১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ধর্ষণের বিরুদ্ধে চাই প্রতিরোধ

  • অহর্নিশি অনন্য

ক্যান্সার একটি দুরারোগ্য ব্যাধির নাম। আমাদের সমাজের কমবেশি সবাই এই রোগটির সঙ্গে পরিচিত। তবে যা অনেকেই জানেন না, তা হলো এই রোগের চারটি স্তর আছে। প্রথম স্তর, দ্বিতীয় স্তর, তৃতীয় স্তর এবং চতুর্থ স্তর। এই রোগটি প্রথম স্তর ও দ্বিতীয় স্তরে থাকাকালীন আক্রান্ত দেহকে পুরোপুরি সারানো সম্ভব। কিন্তু এটি যখনই তৃতীয় স্তরে চলে যায় তখন থেকেই এটি আর পুরোপুরি আরোগ্যযোগ্য নয়। আর যখন এই রোগটি চতুর্থ স্তরে এসে পৌঁছায় তখন আর এটিকে কোনভাবেই সারানো সম্ভব নয়, পরিণতি নিশ্চিত মৃত্যু। বর্তমানে ঠিক এমনই একটি কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত আমাদের সমাজ, যার নাম ‘ধর্ষণ’।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। এই অর্ধেক শতাংশ মানুষই আজ যেন ভোগ্যপণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল যে কোন খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেল খুললেই তার প্রমাণ মিলছে। প্রতিদিনই ২-৪টি ধর্ষণের খবর মিলছে সারাদেশ থেকে। একদিকে দেশ প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে নতুন অগ্রগতির দিকে, অন্য দিকে দিন দিন বাড়ছে এসব নির্যাতনের সংখ্যা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) সারাদেশ থেকে গড়ে প্রতিদিনই গড়ে চার-পাঁচজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে চিকিৎসা নিতে আসে। আর প্রতি মাসে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় দেড় থেকে দুইশতে। এছাড়া দেশের অন্যান্য হাসপাতাল এবং চিকিৎসাকেন্দ্রে যারা চিকিৎসা নেন, তাদের প্রকৃত কোন হিসাব পাওয়া যায় না। আবার অনেকে চিকিৎসাও নিতে আসেন না। সুতরাং এমন অনেক ঘটনা অপ্রকাশিতই রয়ে যায় শুধু মাত্র ‘সামাজিক লজ্জার’ ভয়ে। আগে ধর্ষণ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েদের বয়স ১৫-২০ বছর হলেও বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্তের পরিধি আর অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ধর্ষণ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েদের বয়স ০৩-২০ বছর। অর্থাৎ নরপশুদের হাত থেকে কেউ আর নিরাপদ নয়। মেয়ে মাত্রই যেন ভোগের সামগ্রী হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় মহিলা পরিষদের হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ছ’মাসে সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৪৩১টি এবং এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮২ জন। এ সময়কালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৫ জনকে। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছেন আরও ৫১ জন। আর ২০১১ সালে সারাদেশে ৬২০, ২০১২ সালে ৮৩৬, ২০১৩ সালে ৭১৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়।

তবে অপহরণ করে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক হারে বেড়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৫৫৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রাস্তা থেকে অপহরণ করে গাড়ির মধ্যে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মামলা রয়েছে অন্তত ৫০ ভাগ। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ধর্ষণ একটি মানসিক বিকৃতি। একজন মানুষের মনুষ্যত্ব যখন শূন্যের কোঠায় চলে আসে তখনই সে ধর্ষণ নামক একটি পৈশাচিক অপরাধ করে। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে যখন প্রশ্ন করা হয় যে, কী কারণে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে?- তখন প্রথমেই দোষারোপ করা হয় ধর্ষিত নারীটির প্রতি। অর্থাৎ তাদের পোশাক-পরিচ্ছদের অশালীনতার ফলই হচ্ছে ধর্ষণ। তাদের মতে, মেয়েরা হচ্ছে আগুনের মতো এবং ছেলেদের যৌনসংযম অনেকটা মোমের মতো। মোম যেমন আগুনের সংস্পর্শে এলেই গলে যায় তেমনি অশালীন পোশাক পরা একজন নারীর সামনে একজন পুরুষ এলে তারও ভদ্রবেশী মুখোশ গলে গিয়ে কামনাময় চেহারা বের হয়ে আসে। ফলে এই কামনাবৃত্তি মেটাতে গিয়েই ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটে। ঠিক তখনই মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে যেই ৩ বছরের শিশুটি কিছু দিন আগে ধর্ষণের শিকার হলো তার পোশাকও কী অশালীন ছিল? বাংলাদেশ মূলত একটি ইসলাম ধর্মাবলম্বী দেশ। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক দিক থেকেও উন্নত। ইসলাম ধর্মে নারীকে পর্দা করতে বলা হলেও পুরুষদেরও চোখ অবনত রাখতে বলা হয়েছে বারবার। আমাদের দেশের অধিকাংশ মেয়ে তাদের পারিবারিক এবং সামাজিক রক্ষণশীলতার ব্যাপারটিকে মর্যাদা দিয়ে থাকে। তারই প্রতিফলন ঘটে প্রতিটি মেয়ের আচরণে এবং পোশাক পরিচ্ছদে। কিন্তু তারপরেও বাংলাদেশ ধর্ষক নামক ঘৃণ্য নরপশুদের হাত থেকে মুক্ত নয়। ধর্ষণের মূল কারণ হচ্ছে- পারিবারিক শিক্ষার অভাব, নৈতিক শিক্ষার অভাব, ধর্মীয় শিক্ষার অভাব, যৌন শিক্ষার অভাব, ইভটিজিং, অপসংস্কৃতির প্রভাব, মোবাইল পর্নোগ্রাফি, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, নারীর প্রতি জেদ, বাজে সঙ্গ, মাদকাসক্তি, নারীপুরুষের সমঅধিকারের অপব্যবহার এবং সর্বোপরি আইনের শাসন প্রয়োগের দুর্বলতা। সম্প্রতি একজন মহিলা পুলিশ ধর্ষিত হলে দুর্বল আইনের শাসনের প্রমাণ পাওয়া যায়। ধর্ষণের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করে ইভটিজিং। ইভটিজিং যারা করে তারা যদি সঠিক সময়ে বাধা না পায়, বা সংশোধনের সুযোগ না পায় তাহলে তারা পরবর্তীতে ধর্ষক হিসেবে পরিণত হয়। নারীর সৌন্দর্য ও বুদ্ধিমত্তা পুরুষকে মোহিত করবে সেটাই স্বাভাবিক। তাই বলে আচরণের বহির্প্রকাশ পশুর মতো হতে হবে কেন? আমাদের দেশে যদিও এখন অনেক সচেতনতা বেড়েছে, কিন্তু তারপরও ইভটিজিং বন্ধ করতে না পরলে ধর্ষণ বন্ধ হবে না।

বর্তমানে আমাদের যান্ত্রিক এই জীবনে সঠিক বিনোদনের কোন ব্যবস্থা না থাকায় ধর্ষণকে খুব জোড়ালোভাবে প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করেছে অপসংস্কৃতি এবং মোবাইল পর্নোগ্রাফি। এই দুটি জিনিসের অতি সহজলভ্যতার ফলে মূল্যবোধের প্রতিনিয়ত অবক্ষয় হচ্ছে যুব সমাজের। যার ফলে নিজেদের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে প্রতিশোধ নেয়ার পন্থা কিংবা নিছক বিনোদন হিসেবে বেছে নিচ্ছে ধর্ষণকে। দেশে আইন থাকলেও তার তেমন প্রয়োগ নেই। আমাদের সমাজের সবক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা হলো ঠুঁটোজগন্নাথের মতো। যার ফলে নেই কোন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ।

ফলে তারা উৎসাহিত হয়ে নারীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলতে চায়। আর যদি সফল না হয় তাহলে বিফলে মূল্য ফেরত হিসেবে ধর্ষণ করে তারা। আমাদের সমাজের ক্যান্সার স্বরূপ এই ‘ধর্ষণ’ নামক ব্যাধিটি বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তৃতীয় স্তরে এসে পৌঁছেছে। তাই এখনই যদি এর জন্য সঠিক ব্যবস্থা নেয়া না হয়, তাহলে আমাদের সমাজ থেকে একে সমূলে নির্মূল করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। দেশের আগ্রগতি হবে ব্যাহত। আমাদের সমাজ গিয়ে পৌঁছবে আইয়ামে জাহিলিয়াতের মতো যুগে। সচেতনতা বাড়াতে হবে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে। বাড়াতে হবে সঠিক বিনোদন এবং কর্মসংস্থানের স্থান। সর্বোপরি আইনের শাসন কায়েম করতে হবে, যেন অপরাধীরা পায় যথাযথ শাস্তি এবং সেই শাস্তি পুরো সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। যাতে মেয়েদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে অথবা জৈবিক লোভের বশবর্তী হয়ে যুবসমাজ এই অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে।