২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বেহাল রাস্তায় বিপর্যস্ত নাগরিক জীবন

  • তেজগাঁওয়ের অধিকাংশ রাস্তাই কাটা হয়েছে কমপক্ষে ৫ বার

এমদাদুল হক তুহিন ॥ রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও থানাধীন কয়েকটি এলাকায় জনদুর্ভোগ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। নগরীর তেজকুনিপাড়া, নাখালপাড়া, আরজপাড়া ও শাহিনবাগ এলাকায় সাধারণভাবে বেঁচে থাকাই যেন দুষ্কর। একদিকে অনিয়মিত পানি সঙ্কট অন্যদিকে রাস্তার বেহাল দশা বিপর্যস্ত করে তুলেছে নাগরিক জীবন। স্কুল-কলেজ ও অফিসে যাওয়ার পথে কষ্টের শেষ নেই এই এলাকাবাসীর। রাস্তার স্থানে স্থানে জমে থাকা পানির কারণে ব্যবহার অনুপযোগী অধিকাংশ রাস্তা। বিকল্প রাস্তা ধরেও হাঁটতে হয় অনেককে। এলাকাবসীর দাবি, পানির লাইন পরিবর্তনের নামে পুরো অকেজো করে দেয়া হয়েছে এলাকাগুলো। অধিকাংশ রাস্তাই কাটা হয়েছে কমপক্ষে ৫ বার। পানির লাইন পুনর্স্থাপনে কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠান নাভানা কনস্ট্রকশনের দায়িত্বে অবহেলা ও অদক্ষতার কারণেই বার বার রাস্তাগুলো কর্তন করতে হচ্ছে বলে এলাকাবাসীর ধারণা। এছাড়া এলাকার অধিকাংশ রাস্তার স্থানে স্থানে পড়ে আছে ময়লার বস্তা। কোথাও রাখা আছে বালির স্তূপ। তেজকুনিপাড়ার খেলাঘর মাঠের পাশে রয়েছে পরপর পাঁচটি ডাস্টবিন অথচ ডাস্টবিনের এক শ’ গজের মধ্যেই রয়েছে দু’টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান! নাক চেপে রাস্তায় চলাচল করতে হচ্ছে অফিস ফেরত কিংবা অফিসগামী মানুষকে। একই সমস্যায় রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীসহ তাদের অভিভাকরাও!

জানা গেছে, ঢাকায় পানি সরবরাহে বেসরকারীভাবে একটি প্রতিষ্ঠান ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। আর তারাই চালাচ্ছে এ অপকর্ম। যেন ওই এলাকাগুলোকে বেঁছে নেয়া হয়েছে প্রকল্পের পরীক্ষামূলক এরিয়া হিসেবে। জানা গেছে, নাভানা নামের একটি প্রতিষ্ঠান নদী থেকে পানি সরবরাহের জন্য এ এলাকায় লাইন পুনর্¯’াপন করছে।

তেজকুনিপাড়া ॥ তেজকুনিপাড়া সমাজকল্যাণ খেলাঘর মাঠের পার্শ¦বর্তী রাস্তায় রয়েছে পরপর পাঁচটি ডাস্টবিন! অবাক ও বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে এর এক শ’ গজের মধ্যেই রয়েছে দু’টি স্কুল। বিদ্যালয় দুটি হচ্ছে বি,কে আফতাব মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তেজগাঁও মডেল হাইস্কুল। এছাড়া এ রাস্তা ধরেই চলাফেরা করতে হয় হলিক্রস স্কুল এ্যান্ড কলেজসহ অন্তত আরও তিনটি স্কুল এ্যান্ড কলেজের ছাত্রছাত্রীদের। এলাকার সাধারণ বাসিন্দার মতোই স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদেরও নাক বন্ধ করে এ রাস্তা ধরে চলাফেরা করতে হয়। আর পাশের খেলাঘর মাঠে নিয়মিত খেলাধুলা ছাড়াও ঈদের নামাজ আয়োজিত হয় বলেও জানা যায়। তবে ডাস্টবিনগুলো এখান থেকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে শোনা গেলেও প্রতিকার নেই বহু বছর ধরে। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় দোকানদার মোঃ শহিদ জনকণ্ঠকে বলেন, ‘ডাস্টবিনগুলোর পাশেই রয়েছে স্কুল, কলেজ, খেলাঘর মাঠ ও ঈদগাহ মাঠ। শিশুরাও নাক বন্ধ করে এ রাস্তায় চলাচল করে। তবে শুনেই যাচ্ছি ডাস্টবিনগুলো উঠিয়ে নেয়া হবে। কোন প্রতিকার নেই।’ আরেক দোকানদার মোঃ হারুনুর রশিদ বলেন, ‘এগুলো সরানোর কথা শুধু শোনায় যায়। সাংবাদিকরা আসেন। কিন্তু কই সরানো হচ্ছে?’ ডাস্টবিনের পাশের রাস্তাটি কর্তন করা হয় সপ্তাহখানেক আগে, তখন এ রাস্তার অবস্থা ছিল আরও বেগতিক। অল্পদূরের ফকিন্নি বাজার নামে খ্যাত স্থানটির রাস্তাটি কোনক্রমেই হাঁটার উপযোগী নয়। এমনকি এ রাস্তা ধরে রিকশাসহ অন্য যানবাহন চলাচলেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে রাস্তার বেহাল দশায়। আর লুকাস মোড় খ্যাত স্থানটির অবস্থাও একই, গত তিন মাস যাবত ওয়াসা কর্তৃক রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সব সময় লেগে থাকে দীর্ঘ জ্যাম। এ যেন এক রাস্তার অচলাবস্থা! এসব কারণের পেছনে রয়েছে নাভানা কোম্পানি কর্তৃক ওয়াসার লাইন পুনর্¯’াপন। পানি প্রবাহের সুবিধা সৃষ্টি করতে গিয়ে মহা এক সঙ্কটে ফেলেছে এ এলাকার বাসিন্দাদের। এক বছর আগেও বাসাবাড়িতে যেখানে বিন্দুমাত্র পানির সঙ্কট ছিল না, সেখানে এখন নিত্যদিনকার ঘটনা ‘বাসায় পানি নেই’!

নাখালপাড়া ॥ তেজকুনিপাড়ার খেলাঘর মাঠের পাশে ডাস্টবিনজনিত সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করলেও নাখালপাড়ার কোথাও এ সমস্যা নেই। তবে নাখালপাড়ার অধিকাংশ বাসায় বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট এখন চরমে। অলিগলির প্রতিটি রাস্তা এখন ব্যবহার অনুপযোগী। চার থেকে পাঁচবার কাটা হয়েছে কোন কোন রাস্তা। রাস্তার ওপরে এখনও পড়ে রয়েছে ছোট-বড় পাইপ। নাখালপাড়া প্রাইমারী স্কুলের সামনে সম্প্রতি কাটা হয়েছে রাস্তা। পানির সুব্যবস্থার জন্য রাস্তা কাটা হলেও ওয়াসার পানি প্রবাহের উন্নয়ন নেই বিন্দুমাত্র।

এলাকাবাসী দায়ী করছে ওয়াসার লাইন পুনর্স্থাপনের কাজ পাওয়া নাভানা কনস্ট্রাকশন প্রতিষ্ঠানটিকে। পানি সঙ্কট প্রসঙ্গে নাখালপাড়ার ৮নং গলির ৫৭৭ নম্বর বাসার রক্ষণাবেক্ষণকারী মোঃ কেরামত জনকণ্ঠকে বলেন, ‘পানির সমস্যা আগের মতোই। গত চার-পাঁচদিনে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।’ রাস্তা খোঁড়াখুড়ি প্রসঙ্গে কেরামত বলেন, ‘আমরা যাতে ঠিকভাবে পানি পাই সেজন্য নাভানাকে কাজ দেয়া হয়েছে বলে শুনেছি। তারাই কাজ করছে। বাসায় যাতে ঠিকভাবে পানি পাই সেজন্য এখন পর্যন্ত ৪-৫ বার রাস্তা কাটা হয়েছে। তবু সমস্যা সমাধান হয়নি।’

সরেজমিনে এলাকবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৮ নং গলির মতো প্রতিটি রাস্তার অবস্থা একই। সর্বত্রই চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। অল্প বৃষ্টিতেই হাঁটার অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে প্রতিটি রাস্তা। আর যে পানির কারণে রাস্তার এ কর্তন, পানির সে সঙ্কট পূর্বের যে কোন বছরের তুলনায় বেড়েছে কয়েক গুণে!

আরজতপাড়া ॥ মহাখালী হয়ে আরজতপাড়া প্রবেশের রাস্তাটির আবস্থাও একই। বউ বাজারের সম্মুখের রাস্তাটি কাটা হয়েছিল প্রায় দশদিন আগে। রাস্তাটি কাটার সময় রাস্তা ধরে হাঁটার বিকল্প কোন ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। প্রায় দু’দিন অকেজো ছিল ওই রাস্তাটি। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এমনটিই জানা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। স্থানে স্থানে জমে থাকে পানি। আর ওয়াসার পানির সঙ্কট এখন নিয়মিত ঘটনা।’

শাহিনবাগ ॥ শাহিনবাগ সিভিল এ্যাভিয়েশন মাঠের আশপাশের প্রায় প্রতিটি রাস্তাও দীর্ঘ তিনমাস ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী। এছাড়াও শাহিনবাগের অন্যান্য রাস্তার বেহাল দশা কাটছে না কোন ক্রমেই। দু’মাস ধরে অনিয়মিত পানির সঙ্কটও রয়েছে। ‘আজ আছে, কাল নেই’ এমন অবস্থা। বিমান স্টাফ কোয়ার্টার মসজিদের পার্শ্ববর্তী গলিতে প্রায় হাঁটু পরিমাণ পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। শাহিনবাগ পানির পাম্পের রাস্তাটি দিয়ে হেঁটে যেতে চাইলে যে কেউ বলতে বাধ্য হবেন, বর্তমান সরকারের উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত নয় কি এ এলাকার মানুষ?

শাহিনবাগের ৪১৭ নাম্বার বাসার বাসিন্দা এরশাদ জনকণ্ঠকে বলেন, ‘চার-পাঁচ দিন ধরে বাসায় পানি নেই। রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি তো চলছেই। অবস্থার উন্নতি নেই। এক বছর আগেও এমন অবস্থা ছিল না।’ ইব্রাহিম নামের আরেক বাসিন্দা জানান, ‘দুই মাস হয়নি রাস্তা কেটেছে, আবারও নতুন করে কাটছে ওইসব রাস্তা।’ কয়েকজন দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকায় পানির সঙ্কট এখন চরমে। নাভানাকে কাজ দেয়ার পর থেকেই পানি সঙ্কটের এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। এলাকার পানি সঙ্কট ও রাস্তার বেহাল দশার কারণ জানতে চাইলে ওয়াসার লাইন পুনর্স্থাপনের কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠান নাভানা কনস্ট্রাকশনের ইঞ্জিনিয়ার উজ্জ্বল জনকণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিটি বাসায় দ্রুত পানির সংযোগ স্থাপনের কারণে বার বার রাস্তা কাটতে হচ্ছে। এ কাজের নেচারটাই এ রকম। এ পদ্ধতি ব্যতীত কোন প্রসিডিউর সারা বিশ্বে নেই।’ ৩ থেকে ৪ বার রাস্তা কর্তনের কথা স্বীকার করে উজ্জ্বল বলেন, জনগণকে সেবা দিতেই রাস্তা কাটা হচ্ছে। রাস্তায় হাঁটা যাচ্ছে না এবং কেন বিকল্প রাস্তা রাখা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে এ প্রকৌশলী বলেন, বিকল্প ব্যবস্থাটা কি আপনার জানা আছে? আর নাভানার আরেক প্রকৌশলী ফয়জার রহমান বলেন, সমস্যা ধরিয়ে দিলে আমরা তা সমাধানের চেষ্টা করছি। অবশ্য তিনিও বিভিন্ন বাসায় পানি সঙ্কটের কথা স্বীকার করে নেন। ওই দুই প্রকৌশলীই ধানম-ির উদাহরণ টেনে বলেন, ধানম-ির অবস্থা আরও খারাপ। ঢাকা শহরে বাকি যে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পেয়েছে তাদের তুলনায় আমরা ভাল কাজ করছি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তাদের কাজের গতি এতটাই নিম্ন যে পুরো কাজের জন্য ওয়াসাকেই দোষারোপ করছেন এলাকাবাসী।

এক বছর আগেও এ এলাকায় পানি সঙ্কট ছিল না স্বীকার করে শাহিনবাগ পাম্পের পাম্প অপারেটর আব্দুল কাইয়ুম জনকণ্ঠকে বলেন, ওয়াসার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় পানিসংক্রান্ত সকল কাজ এখন নাভানার। লাইন মেরামত করতে গিয়ে তার সংযোগ দিতে বার বার তারা সমস্যায় পড়ছে। পানি সঙ্কট কাটার কোন রাস্তা দেখছি না। রাস্তার খোঁড়াখোঁড়ি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রায় প্রতিটি রাস্তা চার-পাঁচ বার কাটা হয়েছে। ৯০ শতাংশ রাস্তায় এখন ব্যবহার অনুপযোগী। পানি সংক্রান্ত যে কোন অভিযোগ পেলে আগে ওয়াসার লোক এসে সমস্যা সমাধান করত, এখন সে সুযোগ নেই। তবে নাভানার এ কার্যক্রম পুরোটাই পরীক্ষামূলক বলে জানিয়েছেন পাম্প অপারেটর আব্দুল কাইয়ুম। তিনি বলেন, ‘নাভানা ২ বছর পরীক্ষামূলকভাবে কাজ করবে। এর মধ্যে লাইনসংক্রান্ত সকল কাজ ঠিকভাবে সম্পন্ন না হলে কোনক্রমেই ওয়াসা তাদের কাছে কাজ হ্যান্ডওভার করবে না।’ পানি সঙ্কট ও রাস্তার বেহাল দশা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তেজগাঁও থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ওয়ার্ড কমিশনার শামিম হাসান জনকণ্ঠকে বলেন, আমি আাজকেই নাভানার ইঞ্চিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলেছি। কাল-পরশুর মধ্যে তারা সমস্যার সমাধান করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। তবে তাদের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণও পেয়েছি। আর খেলাঘর মাঠের ডাস্টবিন সরানো প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের এ নেতা আশ্বাস দিয়ে বলেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ডাস্টবিন সরিয়ে নিবো। ডাস্টবিনগুলো স্থানান্তর করে রেললাইনের কাছাকাছি নিয়ে যাব। তিনি আরও বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে সব ধরনের নাগরিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। পূর্বাপর সময় থেকেই নাখালপাড়ার রাস্তাঘাট ও পানি সঙ্কটের বেহালদশা সম্পর্কে জ্ঞাত আছেন উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নগরপিতা আনিসুল হক। মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে গত রমজানে উত্তর সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে আনিসুল হক বলেছিলেন, ‘নাখালপাড়ার একটি গলিতে ৪ বার গিয়েছি। কিন্তু সমস্যা সমাধান করতে পারিনি।’ তবে দুর্ভাগ্যবশত তেজগাঁও থানাধীন নাখালপাড়াসহ ওই কয়েকটি এলাকার অবস্থা রয়ে গেছে পূর্বের মতোই।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া