২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মৃত্যুর প্রহর গুনছে বলধা গার্ডেন

  • দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই হবে বাগানটির

আনোয়ার রোজেন ॥ যেদিন নেমে আসব তার দুদিন আগে তনুকা বললে,/ ‘একটি জিনিস দেব আপনাকে, যাতে মনে থাকবে আমাদের কথা —/একটি ফুলের গাছ। ’/এ এক উৎপাত। চুপ করে রইলেম।/তনুকা বললে, ‘দামি দুর্লভ গাছ,/এ দেশের মাটিতে অনেক যতেœ বাঁচে।’/জিগ্যেস করলেম, ‘নামটা কী?’/সে বললে ‘ক্যামেলিয়া’।/ চমক লাগল — পঙতিগুলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতার। ১৯২৬ সালে কবিগুরু ঢাকা সফরে আসেন। সে সময়, হাজারো উদ্ভিদের ভিড়ে, বলধা গার্ডেনে বেড়াতে আসা কবিগুরুকে বেশি আকৃষ্ট করেছিল ক্যামেলিয়া ফুল। এই ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কলকাতায় ফিরে গিয়ে কবি লেখেন তার বিখ্যাত কবিতা। তবে রবীন্দ্রস্মৃতি বিজড়িত সেই বলধা গার্ডেনের ভুবন ভুলানো রূপ আজ আর নেই। পরিবেশগত সৌন্দর্য-গৌরব সবই হারাতে বসেছে বাগানটি। মাটি দূষণ, জলাবদ্ধতা, বৃক্ষের বার্ধক্য, অযতœ আর নানামুখী অবহেলায় এটির অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বলধা গার্ডেন এক সময় ছিল বৃক্ষপ্রেমী, উদ্ভিদ গবেষক এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির পাঠ নেয়ার আদর্শ স্থান। কিন্তু অব্যবস্থাপনার দরুণ অনকে আগেই বাগানটি সেই বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। শতবছরের ঐতিহ্যবাহী বাগানটি এখন নীরবে গুনছে মৃত্যুর প্রহর। দ্রুত আমূল সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে কেবল ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই হবে বাগানটির।

কণ্ঠে একরাশ হতাশা নিয়ে বাগানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফরেস্ট রেঞ্জার বশির আহমদ জনকণ্ঠকে বলেন, বলধা গার্ডেনের মাটি দূষণের শিকার হয়ে উর্বরতা হারিয়েছে। বাগানের মাটির বয়স কম করে হলেও দেড়শ বছর। এই সময়ের মধ্যে কখনোই মাটি পরিবর্তন করা হয়নি। তাছাড়া বর্তমানে মূল রাস্তা ও আশপাশের এলাকার তুলনায় বাগানটি নিচু। তাই একটু বৃষ্টিতেই বাগানের ভেতর পানি জমে। বাগানের নিজস্ব স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিদ্যুত ও পানির লাইনে সংস্কার হয়নি দীর্ঘদিন। আশপাশে বহুতল ভবন গড়ে ওঠায় বাগানের বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ প্রয়োজনীয় সূর্যের আলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। বাগানের এসব সমস্যার কথা উর্ধতন মহলকে বহুবার জানানো হলেও কাজ হয়নি।

সম্প্রতি সরেজমিন রাজধানীর ওয়ারীতে অবস্থিত বলধা গার্ডেন ঘুরেও দেখা গেছে অব্যবস্থাপনা আর অবহেলার নানা চিত্র। সকাল ১০টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত অবস্থান করে দেখা গেছে, বাগানের ‘সিবিলী’ অংশটি শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। বাগানজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। বাগানের একেবারে শেষ প্রান্তে জড়ো করা আবর্জনা ‘সাজিয়ে’ রাখা হয়েছে স্তূপাকারে। ক্যাকটাস, অর্কিড ও ক্যামেলিয়া হাউসের গাছের পাতায় পুরু হয়ে জমে আছে ধুলার আস্তরণ। বেশির ভাগ বৃক্ষের গায়ে পরিচিতি লেখা কোনো ট্যাগ নেই। বিভিন্ন প্রকার লিলির (শাপলা) জন্য তৈরি করা আট থেকে দশটি চৌবাচ্চাও ফুলহীন। কোনোটি পানিশূন্য, কোনোটির কালচে পানিতে ভাসছে চিপসের প্যাকেট আবার কোনোটির কালচে পানি পড়ছে চৌবাচ্চা উপচিয়ে। এসব চৌবাচ্চার চারদিকের মাটি স্যাঁতসেঁতে-কাদার মতো। বাগানজুড়ে থাকা পানির পাইপের বিভিন্ন স্থান ফুটো হয়ে পানি অনবরত পড়েই যাচ্ছে। অথচ এসব দেখার যেন কেউ নেই। বাগানটি বন বিভাগের অধীন। তবে বাগানে অবস্থানকালীন বন বিভাগের কোনো নিরাপত্তাকর্মী-কর্মচারীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে বশির আহমদ জনকণ্ঠকে বলেন, জনবল সঙ্কটের কারণে বাগানের সার্বক্ষণিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা যাচ্ছে না। একসময় বাগানে ২৫ জন কর্মচারী থাকলেও এখন আছে মাত্র ৬ জন। বাগানের আবর্জনা রাখার জন্য সিটি কর্পোরেশনের একটি ডাস্টবিন রাস্তার পাশে ছিল, এখন সেটিও নেই।

বাগানে ঢুকতে টাঙানো ফলক থেকে জানা যায়, ১৯০৯ সালে এই বাগান প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন তৎকালীন ঢাকা জেলার (বর্তমানে গাজীপুর জেলা) বলধা এস্টেটের জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরী। নিঃসন্তান এই জমিদার ছিলেন প্রকৃতি ও বৃক্ষপ্রেমী মানুষ। শুরুতে বাগানে দেশের বিরল লতাপাতা, ঝোপজাতীয় ঘরোয়া উদ্ভিদ, অর্কিড ও ক্যাক্টাস রোপণ করেন। এই অংশের নাম দেন ‘সাইকি’ (গ্রীক শব্দ)। যার অর্থ ‘আত্মা’। ১৯৩৬ সালে এই অংশের গাছপালাগুলোর বংশবিস্তারের জন্য আরও ৩.৮ একর জমি ব্যবহার করেন তিনি। এ অংশের নাম দেন ‘সিবিলী’। এই গ্রীক শব্দটির অর্থ ‘প্রকৃতির দেবী’। নারায়ণ রায় মারা যাওয়ার পর ১৯৪৩ সালে কলকাতার হাইকোর্ট ট্রাস্টের মাধ্যমে বাগানের দেখাশোনা করা শুরু করে। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে বন বিভাগকে বলধা গার্ডেনের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয়। দুটি ভাগে বিভক্ত এই বাগানের কেবল ‘সিবিলী’ অংশই সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য। একসময় বাগানে আটশ প্রজাতির প্রায় ১৮ হাজার গাছ ছিল। অযতœ আর অবহেলায় দিন দিন গাছ ও প্রজাতির সংখ্যা উভয়েই কমছে।

সকাল নয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকে বলধা গার্ডেন। টিকেট কেটে সিবিলী অংশেই ঢোকা যায়। চওড়া রাস্তা দিয়ে ঢুকতে ‘সিবিলী’ অংশটি দুভাগে বিভক্ত। ঢুকে কিছুদূর গেলেই হাতের বামে শঙ্খনদ-পুকুর। বলা বাহুল্য, ঘাটবাঁধানো সুরম্য পুকুরটির পানির রং বিবর্ণ। ভেসে বেড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। পর্যটকদের কাছে এই পুকুরের আমাজান লিলি ছিল অত্যন্ত দর্শনীয়। কিন্তু কয়েক বছর আগেই এটি এখান থেকে হারিয়ে গেছে বলে জানা যায়। তবে পাশের ‘সাইকী’ অংশের বাঁধানো চৌবাচ্চায় কয়েকটি আমাজন লিলি এখনও টিকে আছে। সিবিলীতে পাতা মরে যাচ্ছে অনেক গাছের। বিচিত্র পাতাবাহার তার সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেছে। পুকুরের ঘাটের সিঁড়ির পাশে ‘কাজুবাদাম’ গাছটির এমন অবস্থা হয়েছে যে চেনাই যায় না। ‘ক্যামেলিয়া হাউসের’ পাশে বাগানের একমাত্র গাছ ‘গড় সিঙ্গা’ কালের সাক্ষী হয়ে আছে। পুকুরের একপাশে ঐতিহাসিক ‘জয় হাউস’। ইতিহাস বলে, বলধা গার্ডেন পরিদর্শনের সময় এই জয় হাউসেই ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অথচ সেই ঘরটির এখন ভগ্নদশা। একতলা এই ঘরটির সিঁড়িতে ঝুলানো তালাতে মরিচা পড়ে গেছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ঘরের অনেকগুলো পাটাতন নড়বড়ে হয়ে গেছে। বাগানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সূর্যঘড়ি। তবে ঠিকমতো কাজ করছে না ঘড়িটি। কারণ, সূর্য ও আলো আড়াল করে আশপাশে গড়ে উঠেছে বিশাল সব অট্টালিকা ঘড়ির কয়েকটি ঘণ্টার কাঁটার দাগও মুছে গেছে।

প্রকৃতি নিয়ে কাজ করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আল আমিন হোসেন। প্রতিবেদককে তিনি জানান, সঠিক পরিচর্যার অভাবে প্রতিবছরই বলধা গার্ডেনের বিরল প্রজাতির দু-চারটি গাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এসব গাছ রক্ষা করতে পরিচর্যা ছাড়াও এগুলোর চারা দিয়ে পৃথক একটি বাগান করা জরুরী। সরেজমিন দেখা গেছে, বাগানের অপর অংশ ‘সাইকী’ও হারিয়েছে তার সৌন্দর্য। এখানে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। তবে জলাবদ্ধতাসহ নানা কারণে এ অংশের কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছে। ভেতরেই ঢাকা ওয়াসার পানির পাম্পস্টেশন বসানো হয়েছে। অনেক প্রজাতির ফুল ও অন্যান্য গাছ সুরক্ষার সম্পূর্ণ বাইরে। এখানে-সেখানে জন্মেছে বেঢপ কচুগাছ। বাগানের সংস্কারের জন্য বহুবার উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে প্রস্তাব পাঠানো হলেও বাজেট না থাকার ‘অজুহাতে’ কাজ হয়নি বলে জানালেন বশির আহমদ। অথচ জানা গেছে, দর্শানার্থী আসার দিক থেকে বাগানটি বেশ লাভজনক। ‘সুমন এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাৎসরিক ৩০ লাখ টাকায় ’সিবিলী’ অংশের ইজারা নিয়েছে বন বিভাগের কাছ থেকে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারী নজরদারি না থাকায় বাগানকে ঘিরে বেড়েছে অসামাজিক কার্যকলাপের দৌরাত্ম্য। এক্ষেত্রে ইজারা নেয়া প্রতিষ্ঠানও দায়ী। উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীরা ২০ টাকায় টিকেট কেটে ‘নিরাপদ ডেটিং স্পট’ হিসেবে বাগানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়। বাগানের ভেতর তাদের ‘দৃষ্টিকটু’ মেলামেশা সাধারণ দর্শনার্থীদের বিব্রত করে।

শত বছরের পুরনো এই বলধা গার্ডেন বর্তমানে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের একটি স্যাটেলাইট ইউনিট। বাগানের সংস্কারসহ সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে উদ্ভিদ উদ্যানের পরিচালক ছায়েদুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, বাগান সৌন্দর্য পিপাসুদের জন্য, অসামাজিক কার্যকলাপের জন্য নয়। বলধা গার্ডেনের সংস্কারের জন্য বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ পেলেই সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।