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে, শেষ জীবনে নির্বাক হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন তিনি। স্বল্প কর্মময় জীবনে যে ছাপ তিনি রেখে গেছেন তা হিসেব করলে আজও চমকে উঠতে হয়। কি করে একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব এমন অসাধারণ সৃজনশীল সৃষ্টি উপহার দেয়া? যা আজও পর্যন্ত কোন মানুষ তাঁর রেখে যাওয়া সৃষ্টি সম্পূর্ণ আত্মস্থ করতে পারেনি। ধারণা করা হয় এখনও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে তাঁর অনেক সৃষ্টি। আর এ ধারণার অন্যতম কারণ হচ্ছে মাঝে মধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে অপ্রকাশিত গান-কবিতার সন্ধান পাওয়া।

কাজী নজরুল ইসলাম সবচেয়ে বেশি খ্যাতি পেয়েছেন বিদ্রোহী কবি হিসেবে, কিন্তু এর বাইরেও তিনি প্রেম ও প্রকৃতিরও কবি। যদিও প্রেম ও বিদ্রোহ বৈপরিত্যপূর্ণ, কিন্তু কবির কাছে বুঝি তা হার মেনেছে। তিনি এই দুটো জিনিস সন্তরালে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। আর এ কারণেই বুঝি তাঁর কবিতা ও গানে আমরা একই সঙ্গে পাই প্রেমিক ও বিদ্রোহী সত্তাকে। বিদ্রোহী কবিতায় আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাশরী আর হাতে রণতূর্য’। প্রেম ও বিদ্রোহ যে সমানতালে চলতে পারে তার প্রমাণ মিলতে এই একটি লাইনই বুঝি যথেষ্ট। এই দ্রোহ এবং প্রেমকে ধারণ করে এমন স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ কেবল নজরুলের পক্ষেই সম্ভব।

কবির জীবনে প্রেম এসেছে বারবার। এই প্রেমেই তার কবিতা এবং গানের অন্যতম প্রেরণাদায়ক। আবার প্রেমে ব্যর্থ কবি হৃদয়ে বেজে উঠেছে বিরহের সুর। কবির জীবনে প্রেমের অধ্যায়ে বহু নারীর কথা উঠে আসলেও মূলত তিনজনের কাছে কবির প্রেম নিবেদনের প্রমাণ মেলে। এরা হলেন নার্গিস, প্রমীলা এবং ফজিলাতুন্নেসা। এর মধ্যে প্রমীলাকে নিজ ভুবনে আবদ্ধ করতে পারলেও বাকি দু’জনকে যেন পেয়ে হারিয়েছেন বারবার।

নার্গিস ট্র্যাজেডি

কবির জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ট্র্যাজেডি হচ্ছে এই নার্গিস ট্র্যাজেডি। কবি হৃদয়ে প্রথম প্রেম হিসেবে আবির্ভূত হন এই নার্গিস। যদিও নার্গিস নামটা কবিরই দেয়া। আসল নাম হচ্ছে সৈয়দা খানম। বাকরুদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত নার্গিস নামটি কখনও মন থেকে মুছে যায়নি। কবির গভীর ভালবাসার প্রমাণ এই নার্গিস উপাখ্যান থেকেই পাওয়া যায়।

সূত্রপাত মূলত নার্গিসের মামা আলী আকবর খানের মধ্য দিয়ে। এই ভদ্রলোকের সঙ্গে কবির পরিচয় ঘটে কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে। সেখানে আলী আকবর নিজের লেখা কবিতা বই আকারে ছাপিয়ে নিজেই বিক্রি করতেন। তার হাস্যকর কবিতা দেখে কবি আলী আকবরকে ‘লিচু চোর’ কবিতাটি লিখে দেন। সেখান থেকেই ঘনিষ্ঠতা। তবে আলী আকবরকে কবির বন্ধু-বান্ধবরা খুব বেশি পছন্দ করতো না। কবিকে বারবার সতর্কও করা হয়েছে তার থেকে দূরে থাকার জন্য। কিন্তু কবি তাতে খুব বেশি কর্ণপাত করতেন না। বন্ধুত্বের সূত্র ধরে আলী আকবর কবিকে তার বাড়ি কুমিল্লার দৌলতপুরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। কবিও সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। ১৯২১ সালের মার্চ মাসে কবি তার বন্ধ-বান্ধবদের না জানিয়ে আলী আকবরের সঙ্গে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হন। ময়মনসিংহের ত্রিশাল ছাড়ার পর এটাই ছিল কবির পূর্ব বাংলার প্রথম সফর। যাবার পথে তিনি ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ কবিতাটি লেখেন। ট্রেন থেকে কুমিল্লায় নেমে কবিকে প্রথমে আলী আকবরের স্কুলবন্ধু বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসায় গিয়ে ওঠেন। বীরেন্দ্রকুমারের মা বিরজা সুন্দরী দেবী এবং একই বাড়িতে জেঠি মা গিরিবাল দেবী তার দুই মেয়ে প্রমীলা এবং আশালতা সেনগুপ্ত নিয়ে থাকতেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে নজরুল রওনা দেন দৌলতপুরের দিকে। আর এ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বীরেন্দ্রকুমারের পরিবারের সবাইকে আপন করে নেন কবি। বিরজা দেবীকে তিনি সম্বোধন করতেন ‘মা’ বলে।

নজরুল সে সময়ই মধ্যাকাশের তারা। নাম ডাক চারদিকে ছড়াতে শুরু করেছে। সেদিকটা মাথায় রেখে আলী আকবর দৌলতপুরে কবির জন্য উষ্ণ অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করেন। কবির আগমন উপলক্ষে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। স্থানীয় কবিরা জড়ো হতে থাকেন এবং কবির জন্য নির্মাণ করা হয় তোরণ। এমন অভ্যর্থনায় কবি বেশ আপ্লুত হন। এবং সিদ্ধান্ত নেন কিছু দিন থাকার। এ বাড়িতেই আলী আকবরের বোন আসমাতুন্নেসা তার একমাত্র মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। আর এই মেয়েই হচ্ছে সেই নার্গিস।

এখানে বেশকিছু দিন কাটলেও নার্গিসের সঙ্গে দেখা হয়নি কবির। একদিন সন্ধ্যায় বাঁশি বাজাচ্ছিলেন কবি আনমনে। সেই বাঁশির সুর মুগ্ধ করে নার্গিসকে। পরদিন কবিকে এসে নার্গিস বলেÑ ‘আপনি কি গত রাত্রে বাঁশি বাজিয়েছিলেন? আমি শুনেছি’। এই পরিচয়ের পর থেকেই নজরুল আকৃষ্ট হতে থাকে নার্গিসের প্রতি। এবং এ কথা আলী আকবরকে জানান। আলী আকবরও যেন এ কথা শোনার অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি তড়িঘড়ি করে বিয়ের আয়োজন শুরু করেন। এর মধ্যে আলী আকবর জঘন্য কিছু কাজ করেন। তা হচ্ছে কবিকে উদ্দেশ্য করে বন্ধু যে চিঠি পাঠাতো তা তিনি গোপন করতেন এবং কবির পাঠানো চিঠিও পোস্ট করতেন না। যে কারণে যোগাযোগ শূন্য হয়ে পড়েন কবি। শেষমেশ তার পক্ষ হয়ে কাছে থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানান বিরজা দেবীকে। আর ভাগ্নিকে কবির উপযোগী করে গড়ে তুলতে নানা সাহিত্যের তালিম দিতে থাকেন যা কবির মোটেও পছন্দ হচ্ছিল না। এরপরে আসে সেই বিয়ের ক্ষণ বাংলা ১৩২৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ আষাঢ় বিয়ের দিন ধার্য হয়। সেদিন আকদও সম্পন্ন হয়। কিন্তু গোলমালটা বাধে কাবিনের শর্ত উল্লেখ করার সময়। সেখানে আলী আকবর শর্ত দেন কবিকে ঘরজামাই থাকতে হবে। যা কবি সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাখ্যাান করেন। বিয়ের আগের আচরণ এবং বিয়ের সময় দেয়া শর্ত বারবার কবিকে পীড়া দিচ্ছিল। আর সে কারণেই রাতে বিরজা দেবীকে ডেকে কবি জানান তিনি আর এখানে থাকবেন না। এখনই চলে যেতে চান। কবির সেই কথা বলার ধরন দেখেই বিরজা দেবী বুঝেছিলেন একে আর ধরে রাখা যাবে না। তাই তিনি সে রাতেই তার ছেলে বীরন্দ্রকুমারকে কবির সঙ্গী করে দেন। সেই রাতে দৌলতপুর থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত কাদামাখা পথ পাড়ি দেন কবি। হাঁটার পরিশ্রম এবং মানসিক যন্ত্রণায় অসুস্থ হয়ে পড়েন কবি। বিরজা দেবীর বাড়িতেই সেই অসুস্থতাকালীন সময়টা পার করেন। আর এখানেই শেষ হয়ে যায় নার্গিস পর্ব। মজার বিষয় হচ্ছে দৌলতপুর থাকা অবস্থায় কোন গান কিংবা কবিতা লেখেননি কবি। দীর্ঘ ১৬ বছর কোন যোগাযোগ ছিল না নার্গিসের সঙ্গে। ১৯৩৭ সালে হঠাৎ নার্গিসের লেখা একটি চিঠি পান কবি। সেই চিঠির উত্তরে তিনি একটি গান লিখে দেন...

‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই

কেন মনে রাখ তারে

ভুলে যাও তারে ভুলে যাও একেবারে।’

অবশ্য এর আগের বছরই নজরুল এবং নার্গিসের উপস্থিতে শিয়ালদহে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটে। বিচ্ছেদের সাত আট মাস পরে আলী আকবর তার বই ব্যবসার ম্যানেজার আজিজুল হাকিমের সঙ্গে নার্গিসের বিয়ে দেন। এই আজিজুল হাকিম ১৯২১ সালে নজরুলের গোপন করা চিঠিগুলোর সন্ধান পেয়ে তা ছাপিয়ে দেন।

প্রেমিকা ও স্ত্রী প্রমীলা

১৯২১ সালের ১৮ জুন বিয়ের রাতে দৌলতপুর থেকে কুমিল্লায় গিয়ে অসুস্থ নজরুল অনেকটাই সংজ্ঞাহীন। এ অবস্থায় তার সেবা করার দায়িত্ব পরে প্রমীলার ওপর। কারণ সে সময় প্রমীলা ছিল ওই বাড়ির মধ্যে সবার বড়। সে কারণেই বিরজা দেবী সব সময় প্রমীলাকে সঙ্গে সঙ্গে রাখতেন। এ সময়টাতে প্রমীলার সঙ্গ কবির মন কাড়ে। যা ধীরে ধীরে প্রণয়ে রূপ নেয়। সুস্থ হয়েই কবি তার বন্ধুবর কাজী মোতাহারের সঙ্গে ৮ জুলাই কলকাতায় ফিরে যান। একই বছর নবেম্বরে প্রমীলার টানে কবি আবার আসেন কুমিল্লায়। সেবার এক মাস ছিলেন তিনি। তবে এবারের আসার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটান। এ সময়ে কবি তাঁর বিখ্যাত দুটি কবিতা ‘বিদ্রোহী’ ও ‘ভাঙার গান’ রচনা করেন। এই বিদ্রোহী কবিতাই কবিকে দেশ জোড়া খ্যাতি এনে দেয়। এ প্রসঙ্গে নজরুল গবেষক ড. আবুল আজাদ লেখেনÑ “দুই অসামান্য রচনা ‘বিদ্রোহী’ ও ‘ভাঙার গান’ নজরুল ইসলামের অন্তরের গভীর মর্মপীড়ার ফসল। কে এর প্রেরণার উৎসÑ নার্গিস না প্রমীলা? নজরুল ইসলামের তাবৎ সাহিত্য কর্মে এই দুই নারীর অপরিসীম প্রভাব মূল্যায়ন করতে গেলে দেখা যাবে প্রেমের জগতে অন্তরের গভীর প্রাধান্য পেয়েছিল নার্গিস... পক্ষান্তরে প্রমীলাকে নিয়ে কবি জড়িয়েছেন জীবন জগতে বাস্তবে।”

১৯২২ সালে ফেব্রুয়ারিতে কবি তৃতীয় বারের মতো কুমিল্লায় আসেন। আর তিন বারের ভ্রমণে কুমিল্লার যুবসমাজ কবিকে বেশ আপন করে নেয়। ১৯২২ সালের নবেম্বরে নজরুল তাঁর সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধুমকেত’তে সরকারবিরোধী লেখালেখির কারণে গ্রেফতার হন। ১৯২৩ সালের ৮ জানুয়ারি তাঁর এক বছরের কারদ- হয়। এ নিয়ে দেশব্যাপী হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ এ সংবাদে ব্যথিত হয়ে তার ‘বসন্ত’ নাটকটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। সে বছরই ১৫ ডিসেম্বর নজরুল বহরমপুর জেল থেকে ছাড়া পান এবং সেখান থেকে সোজা কুমিল্লায় গিয়ে ওঠেন।

অবশেষে ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল তাদের বিয়ের দিন ধার্য হয়। অনানুষ্ঠানিকভাবে অল্প কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবের উপস্থিতিতে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। এ পথ চলার গতি কখনও থামেনি। কবি অসুস্থ হওয়া থেকে শুরু করে প্রমীলা তার শেষদিন পর্যন্ত কবির পাশেই ছিলেন।

বিদুষী ফজিলাতুন্নেসা

জ্ঞানের গভীরতা, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং আধুনিক নারী বলতে যা বোঝায় তার সব উপাদান বেগম ফজিলাতুন্নেসার মধ্যে বিদ্যমান ছিল। আর এসবই বুঝি আকৃষ্ট করেছিল নজরুলকে। ১৯২৮ সালে ঢাকায় দ্বিতীয় বারের মতো মুসলিম সাহিত্যসমাজ অধিবেশনে যোগ দিতে আসেন নজরুল। সেবার ওঠেন কাজী মোতাহার হোসেনের বাড়িতে। কাজী মোতাহার হোসেন তখন তৎকালীন বর্ধমান হাউসে (বর্তমানে বাংলা একাডেমি) সপরিবারে বসবাস করতেন। ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী। থাকতেন দেওয়ান বাজার রোডে বর্তমানে নাজিমুদ্দিন রোড। প্রায় বিকেলে ফজিলাতুন্নেসা কাজী মোতাহার হোসেনের বাড়িতে আসতেন এবং তার বউ শাশুড়ির সঙ্গে আড্ডা দিতেন। কখনও কখনও সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেলে কাজী সাহেব তাকে পৌঁছে দিয়ে আসতেন। একদিন কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে নজরুল ফজিলাতুন্নেসা বাসায় যান। সেখানে ফজিলাতুন্নেসা তার হাত দেখে দেয়ার জন্য নজরুলকে অনুরোধ করেন। নজরুল তার হাত দেখে সবকিছু হিসেব করে পরে জানিয়ে দেবেন বলে সেদিনের মতো বিদায় নিয়ে চলে আসেন। কিন্তু প্রথম দেখাতেই যে কবি তার প্রেমে পড়ে যান এ কথা শুধুমাত্র তিনজনই জানতেন। ফজিলাতুন্নেসা, কাজী মোতাহার হোসেন এবং কবি নিজে। তবে কবি এখানে প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হন। কিন্তু বারবারই ফজিলাতুন্নেসার প্রভাব তার জীবনে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু ফজিলাতুন্নেসা সে সম্পর্ক কখনই আগে বাড়তে দেননি। কবি বিভিন্নভাবে কাজী মোতাহার হোসেনকে অনুরোধ করেছেন ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে দেখা করার কিন্তু দেখা করার সুযোগ মেলেনি। মাঝে মধ্যেই চিঠি লিখতেন, কিন্তু উত্তর আসত না। অনেকদিন পর একদিন চিঠির উত্তর আসে, সেখানে লেখা থাকে তাকে আর কোন চিঠি না লিখতে। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ফজিলাতুন্নেসা বিলেত পাড়ি জমান। তার বিদেশযাত্রা উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানে কবি তখন গেয়ে শোনান তার বিখ্যাত গানটি...

জাগিলে পারুল কিগো ‘সাত ভাই চম্পা’ ডাকে,

উদিলে চন্দ্র-লেখা বাদলের মেঘের ফাঁকে ॥

চলিলে সাগর ঘু’রে

অলকার মায়ার পুরে

ফোটে ফুল নিত্য যেথায়

জীবনের ফুল্ল-শাখে ॥

আঁধারের বাতায়নে চাহে আজ লক্ষ তারা,

জাগিছে বন্দিনীরা, টুট ঐ বন্ধ কারা।

থেকো না স্বর্গে ভুলে,

এ পারের মর্ত্য কূলে,

ভিড়ায়ো সোনার তরী

আবার এই নদীর বাঁকে ॥

এবং একই উপলক্ষে ‘বর্ষ বিদায়’ কবিতাও রচনা করেন। এটি তাঁর বিখ্যাত প্রেমের কবিতাগুলোর মধ্যে অন্যতম। সেদিক থেকে বলা যায় ফজিলাতুন্নেসা কবির গান ও কবিতা রচনার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রেরণাদায়ক।

কবির জীবনে এই তিন নারীর নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু এদের পর আরও কয়েকজনের নাম জড়িয়ে কথা উঠেছিল সাহিত্যজগতে, সে সবে কবি থোরাই কেয়ার করেছেন বলে উল্লেখ আছে। অর্থাৎ প্রেমের সম্পর্ক হয়েছিল তেমন সুস্পষ্ট কোন ধারণা পাওয়া যায়নি। এরা হচ্ছেনÑ রানু সোম পরবর্তীতে যিনি কবি বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে প্রতিভা বসু নামে পরিচিতি পান। এছাড়াও উমা মিত্র, জাহানারা বেগম, কানন দেবী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

মিষ্টি প্রেমের যত গান

নজরুল যে সময় বিখ্যাত হয়ে ওঠেন সে সময় মাত্র তিনজনের জোয়ার। এরা হলেনÑ সঙ্গীতজ্ঞ দিলপ কুমার রায়, রাজনীতিবিদ সুভাষচন্দ্র বসু এবং কাজী নজরুল ইসলাম। সে সময়ে কবির লেখনীর ধার সবাই অবাক করত। সমানতালে প্রেম-বিদ্রোহের কিংবা প্রকৃতির গান কবিতা লিখে চলছেন। একই অঙ্গে এ যেন অনেক রূপ। তবে সবকিছু ছাপিয়ে প্রেম ও প্রকৃতির কাছে বারবার পরাস্ত হয়েছেন কবি। আর এ কারণেই হয়ত অস্ফুট কণ্ঠে বেরিয়ে এসেছে কালজয়ী সব প্রেমের গান।

শিল্পী আব্বাস উদ্দীন তার এক লেখায় লিখেছেন, ‘গ্রামোফোন কোম্পানিতে বসে কবি ও তার বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে গল্প করছিলেন, এমন সময় কথাচ্ছলে প্রশ্ন উঠলো যদি কেউ লটারিতে এক লাখ টাকা পেয়ে যায় তবে কে কার প্রিয়াকে কেমনভাবে সাজাবেন। কেউ কমলালয় স্টোর্সে যেতে চাইলেন, কেউবা সুইজারল্যান্ড, কিন্তু কবি খাতা কলম নিয়ে সাজাতে বসে গেলেন তার প্রিয়াকে... এর পরের গল্প তো ইতিহাস। তিনি তাঁর প্রিয়াকে সাজালেন সেই বিখ্যাত গানে...

মোর প্রিয়া হবে এসো রানী

দেবো খোঁপায় তারার ফুল

কর্ণে দোলাবো তৃতীয়া তিথি

চৈতি চাঁদের দুল ॥

এমনইভাবে বিভিন্ন সময় ও পরিবেশে কবি আমাদের জন্য রেখে গেছেন মিষ্টি যত প্রেমের গান। যা আজও প্রেমিক হৃদয়ে দোল দিয়ে যায়। সেই গানগুলো হচ্ছেÑ

মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলাম

ছিলাম নদীর চরে

যুগলরূপে এসেছি গো

আবার মাটির ঘরে...

প্রকৃতি ও প্রেমের মিশ্রণের গানÑ

শাওন রাতে যদি, স্মরণে আসে মোরে

বাহিরে ঝড়ো বহে, নয়নে বারি ঝড়ে... কিংবা

মেঘ মেদুর বরষায় কোথায় তুমি

ফুল ছড়ায়ে কাঁদে বনভূমি...

একবার আলফ্রেড রঙ্গমঞ্চে মিশরীয় নর্তকী মিস ফরিদা নাচ করছিলেন। গানটি ছিল উর্দু গজল, ‘কিস খ্যায়রো ম্যায় নাজনে... গানটি শুনে নজরুল কিছুক্ষণের জন্য আনমনা সেই সুর অবলম্বনে প্রকৃতি ও প্রেমের মিশেলে চমৎকার এক গান রচনা করেছেন। গানটি হলোÑ

আসে বসন্ত ফুলে বনে

সাজে বনভূমি সুন্দরী...

এছাড়াও নিখাঁদ প্রেমের গানের মধ্যে আরও রয়েছে অভিমান, যেমন...

নাই চিনিলে আমায় তুমি

রইবো আধেক চেনা

চাঁদ কি জানে কোথায় ফোটে

চাঁদনী রাতের হেনা...

রোমান্টিক গান বুঝি গুনে শেষ করা যাবে না। আর এ কারণে প্রেমিক হৃদয়ে কবি সারা জীবন অমলিন হয়ে থাকবে। আর এ কারণেই হয়ত লিখেছেন...

আমি চিরতরে দূরে চলে যাবো

তবু আমারে দিবো না ভুলিতে...

পিতৃ প্রেমও যে কবিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল তা কবির সেই বিখ্যাত গানে ফুটে ওঠেÑ

বাগিচায় বুলবুলি তুই

ফুল শাখাতে

দিসনে আজি দোল।

এই গানটি প্রমাণ করে। কবিপুত্র বুলবুল মারা যাওয়া গভীরভাবে শোকাহত হয়েছিলেন তিনি। এ নিয়ে তিনি আরও লিখেছেনÑ

ঘুমিয়ে আছে শান্ত হয়ে

আমার গানের বুলবুলি...

সত্যিকার অর্থে প্রেম এবং প্রেমময় সৃষ্টি কবিকে যেন আজ অমর করে রেখেছে। আর এই প্রেমবোধ কবিকে কাদিয়েছে, হাসিয়েছে সর্বোপরি ভিন্ন আঙ্গিক সৃষ্টির রসদ যুগিয়েছে। সৈয়দ আলী আশরাফ ‘নজরুল জীবনে প্রেমের এক অধ্যায়’ গ্রন্থে কিছু অংশ লিখেছেন এভাবে... ‘তিনি আসলে সৌন্দর্যের পূজারী, ব্যক্তির উপাসক নন। যে নারীর ভিতর সেই সৌন্দর্যের বিকাশ দেখেছেন এবং সে নারী তার মনে সেই পূজার যে আনন্দের অনুভূতি জাগ্রত করেছেন, তাকে পাওয়ার জন্য ন্যায়-অন্যায়, সমাজের বাধা নিষেধ মানতে তিনি রাজি নন।’

এমনই এক বাঁধনহারা স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তার মানুষ ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। যিনি সুন্দরের পূজা করেছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। যে হাতে বাঁশি সুর তুলেছে সে হাতেই রণতূর্য বেজেছে। যা অন্য কারও মধ্যে দেখা যায়নি। আর শাশ্বতপ্রেম বলতে যা বোঝায় তা হয়তো নজরুলের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়।

নির্বাচিত সংবাদ