২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গারো বধূরা এখন পার্লার-ফার্মেসি ব্যবসায়ী

বদলে গেছে ময়মনসিংহের গারো আদিবাসী পরিবারের সলাজ গৃহবধূদের জীবনধারা। নিত্য অভাবের তাড়নায় পিষ্ট মাতৃতান্ত্রিক গারো গৃহবধূদের সেকাল আর একালের ছবিই বলে দেয় তাদের চিরায়ত জীবন ধারার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা। শিক্ষার সুযোগ ও সচেতনতাসহ অদম্য গারো নারীদের লক্ষ্যে পৌঁছার দৃঢ় মানসিকতাও তাদের এই সাফল্যের মূলকাঠি বলে মনে করছেন স্থানীয় সমাজবিজ্ঞানীরা।

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়াসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের নেত্রকোনার দুর্গাপুর, টাঙ্গাইলের মধুপুর, শেরপুরের ঝিনাইগাতি ও নালিতাবাড়ি পাহাড়ী এলাকার বড় অংশজুড়ে আদিবাসী গারোদের বাস। মাত্র একদশক আগেও আদিবাসী গারোদের বিশেষ করে নারী সমাজের বড় অংশ ছিল অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়াদের তালিকায়। শিক্ষা ও সচেতনার অভাবসহ কর্মক্ষেত্র না থাকায় মূলত ক্ষেতে-খামারের কৃষি কাজ দেখভাল আর ঘর সংসার সামলানোই ছিল গৃহবধূদের দায়িত্ব। তবে এই চিত্র এখন আর নেই বললেই চলে। সমাজের নানা শ্রেণী-পেশার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে আদিবাসী গারো গৃহবধূরা। বিউটি পার্লার, ফার্মেসি, পোশাকের দোকানসহ নানা ব্যবসা-বাণিজ্যে ভূমিকা রাখছে আদিবাসী গারো গৃহবধূরা।

মাতৃতান্ত্রিক সমাজে গারো আদিবাসী পরিবারের জামাইকে নিয়ে আসা হয় বলে গৃহবধূরা থাকে অনেকটা স্বাধীন ও ক্ষমতাবান। তারপরও পুরুষের চেয়ে গৃহবধূদের কর্মমুখী দেখা যায়। বিশেষ করে বাজারঘাট থেকে শুরু করে ক্ষেতে খামারের কাজ, স্বামী-সন্তান ও ঘরসংসার সামলানো সবকিছুই করে আদিবাসী গারো গৃহবধূরা। গৃহবধূদের কমন পোশাক হচ্ছে দলাজিন (ব্লাউজ) ও দকবান্দা (কোমর থেকে পা পর্যন্ত) ও আনফেং (শরীর ঢেকে রাখার জন্য), তবে আধুনিক তরুণী গৃহবধূদের মধ্যে সালোয়ার কামিজও চলছে। শাড়ির ব্যবহার নেই তেমন। কৃষিজীবী পরিবারের গৃহবধূরা স্বামী-সন্তান ও ঘরসংসার সামলেও ক্ষেতে-খামারে ধান চারা রোপণ, ধান কাটাই মাড়াই ও হাটে বেচা বিক্রির কাজ করছে পুরোদমে। বাসাবাড়িতে গরু ছাগলসহ হাস-মুরগির খামারও দেখভাল করছে। কর্মজীবী হলেও স্বামী-সন্তান ও ঘরসংসার সামলাতে হয় গারো গৃহবধূদের। তবে গ্রামীণজীবনের এই চিত্র দিন দিন কমে আসছে। বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে আদিবাসী গারো গৃহবধূরা। শিক্ষার পাশাপাশি নানামুখী প্রশিক্ষণ নিচ্ছে অনেকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেদের সক্ষমতাকে জানান দিচ্ছে তারা। ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলা সদরের বণিক্যপাড়ার গৃহবধূ বাণী বনোয়ারী আদিবাসী গারো পরিবারের সংগ্রামী গৃহবধূদের একজন। স্বামী-সন্তান আর ঘরসংসার সামলে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছার প্রচেষ্টায় কোন গাফিলতি নেই। মানবসেবার পাশাপাশি আর্থিকভাবে সক্ষমতা অর্জনে বাণী বনোয়ারী নার্সিং, ক্ষুদ্র ব্যবসা, ফার্মাসিস্ট, পল্লী চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। নিজের পায়ে দাঁড়াতে ময়মনসিংহ শহরের পাদ্রী মিশন রোডে খুলে বসেছেন ফার্মেসি, সঙ্গে রাখা হয়েছে বিউটি পার্লার। একই সঙ্গে প্রসূতি মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা, রক্তচাপ পরীক্ষা, ইনজেকশন ও স্যালাইন পুশ করার মতো প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন। ভবিষ্যতে বাণী বনোয়ারী মেটারনিটি চরিত্রের ক্লিনিক দিতে চান ময়মনসিংহ শহরে। বাণী বনোয়ারী জানান, তাঁর মতো আদিবাসী গারো গৃহবধূদের অনেকে সংসার সামলে ঘর থেকে বের হয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের কর্মক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে। বিউটি পারলার, টেইলারিংয়ে কাজ, বিভিন্ন মার্কেটে বাণিজ্যিক দোকানপাট চালাচ্ছেন, গার্মেন্টস ব্যবসা করছেন। মূলত কোন আদিবাসী গারো গৃহবধূ এখন আর গৃহকোণে বন্দী নেই বলে দাবি এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বাণী বনোয়ারীর।

Ñবাবুল হোসেন, ময়মনসিংহ থেকে