২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শুধু নেই ঘরকন্নায় ॥ পাল্টেছে বধূর জীবন

  • হাট ঘাট মাঠ সবই সামলাচ্ছেন নারী

কোন এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোন রূপকথা নয় সে নয়, জীবনের মধুমাসে কুসুম ছিঁড়ে গাঁথা মালা শিশির ভেজা কাহিনী শোনাই শোন...’ ষাটের দশকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের এই গানের কথাগুলোর সঙ্গে সেদিনের গ্রামের কৃষাণ বধূর মিল কিছুটা খুঁজে পাওয়া যায় গত শতকের ৯০ দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত। এরপর কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার দ্রুততার সঙ্গে চলার পথে পরিবর্তনের পালা শুরু হয়। একবিংশ শতকের এই সময়ে (দ্বিতীয় দশকের মধ্যভাগে) সেদিনের আটপৌরে শাড়ির গ্রামের বধূকে আর চেনা যায় না। আটপৌরে শাড়ির নামকরণ হয় অষ্টপ্রহর অর্থাৎ দিনরাত যে এক শাড়ি পরে থাকে। কৌশলে এই কথাটি বলে মূলত দরিদ্রতার চিত্র তুলে ধরা হয়। গরিব নারী একটির বেশি শাড়ি কেনার অর্থ জোটাতে পারে না বলেই অষ্টপ্রহর এক শাড়িতেই থাকে। ষাটের দশকে তাঁতপ্রধান এলাকা বৃহত্তর পাবনার তাঁতিরা প্রচারের কৌশলে আটপৌরের বিজ্ঞাপন দেয় এভাবে- শাড়ি এতটাই মজবুত যে অষ্টপ্রহর পরে থাকলেও সহজে ছেঁড়ে না। একটা সময় গাঁয়ের বধূর প্রিয় শাড়ি ছিল তাঁতের। নিকট অতীতের বাংলা ছবি (বাংলাদেশ ও ভারত) পথের পাঁচালী, অশনি সঙ্কেত, জোয়ার এলো, সুতরাং, সুবর্ণ রেখা, তিতাস একটি নদীর নাম ছবিগুলোতে নারীকে উপস্থাপন করা হতো তাঁতের শাড়ি পরিয়ে। অশনি সঙ্কেত ছবিতে অনঙ্গ বৌয়ের চরিত্রে বাংলাদেশের ববিতাকে নির্বাচিত করার পর পরিচালক সত্যজিৎ রায় শূটিংয়ে দৃশ্য বোঝানোর সময় বলেছিলেন বাঙালী গাঁয়ের বধূ তাঁতের শাড়ি পরেই নারীত্বকে মহিমান্বিত করে। এর মধ্যেই গ্রামীণ নারীর ঐতিহ্যের মানসপট খুঁজে নেয়া যায়। আপাত দৃষ্টিতে কথাটি ভারি মনে হতে পারে তবে বাস্তবতা হলোÑ তাঁত ও শাড়ি বাঙালীর শেকড়ের সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ওপর গ্রামীণ নারী এগিয়ে চলেছে। দূর অতীতে উপমহাদেশে নরম বেলে ও দোআঁশ মাটির অঞ্চলে বিশেষ করে বঙ্গীয় ব-দ্বীপে এই শাড়ি পরেই নারী ছিল শাসনকর্তা। মাঠে কাজ করে নারী ফসল উৎপাদন করেছে। সমাজের দ-মু-ের কর্তা ছিল নারী। নারীর নির্দেশ পালন করেছে পুরুষ। এমন কি যুদ্ধের প্রয়োজনে রণসাজে অস্ত্র ছিল নারীর হাতে। সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করে উন্নয়নের ধারায় নারী প্রমাণ করেছেÑ তারা যেমন মাঠে ফসল ফলিয়ে মানুষের মুখে আহার তুলে দিতে পারে তেমনই সন্তান জন্ম দিয়ে তাদের লালন পালনও করে। স্বার্থ ও দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতায় পুরুষ যখন দেখল নারী জমিতে ফসল ফলাতে পারে আবার প্রকৃতির জীববিজ্ঞানের ধারায় মানবশিশু জন্ম দেয়। এই নারীকে বধ করা না গেলে বিশ্ব শাসনে নারীকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। কৌশলে নারীকে বন্দী করা হলো। ঘরের মধ্যে রেখে দেয়া হলো। মাঠে ফসল উৎপাদন থেকে সরিয়ে আনা হলো। উনুন জ্বালিয়ে হাঁড়ি ঠেলে খাদ্য তৈরি এবং পুরুষের যৌনসঙ্গী হয়ে নারীকে সন্তান উৎপাদন করে মা হয়ে সন্তান লালন-পালন করে বড় করা ছাড়া আর কোন কাজ রাখা হলো না। সেই যে নারী বন্দী হয়ে গেল এই বন্দীদশা থেকে নারী মুক্তির পথ খুঁজে ফিরছে আজও। খালি চোখে আমরা দেখি শিক্ষা ও চাকরিতে শহুরে নারী এগিয়ে এখন অনেক ফরোয়ার্ড। মোটরগাড়ি, উড়োজাহাজ, নৌজাহাজ চালাচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান, ভারি প্রকৌশল শিল্প, পরমাণু বিজ্ঞান থেকে শুরু করে সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী, পুলিশ, আনসারসহ জনপ্রশাসন এবং এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে নারী নেই। প্রকারান্তরে এসব নারীর বাস শহরে হলেও এদের শেকড় গ্রামে। এবার দেখা যাক গ্রামের নারী কি করছেÑ দেশের সকল মানুষের আহার মুখে তুলে দেয়ার অলিখিত দায়িত্ব ইতিহাসের ধারায় প্রকৃতি বর্তে দিয়েছে নারীর কাঁধে। একটা সময় কৃষক ফসলের মাঠে হালচাষ করে বীজ বুনে চারা তৈরি ও রোপণ করে স্থানীয় পদ্ধতির সেচ দিয়ে পরিচর্যা করে যখন ক্লান্তির ছায়া নিয়ে ঘরে ফিরত, তখন কৃষাণীবধূ উঠানে পিড়ি দিত বসতে। তারপর সমস্ত প্রেম উজার করে ঘামে ভেজা শরীর মুছে দিয়ে তালপাতার পাখায় বাতাস করে কুয়া থেকে পানি তুলে বালতি অথবা বদনায় ভরে দিত। শরীর জুড়িয়ে দিয়ে মাদুর পেতে বসতে দিয়ে মাটির হাঁড়িতে রান্না করা ভাত তুলে দিয়েছে পাতে। তারপর জ্যোৎ¯œা ভরা আঙিনায় বসে পাকা ধানের স্বপ্নে বিভোর হয়ে শ্যামল ঘেরা কুটিরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। মোরগ ডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফের দিনান্তের কাজ। উঠান ঝাড় দেয়া থেকে শুরু করে ঘর লেপে ঝকঝকে করা, কখনও ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে ধান থেকে চাল করা। চাল থেকে পিঠার জন্য আটা করা। চিঁড়া-মুড়ি খই ভাজা। এ সবই করত গাঁয়ের বধূ। পুরুষের কাজ ধান কেটে উঠানে তুলে মাড়াই সেরে নারীর হাতে দেয়া। তারপর সিদ্ধ শুকানোর দায়িত্ব নারীর। গ্রামের নারীর এই চিত্রের সঙ্গে লেখাপড়ার বিষয়টি ছিল পিছিয়ে। গৃহস্থ ও বড় কৃষক ছাড়া বাকিদের (ক্ষুদ্র ও মধ্যম কৃষক) ঘরে নারীদের লেখাপড়া তেমন ছিল না। ৮০’র দশকের মধ্যভাগ থেকে প্রাথমিক পাঠ বাধ্যতামূলক করার পরও ঝরে পড়ার হার ছিল বেশি। ৯০ দশকের শুরুতে নারী শিক্ষার হার বাড়তে থাকে। গ্রামে বিদ্যুত পৌঁছার সঙ্গে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে যায়। কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহারে টিলার দিয়ে চাষ, সেচযন্ত্র, মাড়াই কাটাইয়ের যন্ত্র পৌঁছার সঙ্গে নারীর অগ্রযাত্রা আর থেমে থাকেনি। পুরুষের পাশাপাশি গ্রামের নারী মাঠে নেমে প্রমাণ করে দেয় তারা পিছিয়ে নেই। জীবন মান উন্নত হওয়ার সঙ্গে বিনোদনের জন্য ঘরে পৌঁছে যায় টেলিভিশন। খড়ির চুলা উঠে গিয়ে এলপি গ্যাসের চুলা, রেফ্রিজারেটর (ফ্রিজ) পৌঁছে যায়। আটপৌরে শাড়ি পরিহিতা গ্রামের শিক্ষিত নারীর পরনেও ওঠে কামিজ পায়জামা থ্রিপিস। ৬০-৭০ দশকের গ্রামের অনেক নারী ব্লাউজ পরেনি। একটা সময় গ্রামের নারী গোসল করেছে নদী পুকুরে ডুব সাঁতার দিয়ে এবং বাড়ির আঙিনায় কুয়ার পাড়ে বালতি দিয়ে পানি তুলে। পরবর্তী সময়ে তা উন্নীত হয়ে টিউবওয়েলের পাড়ে চলে আসে। গ্রামের লোকের কথায় ‘কলের পাড়’। বর্তমানে গ্রামের পথে পা বাড়ালে যা চোখে পড়ে তা হলোÑ পাকা সড়ক ধরে যাচ্ছে বাস, সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, ব্যাটারিচালিত থ্রি হুইলার, রিক্সাও আর প্যাডেলে চলে না তাতেও বসেছে ছোট্ট মোটর। এসব যানবাহনে পুরুষের পাশাপাশি নারীও এখন যাত্রী। স্কুল কলেজে যায়। প্রয়োজনে উপজেলা জেলা সদর বাজার ঘাটে যায়। জমিতে শ্যালোচালিত ভটভটি তো আছেই। পথের ধারে গ্রামের বেশিরভাগ বাড়ি টিন সেডে আধাপাকা। পাকা বাড়িও আছে। গ্রামের নারী এখন আর কুঁড়ে ঘরে থাকে না। তাদের দেখা যায় আধুনিক শাড়ি পরে ঘর গেরস্থালী করতে। ফসলের মাঠে যাচ্ছে শহরের মেয়ের মতো। গাঁয়ের বধূর হাতেও এখন মোবাইল ফোন। কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের হাতে তো স্মার্ট ফোন। অনেকে চাকরির প্রয়োজনে বাইসাইকেল চালিয়ে দূরের পথে যায়। গ্রামের বধূর কাছে এখন ইন্টারনেটও চেনা। প্রবাসী স্বজনদের সঙ্গে স্কাইপিতে কথা বলে। ঈদের সময় গাঁয়ের নববধূর আবদার হয় থ্রিপিসের। যা সমর্থন করেন এযুগের শ্বশুর-শাশুড়ি। দেশের সবচেয়ে বড় বিল চলনবিল এলাকায় গেলে ইতিহাসের ধারার সেই চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় এখন। বিল শুকিয়ে যাচ্ছে। প্রমত্তা জলাশয় আর নেই। জেলেরা পেশা পরিবর্তন করে রাজধানী ও বড় জেলা শহরে গিয়ে মাইগ্রেটেড মজুর হয়েছে। বিলপাড়ের সকল কর্মকা-ই চালাচ্ছে নারী। ফসলের মাঠে এবং গৃহস্থ ও কিষানবাড়ির উঠানে নারী সামলাচ্ছে সব কিছুই। এর মধ্যেই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গাঁয়ের বধূ এগিয়ে চলেছে আগামীর পথে। সে দিনের সেই শিশির ভেজা কাহিনী আজ অনেক দূরে...।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে