১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গ্রামবাংলার অন্যতম প্রধান বাহন- বর্ষায় কদর বাড়ে

গ্রামবাংলার অন্যতম প্রধান বাহন- বর্ষায় কদর বাড়ে
  • কাইকারটেকের নৌকার হাট

মোঃ খলিলুর রহমান

‘নৌকা’ গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। নদীমাতৃক এ দেশে বর্ষাকালে নদীর সীমাও বেড়ে যায়। কূল ছাপিয়ে বর্ষার পানি ছড়িয়ে পড়ে খালবিল, পাড়া-মহল্লায়। ডুবে যায় রাস্তাঘাট। এ সময় চলাচলের প্রধান বাহন হয়ে দাঁড়ায় নৌকা, বেড়ে যায় কদর। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত করতে নৌকাই ভরসা। এ ধরনের নৌকার নাম ‘কোষা’। নৌকা কিনতে ছুটতে হয় হাটে। দাম নাগালের মধ্যেই থাকে। একটি বড় আকৃতির ‘কোষা’ নৌকা ৮-৯ হাজার এবং ছোট আকৃতির নৌকা দেড় হাজার টাকায় কেনা যায়। বর্ষা মৌসুমে দেশের অনেক জায়গায় নৌকার হাট বসে। জুন থেকে শুরু করে আগস্ট পর্যন্ত নৌকা কেনাবেচা হয়। প্রতিটি হাটেরই রয়েছে নিজস্ব খ্যাতি আর ঐতিহ্য। এমনই একটি ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট হলো নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের মোগড়াপাড়া ইউনিয়নের ‘কাইকারটেক’। ঐতিহ্যবাহী এ হাটটি গড়ে উঠেছে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কাইকারটেক নৌকার হাটটি ব্রিটিশ আমল থেকেই বসছে। প্রতি রবিবার বসে এ হাট, দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতা আসেন নৌকা কিনতে। ব্যবসায়ীরা সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখেন ‘কোষা’ নৌকা। ক্রেতারা দরদাম করে কিনে নেন তাঁর পছন্দের নৌকাটি।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার লাঙ্গলবন্দ এলাকার মৃত কমর আলীর ছেলে আখান উল্লাহ (৬০) নৌকা তৈরির একজন দক্ষ কারিগর (মিস্ত্রি)। ৩০ বছর ধরে তিনি কোষা নৌকা তৈরি করছেন। নিপুণ হাতে শত শত নৌকা তৈরি করে নিজেই হাটে নিয়ে বিক্রি করেন। কড়ইসহ বিভিন্ন ধরনের কাঠ দিয়ে তিনি কোষা নৌকা তৈরি করেন। একদিনেই তিনি একটি নৌকা তৈরি করতে পারেন। সপ্তাহে ৮-১০টি নৌকা নিয়ে প্রতি রবিবার কাইকারটেকের হাটে চলে আসেন তিনি। বিক্রি করে ছুটে যান বাড়িতে। গিয়েই লেগে পড়েন নৌকা তৈরির কাজে। আখান উল্লাহ জানান, একটি কোষা নৌকা ২২০০-২৫০০ টাকা বিক্রি হয়। এতে প্রতিটি নৌকা থেকে ২০০-৩০০ টাকা লাভ হয়। মতিন মিয়ার কাছ থেকে তিনি নৌকা তৈরির কাজ শিখেছেন বলে জানান। এতে তার সময় লেগেছে দুই বছর। তার তৈরি করা একটি নৌকা দুই পানি (দুই বর্ষাকাল) পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়।

মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, কলাগাছিয়া, বন্দর, আড়াইহাজার, কুমিল্লার দাউদকান্দিসহ বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন নৌকা কিনতে ছুটে আসেন কাইকারটেকের হাটে। বর্ষার তিন মাস নৌকা বিক্রি হয় বেশি।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দ এলাকার মৃত রহম আলীর ছেলে মুনসুর আলী (৭০) কোষা নৌকার ব্যবসায়ী। তিনি কারিগরদের কাছ থেকে নৌকা কিনে কাইকারটেকসহ বিভিন্ন হাটে বিক্রি করেন। ২৭ বছর ধরে নৌকা কেনাবেচার পেশায় আছেন। তিনি জানান, কাইকারটেকের প্রতিটি হাটে ৮-১০টি করে নৌকা নিয়ে আসেন। এক হাটে তিনি ৩০টি নৌকাও বিক্রি করেছেন। অনেক সময় আরও বেশি নৌকা নিয়ে হাটে আসেন। সাধারণত ট্রলারে নৌকাগুলো হাটে আনা হয়। তিনি জানান, একটি কোষা নৌকা সর্বোচ্চ সাড়ে আট হাজার টাকা ও সর্বনিম্ন দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। ক্রেতারা নৌকা কিনে ভ্যান, ঠেলাগাড়ি, ট্রলার দিয়েও গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছেন।

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার ফুলদি গ্রামের কালু মিয়ার ছেলে আনোয়ার হোসেন (৩০)। তিনিও নৌকা বিক্রি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তিনি ১০ বছর ধরে কাইটারটেকের হাটে নৌকা বিক্রি করছেন। তিনি জানান, কোষা নৌকা কিনতে রাজধানী ঢাকার আশপাশের বর্ষাকবলিত এলাকার মানুষজনও নৌকা কিনতে ছুটে আসছেন এ হাটে। একটি ছোট আকৃতির নৌকায় ৪-৫ জন ও বড় আকৃতির নৌকায় ১০-১২ জন একসঙ্গে চড়তে পারেন।

কাইকারটেক নৌকা হাটের ইজাদার মোঃ সুমন প্রধান জানান, আমরা তিনজন মিলে হাটটি ইজারা নিয়েছি। এ নৌকার হাটের সুনাম চারদিকে। দূরদূরান্ত থেকেও লোকজন নৌকা কিনতে এ হাটে ছুটে আসেন। তিনি জানান, প্রতি হাটে ১৫০-২০০ নৌকা বিক্রি হয়।

নির্বাচিত সংবাদ