১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ক্লাসরুমে রহস্য

  • শিশির মনির

ক্লাসে সুনসান নীরবতা। টিফিনের সময় চলছে। অথচ টিফিন খাওয়া কিংবা খেলাধুলাতে কেউ নেই। ক্লাসের এক কোণায় রবি বন্ধুদের নিয়ে গোল করে দাঁড়িয়ে আছে। রবি কী বলতে যাচ্ছে তা নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে চলছে জল্পনাকল্পনা। তবে সবাই অনেকটা নিশ্চিত যে, রবি আজ কোন জটিল রহস্য উদঘাটন করেছে। তুখোড় গোয়েন্দা হিসেবে স্কুলজুড়ে রবির বেশ হাঁকডাক আছে। একবার কোথাও রহস্যের গন্ধ পেলেই হয়, সাথে সাথে রহস্যের সমাধান খুঁজতে রবি আদা-জল খেয়ে নেমে পড়বে। এটা তার স্বভাবজাত অভ্যাস।

মুখ ঘুরিয়ে একে একে রবি সব বন্ধুর দিকে একবার তাকাল। এরপর কথা বলা শুরু করল। বলল ‘তোরা জানিস, আমি কোন্ রহস্যটার সমাধান করেছি?’

বন্ধুরা সবাই একসাথে জবাব দিল ‘না’।

‘তাহলে শোন। একটা দম নিয়ে রবি এবার বলল ‘পলাশ আর রঞ্জন স্যারের ঘটনাটার আসল রহস্য খুঁজে পেয়েছি।’

অবাক হয়ে বন্ধুরা সমস্বরে বলে উঠল ‘কি? তুই সত্যি বলছিস তো?’

খানিকটা মাথা নেড়ে রবি বলল, ‘হ্যাঁ, সত্যি বলছি আমি।’

পলাশ আর রঞ্জন স্যারের ঘটনাটা ছিল বেশ জটিল। যার রহস্য কিনা ভেদ করতে রবিরও অনেক বেগ পোহাতে হয়েছে। বন্ধুরা তো আশা ছেড়েই দিয়েছিল। তারা ভেবেছিল, রবিও বোধহয় রহস্যটার কোন কূলকিনারা করতে পারবে না। কিন্তু এতদিন পর আজ রবির কথায় বন্ধুরা আশ্বস্ত হয়।

পলাশ রবিদের বন্ধু। একই স্কুলে, একই ক্লাসে পড়ে ওরা। সেদিন রঞ্জন স্যার গণিত ক্লাস নিচ্ছিলেন। পলাশ গণিতে খুব ভাল। সেই সুবাদে স্যারের খুব প্রিয়। এমনিতে অবশ্য রঞ্জন স্যারের ক্লাসে সবাই একটু দুষ্টুমি করে। এতে স্যার তেমন রাগ করেন না, শাস্তিও দেন না। রঞ্জন স্যার বোর্ডে অংক করছিলেন। এই ফাঁকে শিপন পলাশের কান মলে দিল। এই ধরনের দুষ্টুমি নিয়ে স্যারের কাছে অভিযোগ করলে স্যার তেমন কিছু বলেন না। তারপরও কী মনে করে যেন পলাশ দাঁড়িয়ে বলেই ফেলল, ‘স্যার, নন্দন আমার কান মলে দিয়েছে!’

‘নন্দন’ শিপনের ডাকনাম। বন্ধুরা তাকে এই নামে ডাকে। তবে স্যাররা কিন্তু তাকে শিপন নামেই জানে। নালিশ শুনে স্যার হঠাৎ করেই পলাশের দিকে এগিয়ে এলেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তিনি খুব রাগ করেছেন। ক্লাসের কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি পলাশকে মারতে শুরু করলেন। এ ঘটনায় প্রথম পলাশ অবাক হলেও স্যার কিন্তু তাতে ভ্রƒক্ষেপ করলেন না। তিনি পলাশকে মেরেই যাচ্ছেন। ভাগ্যিস, স্যারের বেত ভেঙে দুই টুকরো হয়ে গেল, নইলে স্যার হয়ত আরও মারতেন। পলাশের দুচোখ বেয়ে তখন অঝোরে পানি ঝরছিল। সেদিনের এ ঘটনা সবাইকে অবাক করল বটে। কারণ, স্যার তো কখনও এভাবে কাউকে মারেন না।

আশ্চর্যের বিষয় হল, তিন-চারদিন পর রঞ্জন স্যার ক্লাসে ঢুকেই পলাশকে বুকে টেনে জড়িয়ে ধরলেন। এরপর থেকে প্রতিনিয়ত পলাশের প্রতি স্যারকে আরও যতœবান হতে দেখা গেল। এতেই বোঝা গেল, স্যার তার ভুল বুঝতে পেরেছেন। স্যার কেন সেদিন পলাশকে এমন মার মারলেন? এতদিন যা কিনা ক্লাসের সবার কাছে বিরাট এক রহস্য হয়ে রইল। রঞ্জন স্যার সেদিন কেন এমন করলেন কেউই ভেবে বের করতে পারল না।

‘তাহলে বল রঞ্জন স্যার সেদিন কি ভেবে পলাশকে এত মার মারল?’ বন্ধুরা একসাথে রবির দিকে প্রশ্ন ছুড়ল।

রবি বলল ‘শোন রঞ্জন স্যার কিছুদিন আগে টেনের ক্লাসে ‘নন্দলাল’ কবিতাটি আবৃতি করেছিলেন। এটি দিজেন্দ্রলাল রায়ের একটি ব্যঙ্গাত্মক কবিতা।’

বন্ধুরা এবার রাগান্বিত স্বরে বলল ‘এসব কথা বলার মানে কি? তুই কি সমাধান খুঁজে পেয়েছিস, সেটা বল না।’

রবি বলল, ‘এসব বলার মানে নিশ্চয়ই কারণ আছে। আসল রহস্যটা এখানেই। তোরা চুপ করে শোন আমি বলছি।’

বন্ধুদের একজন বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমরা শুনছি। তুই এবার বল।’

রবি আবার বলতে শুরু করে, ‘রঞ্জন স্যার নন্দলাল কবিতা আবৃতি করার পর থেকে দুষ্টু ছাত্ররা স্যারের অনুপস্থিতিতে রঞ্জন স্যারকে ব্যঙ্গ করে ‘নন্দলাল’ ডাকত। বিশেষ করে ক্লাস টেনের ছাত্ররা এই কাজ বেশি করত। শিপনের ডাকনাম ‘নন্দন’ এটা স্যার জানতেন না। ফলে স্যার সেদিন মনে করেছিলেন, পলাশ বুঝি স্যারকে ব্যঙ্গ করেই কথাটা বলেছে। আর এই ভুল বোঝাবুঝির কারণেই স্যার সেদিন পলাশকে এমন মেরেছেন।’

রবির কথা শেষ হতেই বন্ধুদের চোখেমুখে আনন্দময় আভা ফুটে উঠল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে রবির ওপর বন্ধুরা খুব সন্তুষ্ট এবং রবির রহস্যখ-নকেও শতভাগ নির্ভুল ধরে নিয়েছে। এজন্য কেউই আর কথা বাড়াল না। অস্ফুট স্বরে সবাই বলল ‘যাক! রহস্যের সমাধানটা এবার হল।’ আর এদিকে রহস্য উদ্ঘাটনের সব কৃতিত্ব রবি নিজের করে নিল।

রবি বন্ধুদের কাছে তুখোড় গোয়েন্দা হিসেবে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ আবারও দিল,তবে এবারই শেষ ওর গোয়েন্দাগিরি। কারণ, রবির বাবা বদলি হয়েছেন। কালই ওরা এ শহর ছেড়ে চলে যাবে। অন্যদিকে যে পলাশকে নিয়ে এত আয়োজন, সে আজ স্কুলেই অনুপস্থিত। রবির মুখ থেকে তার নিজের কাহিনীর রহস্যটা নিজেই শুনতে পেল না। এগেইন ব্যাডলাক পলাশ!