২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছাপোষা শিখা রানী গৃহবধূ থেকে এখন ডাক্তারদি

শিখারানী শীল ছিলেন ছাপোষা গৃহবধূ। স্বামী, সন্তান, শ্বশুর, শাশুড়ি নিয়েই ছিল সংসার। ছিল রান্না-বান্না, ঘরকান্নার কাজ। কিন্তু নেশাখোর স্বামীর মাতলামি। শারীরিক-মানসিক নির্যাতন। এখানে-সেখানে চুরি। সংসারের প্রতি উদাসীনতা। তাঁকে স্বামীর সংসারের প্রতি বিতশ্রদ্ধ করে তোলে। সঙ্গী করেন পড়াশোনা। বেসরকারী সংস্থার স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কয়েক বছরের চাকরি, তাকে নিয়ে যায় অন্য জগতে। এখন তিনি শুধু নিজ গাঁ নয়। আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষের কাছে ডাক্তারদি। দিনরাত ব্যস্ততা। এতটুকু ফুরসত মেলে না বিশ্রামের। চিকিৎসার মাধ্যমে মানুষের সেবায় বিলিয়ে দিয়েছেন নিজের সত্তাকে।

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার উত্তরের ছোট্ট বাজার কলাগাছিয়া। গোটা কুড়ি-পঁচিশ দোকান নিয়ে বাজার। সোমবার সাপ্তাহিক হাটের দিনে লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে বাজারটি। বাজারের মধ্যদিয়ে পশ্চিমে পাকা ঘাটলার দিকে যেতে হাতের ডানে পড়ে কয়েকখানা ছোট টিনের ঘর। তার একটিতে বাস করেন শিখারানী শীল। সঙ্গী একমাত্র ছেলে ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া মিঠু। ঘরে আছে কিছু ওষুধ আর চিকিৎসার সরঞ্জাম। এ নিয়েই মধ্যবয়সী শিখারানী শীলের সংসার। কথায় কথায় জানালেন তাঁর বেড়ে ওঠা, বিয়ে, সংসার আর চিকিৎসা শিক্ষার আলোয় সংগ্রাম-সাফল্যে ভরা ফেলে আসা দিনগুলোর কথা।

পাশের কল্যাণকলস গ্রামে বাবার বাড়ি। বাবা হীরালাল শীলের তিন ছেলে এক মেয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। এসএসসি পাস করতেই বিয়ে হয়ে যায় পাশের বকুলবাড়িয়া ইউনিয়নের গুয়াবাড়িয়া গ্রামের মিলন শীলের সঙ্গে। সে প্রায় ১৯ বছর আগের কথা। বিয়ের কয়েক মাস যেতেই ধীরে ধীরে মুখোশ খুলে পড়ে স্বামী মিলন শীলের। নেশা আর চুরি তার নিত্যসঙ্গী। যখন-তখন নেশা করে এসে চালায় নির্যাতন। গায়ে হাত তোলে সময়ে-অসময়ে। কোন কাজ না করে কাটায় বেকার সময়। এনিয়েও হতো ঝগড়া। বছরের পর বছর চলছে এমন ধারা। সংসার চালাতে তাই বাধ্য হয়ে শিখারানী শীল নেমে এলেন পথে। বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থায় নিলেন স্বাস্থ্যকর্মীর চাকরি। সংস্থাটি তাঁকে হাতেকলমে চিকিৎসাবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেয়। চাকরির ফাঁকে ফাঁকে করেন প্রাইভেট প্রাকটিস। ঝুঁকে পড়েন চিকিৎসা সেবায়। এরই ফাঁকে ভর্তি হলেন খারিজ্জমা কলেজে। এইচএসসি পাস করলেন। গলাচিপা ডিগ্রী কলেজ থেকে অর্জন করেন পাস কোর্সে বিএ ডিগ্রী। ঢাকার বেসরকারী ভার্সিটি থেকে তিন বছর মেয়াদি মেডিক্যাল ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে পুরাদস্তুর চিকিৎসক হয়ে গেলেন। আর এসব অর্জন করতে গিয়ে তাকে প্রতি মুহূর্তে লড়তে হয়েছে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। লড়তে হয়েছে স্বামীসহ পরিবারের সবার মতের বিরুদ্ধে। পদে পদে সইতে হয়েছে পারিবারিক-সামাজিক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা। পড়াশোনা আর সন্তানের খরচ মেটাতে দিনরাত করতে হয়েছে পরিশ্রম। একপর্যায়ে স্বামীর সঙ্গে হয়ে গেছে পুরোপুরি বিচ্ছেদ। স্বামীর সংসার ছেড়ে শিশু সন্তানের হাত ধরে নেমে আসেন পথে।

শিখারানী শীল জানান, আধুনিক শিক্ষার আলো তাকে বাঁচার পথ দেখিয়েছে। এর পাশাপাশি দিচ্ছে মানুষকে সেবা করার সুযোগ। কলাগাছিয়া গ্রামের চারপাশে পটুয়াখালী, গলাচিপা ও দশমিনার অন্তত ৫০-৬০টি গ্রামজুড়ে রয়েছে তার অসংখ্য রোগী। এতটুকু ফুরসত মেলে না দম ফেলার। সবার কাছেই তার মোবাইল ফোন নম্বর রয়েছে। গত ৮-১০ বছরে তিনি কমপক্ষে ১৩-১৪ হাজার নারীর স্বাভাবিক সন্তান প্রসবে সহায়তা দিয়েছেন। এমনকি সাগরপাড়ের রাঙ্গাবালী উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলেও তিনি ধাত্রী কাজের জন্য ছুটে গেছেন। গাঁয়ের মানুষ ডাক্তারদি বলে ডাকে, আপদে-বিপদে ছুটে আসে। তাদের পাশে দাঁড়াতে পারছি, এটিই অনেক পাওয়া।’

Ñশংকর লাল দাশ, গলাচিপা থেকে