২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডাক্তাররা মৃত ঘোষণা করে কাফনে শরীর ঢেকে দিয়েছিল

ডাক্তাররা মৃত ঘোষণা করে কাফনে শরীর ঢেকে দিয়েছিল
  • ২১ আগস্ট অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে যাওয়া রুমা

শর্মী চক্রবর্তী ॥ আমি সেদিন বেঁচে ছিলাম তা কেউ প্রথমে বিশ্বাস করেনি। সেদিন সবার কাছেই আমি মৃত ছিলাম। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকও মৃত ঘোষণার পর আমার দেহ কাফনে ঢেকে দিয়েছিলেন লাশের সারিতে। সেই মৃত্যুর পথ থেকে ফিরে এসেছি। কিন্তু মৃত্যু যন্ত্রণা আজও তাড়া করে ফিরছে ভয়াবহ সেই গ্রেনেড হামলা। বিকট শব্দ এখনও ভেসে আসে কানে। ৩৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর মহিলা লীগের সদস্য রাশেদা আক্তার রুমা বেঁচে থাকলেও স্বাভাবিকভাবে কিছুই করতে পারছেন না। শরীরে থাকা স্পিøন্টারের যন্ত্রণা দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছে। একটি কিডনি অকেজো হয়ে গেছে। ডান কানে একদম শুনতে পান না। নিয়মিত চিকিৎসাও করতে পারছেন না। শরীরের স্পিøন্টারের যন্ত্রণা যখন বেড়ে যায় তখন মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যান। বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি করেন। রাতের পর রাত জেগে থাকেন। ঘুমের ওষুধ খেয়েও ঘুমাতে পারেন না। এসব সহ্য করতে না পেরে এখন শুধু একটা কথাই বলেন, সেদিন যদি মরে যেতাম তাহলে আজ এত কষ্ট সইতে হতো না। আমার এখন আর কিছুই চাওয়ার নাই শুধু একটাই ইচ্ছা, যারা এই গ্রেনেড হামলা করেছে মৃত্যুর আগে তাদের বিচার দেখে যেতে পারলে আমাদের কষ্টটা কম হতো। যারা আমাদের পঙ্গু করেছে আমরা তাদের ফাঁসি চাই। প্রধানমন্ত্রী এত অপরাধীর বিচার করেছেন ওই অপরাধীদের মতো গ্রেনেড হামলা মামলার সব আসামির বিচার আমরা দেখে যেতে চাই। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলায় আহত রুমা জনকণ্ঠকে দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেন। পুরো নাম রাশেদা আক্তার রুমা। শরীরে অসংখ্য স্পিøন্টারের ক্ষত নিয়ে বাঁচার লড়াই করছেন ১১ বছর ধরে। মাঝে মধ্যে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন জীবনের প্রতি। যখন স্পিøটারের যন্ত্রণা অনেক তীব্র আকার ধারণ করে তখন জীবনই রাখতে ইচ্ছে হয় না তার। তারপরও অনেক কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছেন।

এখনও গ্রেনেড হামলার ভয়াবহ সেই বীভৎসতার কথা মনে করে কেঁদে ওঠেন তিনি। ২১ আগস্টের ভয়াল সেই দিনের কথা মনে করে রুমা বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের মহাসমাবেশ ছিল। সেখানে মেয়র হানিফ সাহেবের ছেলে সাঈদ খোকনের নেতৃত্বে কোতোয়ালি থানা থেকে আমরা একটি মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেই। সেখান থেকে আমাদের ৩২ নম্বর পর্যন্ত যাওয়ার কথা ছিল। সেদিন আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলাম সমাবেশে গিয়ে আইভি আন্টির সঙ্গে কথা বলব। সেই ভাবনা থেকেই সমাবেশে যাওয়ার পরই আইভি আন্টির সঙ্গে কথা বলার জন্য আমি তার পাশে যাই। আন্টিকে গিয়ে বললাম, আন্টি আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল। তখন তিনি আমাকে বললেন, একটু দাঁড়াও আমি আপাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এসে কথা বলছি। সে সময় সমাবেশে আমাদের সঙ্গে যাওয়া সব মহিলা চলে যান বায়তুল মোকাররমের বাম দিকের গেটে। আমি আইভি আন্টির সঙ্গে কথা বলার জন্য সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকি। তখন আমার সামনে এসে দাঁড়ায় ১৮-১৯ বছরের একটি ছেলে। আমাকে ধাক্কা দিয়ে ছেলেটা মুখের সামনে চলে আসে। তার এ অবস্থা দেখে আমি আন্টির কাছে বললাম, দেখেন আন্টি ছেলেটা আমাকে ধাক্কা দিয়ে মহিলাদের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। আন্টি তখন ছেলেটিকে বললেন, এই ছেলে তুমি এখানে কেন এসেছ? তুমি ছেলেদের দিকে গিয়ে দাঁড়াও। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি বলে উঠলÑ আমাদের এখানে থাকার নির্দেশ আছে। তখন আন্টি বললেন, কে নির্দেশ দিয়েছে? ছেলেটি অফিসের সামনের বিল্ডিংয়ের ছাদে কালো পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে দেখিয়ে বলে, উনি বলছে এখানে থাকার জন্য। আন্টি ভাবলেন র‌্যাবের লোক হয়ত। তাই আর কিছু বলেননি।

তখন আপাকে গাড়িতে তুলে দেয়ার জন্য আমি আর আন্টি গাড়ির সামনে যাওয়ার জন্য পা বাড়াই। এক পা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যখন আপা বলে উঠলেন ‘জয় বাংলা’ ঠিক সেই সময় বিকট আওয়াজে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণ হওয়ার পর আমি কিছুই বলতে পারি না। সেই সময় কয়টা বাজে সকাল না বিকাল কিছুই বুঝতে পারি না। আমি উড়ে গিয়ে কোথায় পড়লাম, আন্টি কোথায় পড়লেনÑ কিছুই বলতে পারি না। অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকি। আমার দুই পা ভেঙ্গে যায়। সেখানে পড়ে থাকার পর প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়Ñ তখন আমার কানে ভেসে আসে কান্না, আর্তনাদ আর চিৎকার। খুব কষ্ট করে চোখ খুলে দেখি চারদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত। স্যান্ডেল পড়ে আছে সব দিকে। পড়ে থাকা অবস্থায় মুখ ঘুরাতেই দেখি আইভি আন্টি বসে আছেন। উনার দুই পা উড়ে গেছে। সেই সময় আমি হাত দিয়ে ইশারা করে এক লোককে ডাকি, আমাকে একটু পানি দেয়ার জন্য। পানি চাওয়ার পর আবার আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। তারা আমাকে রাস্তা থেকে তুলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকরা আমাকে মৃত ঘোষণা করেন। আমাকে লাশের পাশে রেখে দেয় সাদা কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে। সে সময় মিরপুরের চায়না নামের একটি মেয়ে দেখতে পায় সাদা কাপড়ের নিচে আমি নড়াচড়া করছি। সেই মেয়েটি তখন ছুটে গিয়ে সাবের ভাইকে বলল, ভাই এই মেয়েটা জীবিত আছে। আমি শুনতে পাচ্ছি। সেই সময় সাবের ভাইয়ের গাড়িতে করে আমাকে ধানম-ি ২৭ নম্বরের বাংলাদেশ মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়। অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার পর ডাক্তার বললেন, আমাকে বাঁচাতে হলে অনেক রক্ত লাগবে, আর দু’টি পা কেটে ফেলতে হবে। তা না হলে আমাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। ঠিক সে সময় মেডিক্যালে আমাকে দেখতে যান আপার এপিএস জাহাঙ্গীর ভাই (মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম)। তিনি ডাক্তারের কাছে আমার শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে ডাক্তার তাকে সব খুলে বলেন। জাহাঙ্গীর ভাই তখন ডাক্তারকে বললেন, রুমার পা কাটার দরকার নেই। আমি তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাব। সেখানে নেয়ার পর তিনিই চার ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করলেন। দুই দিন পঙ্গু হাসপাতালে আমার চিকিৎসা হয়। তখনও আমার জ্ঞান ফিরেনি। অজ্ঞান অবস্থায় আমাকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। জ্ঞান ফেরার পর আমি সব কথা জানতে পারি।

২৪ আগস্ট আমিসহ ৪৯ জনকে সন্ধ্যায় কলকাতা প্যারালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অপারেশনের ৪ দিন পর আমার জ্ঞান ফেরে। অপারেশনের পর আস্তে আস্তে পুরো শরীরে অনুভূতি আসতে থাকে। কিন্তু তখনও আমি মুখে কিছু বলতে পারি না। ডাক্তার এসে আঘাতপ্রাপ্ত স্থানগুলোতে টোকা দেন আমার জ্ঞান ফেরানোর জন্য। তখন আমি ব্যথা অনুভব করছিলাম ঠিকই, কিন্তু মুখে কিছুই বলতে পারছিলাম না। সব কিছু শুনছিলামÑ নার্সরা আমার চোখে পানি দিচ্ছে, কথা বলছে। কিন্তু আমি তাদের তখনও বলতে পারছিলাম না যে আমি বেঁচে আছি। এ কথাটা বলার জন্য আমি অনেক চেষ্টা করেছি।

৪ দিন পর জ্ঞান ফিরে আসার পর আমি চোখে দেখতে পারছিলাম না। তখন কান্নাকাটি করতে শুরু করি। তখন ডাক্তার আমাকে বলেন, আপনি চোখে দেখতে পাবেন। রক্তশূন্যতার জন্যই এ সমস্যা হচ্ছে। সেই অপারেশনের পর প্রায় ৪-৫ মাস সেখানে ছিলাম।

১১ বছর হয়ে গেল এখনও শরীরের ক্ষত ভরাট হয়নি। সেই যন্ত্রণাগুলো কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে। এছাড়া মনের ভিতরও জমাট হয়ে আছে অনেক কষ্ট। পঙ্গুত্বের জীবন নিয়ে অনেক কষ্টে তিনি বলেন, সেদিন তো আমরা ইচ্ছে করে পঙ্গু হইনি। কিন্তু এখন মনে হয় আমরা অনেকের কাছে বোঝা হয়ে আছি। এক প্রধানমন্ত্রীর কারণে তিনি এখনও পৃথিবীতে বেঁচে আছেন এ কথা উল্লেখ করে বলেন, ১১ বছর হয়ে গেল আপা ছাড়া কোন মন্ত্রী এমপি আমার খবর নেয়নি। প্রতিবছর এই দিনে কেউ না কেউ আমাদের স্মরণ করেন কিন্তু মন্ত্রী-এমপিরা করেন না। আপা ছিলেন বলেই আজ আমরা বেঁচে আছি। তাই আল্লাহর কাছে সব সময় দোয়া করি তিনি যেন বেঁচে থাকেন। তিনি বাঁচলেই আমরা বেঁচে থাকব। তিনি যখন বিরোধী দলে ছিলেন তখন আমার কোন সমস্যা হলে আপার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতাম। কিন্তু এখন তা পারি না। তিনি প্রধানমন্ত্রী, অনেক ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু আমাদের দলের যে মন্ত্রী-এমপিরা আছেন তারা তো পারেন আমাদের খোঁজ নিতে। তারা যদি আমাদের দিকে একটু দেখতেন তাহলে এত কষ্ট করতে হতো না। প্রধানমন্ত্রী আমাকে ১০ লাখ টাকার বিমা করে দিয়েছিলেন। এই টাকা থেকে প্রতিমাসে যে লাভ পাই সেই টাকা দিয়েই চলতে হয় খুব কষ্ট করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আরেফিন স্যার (আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক) সুচিকিৎসার জন্য আমাদের জার্মানি পাঠানোর কথা বলেছিলেন। কারণ এই চিকিৎসা জার্মানিতে করানো সম্ভব। ২০-২৫ লাখ টাকা লাগবে বলে মন্ত্রীরা কোন কথাই বলেননি। আমাদের পাঠাননি। এই টাকা তো কোন মন্ত্রী দেবেন না। টাকা দেবে সরকার। তারা শুধু আমাদের হয়ে একটু বলবেন। কিন্তু তা করেননি কেউ। আরেফিন স্যার রাষ্ট্রপতির কাছেও আমাদের জন্য চিঠি পাঠিয়েছেন। এখন আমার চিকিৎসার খরচ নিজেকে চালাতে হয়। আপা যে টাকা আমাকে দিয়েছেন তা দিয়ে চিকিৎসার খরচ হয় না। চিকিৎসার জন্য স্বামীর ভিটাও বিক্রি করতে হয়েছে।

চিকিৎসক বলেছেন আমি যে কোন সময় মারা যেতে পারি। নিয়মিত চিকিৎসা চালাতে পারলে মনে হয় আরও ক’টা দিন বেঁচে থাকতে পারতাম। ২০০২ সালে স্বামী জাহাঙ্গীর মারা যাওয়ার পর দুই মেয়েকে নিয়েই কাটে তার জীবন। গ্রেনেড হামলায় আহত হওয়ার পর নিজের জীবন অনিশ্চিত ভেবে অল্প বয়সে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেন। তিনি বলেন, যে বয়সে আমার মেয়েদের পড়াশোনা করার কথা ছিল সেই বয়সে তারা স্বামীর সংসার করছে। আজ আমার তাদের খাওয়ানো ও দেখাশোনার কথা ছিল। কিন্তু তারা আমাকে দেখাশোনা করছে। খাওয়ানো, গোসল করানো, ডাক্তার দেখানো সব করছে তারা। স্বামীর ভিটা বিক্রি করার পর থেকে মেয়েদের কাছেই থাকি। একা থাকতে ভয় হয়। কখন আমার কি হয়ে যায়, তা বলতে পারি না। এই চিন্তা করেই মেয়েদের সঙ্গে থাকি।

ডাক্তাররা মৃত ঘোষণা

করে কাফনে শরীর ঢেকে দিয়েছিল

২১ আগস্ট অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে যাওয়া রুমা

শর্মী চক্রবর্তী ॥ আমি সেদিন বেঁচে ছিলাম তা কেউ প্রথমে বিশ্বাস করেনি। সেদিন সবার কাছেই আমি মৃত ছিলাম। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকও মৃত ঘোষণার পর আমার দেহ কাফনে ঢেকে দিয়েছিলেন লাশের সারিতে। সেই মৃত্যুর পথ থেকে ফিরে এসেছি। কিন্তু মৃত্যু যন্ত্রণা আজও তাড়া করে ফিরছে ভয়াবহ সেই গ্রেনেড হামলা। বিকট শব্দ এখনও ভেসে আসে কানে। ৩৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর মহিলা লীগের সদস্য রাশেদা আক্তার রুমা বেঁচে থাকলেও স্বাভাবিকভাবে কিছুই করতে পারছেন না। শরীরে থাকা স্পিøন্টারের যন্ত্রণা দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছে। একটি কিডনি অকেজো হয়ে গেছে। ডান কানে একদম শুনতে পান না। নিয়মিত চিকিৎসাও করতে পারছেন না। শরীরের স্পিøন্টারের যন্ত্রণা যখন বেড়ে যায় তখন মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যান। বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি করেন। রাতের পর রাত জেগে থাকেন। ঘুমের ওষুধ খেয়েও ঘুমাতে পারেন না। এসব সহ্য করতে না পেরে এখন শুধু একটা কথাই বলেন, সেদিন যদি মরে যেতাম তাহলে আজ এত কষ্ট সইতে হতো না। আমার এখন আর কিছুই চাওয়ার নাই শুধু একটাই ইচ্ছা, যারা এই গ্রেনেড হামলা করেছে মৃত্যুর আগে তাদের বিচার দেখে যেতে পারলে আমাদের কষ্টটা কম হতো। যারা আমাদের পঙ্গু করেছে আমরা তাদের ফাঁসি চাই। প্রধানমন্ত্রী এত অপরাধীর বিচার করেছেন ওই অপরাধীদের মতো গ্রেনেড হামলা মামলার সব আসামির বিচার আমরা দেখে যেতে চাই। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলায় আহত রুমা জনকণ্ঠকে দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেন। পুরো নাম রাশেদা আক্তার রুমা। শরীরে অসংখ্য স্পিøন্টারের ক্ষত নিয়ে বাঁচার লড়াই করছেন ১১ বছর ধরে। মাঝে মধ্যে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন জীবনের প্রতি। যখন স্পিøটারের যন্ত্রণা অনেক তীব্র আকার ধারণ করে তখন জীবনই রাখতে ইচ্ছে হয় না তার। তারপরও অনেক কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছেন।

এখনও গ্রেনেড হামলার ভয়াবহ সেই বীভৎসতার কথা মনে করে কেঁদে ওঠেন তিনি। ২১ আগস্টের ভয়াল সেই দিনের কথা মনে করে রুমা বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের মহাসমাবেশ ছিল। সেখানে মেয়র হানিফ সাহেবের ছেলে সাঈদ খোকনের নেতৃত্বে কোতোয়ালি থানা থেকে আমরা একটি মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেই। সেখান থেকে আমাদের ৩২ নম্বর পর্যন্ত যাওয়ার কথা ছিল। সেদিন আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলাম সমাবেশে গিয়ে আইভি আন্টির সঙ্গে কথা বলব। সেই ভাবনা থেকেই সমাবেশে যাওয়ার পরই আইভি আন্টির সঙ্গে কথা বলার জন্য আমি তার পাশে যাই। আন্টিকে গিয়ে বললাম, আন্টি আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল। তখন তিনি আমাকে বললেন, একটু দাঁড়াও আমি আপাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এসে কথা বলছি। সে সময় সমাবেশে আমাদের সঙ্গে যাওয়া সব মহিলা চলে যান বায়তুল মোকাররমের বাম দিকের গেটে। আমি আইভি আন্টির সঙ্গে কথা বলার জন্য সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকি। তখন আমার সামনে এসে দাঁড়ায় ১৮-১৯ বছরের একটি ছেলে। আমাকে ধাক্কা দিয়ে ছেলেটা মুখের সামনে চলে আসে। তার এ অবস্থা দেখে আমি আন্টির কাছে বললাম, দেখেন আন্টি ছেলেটা আমাকে ধাক্কা দিয়ে মহিলাদের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। আন্টি তখন ছেলেটিকে বললেন, এই ছেলে তুমি এখানে কেন এসেছ? তুমি ছেলেদের দিকে গিয়ে দাঁড়াও। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি বলে উঠলÑ আমাদের এখানে থাকার নির্দেশ আছে। তখন আন্টি বললেন, কে নির্দেশ দিয়েছে? ছেলেটি অফিসের সামনের বিল্ডিংয়ের ছাদে কালো পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে দেখিয়ে বলে, উনি বলছে এখানে থাকার জন্য। আন্টি ভাবলেন র‌্যাবের লোক হয়ত। তাই আর কিছু বলেননি।

তখন আপাকে গাড়িতে তুলে দেয়ার জন্য আমি আর আন্টি গাড়ির সামনে যাওয়ার জন্য পা বাড়াই। এক পা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যখন আপা বলে উঠলেন ‘জয় বাংলা’ ঠিক সেই সময় বিকট আওয়াজে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণ হওয়ার পর আমি কিছুই বলতে পারি না। সেই সময় কয়টা বাজে সকাল না বিকাল কিছুই বুঝতে পারি না। আমি উড়ে গিয়ে কোথায় পড়লাম, আন্টি কোথায় পড়লেনÑ কিছুই বলতে পারি না। অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকি। আমার দুই পা ভেঙ্গে যায়। সেখানে পড়ে থাকার পর প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়Ñ তখন আমার কানে ভেসে আসে কান্না, আর্তনাদ আর চিৎকার। খুব কষ্ট করে চোখ খুলে দেখি চারদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত। স্যান্ডেল পড়ে আছে সব দিকে। পড়ে থাকা অবস্থায় মুখ ঘুরাতেই দেখি আইভি আন্টি বসে আছেন। উনার দুই পা উড়ে গেছে। সেই সময় আমি হাত দিয়ে ইশারা করে এক লোককে ডাকি, আমাকে একটু পানি দেয়ার জন্য। পানি চাওয়ার পর আবার আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। তারা আমাকে রাস্তা থেকে তুলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকরা আমাকে মৃত ঘোষণা করেন। আমাকে লাশের পাশে রেখে দেয় সাদা কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে। সে সময় মিরপুরের চায়না নামের একটি মেয়ে দেখতে পায় সাদা কাপড়ের নিচে আমি নড়াচড়া করছি। সেই মেয়েটি তখন ছুটে গিয়ে সাবের ভাইকে বলল, ভাই এই মেয়েটা জীবিত আছে। আমি শুনতে পাচ্ছি। সেই সময় সাবের ভাইয়ের গাড়িতে করে আমাকে ধানম-ি ২৭ নম্বরের বাংলাদেশ মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়। অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার পর ডাক্তার বললেন, আমাকে বাঁচাতে হলে অনেক রক্ত লাগবে, আর দু’টি পা কেটে ফেলতে হবে। তা না হলে আমাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। ঠিক সে সময় মেডিক্যালে আমাকে দেখতে যান আপার এপিএস জাহাঙ্গীর ভাই (মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম)। তিনি ডাক্তারের কাছে আমার শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে ডাক্তার তাকে সব খুলে বলেন। জাহাঙ্গীর ভাই তখন ডাক্তারকে বললেন, রুমার পা কাটার দরকার নেই। আমি তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাব। সেখানে নেয়ার পর তিনিই চার ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করলেন। দুই দিন পঙ্গু হাসপাতালে আমার চিকিৎসা হয়। তখনও আমার জ্ঞান ফিরেনি। অজ্ঞান অবস্থায় আমাকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। জ্ঞান ফেরার পর আমি সব কথা জানতে পারি।

২৪ আগস্ট আমিসহ ৪৯ জনকে সন্ধ্যায় কলকাতা প্যারালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অপারেশনের ৪ দিন পর আমার জ্ঞান ফেরে। অপারেশনের পর আস্তে আস্তে পুরো শরীরে অনুভূতি আসতে থাকে। কিন্তু তখনও আমি মুখে কিছু বলতে পারি না। ডাক্তার এসে আঘাতপ্রাপ্ত স্থানগুলোতে টোকা দেন আমার জ্ঞান ফেরানোর জন্য। তখন আমি ব্যথা অনুভব করছিলাম ঠিকই, কিন্তু মুখে কিছুই বলতে পারছিলাম না। সব কিছু শুনছিলামÑ নার্সরা আমার চোখে পানি দিচ্ছে, কথা বলছে। কিন্তু আমি তাদের তখনও বলতে পারছিলাম না যে আমি বেঁচে আছি। এ কথাটা বলার জন্য আমি অনেক চেষ্টা করেছি।

৪ দিন পর জ্ঞান ফিরে আসার পর আমি চোখে দেখতে পারছিলাম না। তখন কান্নাকাটি করতে শুরু করি। তখন ডাক্তার আমাকে বলেন, আপনি চোখে দেখতে পাবেন। রক্তশূন্যতার জন্যই এ সমস্যা হচ্ছে। সেই অপারেশনের পর প্রায় ৪-৫ মাস সেখানে ছিলাম।

১১ বছর হয়ে গেল এখনও শরীরের ক্ষত ভরাট হয়নি। সেই যন্ত্রণাগুলো কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে। এছাড়া মনের ভিতরও জমাট হয়ে আছে অনেক কষ্ট। পঙ্গুত্বের জীবন নিয়ে অনেক কষ্টে তিনি বলেন, সেদিন তো আমরা ইচ্ছে করে পঙ্গু হইনি। কিন্তু এখন মনে হয় আমরা অনেকের কাছে বোঝা হয়ে আছি। এক প্রধানমন্ত্রীর কারণে তিনি এখনও পৃথিবীতে বেঁচে আছেন এ কথা উল্লেখ করে বলেন, ১১ বছর হয়ে গেল আপা ছাড়া কোন মন্ত্রী এমপি আমার খবর নেয়নি। প্রতিবছর এই দিনে কেউ না কেউ আমাদের স্মরণ করেন কিন্তু মন্ত্রী-এমপিরা করেন না। আপা ছিলেন বলেই আজ আমরা বেঁচে আছি। তাই আল্লাহর কাছে সব সময় দোয়া করি তিনি যেন বেঁচে থাকেন। তিনি বাঁচলেই আমরা বেঁচে থাকব। তিনি যখন বিরোধী দলে ছিলেন তখন আমার কোন সমস্যা হলে আপার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতাম। কিন্তু এখন তা পারি না। তিনি প্রধানমন্ত্রী, অনেক ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু আমাদের দলের যে মন্ত্রী-এমপিরা আছেন তারা তো পারেন আমাদের খোঁজ নিতে। তারা যদি আমাদের দিকে একটু দেখতেন তাহলে এত কষ্ট করতে হতো না। প্রধানমন্ত্রী আমাকে ১০ লাখ টাকার বিমা করে দিয়েছিলেন। এই টাকা থেকে প্রতিমাসে যে লাভ পাই সেই টাকা দিয়েই চলতে হয় খুব কষ্ট করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আরেফিন স্যার (আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক) সুচিকিৎসার জন্য আমাদের জার্মানি পাঠানোর কথা বলেছিলেন। কারণ এই চিকিৎসা জার্মানিতে করানো সম্ভব। ২০-২৫ লাখ টাকা লাগবে বলে মন্ত্রীরা কোন কথাই বলেননি। আমাদের পাঠাননি। এই টাকা তো কোন মন্ত্রী দেবেন না। টাকা দেবে সরকার। তারা শুধু আমাদের হয়ে একটু বলবেন। কিন্তু তা করেননি কেউ। আরেফিন স্যার রাষ্ট্রপতির কাছেও আমাদের জন্য চিঠি পাঠিয়েছেন। এখন আমার চিকিৎসার খরচ নিজেকে চালাতে হয়। আপা যে টাকা আমাকে দিয়েছেন তা দিয়ে চিকিৎসার খরচ হয় না। চিকিৎসার জন্য স্বামীর ভিটাও বিক্রি করতে হয়েছে।

চিকিৎসক বলেছেন আমি যে কোন সময় মারা যেতে পারি। নিয়মিত চিকিৎসা চালাতে পারলে মনে হয় আরও ক’টা দিন বেঁচে থাকতে পারতাম। ২০০২ সালে স্বামী জাহাঙ্গীর মারা যাওয়ার পর দুই মেয়েকে নিয়েই কাটে তার জীবন। গ্রেনেড হামলায় আহত হওয়ার পর নিজের জীবন অনিশ্চিত ভেবে অল্প বয়সে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেন। তিনি বলেন, যে বয়সে আমার মেয়েদের পড়াশোনা করার কথা ছিল সেই বয়সে তারা স্বামীর সংসার করছে। আজ আমার তাদের খাওয়ানো ও দেখাশোনার কথা ছিল। কিন্তু তারা আমাকে দেখাশোনা করছে। খাওয়ানো, গোসল করানো, ডাক্তার দেখানো সব করছে তারা। স্বামীর ভিটা বিক্রি করার পর থেকে মেয়েদের কাছেই থাকি। একা থাকতে ভয় হয়। কখন আমার কি হয়ে যায়, তা বলতে পারি না। এই চিন্তা করেই মেয়েদের সঙ্গে থাকি।