১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিভীষিকাময় ২১ আগস্ট

  • এম নজরুল ইসলাম

ইতিহাসে কিছু আলোকিত, উজ্জ্বল দিন থাকে। আছে কিছু কালো দিন। আলোকিত দিনগুলো যেমন মহান কীর্তির কথা মনে করিয়ে দেয়, তেমনি কালো দিনগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় শিউরে ওঠার মতো কিছু স্মৃতি। আজ ২১ আগস্ট, ইতিহাসের তেমনি এক বিভীষিকাময় দিন। সাল ২০০৪। দেশে তখন চলছে জামায়াত-বিএনপি জোট সরকারের অপশাসন। তাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় দেশজুড়ে বিস্তৃত হচ্ছিল ঘৃণ্য জঙ্গীবাদ। কোথাও কোথাও প্রশাসনের সমান্তরালে তখন জঙ্গী শাসন শুরু হয়ে গিয়েছিল সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে।

২০০৪ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউতে জননেত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় বোমা ও গ্রেনেড হামলা করা হয়। এতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী নিহত হন এবং গুরুতর আহত হন দুই শতাধিক নেতাকর্মী। বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউ সেদিন রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। হতাহত নেতাকর্মীদের আর্তনাদ ও বাঁচানোর আকুতিতে সৃষ্টি হয়েছিল এক হƒদয়বিদারক দৃশ্যের। দলীয় সভানেত্রীকে বাঁচানোর জন্য ট্রাকের ওপর মানববর্ম রচনা করেছিলেন আওয়ামী লীগের নেতারা। সেদিনের গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত আইভী রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মারা যান ২৪ আগস্ট। ওই দিন নিহত হন মোস্তাক আহমেদ সেন্টু, ল্যান্স কর্পোরাল (অব) মাহবুবুর রশীদ, রফিকুল ইসলাম আদা চাচা, সুফিয়া বেগম, হাসিনা মমতাজ রীনা, লিটন মুন্সী ওরফে লিটু, রতন সিকদার, মোঃ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মামুন মৃধা, বেলাল হোসেন, আমিনুল ইসলাম, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারী, আতিক সরকার, নাসিরউদ্দিন সর্দার, রেজিয়া বেগম, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মমিন আলী, শামসুদ্দীন, আবুল কালাম আজাদ, ইছহাক মিয়া এবং অজ্ঞাত পরিচয় আরো দুজন। হামলায় আহতের মধ্যে ছিলেন জিল্লুর রহমান, আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, মোঃ হানিফ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, এ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, কাজী জাফরউল্লাহ, ওবায়দুল কাদের, ড. হাছান মাহমুদ, আব্দুর রহমান, আখতারুজ্জামান, এ্যাডভোকেট রহমত আলীসহ পাঁচ শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়ে অনেকে কিছুটা সুস্থ হলেও পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে অনেককে। সেদিনের সেই দুঃসহ স্মৃতি প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাদের। সেই দুঃস্বপ্নের দিন আজ, ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার একাদশ বার্ষিকী।

সেদিনের ঘটনাপঞ্জির দিকে তাকানো যাক। মিছিল উপলক্ষে বিকেল ৪টা থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষে ভরে ওঠে বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউ। ৫টার দিকে বুলেট প্রুফ গাড়িতে করে সমাবেশস্থলে পৌঁছান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। বক্তৃতায় তিনি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা এবং দেশব্যাপী বোমা হামলা বন্ধে সরকারকে হুঁশিয়ার করেন। প্রায় ২০ মিনিট বক্তৃতা শেষে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল শুরুর ঘোষণা দেয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে শুরু হয় গ্রেনেড হামলা। পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এরপর শেখ হাসিনার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। নিক্ষিপ্ত গ্রেনেডগুলোর মধ্যে তিনটি অবিস্ফোরিত থেকে যায়। শত শত মানুষের আর্তচিৎকার, ছড়িয়ে থাকা ছিন্নভিন্ন দেহ, রক্ত আর পোড়া গন্ধ, সব মিলিয়ে বীভৎস অবস্থার সৃষ্টি হয় পুরো এলাকায়। আহতদের সাহায্য করার বদলে বিক্ষুব্ধ এবং আহত মানুষের ওপর বেপরোয়া লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে তৎকালীন সরকারের পুলিশ। মুহূর্তের মধ্যে দোকানপাট ও যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে পালাতে শুরু করে সবাই।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাণনাশের উদ্দেশ্যেই গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। অথচ বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সংঘটিত এ হত্যাকা- নিয়ে সেদিন সংসদে কোন শোক প্রস্তাবও তুলতে পারেনি আওয়ামী লীগ। শোক প্রস্তাব তুলতেই দেয়া হয়নি। জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে পরিচালিত সেদিনের সেই গ্রেনেড হামলায় যে চারদলীয় জোটের ইন্ধন ছিল তা আজ অনেকটাই প্রমাণিত সত্য। আর, সে কারণেই সেদিন জোট সরকার গ্রেনেড হামলার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল। সিআইডিকে দিয়ে সাজানো হয়েছিল জজ মিয়া প্রহসন।

বর্বর এ হত্যাকা-ের ঘটনা মনে হলে আজও গা শিউরে ওঠে। কোন গণতান্ত্রিক, স্বাধীন ও সভ্য দেশে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে প্রকাশ্য দিবালোকে জনসভায় এমন বর্বরোচিত ঘটনা ঘটতে পারে, তা ভাবনারও অতীত। গ্রেনেড হামলার ঘটনার পর এলাকায় নিয়োজিত পুলিশ হামলাকারীদের আটক করার ব্যাপারে কোন চেষ্টা কি করেছিল? এ প্রশ্নের মীমাংসা আজও হয়নি। গ্রেনেড হামলার পর দ্রুত ঘটনার আলামত নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। এত বড় একটি হত্যাকা-ে চারদলীয় জোটের অনেক নেতা শোক প্রকাশের বদলে হামলার জন্য আওয়ামী লীগকেই দায়ী করে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছিলেন। বিরোধীদলীয় নেতার জনসভায় এ রকম পৈশাচিক হামলার পরও দুঃখ প্রকাশ কিংবা লজ্জিত হওয়া তো দূরে থাক, আমাদের নষ্ট রাজনীতির নির্লজ্জ ঐতিহ্য ধরে তৎকালীন সরকারী দলীয় নেতৃত্ব হামলার জন্য উল্টো আওয়ামী লীগকেই দোষারোপ করে। মামলার তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার নানা চেষ্টা করা হয়।

বিগত জোট সরকারের সময় তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে এ দেশে জঙ্গীবাদ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছিল, এ সত্য আজ আর অস্বীকার করা যাবে না। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানী ঢাকার এক জনাকীর্ণ স্থানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভায় যে বর্বরোচিত ঘটনা ঘটানো হয়েছিল, সেটি যে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এক ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নীলনক্সা ছিল তাও এখন সবার কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে একটি চিহ্নিত অপশক্তি দেশ-জাতিকে উল্টোপথে ঠেলে দিতে চেয়েছিল, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘটনা এরই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। অবশ্য এর আগেও এমন অপচেষ্টা ওরা করেছিল কোটালীপাড়ায় জননেত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থলে বোমা পুঁতে রেখে।

২১ আগস্টের ঘটনার সময় যে দল বা জোট ক্ষমতায় ছিল, তারা সে হামলার ঘটনার কোন বিচার করেনি। সেই ২৪ জনের হত্যার বিচার করেনি তৎকালীন সরকার। তদন্তের ভান করেছিল। ইন্টারপোলের সাহায্য নেয়ার কথা বলা হয়েছিল। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সাহায্য নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপর চুপচাপ ছিল সেদিনের সরকার। এতেই স্পষ্ট হয় এই গ্রেনেড হামলার পেছনে তৎকালীন জোট সরকারের হাত ছিল। জঙ্গী-জামায়াতবেষ্টিত সরকার চেয়েছিল বাংলাদেশ থেকে প্রগতিশীলতার ধারা মুছে ফেলতে। চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি চিরতরে নির্বাসনে পাঠাতে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। সত্যের জয় কোন কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখা যায়নি।

শরতে বাংলার আকাশের রং বদলে যায়। বর্ষায় যে আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা, সেই আকাশই শরতে শ্বেতশুভ্র। আকাশে যেমন সাদা মেঘের ভেলা, মাটিতে শিউলি ও কাশ যেন প্রকৃতিকে শুভ্রতার পোশাক পরিয়ে দেয়। কিন্তু এই শরতেই, বাংলার ইতিহাসে একের পর এক কালো অধ্যায় রচিত হয়েছে। আগস্ট বাঙালীর শোকের মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

২০০৫ সালে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা হয়েছে। বাংলার মানুষ কিন্তু নতুন করে জেগে উঠেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিয়েছে প্রগতিশীলতার পক্ষে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে জামায়াত-বিএনপির জঙ্গী জোট নির্বাচনে অংশ নেয়ারই সাহস পায়নি। এভাবেই মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। ২১ আগস্টের বিভীষিকাময় স্মৃতি মনে রেখে বাংলার মানুষ আগামীতেও অপশক্তিকে রুখে দেবে, প্রত্যাখ্যান করবে, এমন আশা করাই যায়। বাংলার ইতিহাস তো তাই বলে।

লেখক : অস্ট্রিয়া প্রবাসী

হধুৎঁষ@মসী.ধঃ

নির্বাচিত সংবাদ