২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শিশুরা কেন হাসে

দুগ্ধপোষ্য বা কচি শিশুরা হাসে কেন? গবেষকদের কাছে এর চেয়ে বড় তামাশার প্রশ্ন আর হতে পারে না। তবে এর পেছনে যে গুরুতর বৈজ্ঞানিক কারণ আছে, তাতে সন্দেহ নেই।

ডারউইন তার শিশু পুত্রের হাসি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। ফ্রয়েড এই তত্ত্ব দাঁড় করেছিলেন যে, আমাদের হাসবার প্রবণতাটা শ্রেষ্ঠত্ববোধ থেকে উৎপত্তি হয়। তাই অন্যের দুর্ভোগ দেখলে যেমন কাউকে ধপাস করে পড়ে যেতে কিংবা এক্সিডেন্ট হতে দেখলে আমরা মজা পাই। কেননা আমার তো কিছু হচ্ছে না।

প্রখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ জা পিয়াগেট বলেছিলেন যে, শিশুদের হাসিতে তাদের মনের জগতে কি চলছে তা দেখতে পাওয়া যায়। কাজেই শিশুদের হাসি নিয়ে গবেষণা চালালে পারিবার্শ্বিক জগত সম্পর্কে তারা কেমন ধারণা লাভ করছে সে সম্পর্কে উপলব্ধি অর্জন করা যেতে পারে। তবে পিয়াগেট ১৯৪০-এর দশকে এই ধারণাটি ব্যক্ত করলেও তা ঠিকমতো পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। আধুনিক মনস্তত্ত্বেও এই বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে।

তবে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যাডিম্যান শিশুদের হাসি নিয়ে বিশ্বের সর্ববৃহত ও সর্বাঙ্গীণ এক জরিপ চালিয়ে এই অভিমত দিয়েছেন যে, শিশুদের হাসি থেকে আমরা বিশ্বজগত সম্পর্কে তারা ঠিক কি ভাবছে সেই চিত্রটি পেতে পারি। এ্যাডিম্যান প্রশ্নমালার সাহায্যে সারাবিশ্বের এক হাজরেরও বেশি বাবা-মায়ের ওপর জরিপ চালান। জরিপের ফলাফল বেশ চিত্তাকর্ষক। তাতে দেখা যায় যে, শিশু প্রথম নিঃশব্দে হাসে প্রায় ৬ সপ্তাহ বয়সে এবং প্রথম সশব্দে হাসে প্রায় সাড়ে তিন মাস বয়সে। কারোর কারোর ক্ষেত্রে সশব্দে হাসতে তিন গুণ বেশি সময় লেগে যেতে পারে, তবে তাতে উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই। শিশুকে সশব্দে হাসানোর একটা মোক্ষম কৌশল হলো, একটা টাওয়েল বা যে কোন পরিষ্কার কাপড় তার ওপর মেলে দিয়েই টেনে নেয়া। তবে শিশুর এই সশব্দে হেসে ওঠার একক সর্বাধিক কারণটি হলো সুড়সুড়ি বা কাতুকুতু লাগা। অন্যের গড়িয়ে পড়া দেখে শিশু যত না সশব্দে হেসে ওঠে তার চেয়ে নিজের গড়িয়ে পড়ার জন্য তার সশব্দে হেসে ওঠার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

বড় কথা হলো জরিপে দেখা গেছে যে, একেবারে প্রথম মৃদুহাসির সময় থেকে শিশুরা অন্যদের সঙ্গে হাসে এবং অন্যরা কি করে তা দেখে হাসে। সুড়সুড়ি বা কাতুকুতু লাগার মতো নিছক শারীরিক অনুভূতিটাই হাসির জন্য যথেষ্ট নয়। হঠাৎ করে কোন কিছুর উদয় হতে বা অদৃশ্য হতে যেতে দেখাও হাসির জন্য যথেষ্ট নয়। বড়রা যখন শিশুদের হাসাতে এ জাতীয় কিছু করে তখন তা বেশ কৌতুকময় হয়। এ থেকে দেখা যায় যে, শিশুদের হাঁটতে শেখা, কথা বলতে শেখা, হাসা সমস্ত ব্যাপারই হলো সামাজিক। শিশুকে কাতুকুতু দিলে দৃশ্যত সে হাসে। সেটা ঠিক তাকে কাতুকুতু দেয়া হচ্ছে বলে নয় এবং আপনি তাকে কাতুকুতু দিচ্ছেন বলে।

আরও বড় কথা হলো কাউকে ধপাস করে পড়ে যেতে দেখে শিশুদের হাসি পায় ব্যাপারটা এমন নয়। বরং অন্যদের চেয়ে তারা নিজেরাই ধপাস করে পড়ে গেলে তাদের হাসি পাওয়া ও হেসে ওঠার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। অন্যদের দুঃখভারাক্রান্ত, অখুশি দেখতে পাওয়ার চেয়ে সুখী দেখতে পেলেই শিশুরা হাসে। জরিপের এই ফলাফলের ভিত্তিতে ফ্রয়েডের তত্ত্বকে ভ্রান্ত বলে মনে হয়।

বাবা-মায়েদের পরিবেশিত তথ্যে যদিও দেখা গেছে যে, ছেলে শিশুরা মেয়ে শিশুদের তুলনায় একটু বেশি হাসে, তথাপি তাদের উভয়ের কাছে বাবা ও মাকে সামন মজার বলে মনে হয়। তবে তারা এতই ছোট যে, এমন মনে হওয়ার কারণ বোঝাবার মতো ক্ষমতা তাদের থাকে না।

এ্যাডিম্যান এখনও তথ্য সংগ্রহ করে চলেছেন। তিনি আশা করেন যে, গবেষণার ফলাফল আরও স্বচ্ছ আকার ধারণ করলে তিনি তাঁর এই বিশ্লেষণকে কাজে লাগিয়ে দেখাতে পারবেন, কিভাবে হাসির মধ্যে শিশুর চারপাশের জগত সম্পর্কে উপলব্ধি গড়ে ওঠার সন্ধান পাওয়া যায়, কিভাবে বিস্ময় থেকে ধারণা জন্মলাভ করে। তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গবেষণার বিষয় হিসেবে শিশুর হাসির বিষয়টি অদ্ভুতভাবে অবহেলিত থেকেছে।

প্রকৃতি ও বিজ্ঞান ডেস্ক