১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঘর থেকে মঞ্চ কোথায় নেই মর্জিনা

নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহবধূ মর্জিনা বেগম এখন নিজেকে অনগ্রসর জনপদের নারী অধিকার আদায়ের প্রতীকে পরিণত করেছেন। নিজের অধিকার আদায়ের পাশাপাশি অন্যকে সচেতনতার জন্য এখন লড়ছেন এই নারী। কৃষিক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি আদায়ে জাতীয় পর্যায়ের সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন তিনি। সংসারকে নিয়ে গেছেন আর্থিক সক্ষমতার জায়গায়। ভালমন্দ বোঝার বয়স না হতেই মর্জিনাকে বাল্যবিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে। ১৯৯৬ সাল। এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার পনেরো দিনের মধ্যেই বিয়ে সম্পন্ন হয়। স্বামী মাদ্রাসা শিক্ষক। সংসার জীবনের ফাঁকে লেখাপড়ার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও পারেননি, বাস্তবতা ছিল ভিন্নতর। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের মোস্তফাপুর গ্রামে স্বামী এসএম কামাল উদ্দিনের বাড়ি। স্বামীকে নিয়ে সুখেই রয়েছেন মর্জিনা। এখন স্থায়ীভাবে বাস করেছেন বাবার বাড়ি সংলগ্ন বালিয়াতলীর নিজেদের বাড়িতে। সংসারের চাকাও চলছে স্বাভাবিক গতির ধারায়।

মর্জিনা জানান, ২০০৭ সালের প্রথমদিকের কথা। পড়শি একজনের সঙ্গে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার উঠোন বৈঠকে যোগ দেন মর্জিনা। সেখান থেকেই স্বকীয়তায় নিজেকে উপস্থাপন করেন। জানান দেন তার মনের সুপ্ত প্রতিভার। সংস্থার এক কর্মীর কাছ থেকে বাল্যবিয়ে, যৌতুক, যৌন হয়রানিসহ নারী অধিকারের কথা শুনে মনের মধ্যে খটকা লাগে। নেমে যান নিজেকে নিয়ে। সেই থেকে আর দমেননি। দৃঢ়চেতা মানসিকতা নিয়ে মর্জিনা করছেন সমাজ গড়ার কাজ। এসব কাজে অংশগ্রহণের এক বছর পরে তার স্বামী জানতে পারেন। ঘুণে ধরা সমাজে ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে সুন্দর বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে এখন পর্যন্ত এগিয়ে চলছেন মর্জিনা।

নারী অধিকার আদায়ে সচেতনতার কাজটি করতে এই নারী এখন নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। দৃঢ় মনোবল নিয়ে ছুটছেন সামনের দিকে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সর্বদা ইস্পাত কঠিন মর্জিনা। এলাকার ২৫ কৃষাণীকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন কৃষক নারী সংগঠন, উত্তর নয়াপাড়া লিলি ফুল।

সংগঠনের সদস্য নিয়ে উন্নয়ন সংস্থা এ্যাকশন এইড, স্পিড ট্রাস্ট ও আভাসের সহায়তায় বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষের পদ্ধতি, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, নারীর ন্যায্য অধিকার, বাল্যবিয়ের কুফল, শিশুর স্বাস্থ’্য পরিচর্যা, যৌন হয়রানি বন্ধে সচেতনতার প্রশিক্ষণ নেন। এরপরে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। নেমে পড়েন সবজির আবাদে। মর্জিনা জানান, গত বছর আড়াই একর জমিতে বাদাম, ডালসহ রবিশস্যের আবাদ করেছেন। যা বিক্রি করে প্রায় লাখ টাকা আয় করেছেন। এখন করছেন আমনের আবাদ। সংসারের চাকা ঘোরানোর সঙ্গে সমাজ সচেতনতার কর্ম, সেইসঙ্গে দুই সন্তান দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ুয়া তানিয়া এবং নবম শ্রেণীর হেদায়েতুলকে নিয়ে সংসার তাঁর।

কৃষিক্ষেত্রে নারীর ন্যায্য অধিকার, যৌন হয়রানি, বাল্যবিয়ে বন্ধে নিত্য সংগ্রাম এই নারীর। নিজ গ্রাম থেকে বিভিন্ন উপজেলা, জেলা এবং ঢাকায় সভা সেমিনারে যোগ দিয়ে নারীর অধিকারের কথা বলছেন। তাঁর দাবি সহস্রাধিক নারী-পুরুষকে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে দক্ষ করতে সক্ষম হয়েছেন। সর্বশেষ কুয়াকাটায় বিভাগীয় কমিশনারের উপস্থিতিতে উপকূলীয় উন্নয়ন সংলাপে অংশ নেন এ নারী। মর্জিনা প্রচ- ক্ষোভ এবং খেদোক্তির সঙ্গে বললেন, ‘পুরুষ শাসিত সমাজে নারীদের অধিকার আদায় খুবই কঠিন কাজ। এজন্য লড়াইয়ের বিকল্প নেই।’ তাঁর পরামর্শ শুধু স্বামীর আয়ের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজের যা আছে তাই নিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে পুকুর, মাঠে ফসল ফলাতে নারীদের অংশগ্রহণ জরুরী।

Ñমেজবাহউদ্দিন মাননু

কলাপাড়া থেকে