২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দূষণ বাড়াচ্ছে মস্তিষ্কের বয়স

  • জানা-অজানা

জলবায়ুর পরিবর্তনে বিপদ ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে। তবু বিশ্বজুড়ে চলছে পরিবেশ নষ্ট করার নানা কর্মকাণ্ড। পৃথিবীর উত্তাপ বাড়ছে। মানুষের শরীরে বাসা বাঁধছে বিবিধ রোগ। হারিয়ে যাচ্ছে নানা প্রজাতি। কী ব্যবস্থা নিচ্ছে উন্নত দেশগুলো? লিখেছেন কুণাল বসু

জলবায়ু পরিবর্তন ঠিক কোন পথে বাঁক নিচ্ছে, তা দেখার জন্য সারাক্ষণ নজর রেখে চলেছে নাসার একাধিক স্যাটেলাইট। বিশ্বের চারদিকে এই স্যাটেলাইটগুলোই সিসিটিভি হিসেবে কাজ করছে। তার জন্য সব সময় কড়া নজরদারিতে পৃথিবীর কার্বন ড্রাই অক্সাইডের মাত্রা, জলস্তর, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পরিবর্তন, মেরুদেশের হিমবাহ এবং মূল ভূখণ্ডের হিমবাহগুলোতে বরফের পরিমাণ মাপার মাপকাঠি ইত্যাদি। হতাশার পরিমাণও বাড়ছে ক্রমশ। কারণ, সব বৈশিষ্ট্য এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে, যে নাসাকে বলতে হচ্ছে যে, এটাই এখন পর্যন্ত রেকর্ড। যেমন, গত মে মাসে পৃথিবীতে কার্বন ডাই অক্সাইড কতটা ছিল, তার হিসেব দিয়েছে নাসা। ৪০০.৭১ পিপিএম। অ্যাটমোস্ফেরিক ইনফ্রারেড সাউন্ডার (এআইআরএস) এবং অর্বিটিং কার্বন অবইসার্ভেটরি (ওসিও-২) এই দুই ব্যবস্থায় নাসা সারাক্ষণ মেপে চলেছে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা। এর আগে ২০০৫ থেকে যে রেকর্ড আছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ৩৭৮ পিপিএম থেকে দশ বছরে সেটা পৌঁছে গিয়েছে ৪০০’র ঘরে। ১৯৫০ সালের পর কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা আর ৩০০’র নিচে নামেনি। ৫০ হাজার বছর আগে ছিল ২০০ পিপিএমের আশপাশে। কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা যত বাড়বে, গ্রিন হাউস গ্যাস হিসেবে পৃথিবীর তাপমাত্রাও তত বাড়িয়ে তুলবে।

আর কারা গ্রিন হাউস গ্যাস হিসেবে কাজ করে?

জলীয় বাষ্প, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ক্লোরোফ্লুওরো কার্বন। যতদিন আমরা ফসিল-জাত জ্বালানি ব্যবহার করব, ততদিন কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণও কমবে না। আর বায়ু দূষণের কুফল শুধু শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই। কয়েক মাস আগে ভ্যাঙ্কুভারের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার বিজ্ঞানী ডন এরহার্ড ও তাঁর ছাত্রছাত্রীরা একটি পরীক্ষা করেছিলেন। মানুষের ওপর ডিজেলের ধোঁয়ার প্রভাব নিয়ে। পরীক্ষায় তাঁরা দেখেছেন, কিছু জিন কখনও সুইচ অন হয়ে যাচ্ছে, কখনও সুইচ অফ হয়ে যাচ্ছে। যাতে কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।

জিনের এই সুইচ অন বা সুইচ অফ কী?

কোন জিন থেকে কখন প্রোটিন তৈরি হবে, কখন হবে নাÑ সবই সাধারণভাবে থাকে সুনিয়ন্ত্রিত। ডিজেলের ধোঁয়ার প্রভাবে এই নিয়ন্ত্রণেই হচ্ছে গণ্ডগোল। এ ক্ষেত্রে গণ্ডগোলটা হচ্ছে ডিএনএ মিথাইলেশনে। মিথাইলেটেড থাকলে জিন সুইচ অব অবস্থায় থাকে। ডিমিথাইলেটেড হলে সুইচ অন হয়ে যায়। দূষণের জন্য দায়ী অণুগুলো কোথাও মিথাইলেশন করে ফেলছে, কোথাও ডিমিথাইলেশন। ৩০ ঘণ্টা ডিজেলের ধোঁয়ার মধ্যে থেকেছেন, এ রকম মানুষের ক্ষেত্রে এই নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়েছে অন্তত ৪০০টি জিনের ক্ষেত্রে।

শুধু জিনের নিয়ন্ত্রণ নয়, বায়ু দূষণ সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে মস্তিষ্কের ‘বয়স’ বাড়াতে। যাকে বলে ‘ব্রেন এজিং’। আরও একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দূষণের প্রভাবে মস্তিষ্কের শ্বেতবস্তু বা হোয়াইট ম্যাটারের পরিমাণ কমে যায়। যে ঘটনা স্বাভাবিকভাবে ঘটে মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। দূষণ প্রক্রিয়াটাকে এগিয়ে দিচ্ছে কয়েক ধাপ। দেখা গিয়েছে, প্রতি কিউবিক সেন্টিমিটারে দূষণ সৃষ্টিকারী অণুর পরিমাণ যদি ৩.৪৯ মাইক্রোগ্রাম থাকে, তা হলে ৬.২৩ কিউবিক সেন্টিমিটার হোয়াইট ম্যাটার কমে যায়। যা এক থেকে দু’বছর ‘ব্রেন এজিং’-এর সমান। তাই বায়ু দূষণের প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক শ্বাসকষ্টে আটকে নেই। শরীরের একেবারে ভিতরে ঢুকে পড়ে তৈরি করছে সুদূরপ্রসারী সমস্যা।

নাসার স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ১৯৯৩ থেকে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত সমুদ্রের জলস্তর ৬৪ .৪ মিলিমিটার বেড়ে গিয়েছে। এখন প্রতি বছরে ৩.২০ মিলিমিটার করে বাড়ছে জলস্তর। ১৮৭৭ থেকে বেড়ে গিয়েছে ২০০ মিলিমিটার। বিপদঘণ্টা জোরে বাজতে শুরু করেছে। কারণ খুব সহজ, গত ১৩৪ বছরে সবচেয়ে উষ্ণ দশটি বছর গিয়েছে ২০০০ সালের পর থেকে।

হিমবাহগুলোর আয়তন কমছে হু হু করে। যার হাড় হিম করা ছবি রোজ ধরা পড়ছে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে থাকা উপগ্রহের ক্যামেরায়। এমনিতেই বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, ষষ্ঠ গণঅবলুপ্তির পর্যায় শুরু হয়ে গেছে। মাস এক্সটিংশন! একসঙ্গে বেশিরভাগ প্রজাতিরই পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া নাকি শুরু হয়ে গেছে! যে রকম এক্সটিংশনে লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল ডাইনোসর।

গত এক মাসে যে গবেষণাপত্র নিয়ে সবচেয়ে হইচই হয়েছে, সেটা সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এই গণঅবলুপ্তির গবেষণাপত্রটাই। যেখানে মেক্সিকান বিজ্ঞানী খেরার্দো সেবায়োস ও তাঁর আমেরিকান সহকর্মীরা মিলে দেখিয়েছেন, বিভিন্ন প্রজাতির অবলুপ্ত হওয়ার হার হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। আর এর কারণ মানুষ। তাঁদের গবেষণাপত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, আধুনিক যুগের এই প্রজাতি-অবলুপ্তির পিছনে মানুষ। গত ২০০ বছরে যার হার বেড়েছে তরতর করে। তাই সংযমী হতেই হবে মানুষকে। একদিকে দূষণের জন্য নানা রকমের রোগ। পরিবেশ রক্ষার তুলনায় রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকানোর খরচ কিন্তু কম নয়। তাই, পরিবেশ সংরক্ষণে আরও বেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করার কথা ভাবছে বা ইতিমধ্যে করছে উন্নত দেশগুলো। পাশাপাশি যোগ হবে ক্রমাগত প্রজাতির অবলুপ্তি। যার জন্য, প্রভাব পড়বে ইকোসিস্টেমে।