২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রাসঙ্গিকতা

  • রেজাউদ্দিন স্টালিন

নজরুলের কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় কৈশোরে। স্কুলের এক্সারসাইজ খাতার পেছনে নজরুলের বাবরি দোলানো একটা ছবির নিচের লেখা ছিল চার লাইনের একটা কবিতা-

পাতাল ফেড়ে নামবো নিচে

উঠবো আমি আকাশ ফুঁড়ে,

বিশ্ব জগৎ দেখবো আমি

আপন হাতের মুঠোয় পুরে।

আমাকে আলোড়িত করেছিল। একটা মানুষের কী অপরিসীম শক্তি। বিশ্ব জগৎ হাতের মুঠোয় পুরে দেখবে। তখন থেকেই স্কুলের পাঠ্য কিংবা কোথাও নজরুলের কবিতা পেলে পড়তাম। কী অভাবনীয় সব কবিতা। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। আমাদের যশোর উপশহরের কিছু গুণগ্রাহী মানুষ জ্ঞানচর্চা ও সুকুমারবৃত্তি বিকাশে কাজ শুরু করলেন। একটা রচনা প্রতিযোগিতার আহ্বান করা হলে আমি তাতে অংশ নিয়ে প্রথম হলাম। আমাকে প্রথম পুরস্কার দেয়া হলো নজরুলের অগ্নিবীণা। অগ্নিবীণা কতবার যে উল্টেপাল্টে দেখতাম আজ তা মনে হলে আনন্দ পাই। ওই অগ্নিবীণা গ্রন্থেই ছিল আমার প্রিয় কবিতা ‘বিদ্রোহী’। সময় পেলে ওই কবিতাটি উচ্চকণ্ঠে পড়তাম। নিজের ভেতরেই একটা পরিবর্তন আসত। নিজেকে বড় ভাবার; মানুষকে এত উঁচুতে স্থান দেয়ার কল্পনা আর কারও কবিতায় তখনও পাইনি। বলে রাখা ভালোÑ এরই মধ্যে একদিন মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের বার্ষিকীতে সুকান্তের বোধন কবিতার কয়েকটি লাইন আমাকে বিস্ময়াভিভূত করে ফেলেছিলÑ

প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস তোরা

ভেঙেছিস ঘরবাড়ি

সে কথা কি আমি জীবনে মরণে

কখনো ভুলিতে পারি?

আদিম হিংস্র মানবিকতার

যদি আমি কেউ হই,

স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের

চিতা আমি তুলবোই।

অসামান্য কবিতা। আজ অবধি প্রতিশোধের এমন নান্দনিক উচ্চারণ পৃথিবীর কারও কবিতায় পাইনি। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সেই নবম শ্রেণী থেকে আজ পর্যন্ত যতবার পড়েছি, আবৃত্তি করেছি কিংবা শুনেছি; কিন্তু আমার কাছে তার আবেদন দিন দিন বেড়েছে বৈ কমেনি। মাত্র ২২ বছর বয়সে এ রকম একটি কবিতা রচনা করা কী করে সম্ভব হলো তা ভাবলে অবাক হতে হয়। নজরুলপুত্র সব্যসাচীর কণ্ঠে যখন বিদ্রোহী কবিতার আবৃত্তি শুনি তখন গানের চেয়েও তা অর্থময়, তাৎপর্যময় এবং অনিবার্যভাবে প্রয়োজনীয় মনে হয়। নজরুল একই সঙ্গে গল্পকার, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সঙ্গীত রচয়িতা, সাংবাদিক, সঙ্গীত পরিচালক, নাট্যকার, রাজনীতিক ও সৈনিক। কিন্তু নজরুলের সব রচনা কবি মনের গভীরতম সত্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত। মার্টিন হাইডেগার জার্মান দার্শনিক একজন সৃষ্টিশীল মানুষের বিশেষ করে কবির এই কাব্যিক সৌন্দর্য অনেক আগেই অনুধাবন করেছিলেন। তার বক্তব্যে তিনি আমাদের যে অনুশাসনের কথা বলেছিলেন তা এখানে উদ্ধৃত করবÑ ঞযব ংঢ়বধপয ড়ভ মবহঁরহব ঃযরহশরহম রং নু হধঃঁৎব ঢ়ড়বঃরপ রঃ হববফং হড়ঃ ঃধশব ঃযব ংযধঢ়ব ড়ভ াবৎংব. ঞযব াড়রপব ড়ভ ঃযড়ঁমযঃ সঁংঃ নব ঢ়ড়বঃরপ নবধপঁংব ঢ়ড়বঃৎু রং ঃযব ংধুরহম ড়ভ ঃযড়ঁমযঃ. নজরুল হয়ত এই কারণে তার অন্যসব সত্তার চেয়ে কবিসত্তাকে জাগ্রত রেখেছিলেন। আমৃত্যু নজরুলের কবিসত্তাই ছিল প্রবল। কমিউনিজম এবং রুশ বিপ্লবের দ্বারা আলোড়িত হয়েছিলেন সেটা তার রচনা পড়লে বোঝা যায়। ১৯৪৭ সালে সংঘটিত রুশ বিপ্লবের আদর্শ নজরুলের কবিসত্তাকে নাড়া দিয়েছিল সে বিষয়ে আমরা নিঃসন্দেহ। কমরেড মোজাফফর আহমেদের সাহচর্য এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত নজরুলের কবি মানসকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করেছিল বিদ্রোহী কবিতা লেখায়। একদিকে রেনেসাঁর বুদ্ধিবৃত্তিকতা অন্যদিকে সাম্যবাদী চিন্তা; দুয়ে মিলে নজরুল মানবমুক্তির উপায় অন্বেষণে তৎপর। স্বাধীনতা ছাড়া ভারতবর্ষের ভাগ্য পরিবর্তিত হবে না তা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন। আর এই সংগ্রামের জন্য প্রয়োজন ছিল বড় মানুষ। কেমন বড় মানুষ তার চাই আসন্ন বিপ্লবের জন্য, তা তিনি ভেবেছিলেন কাব্যিক বাস্তবতায়। হাইপার রিয়েলিটি এবং এ্যাবসেন্ট রিয়েলিটি এই দুটোর ভেদরেখা ঘুচিয়ে নজরুল অতিমানুষের কল্পনা করেছিলেন। কাব্যিক সত্য হলেও তৎকালীন স্বাধীনতাকামী মানুষের কাক্সিক্ষত বীরের চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতিময় হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহীর দার্শনিক চিন্তা। এখনও সেই কাক্সিক্ষত বীরের চরিত্রের সঙ্গে নজরুল সৃষ্ট বিদ্রোহী কবিতার বাস্তবতা খুঁজে পাই বলে বিদ্রোহী এখনও নানাভাবে প্রাসঙ্গিক। আজও অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিত হচ্ছে। অসহায় মানুষ বাস্তুচ্যুত। বেকারত্বের যন্ত্রণায় কাতরে বেড়াচ্ছে যুবকগণ। কৃষক আজও তার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। রাজনৈতিক নৃশংসতায় বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এক শ্রেণীর মধ্যস্বত্বভোগীর দাপটে বাজারব্যবস্থা বেসামাল। পুলিশ, আমলা, আর্মি, সাংবাদিক সব জায়গাতে ব্যক্তিস্বার্থ এত প্রকট হয়ে উঠেছে যে, রাষ্ট্রের নাভিশ্বাস। সে কারণে এখনও এই একুশ শতকে যতবার যেখানে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার আবৃত্তি শুনি কিংবা কোন আলোচনা পড়ি তখন নিজেকে একজন শক্তিমান মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার সাহস পাই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভৃগুভগবান বুকে পদচিহ্ন আঁকবার দুঃসাহসে স্থিত হই। হল বলরাম স্কন্ধে অধীন বিশ্ব উপড়ে ফেলার শক্তি অর্জন করি। পাথরের পর পাথর সাজিয়ে আশ্চর্য পিরামিডতুল্য শিখরস্পর্শী কবিতা ‘বিদ্রোহী’। আমি একে মহাকবিতা বলতে চাই। ন্যায়ের, যুক্তির শৃঙ্খলায় সৌন্দর্যে নান্দনিক বোধের ঐশ্বর্যে স্তবকের পর স্তবক সাজিয়ে গড়ে উঠেছে এই মহাআশ্চর্য কাব্যিক প্রকৌশল। পিরামিড প্রাসাদের মতো আশ্চর্য, ভয়াবহভাবে চিত্তাকর্ষক এবং ব্যঞ্জনাময় এবং বিস্ময়কর।

অনেকগুলো কক্ষ আছে যেন এই কাব্যপ্রাসাদে। একবার ঢুকলে তার শেষ না দেখে বেরোনো যাবে নাÑ এই যেন এই মহলের নির্দেশনা। কী বিষণœবিধুর বজ্রনির্ঘোষ বিদ্রোহ, কী নাটকীয়তাÑ যেন চরম ট্র্যাজেডির রক্তাক্ত প্রান্তর। প্রেম আর দ্রোহ, স্বপ্ন আর আকাক্সক্ষা, যুদ্ধ আর রক্তপাত, বিজয় আর উল্লাস, মমতা আর পিতৃময়তা, কঠিন আর পেলব সবকিছুর অপূর্ব সংশ্লেষ। কী আরণ্যক অব্যর্থ তীরন্দাজ এই ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নায়ক ‘আমি’। মুক্তক মাত্রাবৃত্তের যতটুকু শক্তি তার সবই নিংড়ে ব্যবহার করেছেন নজরুল বিদ্রোহী কবিতায়। চারমাত্রার মাত্রাবৃত্তে যে এত শক্তি তা বিদ্রোহী রচিত না হলে আমরা জানতাম না। আর জানতাম না বাংলাভাষার মধ্যে এই অমিত শক্তি লুকানো ছিল।

একবার ঘুরে তাকাচ্ছি মধুসূদনের দিকেÑ স্থির, অতল গম্ভীর সমুদ্রস্বরে তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দে আমাদের দেখিয়েছিলেন বাংলাভাষার শক্তি আরেকবার দেখালেন মুক্তকমাত্রাবৃত্তে নজরুল। রুগ্্ন পৃথিবীর যাবতীয় অসঙ্গতির প্রেক্ষাপটে, প্রতিশোধ স্পৃহায় হৃদয় উদ্বেল। সমাজ চৈতন্য ও ব্যক্তিস্বরূপকে আশ্রয় করে এই কাব্যের জন্ম। ব্যর্থতার পীড়া, মর্মদাহের আর্তনাদ কিন্তু স্বচ্ছ চৈতন্যের আগ্নেয় লাভায় জারিত নজরুলের উচ্চারণ। অন্তর্দাহের তীব্রতায় শিল্পীর কাব্যিক দায়িত্বে নজরুল এই অসীম ধ্বনিব্যঞ্জনা তৈরি করেছিলেন। মাঝেমধ্যে মনে হয় আবৃত্তির তাড়নায় আমরা অনেক সময় বিদ্রোহী কবিতার মূল এসেন্স বা তাৎপর্য বুঝতে পারি নাÑ বিদ্রোহীর স্বররীতির মধ্যে এই ফাঁদ লুকিয়ে আছেÑ সুতরাং সৎপাঠককে এই কাব্যপাঠ কিংবা আবৃত্তি শোনার সময় মনোসংযোগ করতে হবে সতর্কভাবে। কবি পাস্তেরনাক এজন্য পাঠককে সাবধান করে বলতেন ‘উড়হঃ ঃৎু ঃড় রিহ সব ড়াবৎ রিঃয ুড়ঁৎ াড়রপব.’ আরও এক গূঢ় ভয় কবির কবিতায় আবৃত্তি কিংবা কবির উচ্চারণে কবিতা যখন হয়ে ওঠে ‘চবৎভড়ৎসধহপব’ তখন হারিয়ে যেতে পারে নাটকীয় স্বরক্ষেপের প্রবলতার মধ্য কবিতার ভেতরের জয়গান, গভীর নৈঃশব্দ্যের শক্তি। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে কবিতার সার্থকতার ভিত্তি কী মুদ্রিত পাঠ না উচ্চারিত পাঠ? উচ্চারিত পাঠেই কবিতার প্রতিমূর্তি সুন্দর হয়। কারণ কবিতা ছিল আদিতে সঙ্গীত। সের্গেট লুইস বোর্হেস মনে করেন, কবিতা প্রাণ পায় উচ্চারণে জোরে জোরে পাঠের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সাবধান হতে হয় এই ভেবে যে, মুদ্রিত কবিতা পাঠ অনেক নির্লিপ্তি এবং নিরপেক্ষ কিন্তু আবৃত্তি কণ্ঠস্বরের অপেক্ষা রাখে মোহ তৈরি করে অর্থের অবগুণ্ঠন টেনে ধরেÑ বিদ্রোহীর আবৃত্তি অনেক ক্ষেত্রে এই বিচ্যুতি ঘটায় বলে কবিতাটি নির্জন পাঠ এবং মুদ্রিত পাঠ উভয় দাবি করে। ডিলান টমাসের কবিতার মুদ্রিত পাঠ অনেক সময় আকর্ষণ নাও করতে পারে কিন্তু যারা তার কণ্ঠে তার কবিতার আবৃত্তি শুনেছেন তারা বলবেন অপূর্ব। বিদ্রোহী কবিতার যে অক্ষরবিন্যাস সেটাও একটা আবেগের প্রতিমূর্তি তৈরি করে। আমরা যদি গিয়ম আপলিয়নারের কবিতা কিংবা ই. ই. কামিংসের কবিতা দেখি সেখানে অক্ষর দিয়ে দৃশ্যকল্প তৈরির প্রচেষ্টা আছে। ই. ই. কামিংস তার একটি কবিতায় অক্ষর বিন্যাস দিয়ে পাতা ঝরার দৃশ্যকে রূপায়িত করতে চেয়েছেন। অক্ষরসজ্জায় বিদ্রোহী কবিতা এক সামুদ্রিক উচ্ছ্বাসের বীররসের আভাস দিয়ে চিত্রময়তা গড়ে তোলে। অক্ষরই এখানে টাইপোগ্রাফির প্রসাদে উপস্থাপন করেছে চিত্রময়তা। আপলিয়নারের ‘ঈধষষরমৎধসসবং’ যাকে অনেকে বলেছেন ‘খরঃবৎধৎু ছঁনরংস’ নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার অঙ্গসৌষ্ঠবের মধ্যে আছে এই জ্যামিতিক যৌক্তিকতা। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অক্ষরবিন্যাস ও শব্দশৈলীর বুনন, স্তবক নির্মাণের যে প্রাচ্য কারুকার্য তাতে আমি পিরামিডের আকৃতি আবিষ্কার করি।

বিদ্রোহী

বল বীর

বল উন্নত মম শির।

শির নেহারি আমারি, নতÑশির ওই শিখর হিমাদ্রির।

বল বীরÑ

বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়িÑ

চন্দ্রসূর্য গ্রহতারা ছাড়ি,

ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া

খোদার আসন আরশ ছেদিয়া

উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাত্রীর

মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজরাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর

বল বীরÑ

আমি চির উন্নত শির।

পাঠক এখানে কবিতার অঙ্গসজ্জা এবং অক্ষরবিন্যাসের পর্যায়গুলো লক্ষ করুনÑ কিভাবে একের পর এক অনিবার্য অলঙ্ঘনীয় শব্দশৈলী দিয়ে কবি প্রথম পর্বে গেঁথে তুলেছেন নিজের অনুভব এবং অন্তর্গত-মননের উপলব্ধির অস্তিত্ব, স্থাপত্যধর্মী এবং সঙ্গীতধর্মী সংগঠন এবং একেকবার আগ্নেয় চিন্তার প্রগতি আর অভ্যুত্থান। দ্বিতীয় পর্বে কবি কী করতে চান তার বর্ণনাÑ

আমি ঝঞ্ঝা আমি ঘূর্ণি

আমি পথ সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি

আমি নৃত্যপাগল ছন্দ

আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ

আমি হাম্বীর আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল

আমি চল চঞ্চল ঠমকি ছমকি

পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি

ফিং দিয়া দিই তিন দোল

আমি চপলা, চপল হিন্দোল

কবির এই অভিযানে ‘আমি’ শব্দবন্ধ সতর্কতার সঙ্গে গ্রোথিত হয়েছে। ‘পাগল’ শব্দটি তুচ্ছ হলেও কবি ‘নৃত্যপাগল ছন্দ’ এই বাক্যবন্ধ তৈরি করায় তা শ্রুতিতে নতুন মাত্রা দেয় এবং মাধুর্য তৈরি করে। একইভাবে ‘ফিং’ শব্দটিও তেমন যুৎসই নয় কিন্তু যখন ‘ফিং দিয়া দিই তিন দোল’ তখন মানিয়ে যায় অনিবার্য মনে হয়। এভাবে আমি ‘উন্মাদ’ এই উন্মাদ শব্দটিও কবিতার শরীরে মানিয়ে গেছে ‘আমি উন্মাদ আমি ঝঞ্ঝা’। এ রকম গতিময় শব্দব্যঞ্জনা তৈরির ক্ষমতায় নজরুল যারপরনাই পারঙ্গম। ১৩৯ লাইনের এই বিদ্রোহী কবিতায় ‘আমি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ১৩১ বার। কিন্তু কী আশ্চর্য কবিতার শ্রুতিময়তা, গতিময়তা এবং নান্দনিকতা কিংবা আভিজাত্যে একটুও টাল খায়নি বরং তার শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে। কবিতার শেষে কবি যে জয়ের নেশায় যুদ্ধ সংঘটিত করলেন, যে অভিযাত্রা তিনি শুরু করেছিলেন তার উপসংহারে অর্থাৎ পরিসমাপ্তিতে তিনি তার পরাজিত শক্তির প্রতি যে শর্ত দিলেন তা কাব্যিক শর্ত, অনাগত শত্রু এবং বর্তমান শত্রুপক্ষকে সাবধান করে দিলেন এবং তার বিজয়ের সিংহাসনে এই বলে আসীন হলেন-

আমি চির বিদ্রোহী বীর-

আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা- চির উন্নত শির।

ইউলিসিসের এক দুর্গম সমুদ্রযাত্রা- স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের এক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অধ্যাবসায়। কাক্সিক্ষত লক্ষ্য ছাড়া কোন বীর কি অবসিত হয় যুদ্ধে? নজরুল ইউলিসিসের মতো আজীবন এই যুদ্ধ জারি রেখেছিলেন এবং জীবন দিয়ে তা প্রমাণ করেছিলেন কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো পর্যন্ত। সব বীরের যে ট্র্যাজেডি তা নজরুলের ভাগ্যেও ঘটেছে। নিজের জাতিকে স্বাধীন দেখার আগেই তিনি নির্বাক হলেন- তবে সাক্ষী হয়ে রইলেন কালের- সে এক অসীম সময় যেখানে নজরুল গচ্ছিত রেখেছেন তাঁর স্বপ্ন- যে স্বপ্ন স্বাধীনতার। যতবার আমরা পররাধীনতার বিরুদ্ধে জাতিগত বিদ্বেষ, অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাব ততবার আমরা সঙ্গে নেব ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। মহাবীর আলেকজান্ডার যেমন তার বালিশের নিচে রাখতেন হোমারের অডিসি। সুভাষ চন্দ্র বসু বলেছিলেন আমরা যখন কারাগারে যাব তখন নজরুলের গান গাইব- আমরা যখন যুদ্ধে যাব তখনও নজরুলের গান গাইব- সঙ্গে আমি যোগ করব- আমরা যখন অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সঙ্কুল পথ পেরোবো তখন নজরুলের বিদ্রোহী পাঠ করব এবং আমরা যখন সমাজ সংগঠনে মানবকল্যাণে ব্রতী হব তখনও নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র আবৃত্তি শুনব।