২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ আগামী নির্বাচন এবং...

  • কেএম এনায়েত হোসেন

বাংলাদেশে এখন ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতির গণতন্ত্র চালু আছে। যেখানে রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন রাষ্ট্রের আলঙ্কারিক প্রধান; আর প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন নির্বাহী প্রধান। বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার কারণে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে কোন বিশৃঙ্খলা কিংবা অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এমনটি আমরা কেউ লক্ষ্য করিনি কিংবা করছি না। শাসনতন্ত্র নির্দেশিত পথ ও পন্থায় উভয়েই স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন করে চলেছেন নিজ নিজ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই। এ বিষয়টি নিয়ে হঠাৎ করে উদ্বিগ্ন হওয়ার কি আছে তা সহজে বোধগম্য নয়। অথচ গত ১২ আগস্ট, ২০১৫ তারিখের একটি জাতীয় দৈনিকের সংবাদে জানা যায় দেশের উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ ‘পূর্ণ-গণতন্ত্রের জন্য ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। পত্রিকার ভাষ্য অনুসারে ‘রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে সংবিধান সংশোধন হওয়া জরুরী। এ লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করা উচিত। প্রশ্ন হচ্ছেÑ এই কমিশনটি গঠন করবে কে? উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ বৈঠক করতে পারলেও এটি যে করতে পারবেন এমন কোন ব্যবস্থা বর্তমান সংবিধান তাঁদের জন্য রাখেনি। তা হলে বাকি থাকে পার্লামেন্ট। পার্লামেন্টের কার্যকরী প্রধান হচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। গোলটেবিল বৈঠকে বসে মিনারেল ওয়াটার পান করা যতটা সহজ কাজটি তাঁকে দিয়ে করিয়ে নেয়াটা ততটাই কঠিন। কারণ তিনি ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা জনিত বিন্দুমাত্র কোন সমস্যায় আছেন বলে আমাদের মনে হয় না। এ কথাটা যে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ বোঝেন না এমনটা মনে করার কোন কারণও নেই। তাহলে তাঁরা কী চান?

সে কথাটাও ওই একই পত্রিকার ভাষ্যে মেলে, আর তা হলোÑ ৫ জানুয়ারি ‘একতরফা’ নির্বাচনের বছরপূর্তি উপলক্ষে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের সহিংস আন্দোলন কর্মসূচী চলাকালে সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরুর আকাক্সক্ষা থেকে ১৩ নাগরিক মিলে এই সংগঠন গড়ে তোলেন। অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াতের একটি অনৈতিক, সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মারার মতো সহিংস আন্দোলন তাঁদের মধ্যে একটি আকাক্সক্ষার জন্ম দিয়েছিল! এমন আকাক্সক্ষার জন্ম দেয়া গণতন্ত্র এবং নৈতিকতার মানদ-ে কতটা গ্রহণযোগ্য সে বিষয়টি উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের ভেবে দেখা দরকার। তা না হলে ভবিষ্যতেও অনেকেই এমন দুর্লভ আকাক্সক্ষা তৈরির লক্ষ্যে তথাকথিত আন্দোলনের নামে সাধারণ মানুষকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারার মতো কর্মকা-ে উৎসাহিত হয়ে উঠতে থাকবেন। তেমন অবস্থায় ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ বেশি বেশি উদ্বিগ্ন হয়েও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসবেন কিংবা তা করতে পারবেন এমন ভরসা হয় না।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার প্রায় চুয়াল্লিশ বছর অতিক্রম করছে। এর মধ্যে রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থায় অসংখ্যবার ভাঙচুর এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্ব শেষ করেছে; এর মধ্যে মানুষ প্রধানমন্ত্রী শাসিত, রষ্ট্রিপতি শাসিত, সামরিক একনায়ক শাসিত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার শাসিতসহ বহু বিচিত্র রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থা দেখে এসেছে। সত্যি বলতে, কি মানুষ এসব এ্যাড-হক ব্যবস্থাপনা দেখে জ্বলে-পুড়ে একরকম তিতিবিরক্ত হয়ে গেছে। তারা এখন আর নিত্যনতুন ভাঙচুর এবং নব নব উদ্ভাবন, আবিষ্কার রাষ্ট্র-সরকার ব্যবস্থাপনায় দেখতে মোটেই আগ্রহী নয়। মহামান্য সুপ্রীমকোর্টও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে সে কথাটি বুঝিয়ে দিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেই আমাদের ফিরে আসতে হয়েছে এবং থাকতে হবে। অন্যথায় কেবলই বারবার দেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে এবং হতেই থাকবেÑ এ কথাটা আমাদের সকলকে বুঝতে হবে, মানতে হবে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশে প্রধান বড় দুটি রাজনৈতিক দল হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। তারাই সরকারী ও বিরোধী দল হিসেবে ’৯১-পরবর্তী সময়ে ভূমিকা পালন করে আসছে। সে ভূমিকার সফলতা ও ব্যর্থতার ফলাফলই দেশের জনগণকে উপভোগ কিংবা বয়ে নিতে হয়েছে এবং হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেয়া বিএনপি নামক দলটির দলপতি জিয়াউর রহমানের ঘোষিত ‘রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে দেয়ার তত্ত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ভয়ঙ্কর অশুভ তৎপরতার সূচনা করে। ফলে জিয়ার অবৈধ সরকারে শাহ আজিজ, আবদুল আলীমের মতো স্বাধীনতাবিরোধীদের দাপট দেখতে হয়েছে এদেশের মানুষকে। পরবর্তীতে তারই স্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারেও একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় এদেশের রাজনীতির দূষিতকরণ প্রক্রিয়া ষোলকলায় পূর্ণতা পায়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ থেকে ২০১৫ সময়কালে বিএনপির দৌরাত্ম্যে নিরীহ সাধারণ মানুষকে পুড়তে হয়েছে পেট্রোলবোমার আগুনে। এসব ঘটনার তীব্র উত্তাপ এতটাই বিভীষিকাময় ছিল যা বিস্তারিত বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের সে দহনপীড়নের জ্বালা সহজে নিরাময় হবে বলে অনুমিত হয় না।

সে যাক, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আমরা যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকি তা হলে মহামান্য সুপ্রীমকোর্ট কর্তৃক তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পরে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানতম কাজ হওয়া উচিত ছিল নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থা দৃঢ় করা এবং জনগণের আস্থা অর্জনে সচেষ্ট হওয়া। কিন্তু আমরা দেখলাম দেশের একটি বড় দল বিএনপি সে রাস্তায় না হেঁটে নিয়মতান্ত্রিক এবং শাসনতান্ত্রিক পথ ছেড়ে তথাকথিত একটি আন্দোলনের কানাগলিতে ঢুকে পড়ল। যার ফলাফল শূন্য এবং শূন্য, সঙ্গে ভবিষ্যতের আতঙ্ক। এ আতঙ্কের কারণেই উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ। এই উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের কাছে আমরা আশা করব রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে অপ্রয়োজনীয় নতুন ইস্যু সৃষ্টি না করে সর্বজন স্বীকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক দলগুলোর করণীয় কাজগুলো যাতে তাঁরা করেন সে ব্যাপারে তাঁদের বুদ্ধি-পরামর্শ দেয়া। না হলে কেবল পানিই ঘোলা করার কাজটি হবে, কাজের কাজ কিছুই হবে না।

দেশের একজন ক্ষুদ্র নাগরিক হিসেবে বিএনপির জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের সূচনালগ্নে পত্রিকায় প্রকাশিত আমার লেখা ‘সঙ্কটে সংলাপ’ নামীয় কলামের একাংশ এখনও প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় সহৃদয় পাঠকের সামনে তুলে ধরছি : ‘২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করার ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিএনপির ক্ষমতার চৌহদ্দি থেকে ছিটকে পড়ার দায় কেবল তারই। সাধারণ মানুষের নয়। সাংবিধানিক এবং গণতান্ত্রিক ধারায় থাকতে হলে বিএনপিকে অবশ্যই পরবর্তী নির্বাচনের আগের সময়টুকু জনগণের সঙ্গে থাকতে হবে। তাদের বুঝিয়ে স্বমতে আনতে হবে যে, আওয়ামী লীগ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি করে জবরদস্তি ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে এবং সে কারণে দেশ রসাতলে যাচ্ছে। অতএব আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচনে আপনারা আমাদের সঙ্গে থেকে ভোট দিয়ে রসাতলের অতল তল থেকে দেশকে তুলে আনার দায়িত্বটি দেবেন।’ ... ধরেই নিন আগামী নির্বাচন ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতিতেই হতে যাচ্ছে! ক্ষতি কী? হোপ ফর দ্য বেস্ট এ্যান্ড প্রিপেয়ার ফর দ্য ওয়াস্ট! নিজেদের জন্য তো কিছু নয়, সবই তো পোড়া জনগণের জন্য!

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী

বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট