২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

’৭৫ থেকে ’৮১- কেমন ছিল বাংলাদেশ?

  • গোলাম কুদ্দুছ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর ক্ষমতা দখলকারী খুনীচক্র দীর্ঘদিন বন্দুকের জোরে বিভিন্ন অধ্যাদেশ জারি করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। এ সময় ইনডেমনিটি অর্ডিনেন্স জারি করে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের রক্ষা করা, খুনীদের দূতাবাসে চাকরি দেয়া, স্বাধীনতাবিরোধীদের ক্ষমতার অংশীদার করা হয়। এই কাজগুলো করেছেন জেনারেল জিয়াসহ তার সহযোগীরা। গত বুধবারের পর আজ পড়ুন দ্বিতীয় কিস্তি....

খুনী খন্দকার মোশতাকের নবগঠিত ডেমোক্র্যাটিক লীগ এবং স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সরকারী অনুমোদন পেলেও আওয়ামী লীগ নিয়ে টালবাহানা করা হয়। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি বাদ দেয়ার জন্য পত্র দেয়া হয়। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত বিচারপতি সায়েমের সরকার ১৯৭৬ সালের ৪ নবেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে অনুমোদন প্রদান করে।

বিএনপির নেতৃবৃন্দ প্রায়ই বলে থাকেন, জেনারেল জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা এবং আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল করার অনুমতিদাতা। এ কথাটি সর্বৈব মিথ্যা। কারণ, সে সময়ে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ছিলেন বিচারপতি সায়েম।

পঁচাত্তরপরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতার মধ্যকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণকারী সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক অভিলাষ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। সামরিক সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী রাজনৈতিক দলসমূহ যখন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল- ঠিক সেই সময়ে ২১ নবেম্বর ১৯৭৬ রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এএসএম সায়েম এক ঘোষণার মাধ্যমে ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭ সালে প্রতিশ্রুত সাধারণ নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হন। সরকারী আদেশের প্রতিবাদ করে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অবিলম্বে জাতীয় নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা, রাজবন্দীদের মুক্তি এবং অবাধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দাবি করা হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ নবেম্বর সেনাপ্রধান ও উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়া প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক পদ গ্রহণ করেন এবং তার চাপের কারণেই ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি সায়েম পদত্যাগে বাধ্য হন এবং জেনারেল জিয়া রাষ্ট্রপতি হন। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭৬ লন্ডনের বিখ্যাত ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় বলা হয়, ‘প্রশাসন ক্ষেত্রে সায়েমের (প্রেসিডেন্ট) কোন ভূমিকা ছিল না এবং কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে পরামর্শও করা হতো না। নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তিনি পীড়াপীড়ি করছিলেন এবং শাসনক্ষমতা থেকে সামরিক বাহিনীকে বিদায় দেয়ার জন্য তিনি ঘরোয়াভাবে শলা-পরামর্শ শুরু“করেছিলেন। এখন তাঁকে ছুড়ে ফেলে দেয়া হবে। সায়েমকে অসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে এতদিন রাখা হয়েছিল (মে.জে.) জিয়ার সামরিক শাসনের চেহারা ঢেকে রাখার জন্য।’

জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করে সেদিনই গ্রেফতার করেন আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মালেক উকিল, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সাজেদা চৌধুরী, আবদুল মোমেন তালুকদার, সালাউদ্দিন ইউসুফ, মোজাফফর হোসেন পল্টু, রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া এবং ন্যাপ নেতা মতিয়া চৌধুরীসহ আরও অনেককে।

চ.

বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতাকে হত্যা, গ্রেফতার-নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্যেও এ সময় আওয়ামী লীগ মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় এবং দেশব্যাপী সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করে। ১৯৭৭ সালের ৩ ও ৪ এপ্রিল ঢাকার হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের দু’দিনব্যাপী কাউন্সিল অধিবেশন। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন বেগম মনসুর আলী। সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী ও মোল্লা জালালউদ্দিন। সম্মেলনে ১৪০০ কাউন্সিলর ও ১৪০০ ডেলিগেট অংশ নেন। উক্ত সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু সরকার ঘোষিত গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাকে আওয়ামী লীগের মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কাউন্সিল অধিবেশনে পরবর্তী সম্মেলন না হওয়া পর্যন্ত বেগম জোহরা তাজউদ্দীনকে অন্তর্বর্তী আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হয়। নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে সাংগঠনিক কমিটির ৪৪ সদস্যের নাম নির্বাচনের দায়িত্ব তাঁকে দেয়া হয়। ১৫ এপ্রিল বেগম জোহরা তাজউদ্দীন ৪৪ জনের নাম ঘোষণা করেন। তাঁরা হলেন :

আহ্বায়ক : সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন, সদস্য : ১. মোল্লা জালালউদ্দিন আহমদ, ২. ফণীভূষণ মজুমদার, ৩. কাজী জহিরুল কাইয়ুম, ৪. মতিউর রহমান, ৫. মিজানুর রহমান চৌধুরী, ৬. আব্দুল মান্নান, ৭. আব্দুল মোমিন, ৮. সোহরাব হোসেন, ৯. আসাদুজ্জামান খান, ১০. মনোরঞ্জন ধর, ১১. দেওয়ান ফরিদ গাজী, ১২. অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী, ১৩. ডাঃ ক্ষিতিশ চন্দ্র মণ্ডল, ১৪. মো. ময়েজউদ্দিন আহমেদ, ১৫. মফিজুল ইসলাম খান কামাল, ১৬. ফজলুল করিম, ১৭. মোঃ হানিফ, ১৮. আনসার আলী, ১৯. ওমর আলী, ২০. শামসুর রহমান খান (টাঙ্গাইল), ২১. ব্যারিস্টার শওকত আলী, ২২. মহিউদ্দিন আহমদ (বরিশাল), ২৩. আহাম্মদ আলী (কুমিল্লা), ২৪. আলী আজম ভূঁইয়া, ২৫. নুরুল ইসলাম, ২৬. এ.বি.এম তালেব আলী (ফেনী), ২৭. অধ্যাপক মোঃ হানিফ (নোয়াখালী), ২৮. অধ্যাপক হাকিম (ময়মনসিংহ), ২৯. খন্দকার আবুল কাশেম (পটুয়াখালী), ৩০. কামরুজ্জামান (যশোর), ৩১. হাদিউজ্জামান, ৩২. আজিজুর রহমান আক্কাস (কুষ্টিয়া), ৩৩. খন্দকার আবু তালেব (পাবনা), ৩৪. ডাঃ আলাউদ্দিন (রাজশাহী), ৩৫. এ.কে মজিবুর রহমান (বগুড়া), ৩৬. লুৎফর রহমান (রংপুর), ৩৭. আবদুর রহিম (দিনাজপুর), ৩৮. সিরাজুল ইসলাম, ৩৯. মোহাম্মদ মহসীন (খুলনা), ৪০. সৈয়দ কামাল বখত, ৪১. নুরুন্নবী (ফরিদপুর), ৪২. এম.এ ওয়াহাব (চট্টগ্রাম), ৪৩. বেগম মাহমুদা চৌধুরী (ঢাকা) ও ৪৫. রওশন আরা মোস্তাফিজ (রংপুর)।

ছ.

২১ এপ্রিল ১৯৭৭ অকস্মাৎ বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতি থেকে পদত্যাগ করে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হন। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া প্রসঙ্গে বিচারপতি সায়েম বলেন,

‘... যেহেতু জিয়া প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছেন, এবং আমার মনে হয়েছে যে, উপদেষ্টা কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্যই তাঁকে সমর্থন করেছেন, তাই আমি তাঁকে আবার জিজ্ঞেস করি যে, তিনি নিজে কোন হুমকির সম্মুখীন না হয়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বাবলী সামলাতে পারবেন কি না। তিনি হ্যাঁ সূচক জবাব দেন। ... প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার আগ মুহূর্তে আমি জিয়াকে বলি, আমি যেহেতু নির্বাচন করে যেতে পারলাম না, আমি তাঁকে অনুরোধ করব তিনি যেন নির্বাচন দেন। তিনি আমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন যে, তিনি নির্বাচন অনুষ্ঠান করবেন। শুনে আমি খুশি হই। কিন্তু আমি তখন বুঝতে পারিনি যে, নির্বাচনে তিনি নিজেই অংশ নেবেন। সেরকম ক্ষেত্রে সেনাপ্রধান থাকা অবস্থাতেই এবং সামরিক আইনের অধীনে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবেও, অর্থাৎ ক্ষমতাসীন হয়েই তিনি নির্বাচন করবেন এবং সেই নির্বাচনে নিজে অংশগ্রহণ করবেন এমন চিন্তা তখন আমার মাথায় আসেনি।’

[সূত্র : বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলো, লেখক- আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, পৃষ্ঠা-৩৬]

জিয়াউর রহমান কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে সকল ক্ষমতা গ্রহণ করার পরদিনই সরকার এক অধ্যাদেশ জারি করে বাহাত্তরের সংবিধানের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে আদর্শিক পরিবর্তন আনে। সংবিধানের শিরোনামে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ লিপিবদ্ধ করা হয়। ‘জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা’-এর পরিবর্তে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচারÑ কথাগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়। এ অধ্যাদেশের ফলে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সকল মানুষের সমান অধিকার এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষায় এক প্রচণ্ড ঝাঁকি লাগে।

২২ এপ্রিল ১৯৭৭ রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং একই সঙ্গে সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল জিয়া এক বেতার ভাষণে ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। একই ভাষণে তার ওপর জনগণের আস্থা আছে কি না তা যাচাইয়ের জন্য ৩০ মে ১৯৭৭ দেশব্যাপী গণভোট অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। সে সময় দেশে ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৮৫৬ জন। অবিশ্বাস্যভাবে সরকারী ঘোষণায় বলা হয় ৮৮.৫% ভোটার গণভোটে অংশ নিয়েছেন এবং জিয়াউর রহমানের পক্ষে ‘হ্যাঁ’সূচক ভোট পড়েছে ৯৮.৮৮%। বিএনপির কথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা জিয়াউর রহমানের ‘ভোটারবিহীন বাক্স পূর্ণ’ এ নির্বাচনকে তরুণ প্রজন্মের বিএনপি সমর্থকরা কি বলবেন?

এ নির্বাচন প্রসঙ্গে বিচারপতি সায়েম বলেন,

“বস্তুত জিয়া তাঁর অবস্থান সংহত করার উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যে একটা গণভোট করে ফেলেন। তাঁর প্রতি এবং তাঁর ঘোষিত নীতি ও কর্মসূচীর প্রতি ভোটারদের আস্থা আছে কি না তাই ছিল গণভোটের বিষয়। কিন্তু সেই গণভোটে হ্যাঁ বাক্সে এত বেশি ভোট পড়ে যে, জনগণ সেই ফলাফলকে হাস্যকরভাবে অবিশ্বাস্য মনে করে।”

[সূত্র : বঙ্গভবনের শেষ দিনগুলো, লেখক- আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, পৃষ্ঠা-৩৭]

চলবে...

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

নির্বাচিত সংবাদ