২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে আড্ডা

  • নুরুল করিম নাসিম

ঊনসত্তরের এলোমেলো দিনগুলোতে আমরা পুরনো ঢাকার বাংলাবাজারের ‘বিউটি বোর্ডিং’য়ে আড্ডা দিতাম। প্রয়াত লেখক আহমদ ছফা ভাই এক সন্ধ্যায় সেই আড্ডা থেকে তুলে নিয়ে আমাকে কবি শামসুর রাহমানের আশেক লেনের বাসায় এলেন। ঝাঁকড়া-চুলের সুদর্শন কবির সঙ্গে সেই আমার প্রথম পরিচয়।

এক ধরনের মুগ্ধতা আমাকে সেদিন বিহ্বল করে তুলল। এরপর কাজে-অকাজে অসংখ্যবার গেছি লায়ন সিনেমা হলের পাশের গলিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা আশেক লেনের সেই বাড়িতে। তাঁর অফিসেও গেছি, তখন প্রেস ট্রাস্টের পত্রিকা ‘দৈনিক পাকিস্তান’-এ কাজ করতেন।

অন্যান্য আড্ডায়ও দেখা হয়েছে। টেলিফোনে রাতে দীর্ঘ আলাপচারিতা হতো। এই হƒদ্যতার কারণ আমার বিদেশী সাহিত্য, বিশেষ করে, বাইরের দেশের কবিতাপ্রীতি। তিনিও ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। পড়তেন প্রচুর। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষ ইংরেজী সাহিত্যের নিবেদিতপ্রাণ ছাত্র। চোখে স্বপ্ন, মনের ভেতর সাহিত্যের প্রতি অফুরন্ত প্রেম।

তিনি, মনে পড়ে, কবিতা বিষয়ে একটি ইংরেজী বই আমাকে সংগ্রহ করে দিতে বলেছিলেন। ‘অন পোয়েট্রি’ বইটির নাম, কিন্তু লেখকের নাম আজ দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর কিছুতেই স্মরণ করতে পারছি না। হয়তো কখনও কোনদিন মনে পড়বে।

রাহমান ভাই সেই সময় একটি পত্রিকায় কলাম লিখতেন, ‘মৈনাখ’ ছদ্মনামে, মাসে দুটি। আমরা অপেক্ষা করতাম সেই লেখার জন্য অসম্ভব তৃষ্ণা নিয়ে। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে সহজ-সরল ভাষা ও গল্পের ঢংয়ে লেখা সেসব অবিস্মরণীয় গদ্য আজও তরুণ ও প্রবীণ লেখক এবং পাঠকদের কাছে অম্লান হয়ে আছে। পরে এই নির্বাচিত কলামগুলো নিয়ে ‘শামসুর রাহমানের গদ্য’ শিরোনামে বই প্রকাশিত হয়েছিল।

দুঃখ হয় তিনি জীবনের শেষ প্রহরে এসে আত্মজীবনী লিখলেন ‘কালের ধুলোয় লেখা’ যা একটু এলোমেলো, গদ্যের বাঁধন ততটা সুদৃঢ় নয়। আসলে সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে এবং বাইরের দেশগুলোয়ে যেসব আত্মজীবনী, আত্মকথন স্মৃতিচিত্র লেখা হচ্ছে তা’ লেখকের স্মৃতি উজ্জীবিত থাকবেই লেখা, বয়স এবং স্বাস্থ্য যখন তরতাজা। জীবন সায়াহ্নে এসে আত্মজীবনী লেখার যে ঐতিহ্য দেশে-বিদেশে প্রচলিত ছিল, এখন তা ভেঙে গেছে। ১৯৮২ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী লাতিন আমেরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক গ্যাব্রিয়েল মার্কেজ ‘জীবনের গল্পবলা’ স্মৃতি প্রখর ও শরীর তরতাজা থাকতে লেখা।

কবি শামসুর রাহমান আত্মজীবনীটি সম্পাদনা করবার সময় পাননি। তাঁর শরীর তখন ভেঙে পড়েছে। হয়তো প্রকাশকের তাড়া ছিল, বাণিজ্যভাবনা হয়তো প্রকাশককে প্রভাবিত করেছে।

সর্বসাকুল্যে ৩টি উপন্যাস পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় লিখেছেন। সম্ভবত গল্পও তিন-চারটি লিখেছেন। পরে পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়েছে।

বনানীতে তাঁর বাড়িতেও বেশ কয়েকবার গেছি। তিনি মৃত্যুর তিন-চার বছর আগে এক ম্লান সন্ধ্যায় বলেছিলেন, একজন ভালো গদ্যকারকে বেশি করে কবিতা পড়তে হয়। একজন কবি বা কথাসাহিত্যিককে ভ্রমণ করতে হয়, মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়, জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হয়। আর দেশ-বিদেশের চিরায়ত লেখাগুলো পাঠ করতে হয়।’

১৯৮০ সালে অধ্যাপনার চাকরি নিয়ে ভূমধ্যসাগর তীরের দেশ লিবিয়ায় যাওয়ার আগে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তাঁর আশীর্বাদ নিয়েছিলাম। তিনি একজন অভিভাবকের মতো উপদেশ দিয়েছিলেন। দেড় বছর পর ছুটিতে দেশে ফেরার সময় দুবাই এয়ারপোর্টের বইবিপনি থেকে ‘অক্সফোর্ড বুক অব ইন্টারভিউজ’ বইটি তাঁর জন্য কিনেছিলাম। অসংখ্য কবি, রাষ্ট্রনেতা, চলচ্চিত্রকার প্রমুখের দুর্লভ সাক্ষাৎকার ছিল সেই বইটিতে। তাঁর হাতে যখন তুলে দিলাম তিনি কী যে খুশি হয়েছিলেন, কী ভীষণ অভিভূত হয়েছিলেন।

এরপর ছুটির যে ক’দিন দেশে ছিলাম, তাঁর অফিসে, তখন ‘দৈনিক বাংলা’য় রূপান্তরিত, অধিকাংশ দিন গেছি। তখন তিনি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ভীষণ ব্যস্ততার ভেতরও আড্ডা চালিয়ে যেতেন। তিনি বাইরের কবি ও কবিতা সম্পর্কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, কবিতা আন্দোলন ও কাব্যধারা সম্পর্কে জানতে চাইতেন। আমার কাছে ছিল ‘পোয়েট্রি’ কবিতাপত্রের বেশ ক’টি সংখ্যা, আর ছিল ‘লন্ডন’ মাসিক সাহিত্যপত্র আর বেশকিছু বাইরের দেশের সাহিত্যপত্র। তিনি এসব পড়তে পেয়ে ভীষণ অভিভূত হতেন। কবিতা নিয়ে আলোচনা ও আড্ডা হতো। কখনও বনানীর বাসায়, কখনও বাইরে কোনো রেস্তরাঁয়। তাঁর কিছু শুভাকাক্সিক্ষও আসতেন সন্ধ্যার সেসব আড্ডায়। রাত দীর্ঘ ও বুড়ো হতো, সময় বয়ে যেত, আমরা ক্লান্ত হয়ে যেতাম, কিন্তু কবি আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতেন। তাঁর যেন ক্লান্তি নেই, তিনি বলে যেতেন, অবিশ্রান্ত সেই আলাপচারিতা। অনিঃশেষ সেই আড্ডা আজও আমার কানে বাজে।

তিনি কোনো পরচর্চা করতেন না সেসব আড্ডায়, কাউকে পরনিন্দা করতেও দিতেন না, শুধুই কবিতালাপ। তার দর্শন, তার ভাবনা-চিন্তা, তার স্বপ্ন, কথার ভেতর দিয়ে উচ্চকিত হয়ে উঠতো।

একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী অনার্সে বাংলাসাহিত্য পড়াতে গিয়ে ‘টেলিমেকাস’ কবিতা সম্পর্কে বলতে হয়। তখন আড্ডার কবিতাবিষয়ক সেসব অমৃত বাণী মনে পড়ে। তিনি ছিলেন জাতকবি। তিনি কতটা বড় কবি, সেসব বিচার করবে মহাকাল।

তার একটি কবিতা একবার এক সম্পাদকের বিশেষ অনুরোধে বাংলা থেকে ইংরেজীতে অনুবাদ করতে হয়েছিল। তিনি খুশি হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘তুমি যেহেতু কবিতা লেখ, সেজন্য তোমার অনুবাদটি স্বচ্ছ ও সাবলীল হয়েছে।’

তিনি নিজেও রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার বইটি ইংরেজী থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। ইদানীং আবার পাওয়া যাচ্ছে বইটি। অনুবাদের স্বচ্ছতা ও সাবললিতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন আছে, তাঁর অনুবাদ পড়লে সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়।

তিনি নিজেও রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার বইটি ইংরেজী থেকে বাংলা অনুবাদ করেছিলেন। তিনি শেক্সপিয়রের একটি ‘হ্যামলেট’ নাটকটিও বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। এটাকে অনুবাদ বলে ট্রান্সক্রিয়েশন (নাকি বাংলায় ‘নিবির্মাণ’ বলব) বলা ভালো।

আড্ডায় তার সমসাময়িক কবি বন্ধু কবি আল মাহমুদ, কবি শহীদ কাদরী, কবি সৈয়দ শামসুল হক, কবি ফজল শাহাবুদ্দিন, কবি শহীদ কাদরীর প্রসঙ্গ এলে কেমন লাজুক হয়ে যেতেন। কারও সম্পর্কে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতেন না। হয়তো এটা তার বিনয়। এমনিতে তিনি ছিলেন অসম্ভব লাজুক, বিনয়ী ও ভদ্র। কথা বলতে গিয়ে একটু ফর্মাল হতো, একটু জড়িয়ে যেত কথাগুলো, তবুও তিনি ছিলেন শব্দশিল্পী, চমৎকার কথা বলতে পারতেন, আমরা তাঁর কথাজাদুতে সম্মোহিত হয়ে স্তব্ধ হয়ে থাকতাম।

পুরনো ঢাকার আশেক লেন, যেখানে জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে, তাঁর সেসব স্মৃতি কবিতায় ছায়া ফেলেছে। গ্রীক পুরাণ তো তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল, তারপরও তিনি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়েও লিখেছিলেন।

‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধের দুর্বিনীতি ও ভয়াবহ দিনগুলো বিবৃত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি এই শহর ছেড়ে কোথাও যাননি, দেশের অভ্যন্তরে আন্তঃগোপন করেছিলেন। রুশকবি মায়াকোভস্কির কিছু কিছু কবিতার যেন প্রভাব পড়েছে সেসব কবিতায়।

তার কবিতায় রাজনীতিও উপেক্ষিত হয়নি, কিন্তু সেখানে প্রবল প্রতিবাদের পাশাপাশি এক ধরনের রোমান্টিকতাও সহবাস করছে। ‘আসাদের শার্ট, ‘সফেদ পাঞ্জাবী’, ‘স্বাধীনতা তুমি’ আজও পাঠকের মুখে মুখে ফেরে।

ভাবতে ভালো লাগে, যেসকল কবিদের সাহচর্য পেয়ে আমি উদ্বেলিত হয়েছি কবি শামসুর রাহমান তাদের অন্যতম। তিনি, তাঁর কবিতা, তাঁর সঙ্গে আড্ডার দিনগুলো আমার জীবনে স্মৃতিময় হয়ে থাকবে।