১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমসাময়িকদের চোখে নজরুল

  • সমসাময়িক বিখ্যাতজনেরা বিভিন্নভাবে দেখেছেন কাজী নজরুল ইসলামকে। তাদেরই কয়েকজনের মন্তব্য তুলে ধরা হলো

ধর্মের চেয়ে মানুষকে বড় করে দেখেছেন

সাবিত্রী প্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়

জোড়াসাঁকোর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবার সময় যেমন-তেমন বড়লোককেও সমীহ করে যেতে দেখেছি,Ñ অতি বাকপটুকেও ঢেঁকি গিলে কথা বলতে শুনেছি- কিন্তু নজরুলের প্রথম ঠাকুবাড়িতে আবির্ভাব সে যেন ঝড়ের মতো। অনেকে বলত, ‘তোর এসব দাপাদাপি চলবে না জোড়াসাঁকোর বাড়িতে, সাহসই হবে না তোর এমনভাবে কথা কইতে।’

নজরুল প্রমাণ করে দিলেন যে, তিনি তা পারেন। তাই একদিন সকালবেলা- ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’ এই রব তুলতে তুলতে তিনি কবির ঘরে গিয়ে উঠলেনÑ কিন্তু তাঁকে জানতেন বলে কবি বিন্দুমাত্রও অসন্তুষ্ট হলেন না।...

নজরুল ধর্মের চেয়ে মানুষকে বড় করে দেখেছেন সব সময়, তাই ধর্ম-নির্বিশেষে নজরুলকে ভালোবাসতে কারো বাধেনি।

কতদিন আমাদের বাড়িতে গানের মজলিস বসেছে, খাওয়া-দাওয়া করেছি আমরা একসঙ্গে, গোড়া বামুনের ঘরের বিধবা মা নজরুলকে নিজের হাতে খেতে দিয়েছেন- নিজের হাতে বাসন মেজে ঘরে তুলেছেন, বলেছেন, ও তো আমারই ছেলেÑ ছেলে বড়, না আচার বড়?

এই যে নজরুল আপনাকে সকলের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর প্রাণের প্রাবল্যে, হৃদয়ের মাধুর্যে এই তো মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম, বড় আদর্শের কথা!।

একটি স্মরণী দিন

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

আমার মন সেদিন একটি বিশেষ কারণে খুব স্বাভাবিক ছিল না। ১৯৩৯ সালের অক্টোবরÑ ঠিক পূজার পরেই। সেদিন বেলা বারোটা একটার সময় আমার একটি শিশু-সন্তান মারা গেল। কয়েক মাসের সন্তান। বেলা দুটো নাগাদ তার সৎকারের ব্যবস্থা করে শবটিকে শ্মশানে পাঠানো হলো। বেলা তখন চারটে, একটি টেলিগ্রাম পেলাম, ‘শ্মশানে পাঠানো হলো। ‘আমি এবং নজরুল আজ তোমার ওখানে পৌঁছুচ্ছি।- নলিনী।’

বলা প্রয়োজন, আমার সঙ্গে কাজী সাহেবের পরিচয় ছিল নামমাত্র। বোধ করি ১৯৩৩/৩৪ সালে তাঁর সঙ্গে আদমপুরে রেলস্টেশনে দেখা হয়েছিল। তিনি আমাদের ও অঞ্চলের একটি বর্ধিঞ্চু এবং উঁচু সরকারী চাকুরে মিয়া সাহেবের সঙ্গে তাঁদের বাড়ি যাচ্ছিলেন। কয়েকটি মাত্র কথা হয়েছিল। ১৯৩৩/৩৪-এ আমি আমার পরিচয় গড়ে তুলতে পারিনি। নলিনীদার সঙ্গে পরে পরিচয় হয়েছে ‘শনিবারের চিঠি’র আফিসে। সেইহেতু টেলিগ্রাম তো তিনিই করছিলেন। ওঁদের ওখানে যাবার বিশেষ একটি প্রয়োজন সেইহেতু তিনিই টেলিগ্রাম করেছিলেন। কাজী সাহেবের স্ত্রী বাতে পঙ্গু ছিলেন। বহু স্থানে চিকিৎসা করিয়ে কিছু হয়নি। তখন দৈব ওষুধের সন্ধানে ‘বেলে’র কথা মনে পড়ে। বেলে গ্রামে ধর্মঠাকুর আছেন। বেলের ধর্মঠাকুরের স্থানের মাটি এবং এক ধরনের জলজ উদ্ভিদও তেলের খ্যাতি বাতের ওষুধ হিসেবে বহুকাল থেকে বাংলাদেশে ছড়িয়ে আছে। দূর চট্টগ্রাম থেকেও লোক আসতে দেখেছি আমিও। পাটনার একজন... ডাক্তারকেও এই মাটি তেল ব্যবহার করতে দেখেছি। আমিই পাঠিয়েছি। কাজী সাহেব বর্ধমানের লোক, তাঁর নিশ্চয়ই জানা ছিল।

যাক, টেলিগ্রামখানি পেয়ে আমি বিব্রত হলাম। কারণ মেয়েরা এই সময় এই আসা কেমনভাবে নেবেন ঠিক বুঝলাম না। তবুও এসে কথাটা বললাম। এবং ওঁদের জন্য যথাসাধ্য বাবস্থাদি করলাম।

ওঁরা এলেন। লাভপুরে নামলেন রাত্রি ন’টায়। সেদিন বারে শনিবার ছিল। কারণ রবিবার হলো ধর্মঠাকুরের বিশেষ -বার।

ওঁরা নেমেই আমাকে আমার ছেলে কেমন আছে প্রশ্ন করলেন। ছেলেটির অসুখের সংবাদ নলিনীদা জানতেন। কারণ সজনীকে (সজনীকান্ত দাস) কথাটা বলেছিল। যাই হোক, কথাটা শুনে সাহেব বললেন, আমাদের ডাকবাংলোয় একটু ব্যবস্থা করে দাও। কিংবা স্টেশনের ওয়েটিংরুমে।’ আমার আগ্রহে ও অনুরোধে শেষ পর্যন্ত আমার ওখানেই এলেন। রাত্রে থাকলেন। সকালে ট্যাক্সি করে বেলে গিয়ে দুপুরে ফিরে এসে আহারাদির পর বললেন, ‘রাত্রে আসর পাতো। গান গাইব।’

বিকেলে আমাদের ওখানে ফুল্লরা মহাপীঠে গিয়ে দেবীর মন্দিরের সামনে নাট্যমন্দিরে পদ্মাসন হয়ে বসে কাজী সাহেব প্রাণায়ম যোগে শুরু করলেন। দেখতে দেখতে মনে হলো মানুষটা নিষ্পন্দ বা সমাধিস্থ হয়ে গেছে। কুম্বকে এতক্ষণ অবস্থান খুব বড় যোগী ভিন্ন সম্ভবপর নয়। সমস্ত শরীরে ঘামের বন্যা বয়ে গেল। যখন জপ সেরে উঠলেন তখন চোখ দুটি জবাফুলের মতো লাল, এবং তখনও ঠিক জাগ্রত চেতনায় যেন ফেরেননি। সেই অবস্থাতেই একখানি গান রচনা করে সুর দিয়ে দেবতাকে এবং সমবেত লোকদের শুনিয়ে বাড়ি ফিরলেন।

তারপর সন্ধ্যা থেকে গানের আসর বসল। রাত্রি দুটো পর্যন্ত একনাগাড়ে গেয়ে গেলেন। মধ্যে একবার আধঘণ্টার জন্য নলিনীদা দুই বা তিনখানি হাসির গান গেয়েছিলেন। লোকে লোকারণ্যের সৃষ্টি করেছিল। স্থানীয় মুসলমানরা এসেছিলেন দলে দলে। তাঁরা ইসলামী সঙ্গীত শুনতে চেয়েছিলেন। রাত্রির মধ্যখানে গেয়েছিলেন শ্যামাসঙ্গীত। সে সময়ে আশ্চর্য ভাবণ্ডলের সৃষ্টি করেছিলেন, এবং তার মধ্যে কবি ও ভক্ত ... ভারতবর্ষের, বিশেষ করে বাংলাদেশের সাধক বা মহাজনকে প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

আমার হৃদয়ের সন্তান-বিয়োগ-বেদনার নিঃশেষে উপশম হয়েছিল এমন কথা বলব না, তবে তার উপর যে তিনি আনন্দ শ্বেতচন্দনের একটি স্নিগ্ধ-শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দিয়ে এসেছিলেন, এ শতবার উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করে বলব।

আমর কাছে ঘটনাটা স্মরণীয় হয়ে আছে দুটো কারণে। এক এবং প্রথমÑ আমার সন্তান-বিয়োগের ঘণ্টা কয়েক পরেই এক বরণীয় অতিথিকে সংবর্ধনা করা দ্বিতীয়- কাজী সাহেবের মতো ব্যক্তির আগমন।

দুটি ছোট গল্প

নলিনীকান্ত সরকার

দুটি হিন্দুস্তানী পথচারী ভিখারী- একজন পুরুষ, অপরটি নারী- হারমোনিয়ামের সঙ্গে উর্দু গজল গেয়ে উর্ধ্বমুখে চলেছে সারা পল্লীতে মধুবর্ষণ করতে করতে। নজরুলের একান্ত আগ্রহে আমার বৈঠকখানায় তাদের ডেকে এনে গান শোনার ব্যবস্থা হলো। অনকেগুলো গান শুনিয়ে তারা বিদায় নিলো।

নজরুল তক্ষুণি বসলেন গান লিখতে। তাদের ‘জাগো পিয়া’ গানটির রেশ তখনও আমাদের কানে যেন ধ্বনিত হচ্ছে।

এই গানের সুর অবলম্বন করে নজরুল কয়েক মিনিটের মধ্যে লিখে ফেললেন- ‘নিশি ভোর হলো জাগিয়, পরাণ পিয়া’ গানটি।

তাঁর গজল গান লেখার এইখানে থেকে। গজল গানের নেশা তাঁকে যেন পেয়ে বসলো। আসি ছেড়ে এই বাঁশি ধরার জন্য কয়েকজন উগ্রপন্থী ব্যঙ্গ-বিদ্রুপও করেছিলেন যথেষ্ট রসের সন্ধান পেলে কবিপ্রাণের অপ্রতিহত গেতিমুকে সকল বাধাই তৃণখণ্ডের মতো ভেসে যায়। এ ক্ষেত্রেও তাই হলো। নজরুল এজন্য কয়েকজন চরমপন্থী রাজনীতিকের বিরাগভাজন হয়ে পড়েন।

স্বার্থবিমুখ নজরুল কোনোদিই পরার্থপরতায় পরাঙ্মুখ ছিলেন না। মাত্র একটি ঘটনার কথা বলি।

দক্ষিণ কলকাতায় একটি দুস্থ কন্যার বিবাহ। কোনোরূপে দায় নির্বাহ করার আয়োজন চলছে।

কন্যাপক্ষ নজরুলের পরিচিত।

একদিন সন্ধ্যার প্রাক্কালে নজরুল তাঁর গাড়ি নিয়ে আমার কাছে উপস্থিত। এসে বললেন, ‘তোমার এখন কোনো কাজ আছে? একটু এসো না আমার সঙ্গে।’

কোথায় যাচ্ছো?

নজরুল প্রথমে কিছু ভাঙ্গলেন না।

গাড়িস্টান চৌরঙ্গী অভিমুখে চরে থামলো। ‘বেঙ্গল-স্টোরস’-এর সামনে। বেঙ্গল-স্টোরস’-এর নেমে তখন তিনি সমস্ত কথা প্রকাশ করলেন আমার কছে।

হিন্দু-বিবাহের লৌকিক ব্যাপারের সঙ্গে নজরুলের বিশেষ পরিচয় ছিল না, সেইজন্য আমাকে সঙ্গে নিয়ে আসা।

‘বেঙ্গল-স্টোরস’ থেকে নজরুল ফুলশয্যায় তত্ত্বের বহু জিনিস কিনলেন। গাড়ি বোঝাই সেই সকল সামগ্রী কন্যার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন তিনি।

প্রথম আলাপে

সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর

নজরুলের সঙ্গে আলাপ জমে গেল। সে কবিতা পড়ল। গান শোনালো। আমিও তাকে গান শোনালুম।

কি ভালোই লেগেছিল নজরুলকে সেই প্রথম আলাপে। সবল শরীর, ঝাঁকড়া চুল, চোখ দুটি যেন পেয়ালা, কখনো সে পেয়ালা খালি নেই, প্রাণের অরুণ রসে সদাই ভরপুর। গলাটি সারসের মতো পাতলা নয়, পুরুষের গলা যেমন হওয়া উচিত তেমনি সবল বীর্য-ব্যঞ্জক। গলার স্বরটি ছিল ভারি গলায় যে সুর খেলতো তা বলতে পারিনে, কিন্তু সেই মোটা গলার সুরে ছিল জাদু। ঢেউয়ের আঘাতের মতো, ঝড়ের ঝাপটার মতো তাঁর গান আছড়ে পড়তো শ্রোতার বুকে।

অনেক চিকন গলার গাইয়ের চেয়ে নজরুলের মোটা গলার গান আমার লক্ষগুণ ভালো লাগলো।...

প্রবল হতে সে ভয় পেতো না, নিজেকে পিঠে দেখবার জন্য সে কখনো চেষ্টা করতো না।

রবীন্দ্রনাথের পরে এমন শক্তিশালী কবি আর আসেনি বাংলাদেশে। এমন সহজ গতি, আবেগের আগুনভরা কবিতা বাংলা সাহিত্যে বিরল।

সুরের রাজা

ইন্দুবালা দেবী

চিৎপুরে বিষ্ণ-ভবনে ছিল আমাদের গ্রামাফোন কোম্পানির রিহার্সাল ঘর। কাজীদা ছিলেন আমাদের বাংলা গানের ট্রেনার। কাজীদার ঘরে থাকতো সদাসর্বদাই নানা লোকের ভিড়। কাজের লোকই শুধু নয়, নানান আকাজের লোকও এসে ভিড় জমাতো। তা এজন্য তাঁকে বিরক্ত হতে কোনোদিন দেখেনি।

একদিন তাঁর ঘরে লোকজনের ভিড় ছিল কম। কাজীদা তাঁর প্রিয় পান আর জর্দার কৌটো সামনে নিয়ে বসেছিলেন। মুখে একমুখ পান। সামনে খোলা গানের খাতা। আমার পায়ের আওয়াজ পেয়ে তিনি মুখ তুলে তাকালেন। তারপর তাঁর নিজস্ব কায়দায় হা-হা করে হেসে উঠলেন। এমন হাসি যা আমার মনে হয়েছে কাজীদা ছাড়া আর কেউ হাসতে পারবেন না কোনোদিন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘আয় ইন্দু, বোস।’

তারপর আমি তাঁর পাশটিতে বসতেই বললেন, আচ্ছা, তোর ওই ‘অঞ্জলি লহো মোর সঙ্গীতের’-এর উল্টোপিঠের গানটা কি লিখি বলতো?

আমি চট করে কোনো জবাব দিলাম না। কাজীদা মহান, কবি শ্রেষ্ঠ গীতিকার। তাঁর এই কথার জবাব দিতে যাওয়া আমার মতো মানুষের মূর্খামি ছাড়া আর কি?

তাই একটুখানি চুপ করে থেকে শুধু বললাম, ‘কাজীদা, এই গানটার সঙ্গে ওই নতুন গানটাও যেন খুব ভালো হয়।

কাজীদা আবার হা-হা করে সারা ঘর হাসিতে ভরিয়ে তুলে বললেন, ‘আচ্ছা দাঁড়া চুপটি করে বোস।’ বলে এক মুখ পান ঠেসে খস্ খস্ খস্ করে কাগজে লিখে দিলেন সেই আমার গাওয়া বিখ্যাত গানটি ‘দোলা লাগিল দখিনার বনে বনে’।

কাজীদা একটি জিনিস দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যেতাম। শুধু আমি কেন আমার মতো অনেকেই হতো। রিহার্সাল ঘরে হৈহুল্লোড় চলছে, নানা জনে করছে নানারকম আলোচনা। কাজীদাও সকলের হৈহুল্লোড় করছেন, হঠাৎ চুপ করে গেলেন। একাধারে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন খানিক। অনেকে তাঁর এই ভাবান্তর লক্ষই করলো না হয়তো। কাজীদার সেদিকে খেয়াল নেই। এত গোলমালের মধ্যেও তিনি একটুক্ষণ ভেবে নিয়েই কাগজ কলম টেনে নিলেন। তারপর খস্ খস্ খস্ করে লিখে চললেন আপন মনে।

মাত্র আধঘণ্টা। কি তারও কম সময়ের মধ্যে পাঁচ-ছ’খানি গান লিখে পাঁচ-ছ’জনের হাতে বিলি করে দিলেন। যেন মাথার মধ্যে তাঁর গানগুলো সাজানোই ছিল, কাগজ-কলম নিয়ে সেগুলো লিখে ফেলতেই যা দেরি।

কাজীদা এই রকম ভিড়ের মধ্যে, অল্প সময়ের মধ্যে এমন সুন্দর গান লিখতে পারতেন।

আর শুধু কি এই?

সঙ্গে সঙ্গে হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে সেই পাঁচ-ছ’জনকে সেই নতুন গান। শিখিয়ে দিয়ে তবে রেহাই। গান লেখার সঙ্গে সঙ্গে সুরও তৈরি করে ফেলতেন কাজীদা। অপূর্ব কাজীদা ছিলেন সুরের রাজা।

একটি করুণ কাহিনী

আঙুরবালা দেবী

গ্রামোফোনের রিহার্সাল-রুমে মাঝে মাঝে কাজীদা হাত দেখার বই যোগাড় করে তাই নিয়ে মেতে থাকতেন। আমরা এই নিয়ে তাঁকে ঠাট্টা করতাম প্রায়ই।

কাজীদা কিন্তু রাগ করতেন না।

তাঁর এই হাত দেখা নিয়ে একটা খুব করুণ গল্প আছে।

আমাদের সময়ে গ্রামোফোনে একজন তবলাবাজিয়ে ছিলেন। নাম রাসবিহারী শীল। খুব গুণীলোক। রাসবিহারীবাবুর তবল সঙ্গত না থাকলে আমাদের গান যেন জমতেই চাইতো না।

একদিন শোনা গেল, জ্ঞানেন্দ্র গোস্বামী মশাই নৌকাযোগে কোথায় যেন গান গাইতে যাবেন, আর তাঁর সঙ্গে তবলা বাজানোর জন্য যাবেন সেই রাসবিহারীবাবু।

সেদিন যথারীতি রিহার্সাল-রুমে কাজীদার সঙ্গে আমরা গান-বাজনা নিয়ে মেতে রয়েছি। রাসবিহারীবাবু আমাদের সঙ্গে তবলাসঙ্গত করছেন। গান-বাজনার ক্ষণিক বিরতিতে তিনি কাজীদার সামনে ডান হাতটি মেলে ধরলেনÑ

‘কাজীদা, আমার হাতটা একটু দেখুন না।’

এটা তাঁর জ্ঞানবাবুর সঙ্গে বাইরে যাবার আগের দিনের ঘটনা।

কাজীদার মুখে সব সময়েই হাসি লেগে থাকতো। সেই হাসি মুখেই তিনি রাসবিহারবীবাবুর হাত দেখায় মন দিলেন। দেখতে দেখতে তাঁর মুখ ক্রমশ গম্ভীর হয়ে উঠলো। এক সময় রাসবিহারীবাবুর হাত ছেড়ে দিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি।

সবাই চুপচাপ। হঠাৎ কাজীদার এই ভাবান্তর দেখে আমরাও অবাক না হয়ে পারলাম না।

রাসবিহারীবাবু হাসিমুখে বললেন, ‘কই কাজীদা, হাতে কি দেখলেন, বললেন না তো!’

কাজীদ তবুও নিরুত্তর।

রাসবিহারীবাবু আবার বললেন, ‘কই কাজীদা, হাতে কি দেখলেন। খারাপ কিছু?’ এবার কাজীদার মুখে মৃদু করুণ হাসি ফুটে উঠলো। রাসবিহারীবাবুকে তাঁর গুণের জন্য কাজীদা খুবই স্নেহ করতেন। তাই ধীরে ধীরে তাঁর পিঠ চাপড়ে বললেন, দূর পাগল খারাপ কেন হবে। ভালোই তো, সব ভালো।’

এই কথার পর কাজীদা অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন।’

তখনকার নামকরা গায়ক ধীরেন দাস সেদিন ওই ঘরে উপস্থিত ছিলেন। রাসবিহারীবাবু চলে যাবার পর ধীরেনবাবু কাজীদাকে চেপে ধরলেন, ‘বলুন না কাজীদা, ওর হাতে কি দেখেছেন।’

কাজাদী বললেন, ‘একটু খারাপ জিনিসই দেখলাম।’

ক’দিন পর জ্ঞানবাবু গান গেয়ে আবার ফিরে এলেন, কিন্তু রাসবিহারীর দেখা নেই। আমরা তাঁর খোঁজ করতেই শোনা গেল, রাসবিহারীর জ্বর হয়েছে। এর ক’দিন পরে খবর এলো তাঁর সামান্য জ্বর নিমোনিয়ায় দাঁড়িয়েছে।

অনেক চিকিৎসা করা হ’লো। কিন্তু তাঁর সে নিমোনিয়া আর ভালো করা গেল না। মাত্র সপ্তাহখানেকের মধ্যেই রাসবিহারী শীল মারা গেলেন।

ধীরেনবাবু কাজীদাকে ধরে বললেন, ‘কাজীদা, এই জন্যই আপনি হাত দেখে রাসবিহারীকে কিছু বলেননি, না?’

কাজীদা বেদনার হাসি হেসে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি সেদিন ওর হাতে মৃত্যুযোগ দেখেছিলাম। বুঝেছিলাম, খুব শীঘ্রই হয়তো রাসবিহারীর মহাবিপদ আসছে। আর সেই জন্যই আমি কিছু বলিনি সেদিন।’ কাজীদার গানের ক্লাস ভালো জমলো না সেদিন। (চলবে)

এই মাত্রা পাওয়া