২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উজ্জ্বল উদ্ধার সিলেটি নাগরীলিপি ও সাহিত্য

  • শফিক হাসান

একটি জাতির আত্মপরিচয় পরিস্ফুট হয় তার সংস্কৃতিতে। সংস্কৃতিকে লালন করতে হয়, যথাযথ বিকাশের জন্য উদ্যোগ লাগে। অতীত ইতিহাসের গৌরব বুকে ধারণ না করলে জাতি তথা ব্যক্তির মানসচেতনা পরিপুষ্ট ও পোক্ত হয় না।

একটি ভাষার দুটি লিপি পৃথিবীতে তৃতীয়টি নেই। এর প্রথমটি বাংলাদেশের একটি নির্র্র্র্দিষ্ট অঞ্চলে রয়েছে, দ্বিতীয়টি স্কটল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে। বাংলাদেশের এ বর্ণমালার নাম নাগরী।

গুরুত্ব অনুধাবন, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় তত্ত্বাবধান ও সংস্কারের অভাবে বাংলাদেশের অনেক ঐতিহ্যই বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সিলেটি নাগরীলিপিও প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে না দিয়ে ভাষার অমূল্য সম্পদ এ লিপিকে উদ্ধারকল্পে এগিয়ে এসেছেন একজন প্রকাশক- ইতিহাস-ঐতিহ্য অনুরাগী মোস্তফা সেলিম।

চর্যাপদ থেকে নাগরীপুঁথি

বাংলা সাহিত্যের প্রথম উদাহরণ চর্যাপদের পরে অন্যতম উদাহরণের খোঁজ করলে এসে যায় নাগরীপুঁথির কথাই। চতুর্দশ শতকে নাগরীলিপির উদ্ভব। অব্যবহিত পরেই লিপিটি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়- ব্যবহার বাড়তে থাকে। এ লিপিতে বর্ণ রয়েছে ৩২টি। পঠন-পাঠন-শিক্ষাপদ্ধতি সহজ বলে এটি অল্পসময়েই সাধারণের মধ্যে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে। দৈনন্দিন লেখাজোখা থেকে শুরু“করে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের হিসাব, দলিল-দস্তাবেজ লেখা, দাফতরিক বিভিন্ন কাজেও নাগরীলিপির প্রচলন ঘটে।

বাংলা ভাষাটাই বিকল্প বর্ণ হিসেবে নাগরীতে লেখা হতো। নাগরী কোন ভাষা নয়- লিপি মাত্র। এখনকার কেউ কেউ যেমন বাংলিশ (ইংরেজী অক্ষরে বাংলা, যেমন ‘আমার’ শব্দটি লেখা হয় অসধৎ) লেখে ঠিক এ পদ্ধতিতেই শুরু হয়েছিল নাগরীলিপির ব্যবহার। তবে সেটি এখনকার বানানের মতো অতটা ‘খেলো’ ছিল না, ভাষা ও বানান নিয়ে এমন যথেচ্ছাচারও ছিল না। এ লিপির প্রাণ ছিল, মানও ছিল। চর্যাপদে যেমন উন্নত সাহিত্যের সন্ধান মেলে, তেমনি নাগরীপুঁথিও দেয় সাহিত্যের সোনালি আকর।

নতুন সাহিত্যের খোঁজে...

আরবি, কাইথি, বাংলা ও দেবনাগরী অনুসরণে উদ্ভব হয়েছে সিলেটি নাগরীলিপির। দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি এ লিপিতে রচিত হয়েছে অসংখ্য পুঁথি। পুঁথিগুলোতে ব্যবহৃত হয়েছে ধর্মীয় নানা অনুষঙ্গ। এতে ইসলাম যেমন স্থান পেয়েছে তেমনি আছে সনাতন ধর্মও। তবে ইসলামী নানা অনুষঙ্গই বড় আকারে ঠাঁই পেয়েছে।

এসব পুঁথিতে অনেক সময়ই চমক সৃষ্টি কিংবা কাহিনীকে চটকদার করতে এবং গতিশীলতা আনতে গিয়ে রচয়িতা খেই হারিয়ে ফেলেছেন। যার ফলে কাহিনীকাব্যগুলোর সর্বজনীন বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণœ হয়েছে। মিথ এবং মানুষের মুখে মুখে ফেরা লোককাহিনীগুলো পেয়েছে বাড়তি ব্যঞ্জনা। চর্বিতচর্বনে নতুন ঢঙে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলা পুঁথিকাব্যে গল্পসুলভ চমকে হয়ত সাহিত্যমান বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু হারিয়েছে ইতিহাস ও মানুষের মনে প্রোথিত নির্জলা সত্যের অবস্থান। লোকমুখে প্রচলিত কিংবা ইতিহাস-আশ্রিত বিষয়গুলোকে সাহিত্য করে তুললে বাস্তবতা এবং সত্যের অপলাপ না ঘটিয়েই সেটি করতে হয়। কাজটি সহজসাধ্য নয় মোটেও।

কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা বাদ দিলে নাগরীসাহিত্য এখনও অসাধারণ সাহিত্যমূল্যে দীপ্যমান। একটি মহৎ রচনা সবকালের হয়ে ওঠে, এর অতীত, বর্তমান কিংবা ভবিষ্যত থাকে না। নাগরীপুঁথির অটুট অবস্থানের উপযোগিতাকেই তুলে ধরে সগর্বে। প্রাচীন হয়েও নাগরীপুঁথি চিরনতুন।

ধর্ম কিংবা প্রণয়ের শিলালিপি

নাগরীলিপিতে রচিত পুঁথিকে সাধারণ মানুষ ধর্মগ্রন্থের মতো পবিত্র ভেবে সমীহ করত। এর যথার্থ কারণও আছে। মানবিক প্রেম-প্রণয়, রূপকথা, সামাজিক রচনা, মরমি কাহিনী, সুফিবাদ, ফকিরি গানসহ বিবিধ ব্যবহারের পাশাপাশি নাগরী সাহিত্যে ইসলামের বিভিন্ন কাহিনী স্থান পেয়েছে। নবীচরিত, ধর্মের বাণী লিপিবদ্ধ হওয়ায় এ পুঁথি পেয়েছে বিশেষ সম্মানের আসন। নাগরীলিপিতে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি রয়েছে ইসলাম ধর্মের ঘটনাক্রম, নবী-রসুলচরিত। সবচেয়ে জনপ্রিয় নাগরী পুঁথি মুন্সী সাদেক আলী রচিত ‘কেতাব হালতুন্নবী’। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে রচিত এ পুঁথিগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৮৬০-এ। বর্ধিত কলেবরের এ কাহিনীকাব্য ২টি অংশে বিভক্ত। একটি অংশে বিধৃত হয়েছে সৃষ্টিকর্তার কুদরত। বড় অংশে রয়েছে হযরত মোহাম্মদ (স.)-এর জীবন ও কর্মের আলোকপাত, মাহাত্ম্য। ছন্দবদ্ধ আখ্যানে নবী মোহাম্মদের জীবন ইতিহাস সহজেই শ্রোতার বোধগম্য হয়ে ওঠে।

‘মুশকিল তরান’ পুঁথিগ্রন্থটিও ধর্মীয় প্রচারমূলক। ইসলাম ধর্মের নবী, ফেরেশতাদের কাহিনীর পাশাপাশি বিধৃত হয়েছে ধর্মীয় নানা অনুষঙ্গ।

প্রেমোপাখ্যানও চমৎকার শৈলীতে বিধৃত হয়েছে পুঁথিগুলোতে। মুহম্মদ খলিলের ‘চন্দরমুখী’, মুন্সী সাদেক আলীর ‘মহব্বত নামা’ ইউসুফ-জোলেখার প্রেমকাহিনীকে উপজীব্য রচিত। এ যাবত প্রকাশিত হয়েছে নাগরীলিপির ২৫টি বই। প্রকাশের অপেক্ষায় আছে আরও অন্তত ৫০টি। প্রকাশিত বইগুলো হচ্ছে- কেতাব হালতুন্নবী : মুন্সী সাদেক আলী, আহকামে চরকা : মৌলবী আকবর আলী, বাহরাম জহুরা : মহম্মদ জওয়াদ, চন্দরমুখী : মুহম্মদ খলিল, দেশ চরিত : ছৈয়দুর রহমান, দইখুরার রাগ : মবিন উদ্দীন মুন্সী (দইখুরা), হাশর মিছিল : মুন্সী সাদেক আলী, হাশর তরান : শাহ আবদুল ওয়াহাব চৌধুরী, হরিণ নামা : মুন্সী আবদুল করিম, হুসিয়ার গাফেলিন : মুন্সী ওয়াজিদ উল্লাহ, কড়ি নামা : মুন্সী আবদুল করিম, মায়ারশি দুছরা : হাজী ইয়াছিন, মহব্বত নামা : মুন্সী সাদেক আলী, মুশকিল তরান : শিতালং শাহ, নূর পরিচয় : শাহ আরমান আলী, ওছিওতুন্নবী : মুন্সী জফর আলী, সাত কন্যার বাখান : সৈয়দ শাহনূর, ছদছি মছলা : আবদুল করিম, সহর চরিত : মুন্সী আছদ আলী, ছয়ফুল বেদাত : মুন্সী ইরফান আলী, সোনাভানের পুথি : মুন্সী আবদুল করিম, জঙ্গনামা : ওয়াহেদ আলী, ভেদ চরিত : ফকির আমান, ভেদ কায়া : শাহ আবদুল ওয়াহাব চৌধুরী, মুজরা রাগ হরিবংশ : দীন ভবানন্দ।

নাগরীলিপির ব্যবহার সিলেটের দিকে বেশি মাত্রায় থাকলেও কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ভৈরব, করিমগঞ্জ, শিলচর, আসামেও ছিল এর উপস্থিতি।

সীমানা ছাড়িয়ে অন্য দিগন্তে

প্রবাদে আছে- পুরান চাল ভাতে বাড়ে। তেমনি পুরনো কিছু সংস্কৃতি যত দিন যায় ততই খোলতাই হয়, উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে। সিলেটি নাগরীপুঁথিও দীর্ঘদিন সাধারণের চক্ষুর অন্তরালে থেকে বর্তমানে নতুন করে আবার আলো ছড়াচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির আগ্রাসন, সংস্কৃতির পালাবদলে বাংলাদেশ থেকে পুঁথি পাঠ হারিয়ে গিয়েছিল প্রায়। নাগরীপুঁথির এ নবআবির্ভাবে স্তিমিত অঞ্চলটি কিছুটা হলেও তরঙ্গায়িত হয়ে উঠেছে। নাগরীপুঁথি নিয়ে বর্তমানে গবেষণা হচ্ছে, বই লেখা হচ্ছে। বিদ্বজ্জনদের কেউ নাগরীপুঁথিকে বিষয় করে পিএইচডি অভিসন্দর্ভ রচনা করছেন। এ পর্যন্ত নাগরীলিপির ওপর পিএইচডি করেছেন অধ্যাপক গোলাম কাদের, ড. মোহাম্মদ সাদিক, ভারতের অধ্যাপক মোসাব্বির ভূঁইয়া প্রমুখ। নাগরীলিপি নিয়ে গবেষণা করছেন ব্রিটিশ দম্পতি উইলিয়াম লয়েড ও ড. সু লয়েড, রেজা গোয়েন, শিকাগো (আমেরিকা) বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ড. থিবো দুবের।

ব্যবসায়িক সাফল্য দূরে থাক- বিনিয়োগও উঠে আসে না এসব বইয়ে। ব্যবসায়িক সাফল্য মার খেলেও সাফল্য মিলেছে আসল জায়গায়। সবচেয়ে বড় সাফল্য- অনেকেই বিলুপ্ত এ ঐতিহ্য সম্বন্ধে অবগত হয়েছেন। আগ্রহের পরিধি বাড়ছে দিন দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ে নাগরীলিপির ওপর ৫০ নম্বর পাঠ্য করার প্রস্তাব উঠেছে। কেউ কেউ নাগরী জাদুঘর, নাগরী পাঠশালা, নাগরী অভিধান তৈরির প্রস্তাবও রাখছেন। সে অনুযায়ী কর্মসূচীও গ্রহণ করা হচ্ছে। ২৫ খণ্ডের নাগরীপুঁথির প্যাকেজটি বিক্রি হচ্ছে ১০,০০০ টাকায়। সব বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী হাজরা।