২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গুরু পাপে লঘু দন্ড

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, জীবন রক্ষার জন্য মানুষ যে ওষুধ ব্যবহার করে সেই ওষুধই হয়েছে জীবনহানির কারণ। এই বাংলাদেশে টানা চার বছরে ওষুধে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়েছে প্রায় তিন হাজার শিশুকে। এর চেয়ে ভয়ানক আর কী হতে পারে! কিন্তু এই নির্মম হত্যাযজ্ঞের বিচার করা হয়নি। বিচার হচ্ছে ভেজাল ওষুধ উৎপাদনের। তাও গত ২৩ বছর ধরে চলছে মামলার কার্যক্রম। কিন্তু সুরাহা আর হয় না। প্যারাসিটামল সিরাপে বিষাক্ত রাসায়নিক মিশিয়ে অধিক মুনাফার লোভে বাজারজাত করে আসছিল ওষুধ কোম্পানিগুলো। আর শিশুরা সেই সিরাপ সেবন করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল। বেঁচে থাকলে সে সব শিশু ২৭-২৮ বছরের যুবকে পরিণত হতো। পিতা-মাতা-স্বজনদের নয়নমণি হয়ে থাকত। কিন্ত শিশু হন্তারকরা তা হতে দেয়নি। বরং জেনেশুনেই সিরাপের স্বাদ মিষ্টি করতে ওষুধে মারাত্মক বিষাক্ত ডাই-ইথিলিন গ্লাইকল মিশিয়েছিল অসাধু ওষুধ কোম্পানিগুলো। অথচ এটি মানুষ বা অন্য কোন প্রাণীর সেবন উপযোগী নয়। যা রং, সিল প্যাডের কালিতে দ্রবণ হিসেবে এবং রেফ্রিজারেটরে এ্যান্টিফ্রিজ কিংবা বিভিন্ন পরিবহনে ব্রেক অয়েল বা লুব্রিকেন্টে ব্যবহৃত হয়। এসব জানা সত্ত্বেও মেশানো হয়। এই সিরাপে মেশানোর কথা প্রোপাইলিন গ্লাইকল। ওষুধসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে এটি পরিমিত মাত্রায় ব্যবহার করা হয়। তবে এটি মেশানোর পর সিরাপের স্বাদ তেতো হয়ে যায়। আর দামও বেশি। তাই সস্তার ডাই-ইথিলিন মেশানো হয়। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই সিরাপের প্রতিক্রিয়ায় ২৭শ’ শিশু মারা যায়। সারাদেশে এ নিয়ে আলোড়ন হলেও অভিভাবকরা আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার পরও ওই সব ওষুধ উৎপাদক কোম্পানি ও এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোন হত্যা মামলা হয়নি। মামলা হয় ওষুধ নিয়ন্ত্রণ আইনে। এত শিশুকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলার পরও ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা যেমন করা হয়নি, তেমনি বাদী হিসেবে আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় বিচার বিলম্বিত হয়। সমন পাঠানোর পরও আদালতে বাদী হাজির না হাওয়ায় গ্রেফতার করা হয় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে। দীর্ঘ ২৩ বছর পর আদালত রায় দিয়েছে। এই এতটা বছর মামলা ঝুলেছিল বাদী গরহাজির থাকায়। পুরো বিষয়টি নিয়ে চলছিল এক ধরনের লুকোচুরি খেলা। বাদীকে অবশেষে গ্রেফতার করে পাঠানো হয় কারাগারে। তবে তিন দিন পর তাকে জামিন দেয়া হয়। পাশাপাশি ১৯৯৪ সালে অভিযোগ গঠনের পর আসামিপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের আদেশে বিচার কার্যক্রম স্থগিত থাকে। ২০১২ সালের এপ্রিলে স্থগিতাদেশ বাতিল করে আদালত মামলা চলবে বলে নির্দেশ দেয়ার পর সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য হয়। কিন্তু এরপরও দীর্ঘদিন বাদী আদালতে না আসায় বিচার কাজ স্থবির হয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, বছরের পর বছর বিভিন্ন অজুহাতে মামলাটি ঝুলিয়ে রাখে স্বার্থান্বেষীরা। বিষাক্ত ওষুধ খাইয়ে শিশু মারার ঘটনায় হত্যা মামলা হওয়া যেখানে উচিত ছিল, সেখানে ফৌজদারি মামলা করা হয় ভেজাল ওষুধ উৎপাদনের। অর্থাৎ হত্যা মামলার বিচার হয়নি মামলা না করায়।

বিষাক্ত ওষুধ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত থাকায় ছয়টি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা হয়। এর মধ্যে গত বছরের জুলাইয়ে একটি কোম্পানির তিন কর্মকর্তাকে ১০ বছরের কারাদ- দেয় আদালত। একই অভিযোগ থেকে ওষুধ উৎপাদক আরেক কোম্পানিকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে দায়মুক্তি দেয়া হয়। সর্বশেষ ৭৬ শিশু হত্যাকারী প্রতিষ্ঠান বিসিআইয়ের ৬ কর্মকর্তাকে ১০ বছর করে কারাদ- ও অর্থ জরিমানা করা হয়েছে দুটি মামলায়। এর মধ্যে পাঁচজনই পলাতক। এ যেন গুরু পাপে লঘু দ-। আইনজীবীরা বলছেন, উচ্চ আদালত থেকে আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে যাবে। আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- না থাকায় এরা পার পেয়ে যাচ্ছে। অপরাধের তুলনায় সাজা অপ্রতুল তাই। যে ঘটনা ঘটেছে তা হৃদয়বিদারক। কিন্তু আইনের হাত খাটো বলে নারকীয় অপরাধ থেকে পার পাওয়ার এই পথ বন্ধ করতে হবে। হত্যার বিচার করা এখন সঙ্গত।