১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এনসিটিবির মতে এটি জামায়াতী ষড়যন্ত্র

  • পাঠ্যবই নিয়ে সরকারকে সঙ্কটে ফেলতে বিশেষ গোষ্ঠীর কারসাজি নস্যাত;###;অভিযুক্ত দুই প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করে এক কোটি ১৯ লাখ টাকা জরিমানা

বিভাষ বাড়ৈ ॥ এবার সরকারবিরোধী বিশেষ গোষ্ঠীর দুটি কাগজ মিলের কর্মকা-ে বড় ধরনের সঙ্কটে পড়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) নতুন পাঠ্যবই ছাপার কাজ। দরপত্র এমনকি পুনঃদরপত্রে অংশ নিয়েও প্রায় ছয় হাজার মেট্রিক টন কাগজ সরবরাহের কাজ পেয়ে হঠাৎ শেষ মুহূর্তে এসে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ওই দুটি প্রতিষ্ঠান। প্রতারণার দায়ে বিতর্কিত ওই দুটি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি তাদের এক কোটি ১৯ লাখ টাকার জামানত বাজেয়াপ্ত করে নগদায়ন করেছে এনসিটিবি। অভিযুক্ত এ প্রতিষ্ঠান দুটির একটি হচ্ছে ‘টিকে গ্রুপ’ অন্যটি ‘আল নূর পেপার মিল’। এর মধ্যে টিকে গ্রুপ একাই ৫ হাজার মেট্রিক টন কাগজ শেষ মুহূর্তে এসে আটকে দিয়েছে। সরকারের সঙ্গে কাজের শর্ত ভঙ্গের অপরাধে এ প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ১৯ লাখ টাকার জরিমানা করা হয়েছে আল নূর পেপার মিলকে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র পাল জানিয়েছেন, টিকে গ্রুপ শর্ত ভঙ্গ করেছে। শোনা যাচ্ছে এ প্রতিষ্ঠানটি জামায়াতপন্থী। তারা হয়ত ভেবেছিল শেষ মুহূর্তে এসে ৫ হাজার মেট্রিক টন কাগজ না দিলে সরকার পুরো পাঠ্যবই নিয়ে কেলেঙ্কারিতে পড়বে। হয়ত আরও কোন কারণ আছে। প্রতিষ্ঠানটিই বলতে পারবে আসলে কেন এটা তারা করল। তবে আমরা শর্ত ভঙ্গ করার জন্য তাদের জামানতের পুরো টাকা বাজেয়াপ্ত করে নগদায়ন করেছি। জানা গেছে, জামানত বাজেয়াপ্ত না করতে এনসিটিবি’র কর্মকর্তাদের নানাভাবে আর্থিক প্রলোভনও দেখিয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠান। দুই কাগজ মিলের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে পাঠ্যবই মুদ্রণ ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হচ্ছে বলে বলছেন এনসিটিবি’র কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছন, ২০১৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই মুদ্রণের কাগজ ক্রয় নিয়ে বার বার জটিলতায় পড়ছে এনসিটিবি। সরকারের সফল উদ্যোগ নস্যাত করার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ‘টিকে গ্রুপ’ এবং ‘আল নূর পেপার মিল’ কাগজ সরবরাহে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলে মনে করছে এনসিটিবি’র প্রায় সকল কর্মকর্তাই। একই কথা বলছেন, পাঠ্যবই ছাপার সঙ্গে জড়িত অনেক মুদ্রাকরও। জানা গেছে, চট্টগ্রামের ‘টিকে গ্রুপ’ উন্মুক্ত দরপত্রে অংশ নিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে পাচঁ হাজার মেট্রিক টন কাগজ সরবরাহের কাজ পায়। তাদের কাগজ সরবরাহের শেষ সময় এসে গ্রুপটি কাগজ সরবরাহে অস্বীকৃতি জানিয়ে বসে। পরবর্তীতে গত ওই পাচঁ হাজার মেট্রিক টন কাগজ ক্রয়ের জন্য পুনরায় দরপত্র (রি-টেন্ডার) আহ্বান করা হলে তাতে পাচঁটি প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ‘আল নূর পেপার মিল’ কাজ পেয়েও শেষ মুহূর্তে কাগজ সরবরাহে অস্বীকৃতি জানায়। এতে এনসিটিবি দ্বিতীয় দফায় বেকায়দায় পড়ে। আল নূর পেপার মিলের ১৯ লাখ টাকার জামানত বাজেয়াপ্ত করেছে এনসিটিবি। কালো তালিকাভুক্ত হওয়ায় ‘টিকে গ্রুপ ও আল নূর পেপার মিল’ যাতে আগামী পাঁচ বছর সরকারের কোন দরপত্রে অংশ নিতে পারে সেজন্য প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। কাগজের কাজ নিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটির এমন অবস্থানে যে সঙ্কট তৈরি হয়েছে তা যে কোন উপায়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নিয়ে সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে এনসটিবি। কিন্তু দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বড় ধরনের সঙ্কটে ফেলার জন্য টিকে গ্রুপের ওপর ক্ষুব্ধ উর্ধতন ভা-ার কর্মকর্তা জিয়াউল হক। তিনি বলছিলেন, ৫ হাজার মেট্রিক টন কাগজ মানে হচ্ছে বিশাল পরিমাণ। এত বড় কাজ নিয়ে শেষ মুহূর্তে যদি বলা হয় কাগজ দেয়া যাবে না তাহলে বিপদে পড়তেই হয়। আমরা পুরো ঘটনায় খুবই বিব্রত। রি-টেন্ডার দিয়ে সামাল দিচ্ছি আমরা কিন্তু এ ধরনের কর্মকা-ের ধাক্কা পোহাতে হচ্ছে। সময় নষ্ট করা হয়েছে।

কাজের শর্ত ভঙ্গের জন্য এ প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মানে হচ্ছে তাদের এক কোটি টাকার জামানত বাজেয়াপ্ত করে নগদায়ন করেছে এনসিটিবি।

দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকা- নিয়ে চিন্তিত অনেকেই। কর্মকর্তারা বলছেন, কাজ নিয়ে হয়ত সরকার বিরোধী একটি গ্রুপ শেষ মুহূর্তে এসে আরও জটিলতা পাকাতে চায়। তবে এ দুটি প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রায় সকল কর্মকর্তাই। এনসিটিবি’র সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছিলেন, আমরা তদন্ত করে দেখেছি দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে টিকে গ্রুপের অবস্থান সরকারবিরোধী। টিকে গ্রুপের এক কোটি টাকা জামানত বাজেয়াপ্ত করে পুরো অর্থ নগদায়ন করে এনসিটিবি’র কোষাগারে জমা করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এনসিটিবির চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র পাল আরও বলছিলেন, ‘টিকে গ্রুপ কাগজ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় রি-টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এতে পাচঁটি প্রতিষ্ঠান বিড (প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়) করেছে। রি-টেন্ডারে আল নূর পেপার মিল দুটি লটে কাজ নিয়ে একটি দিতে অস্বীকার করে। এটাও শর্ত ভঙ্গ।

এদিকে কালোতালিকাভুক্ত না করতে লিখিত আবেদন করেছে টিকে গ্রুপ। কাগজ না দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তারা চায়নি সরকার বই নিয়ে সঙ্কটে পরুক। কিন্তু কেন এটা করলেন? এমন প্রশ্নে টিকে গ্রুপের কর্মকর্তা (বইয়ের টেন্ডারের দায়িত্বপ্রাপ্ত) মোঃ মহিউদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের ‘র’ ম্যাটেরিয়াল নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। তাহলে সরকারকে কেন আগে না জানিয়ে শেষ দিন পর্যন্ত সময় দিয়েছেন? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা শেষ দিন পর্যন্ত ভেবেছি সমস্যা সমাধান হবে। কিন্তু হয়নি। এর আগেওতো কোনদিন আমরা এমন করিনি-এমন মন্তব্য করে এ কর্মকর্তা বলেন, আমাদের এক কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

জানা গেছে, এনসিটিবি ২০১৬ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৩৫ কোটি কপি পাঠ্যবই মুদ্রণ ও সরবরাহ করবে। সংস্থাটিকে এবার মাধ্যমিক ও নিম্ম মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই ছাপতে কাগজ কিনতে হচ্ছে প্রায় ১৯ হাজার মেট্রিক টন। কাগজ কিনতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গত ৫ মে পাঠ্যবই মুদ্রণের কাগজ কেনার বিষয়টি অনুমোদন করে। ২০১৬ শিক্ষাবর্ষের মোট ৩৫ কোটি বইয়ের মধ্যে মাধ্যমিকের প্রায় ২০ কোটি, প্রাথমিকের ১০ কোটি ৮৭ লাখ এবং প্রাক-প্রাথমিকের ৬৭ লাখ কপি বই। এনসিটিবি জানিয়েছে, প্রথম দরপত্র অনুযায়ী এবার বেসরকারীভাবে কেনা প্রতি টন কাগজের দাম পড়ছে প্রায় ৬৪ হাজার টাকা। আর দরপত্র ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত কর্ণফুলী পেপার মিল (কেপিএম) থেকে কেনা হবে তিন হাজার মেট্রিক টন কাগজ, যার দাম পড়বে টনপ্রতি প্রায় ৯৮ হাজার। কিন্তু পুনঃদরপত্রে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন কাগজ কিনতে হওয়ায় সেগুলোর দাম কিছুটা বেশি পড়ছে।

বরাবরের মতো এবারও প্রাথমিক স্তরের সব বই ছাপা হচ্ছে আন্তর্জাতিক দরপত্রে। অর্থাৎ দরদাতা প্রতিষ্ঠান নিজেরাই কাগজ কিনে বই ছেপে উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ করবে। এনসিটিবি কেবল বই ও কাগজের গুণগত মান এবং সরবরাহ কার্যক্রম তদারকি করবে।

উল্লেখ্য, চলতি শিক্ষাবর্ষে ২০১৫ সালে দেশের প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের চার কোটি ৪৪ লাখ ৫২ হাজার ৩৭৪ শিক্ষার্থীর হাতে ৩২ কোটি ৬৩ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৩টি চাররঙ্গা নতুন বই তুলে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আগামী শিক্ষাবর্ষে গড়ে মোট ৫ শতাংশ ছাত্রছাত্রী বেশি ধরে নিয়ে বই ছাপা হচ্ছে। এতে ২০১৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য মোট ৩৫ কোটি কপি পাঠ্যবই মুদ্রণ ও সরবরাহ করার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে।

২০১০ সাল থেকে সরকার শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করে আসছে। ২০১০ সালের আগে দেশের ইতিহাসে কখনোই ছাত্রছাত্রী বিনামূল্যের বই পায়নি, তেমনি বছরের প্রথম দিনও পাঠ্যবই হাতে পায়নি। ছাত্রছাত্রীদের বই পেতে মার্চ বা এপ্রিল পার হয়ে যেত। এই সুযোগে পাঠ্যবই নিয়ে অসাধূ সিন্ডিকেট চক্র অস্থির করে তুলত সারাদেশের বইয়ের বাজার। এতে চড়া দামে নিম্নমানের বই কিনতে বাধ্য হতো অভিভাবকরা। এর পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো ২০১০ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের দুই কোটি ৭৬ লাখ ৬২ হাজার ৫২৯ জন শিক্ষার্থীকে ১৯ কোটির অধিক বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।

কিন্তু সরকারের এই বিশাল সাফল্যকে ব্যর্থ করতে একটি বিশেষ মহল এনসিটিবি’র গুদামে আগুন লাগিয়ে দেয়। এতে মাঝপথে বিশাল এই কর্মযজ্ঞ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এতকিছুর পরও সরকারের দৃঢ় প্রচেষ্টায় নতুন বছরে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই পাঠ্যবই পায় বিনামূল্যে। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০১১ ও ২০১২ সালে বইয়ের সংখ্যা ২৩ কোটিতে উন্নীত হয়। পরের বছর প্রায় ২৭ কোটি। ২০১৩ সালে বিতরণ করা হয় সাড়ে ৩১ কোটি কপি পাঠ্য বই।