১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অজর-অমর প্রাণী ও উদ্ভিদ

  • এনামুল হক

গ্রীক রূপকথার এক কাহিনী আছে। ট্রয়নগরীর রাজকুমার ছিলেন টিথোনাস। তাঁর ছিল এমন অপরূপ কান্তিময় চেহারা যে, সেই সৌন্দর্য সম্মোহিত হয়ে গেল ঊষার দেবী ইয়োস। তাঁকে সে অনন্তকাল কাছে পেতে চাইল। কিন্তু টিথোনাস যে মানব। সে যে নশ্বর। মৃত্যু যে এক সময় তাঁকে গ্রাস করবে। ইয়োস অগত্যা গেল দেবরাজ জিউসের কাছে। প্রার্থনা জানাল টিথোনাসকে যেন অমরত্ব দেয়া হয়, যাতে ইয়োস তাকে চিরসঙ্গী করে রাখতে পারেন। জিউস তাই করলেন। অমরত্ব দিলেন। টিথোনাস মরল না, তবে তার বয়স বাড়তে লাগল। এক সময় তাঁর সেই কান্তি চলে গেল। হারাল দৃষ্টি ও অন্যান্য ইন্দ্রীয়। ইয়োস তার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। শেষে সে তাকে একটি কক্ষে আটকে রাখল। সেখানে সে বিরামহীনভাবে মুখ দিয়ে অস্পষ্ট কিছু ধ্বনি তুলে চলে। এভাবে অমরত্বের যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকে টিথোনাস।

প্রাণী মাত্রই শেষ পর্যন্ত বুড়ো হয়ে মারা যায়। কিন্তু কিছু কিছু প্রজাতি আছে, যেগুলো সময়ের ভার বোধ করে না। সেগুলো বেঁচে থাকে অজরের মতো। এগুলো সত্যিই টেকনিক্যাল অর্থে অমর। টিথোনাসের মতো তাদের এই অমরত্ব ঠিক অভিশাপ নয়। অনেক প্রজাতি চিরতারুণ্য ধারণ করে থাকে। এখানে যে অমরত্বের কথা বলা হচ্ছে সেটা বায়োলজিক্যাল ইমমর্টালিটি বা জীবতাত্ত্বীয় অমরত্ব। এক্ষেত্রে প্রাণীগুলো মারা যায়। তবে ওগুলো বাহ্যত বুড়িয়ে যায় না। অমরত্ব মানে তো মৃত্যু না হওয়া। সেটা তো আর সম্ভব না। জীবতাত্ত্বীয়ভাবে অমর প্রাণীগুলো অবশ্যই মরবে। নানাভাবেই তাদের মৃত্যু হতে পারে। তবে মানুষ যেমন বুড়ো হয়ে মারা যায়, ওদের ক্ষেত্রে তেমনটা হয়। বুড়িয়ে গিয়ে মরে যাওয়া ওদের বেলায় কদাচিৎই ঘটে। অন্যকথায় বললে এরা মরে তবে এদের বয়স বাড়ে বলে মনে হয় না। টিথোনাসের ঠিক বিপরীত অবস্থা।

এর এক উত্তম দৃষ্টান্ত হলো ব্রিস্টলকোন পাইন। উত্তর আমেরিকার এই গাছগুলোর কোন কোনটি বিশ্বয়কর রকমের পুরনো। পাঁচ হাজার বছর আগে অর্থাৎ আজকের তুরস্কে সত্যিকারের ট্রয়নগরীর যখন পত্তন ঘটেছিল সে সময় গাছগুলো জন্মাতে শুরু করেছিল। এরা হাজার হাজার বছর বাঁচতে পারে। এদের ওপর অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা, তুষারপাত বয়ে যায়। পুরনো গাছগুলোর বাহ্যিক চেহারায় তার স্বাক্ষর থাকে। তাতে বয়স বাড়ার সঙ্গে মিউটেশন হারের উল্লেখযোগ্য কোন বৃদ্ধি ঘটে না। আরও বড় কথা, কচি অবস্থায় এই প্রাচীন বৃক্ষগুলোর সংবহননালীর টিস্যুগুলো যেভাবে কাজ করেছিল, এখনও সেভাবে কাজ করছে। কা-ের কোষগুলো শত শত বছর ধরে বাহ্যত তারুণ্যদীপ্ত ও বলিষ্ঠ রয়ে গেছে। এর রহস্য কি কেউ জানে না। তবে হাওয়ার্ড টমাস নামে এক উদ্ভিদবিজ্ঞানীর মতে, এই গাছের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে যাকে বলে মেরিস্টেম, যা নতুন বৃদ্ধি ঘটায়। এই কোষগুলো হাজার বছর ধরে তরতাজা তরুণ ও বলিষ্ঠ থাকতে পারে। আরেক ব্যাখ্যা হলো, ব্রিস্টলকোন পাইনের কা-ের কেন্দ্রভাগের ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণকারী একটি প্রোটিন আছে, ‘এরাবিডোপসিস’ নামে, যা কোষের বয়স বৃদ্ধিতে বাধা দেয়, যার ফলে এরা দীর্ঘায়ু হয়।

উদ্ভিদের মতো প্রাণীরা অত দীর্ঘায়ু হয় না। তবে কোন কোন প্রজাতি কদাচিৎ কয়েক শ’ বছর বাঁচতে পারে। অবশ্য একটা ব্যতিক্রম আছে। যেমন কলোনি গঠনকারী প্রবালরা ৪ হাজার বছরের বেশি বাঁচতে পারে, যদিও এক একটি প্রবালের আয়ু হতে পারে বড় জোর কয়েক বছর।

২০০৬ সালে আইসল্যান্ডের উপকূলে একটি সামুদ্রিক শামুক ধরা পড়ে, যার বয়স ছিল জীববিজ্ঞানীদের হিসেবে ৫০৭ বছর। এটাই রেকর্ডভুক্ত ও পরীক্ষিত সবচেয়ে বেশি বয়সের প্রাণী। ওটার নাম দেয়া হয় মিং। মিং কিভাবে এত দীর্ঘদিন বেঁচে ছিল? ব্রিস্টলকোন পাইন গাছের মতো সম্ভবত এরও কোষগুলোর বয়স অতি মন্থরগতিতে বেড়েছিল। ২০১২ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, মিংয়ের শরীরে হয়ত এমন পর্দা বা ঝিল্লি ছিল, যেগুলো কোষের ক্ষতি প্রতিরোধে অস্বাভাবিক সক্ষম।

হাইড্রা নামের নরম শরীরের একটি ক্ষুদ্র প্রাণী জেলিফিশের আত্মীয়। ছোট প্রাণীগুলোর আয়ু সাধারণত কমই হয়। হাইড্রা সাধারণত হয় ১৫ মিলিমিটার। এক জীববিজ্ঞানীর ল্যাবে একটি হাইড্রা ৪ বছরের বেশি বেঁচেছিল। ওই প্রাণীটির জন্য এটা বিস্ময়কর রকমের দীর্ঘ সময়। চার বছরের গবেষণা শেষে দেখা যায়, হাইড্রাটি প্রথম দিনের মতোই তারুণ্যে ভরপুর। এমনও তো হতে পারে, হাইড্রা ১০ হাজার বছর বাঁচতে পারে। হাইড্রার ক্ষুদ্র শরীরে অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন স্টেমসেল থাকে, যা কিনা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে হাইড্রার শরীরের এক বড় অংশ নতুন করে জন্মাতে পারে। এর শরীরে ফক্সও নামে এক প্রোটিন থাকে, যা বুড়িয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে।

জীবতাত্ত্বিক দিক দিয়ে অমরত্ব জেলিফিশেরও আছে। এর রহস্য লুকিয়ে আছে জেলিফিশের জটিল জীবনচক্রে। জেলিফিশের শুক্রাণু ও ডিম্বানু মিলিত হয়ে ক্ষুদ্র লার্ভায় পরিণত হয়। তবে সেই লার্ভা থেকে পূর্ণতাপ্রাপ্ত জেলিফিশ তৈরি হয় না। লার্ভা সাধারণত কঠিন কোন পৃষ্ঠদেশের ওপর টুপ করে পড়ে এবং নরম শরীরের শাখাময় কাঠামোয় পরিণত হয়, যার নাম পলিপ। বেশিরভাগ পলিপ নিজেরাই নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্লোন তৈরি করে ঠিক হাইড্রার মতো। তবে কোন কোন প্রজাতির ক্ষেত্রে পলিপ অন্য কিছুও করেÑ ছোট ছোট পুরুষ ও স্ত্রী জেলিফিশ তৈরি করে। এরাই আবার পূর্ণবয়স্ক হয়ে জেলিফিশ শুক্রাণু ও ডিম্বানু তৈরি করে। এভাবে ওই চক্রটি আবার নতুন করে শুরু হয়। অমরত্ব লাভকারী জেলিফিশ এই মৌলিক নিয়মটি অগ্রাহ্য করে। নিজেরা আবার অপরিণত পলিপে পরিণত হয় এবং এভাবে মৃত্যুর হাত থেকে পরিত্রাণ লাভ করে।

আমেরিকান লস্টার বা গলদা চিংড়িও (হোমারাস আমেরিকানস) জীবতাত্ত্বিক হিসেবে অমর শ্রেণীভুক্ত। প্রজননগত পূর্ণতা পেলে বেশিরভাগ প্রাণীর দৈহিক বৃদ্ধি মোটামুটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে আমেরিকান লবস্টারের বেলায় হয় না। তদুপরি একটা পূর্ণবয়স্ক লবস্টার দুর্ঘটনায় একটা অঙ্গ হারালে পুনরায় সেটাকে জন্মাতে পারে। অর্থাৎ, পূর্ণতা প্রাপ্তির পরও বিনষ্ট কোন অংশ নতুন করে গজানোর অসাধারণ ক্ষমতা এদের আছে। হয়ত এ থেকেই ব্যাখ্যা মিলতে পারে যে, এদের বড় বড় জাতগুলোর বয়স কেন অন্ততপক্ষে ১৪০ বছর। লবস্টারের এই আয়ু তাদের ডিএনের আচরণের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।