২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাগরতলের ভাস্কর্য

  • মাহবুব রেজা;###;বিস্ময় জাগে

জাদুঘর সাধারণত থাকে মাটির ওপরে। পৃথিবীর অনেক নামকরা জাদুঘর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পৃথিবীর নানা দেশে। লাখ লাখ পর্যটক প্রতি বছর সেসব জাদুঘর দেখতে যায়। এ রকম অনেক নামকরা জাদুঘরের কথা নিশ্চয়ই তোমরা বইতে পড়েছ। আমাদের দেশেও এ রকম বেশ কয়েকটি জাদুঘর রয়েছে। ঢাকা জাদুঘর প্রাচীন জাদুঘর হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। এ বছর জাদুঘরটি শত বছর অতিক্রম করেছে।

এটা তো গেল পৃথিবীর জাদুঘরের কথা। আচ্ছা, যদি পানির নিচে জাদুঘর থাকে তাহলে! আবার সেই জাদুঘর যদি শুধুমাত্র ভাস্কর্য দিয়ে তৈরি হয়, তাহলে! এবার তোমাদের জন্য পানির নিচে সে ধরনের একটি জাদুঘরের কথাই তুলে ধরব।

ক্যারিবিয়ান সাগরের তীরে গ্রানাডার উপকূলে সমুদ্রের নিচে এ রকম একটি জাদুঘর রয়েছে।

দেশের নাম গ্রানাডা। দেশটি ক্যারিবিয়ান সাগরে অবস্থিত। এটি ক্যারিবিয়ান দ্বীপরাষ্ট্র। তবে গ্রানাডা অন্য ক্যারিবিয়ান দেশগুলোর চেয়ে একটু আলাদা। এর একপাশে আছে ক্যারিবিয়ান সাগর আর অন্যপাশে আছে আটলান্টিক মহাসাগর। এই কারণে এই দেশের প্রকৃতি অপার সুন্দর।

গ্রানাডার রাজধানী সেন্ট জর্জেস থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে মলিনেয়ার সৈকত। এখানে আছে ন্যাশনাল মেরিন পার্ক। বছরখানেক আগে সাইক্লোনে দেশটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল মেরিন পার্কও। এই ঝড়ে পার্কের প্রাণীদের জীবনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো।

ক্ষতিগ্রস্ত প্রাণীদের জীবন যেন স্বাভাবিক পর্যায়ে আসে সেজন্য চিন্তাভাবনা চলল। অনেক চিন্তাভাবনার পর গবেষকরা প্রাণীদের জন্য একটা কৃত্রিম জাদুঘর তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন। সাগরের নিচে তৈরি করা হবে ভাস্কর্য রাজ্যের। আর সেই ভাস্কর্য রাজ্যে থাকবে নানা প্রাণীর সমাহার।

ভাস্কর্য রাজ্যটির আয়তন প্রায় ৮০০ বর্গমিটার। আর তাতে মোট ভাস্কর্য আছে ৬৫টি। ভাস্কর্য রাজ্যটি কেন এখানে বানানো হলো? এর পেছনে কারণও আছে। জায়গাটা চারপাশে পাথুরে ভূমি দিয়ে ঘেরা। সাগরতলের এই জাদুঘরের সাগরের গভীরতা হলো সর্বোচ্চ ২৫ মিটার।

ন্যাশনাল মেরিন পার্কে কেন তৈরি করা হলো এই ভাস্কর্য জাদুঘর? তার পেছনেও রয়েছে কারণ। রয়েছে উদ্দেশ্যও। ঘরের পাশে সাগর থাকলে মানুষ সেটা ব্যবহার করবেই। সেখানে নৌকা চালাবে, মাছ ধরবে, সাঁতার কাটবে, আরও কত কী করে। কিন্তু এসব কাজে সাগরের প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের পর এই সৈকতের প্রাণিকুলের জীবন প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। এই বিপন্ন প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখতে গবেষকরা একটা বুদ্ধিদীপ্ত সমাধানও বের করে ফেললেন। সেটা কী? তারা বিপন্ন প্রাণীদের ভাস্কর্য তৈরি করে পানির নিচে স্থাপন করে দিলেন। এতে করে বিপন্ন প্রাণীদের নমুনা রয়ে গেল পানির নিচে। সাগরের নিচে অবিকল সব প্রাণীর ভাস্কর্য দেখে উৎসাহীরা ধারণা নেন কেমন দেখতে ছিল তারা।

ভাস্কর্যের এই জাদুঘর তৈরি করতে এক বছরেরও বেশি সময় লাগে। আর এই জাদুঘর নির্মাণ করেছেন লন্ডনের ক্যাম্বারওয়েল কলেজ অব আর্টস থেকে গ্রাজ্যুয়েশন করা ব্রিটিশ ভাস্কর জেসন ডিক্লেয়ার টেইলর। জাদুঘরটি হাজার বছর আগে সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া একটি প্রাচীন সভ্যতার মতো করে তৈরি করা হয়েছে। ভাস্কর্যগুলো তৈরি করা হয়েছে তার, ইস্পাত ও কংক্রিটের সংমিশ্রণে। এরমধ্যে অনেকগুলো তৈরি করতে আবার কোন আলাদা জিনিসই ব্যবহার করা হয়নি। সাগরের নিচে থাকা প্রবাল দিয়েই তৈরি করা হয়েছে এসব ভাস্কর্য। তবে এর নির্মাতা জেসন টেইলর মনে করেন সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অন্যসব প্রাকৃতিক জিনিসের মতো এই ভাস্কর্যগুলোরও পরিবর্তন ঘটবে। সেই সঙ্গে সাগর এবং ঢেউয়ের কারণে এসব ভাস্কর্যের আকারও পরিবর্তিত হবে।

জাদুঘরের ভাস্কর্যগুলো বানানোর সময় এর নির্মাতারা গ্রানাডার ঐতিহ্যের কথা চিন্তা করেছেন। ভাস্কর্য তৈরি করার ক্ষেত্রে নির্মাতারা বিশালতার দিকে নজর দিয়েছেন। প্রতিটি ভাস্কর্যকে স্বাভাবিক আকৃতির চেয়েও ২৫ শতাংশ বড় করে বানানো হয়েছে।

ভাস্কর্যের এই জাদুঘরে রয়েছে অদ্ভুত সুন্দর সুন্দর ভাস্কর্য। সুন্দর এসব ভাস্কর্যের রয়েছে মজার মজার নাম। জাদুঘরের সবচেয়ে সুন্দর ভাস্কর্যের নাম হলো ‘দ্য লস্ট করেসপন্ডেন্ট’। এই ভাস্কর্য সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ২৩ ফুট নিচে অবস্থিত। ভাস্কর্যটিতে একজন লোক একটি টাইপরাইটার দিয়ে কতগুলো দলিল-দস্তাবেজ টাইপ করছেন। আরও একটি অসাধারণ সুন্দর ভাস্কর্যের নাম হলো ‘ভিসিসিচুডস’। পানির ১৬ ফুট নিচে অবস্থিত এটি। ২৬টি শিশুমূর্তিকে পরস্পরের হাত ধরে বৃত্তাকারভাবে দাঁড় করিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই ভাস্কর্য। প্রতিটি শিশুমূর্তি তৈরি করা হয়েছে ১০-১৪ বছর বয়সী শিশুর দেহের আকার ও ছাঁচে। জাদুঘরের সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলোÑ এসব ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে প্রবাল দিয়ে। ‘সিয়েনা’ নামে আরও একটি ভাস্কর্য রয়েছে। প্রায় চার ফুট আকৃতির একটি ভাস্কর্য এটি। এই ভাস্কর্যটি জেকব রস নামক গ্রানাডিয়ান এক লেখকের গল্পের একটি চরিত্রের আদলে তৈরি করা হয়েছে।

ভাস্কর্য রাজ্যের ভাস্কর্যগুলো তো এমনিতেই অনেক সুন্দর। আর ওগুলো আরও সুন্দর লাগে কখন জানো? যখন জাদুঘরে ভাস্কর্যগুলো যে-ই দেখে সেই চমকে যায়। সুন্দর সুন্দর এমন ভাস্কর্য আরও সুন্দর হয়ে ওঠে যখন ভাস্কর্যের গায়ে রং-বেরঙের আর বাহারি রূপের সামুদ্রিক প্রাণীরা বসে থাকে আর ঘুরে বেড়ায়, তখন।

ক্যারিবিয়ান সাগরের তীরে গ্রানাডার উপকূলের সাগরের নিচের মনোমুগ্ধকর ভাস্কর্যের জাদুঘর দেখে কৌতূহলী মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, সাগরের নিচেও এ রকম সুন্দর আর অনবদ্য জাদুঘর থাকতে পারে! ভাস্কর্যের এই অসাধারণ সুন্দর জাদুঘর মানুষকে নিয়ে যায় অজানা এক রাজ্যে।