২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডিভোর্সি মায়ের সমান সম্পত্তি পাওয়ার অধিকার চাই

  • রুখসানা কাজল

ডিভোর্সি মায়েদের সমস্যা অনেক। সর্বদা ঝাপসা দেখে চারপাশ। চোখ মুছে যখন তাকায় তখন মনে হয় এই পৃথিবীর মাটিতে আমার সবল পদচিহ্ন স্বীকৃতির লাল পতাকার মতো সগৌরবে দুলছে। আমি যে মা। আমিও মানুষ। আমার পরিচয়ে আমার সন্তান এই পৃথিবীর মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। কিন্তু আমি কি পারছি তা? বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে ডিভোর্সের হার উর্ধগতি। ক্রমাগত বাড়ছে বই কমছে না।

একটি সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকে। এই কারণগুলোর মধ্যে বর্তমানে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু কারণ। যেমন, নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, নিজের দায় নিজের দায়িত্বে গ্রহণ ও পালন করার আত্মশক্তি এবং সাহস, কন্যাসন্তানের প্রতি বাবা-মা বা অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রগতিশীলতা, রাষ্ট্রের অগ্রগামী এবং নারীবান্ধব আইন তৈরিতে সাহসী ভূমিকা গ্রহণ ইত্যাদি আরও কিছু। সবচেয়ে আনন্দ আর গর্বের বিষয় হচ্ছেÑ ‘পিতাই ধর্ম পিতাই সব’ এই অন্ধ কালাবদ্ধ ধারণাকে দুরমুশ করে সন্তানের বিশ্বাস অর্জন করা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সমাজের পুরাণ ধারণার ঘুণ ঝরে পড়ছে। এখন একটি মেয়ে ডিভোর্স নিলে বা পেলে বাবা-মা ভাইবোনরা বেদনা পেলেও তাদের মুখ পুড়ে যায় না। একজন নারীর সামনে জীবনের যে পথগুলো আগে রুদ্ধ ছিল বা রুদ্ধ করে রাখা হতো, আজ সেই পথ অনেকটাই খুলে গেছে। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের কাছে নারীরা যোগ্য হয়ে উঠেছে সন্তানের সব দায়-দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়ার জন্য।

বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত এবং নিম্নবর্গের মানুষের কাছে আগে সংসার ভাঙ্গা, আবার সংসার করা বা একেবারে না করে স্বাধীনভাবে একাকী বাঁচার প্রচলন ছিল। উচ্চবিত্তের ছিল অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। যা দিয়ে তারা সমাজের পাকা বাঁশ অনায়াসে বাঁকানো, মোচড়ানো বা ভেঙ্গে দিতে পারত। এই সকল মায়ের সন্তানরা কিন্তু দিব্যি মানুষ হয়ে সমাজে টিকে গেছে। আর নিম্নবিত্ত সমাজের একা একটি নারীও সন্তানের দায়িত্ব পালন করেছে অম্লান মুখে। দ্বিধান্বিত সমাজের মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে কে কি বলবে তার তোয়াক্কা না করে নিম্ন আয়ের গরিব মায়েরা যে কোন কাজ করে সন্তানের জীবন বাঁচিয়ে রেখেছে। সমস্যা ছিল বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের গ-িতে। এরা নিজেরাই শক্ত গেরো তৈরি করে হাঁসফাঁস করত যে কোন সমস্যায়। পাছে লোকে কি বলে ভেবে সারাক্ষণ শঙ্কিত ছিল এই গ-িবদ্ধ মধ্যবিত্তরা।

কিন্তু আশি পেরিয়ে নব্বই দশকে এই মধ্যবিত্ত সমাজে এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। রাজধানী ঢাকা পেরিয়ে শহর, নগর গ্রামে নারী জাগরণের এক মহাকর্মযজ্ঞ ঘটে গেছে। বিপুল উদ্যমে নারীরা বাইরে এসেছে। স্বল্প হোক সচ্ছল হোক, তাদের আয় দিয়ে তারা তাদের পরিবারের দুর্বল হাতটি সবেগে ধরে নিয়েছে। যেমন নিত পরিবারের পুরুষ সন্তানটি। ফলে নারী সন্তানটি এখন বাবা-মার কাছে আশ্রয়ের কা-ারি। নারীর প্রতি সকলের আস্থা এবং বিশ্বাস অর্জিতের জন্য সম্মানিত হচ্ছেন মধ্যবিত্ত নারীরা। তাহলে অসুবিধা কোথায় নারীর পরিচয়ে সন্তানের পরিচিতি দিতে? স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিসে, পাসপোর্ট তৈরিতে, জাতীয় পরিচয়পত্রে সবখানে বাবার পাশে মায়ের নাম থাকছে জাঙলা ঠেকা দেয়া কঞ্চির মতো করে। যে পুরুষটি সন্তানসহ ফেলে গেছে মাকে, জীবনে যে কোনদিন সন্তানের খোঁজ রাখেনি, সেই অসম্মত পিতৃনাম কেন বহন করবে সন্তানটি? ধর্মে আছে, মায়ের পদতলেই সন্তানের বেহেস্ত। আরও আছে হাশরের ময়দানে প্রতিটি মুসলিম ব্যক্তিকে তাদের মায়ের নামে ডেকে আমলনামা শোনানো হবে। তবে কেন এই পৃথিবীতে অনিচ্ছুক, অখুশি, দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃত একজন পুরুষের নাম থাকবে সন্তানের পরিচয়পত্রে?

আজকাল বেশ সুবিধা হয়েছে কিছু পুরুষের। চাকরিজীবী স্ত্রীদের ঘাড়ে সন্তানের দায়দায়িত্ব আর সন্তানের অস্তিত্বে নিজের নাম দিয়ে ফুরফুর করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরা কি সত্যিকারের পিতা হওয়ার যোগ্য? কোন মানদ-ে এদের পিতা বলা হবে? একজন নিষ্পাপ শিশুকে জন্ম দিলেই কি সে পিতা হতে পারে? বিশ্বের প্রতিটি ধর্মগ্রন্থে পিতার দায়দায়িত্ব পালনের অনুশাসন রয়েছে। আদালতে বিচ্ছিন্ন পিতাকে নির্দেশ দেয়া হয় সন্তানের ভরণ-পোষণের। তারপর? বাংলাদেশে সেই সন্তানকে ভিখিরির মতো দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। কেননা পিতা পুরুষ তখন মৌতাতে মগ্ন। এ রকম হাজার লক্ষ উদাহরণ রয়েছে ধনী, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবর্গের সমাজে।

এই মুহূর্তে নারী এবং সন্তানের মঙ্গল চেয়ে রাষ্ট্রের আরও সাহসী এবং অতি জরুরী আইন তৈরি করা দরকার নয় কি? মা-ই যদি সন্তানের সব রকমের দায়িত্ব পালন করে, তবে কেন মায়ের নামে পরিচিত হবে না সন্তানরা? স্কুল, কলেজে সর্বত্র কেন মাতৃনাম থাকবে না সন্তানের? কিংবা আমেরিকা-ইউরোপের দেশগুলোর মতো স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হলে কেন সম্পত্তি সমান ভাগ হবে না বিচ্ছিন্ন দম্পতির মধ্যে? রাষ্ট্রের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি (ক) সন্তানের সামাজিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে মাতৃনাম আবশ্যিক করে দেয়া হোক। (খ) বিচ্ছেদকালে স্বামী এবং স্ত্রীর সম্পত্তি সমানভাবে ভাগ করে দেয়ার কঠিন এবং শক্তিশালী আইন পাস করা হোক। যেহেতু নারীদেরই দায় বহন করতে হয় এবং সন্তানের খরচ দেয়ার ক্ষেত্রে পিতা পুরুষ গড়িমসি করে দায়িত্ব পালনে ফাঁকি দেয়, সেহেতু এই আইন সমাজের অনিশ্চয়তা দূর করতে অনেক সহায়ক হবে। মনে রাখতে হবে সমাজের পরিবর্তন হচ্ছে। সেইসঙ্গে আইনকেও গতিশীল করার কর্তব্য সরকারের তথা রাষ্ট্রের।

সমাজবিজ্ঞানীরা নানাবিধ গবেষণা করে দেখেছেন যে, বিষয়সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বংশ বা কুলপ্রথা, ছেলে সন্তানের মাধ্যমে বংশগৌরব বর্ধন, স্ত্রীদের কেবল সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে গণ্য করাÑ এই সকল কিছুই পুরুষের সৃষ্টি। নবপ্রজন্ম কিন্তু আরও অগ্রসর হচ্ছে এই বাংলাদেশে। কেননা বিজ্ঞান এখন মানুষকে সভ্যতা চিনিয়ে দিয়েছে। আদিম ভূমিতে মা নারীই মানব সভ্যতাকে টেনে এনেছে। সেখানে পুরুষের ভূমিকা ছিল না বা থাকলেও তার বেশির ভাগই ছিল অনুল্লেখ্য। সন্তানের একক অভিভাবকত্ব ছিল কেবল নারীর। নারী তখনও সবল ছিল সন্তান পালনে, এখনও সবল আছে সন্তান প্রতিপালনে। তখন ছিল প্রাকৃতিক পরিবেশ। আর এখন সভ্য পরিবেশে নারীর সামর্থ্যকে ছোট করার জন্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রাখা হয়। পুরুষ ভাল করেই জানে নারীকে স্বাবলম্বী করে তুললে তারা একাই চলতে পারবে। অথচ ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশে যে হারে ডিভোর্সের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, বিচ্ছিন্ন পরিবারের ছেলে-মেয়েদের দায়িত্ব কিন্তু সেইভাবে পিতারা পালন করছে না। তাছাড়া চিরন্তন নিয়ম অনুযায়ী সন্তানরা পিতাকে ছাড়তে রাজি হলেও মাকে ছেড়ে থাকতে চায় না। ফলে এক বিরাট অর্থনৈতিক চাপে পড়ে যায় মায়েরা। এ কারণেই রাষ্ট্রের এই মুহূর্তে দৃঢ় সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন যে, বিচ্ছিন্ন দম্পতির সম্পত্তি সমানভাবে ভাগ হয়ে যাবে স্বামী এবং স্ত্রীদের মধ্যে। আর যেহেতু মা-ই লালন পালন, লেখাপড়া ছাড়াও সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার যাবতীয় দায়িত্ব এক হাতে বা অন্যদের সাহায্য-সহযোগিতায় সম্পন্ন করে থাকে।, তাই মায়ের এই কষ্ট এবং ত্যাগকে সম্মানিত করে সন্তানের পরিচয় হবে মায়ের নামে। মা-ই হবে সন্তানের একমাত্র আইনগত অভিভাবক।