২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মন্ত্রণালয়, অফিস ও হাব সমন্বয়হীন ॥ হজ নিয়ে নয়ছয়

মন্ত্রণালয়, অফিস ও হাব সমন্বয়হীন ॥ হজ নিয়ে নয়ছয়
  • আবেদনের পরও ভিসা মিলছে না ৪ হাজার হজযাত্রীর;###;আইটি বিভাগের হয়রানি;###;সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে অসহায় হজ এজেন্সিগুলো;###;ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে

আজাদ সুলায়মান ॥ এক সপ্তাহ আগে ১২৪ হজ যাত্রীর ভিসার জন্য আবেদন করেন জারিফ এন্টারপ্রাইজের মাহবুব। হজ অফিস থেকে ডিওসহ সে আবেদন পাঠানো হয় ঢাকার সৌদি দূতাবাসে। শনিবার পর্যন্ত তার আবেদনের একটি ভিসাও হয়নি। এ জন্য তাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। একদিকে হজযাত্রীদের চাপ সামলানো অন্যদিকে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় টিকেটের মাসুল দেয়ার মতো আর্থিক ক্ষতি। এ ছাড়া মদিনায় ভাড়া করা বাড়িও ছুট্ েগেছে। এ ধরনের ত্রিশংকু পরিস্থিতির শিকার শুধু মাহবুব একা নন, তার মতো তিরিশটি এজেন্সির প্রতিনিধি এমন ভোগান্তির মুখে প্রতিদিন ধর্ণা দিচ্ছেন আশকোনা হজ ক্যাম্পে। এসব এজেন্সির প্রায় চার হাজার হজযাত্রী এখন চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় হজক্যাম্পে এসে কান্নাকাটি করলেও কেউই তাদের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। কবে নাগাদ ভিসা হবে সেটাও কেউ বলতে পারছে না।

শনিবার সকালে মাহবুবের মতো অন্তত এক ডজন এজেন্সির মালিক হজ ক্যাম্পে এ প্রতিনিধির কাছে তুলে ধরেন তাদের সীমাহীন ভোগান্তি ও হয়রানির চিত্র।

তাদের অভিযোগ, হজের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মূলত হেলাফেলা করা হচ্ছে। হজের দায়ি্েত্ব থাকা লোকজনের মনোভাব দেখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এরা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœœ করার জন্যই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এমন আত্মঘাতী কাজ করছে। ভিসা বিড়ম্বনা ছাড়াও রয়েছে হজযাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, বয়স্ক নারী ও পুরুষকে ক্যাম্প থেকে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটিয়ে এয়ারপোর্টে যেতে বাধ্য করা, মোয়াল্লেমের জামানত প্রদানে গড়িমসি, রিপ্লেসমেন্ট ও বারকোড নিয়ে বাণিজ্য, যারা ওমরাহর নামে আদম পাচারে জড়িত তাদেরই প্রাধান্য দেয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগ। হজ অফিস ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চোখের সামনে এ সব অনিয়ম ও অরাজকতার চিত্র পড়লেও কোন প্রতিকার নেই। মূলত গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের হজ কার্যক্রম সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ে। হজযাত্রীদের ভোগান্তি ও দুর্দশা দেখারও যেন কেউ নেই। অনুসন্ধানে দেখা যায়- হাব, হজ অফিস ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা, দক্ষতা ও আন্তরিকতার অভাবেই এ সংকট।

শনিবার সকালে আশকোনা হজক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, ভিসা না হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন বেশ কয়েকটি এজেন্সি মালিক ও তাদের হাজার চারেক হজযাত্রী। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তারা ভিসার জন্য আবেদন করেন হজ ক্যাম্পে। সে আবেদনে ডিও দিয়ে সৌদি দূতাবাসে পাঠানোর পর এখনও পর্যন্ত ভিসা দেয়া হচ্ছে না। এ জন্য প্রথমে দূতাবাস থেকে হজক্যাম্পকে ব্যাখ্যা দেয়া হয়, ই- ভিসার জটিলতায় আবেদনপত্রের ছবি ছোট-বড় হওয়ায় দরুণ ভিসা দেয়া যাচ্ছেনা। এ ব্যাখ্যা দেয়ার পর দূতাবাস আবারও হজক্যাম্পকে জানায় এ জটিলতার অবসান হয়েছে। আর কোন আবেদন এ জন্য বাদ পড়বে না। কিন্তুুু তারপরও দেখা যাচ্ছে ওই চার হাজার পাসর্পোর্ট শনিবার পর্যন্ত দূতাবাসে পড়ে থাকলেও ভিসা দেয়া হচ্ছে না।

কেন ভিসা হচ্চেনা সেটা জানার জন্যই প্রতিদিন হজ অফিসে গিয়ে ধর্ণা দিচ্ছেন জারিফ এন্টারপ্রাইজের মাহবুব, এভিয়েশন ট্রাভেলসের ইসহাক ফরিদ, গুডউইল এভিয়েশন সার্ভিসের জিয়াউল হক, রঙ্গন এয়ার সার্ভিসের ওমর ফারুক, ইস্টবাংলার লুৎফর রহমান, সাকিব এভিয়েশনের আনোয়রুল হক মিল্লাত, ওমেগা ট্রাভেলসের বকর আলি, সাবওয়ের খন্দকার সাইফুর রহমানসহ আরও অনেকে।

্জারিফের মাহবুব কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, গত ১৭ আগস্ট ১২৪ পাসপোর্ট হজ অফিসের মাধ্যমে পাঠানো হয় সৌদি দূতাবাসে। আজও ভিসা দেয়া হচ্ছে না। অথচ এ জন্য আগে থেকেই কাটা টিকেট বাতিল করতে হয়েছে। ফ্লাইট বাতিলের জন্য প্রতি টিকেটে তিন শ’ ডলার করে মাসুল দেয়া লাগবে। ওদিকে মদিনায় বাড়ি নেয়া ছিল আট দিনের জন্য। সময়মতো হাজি না পাঠানোর দরুণ সেখানেও গচ্চা দিতে হবে অনেক টাকা। একজন হাজীর বিপরীতে যে টাকা লাভ হতো এখন লোকসান গুণতে হবে তার দ্বিগুণ। এর দায়ভার কে নেবে ?

তিনি বলেন. হজ অফিসার বার বার আশ্বাস দিচ্ছেন আজ না কাল ভিসা হবেই। কিন্তুু হচ্ছে তো না-ই। সর্বশেষ আজ (শনিবার) সকালে এসে তাকে অফিসেই পাওয়া যাচ্ছে না।

গুড উইলের জিয়াউল হক বলেন, ‘ভিসা না হওয়ায় ইতোমধ্যে একটা ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। এখনও ভিসার কোন লক্ষণ নেই। এজন্য হজযাত্রীদের চাপের মুখে কোথাও নিস্তার নেই। একদিকে ব্যবসার সর্বনাশ অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এর দায় কে নেবে- হজ অফিসার নাকি দূতাবাস?

সাকিব এভিয়েশনের আনোয়ারুল হক মিল্লাতের ১৩৭ হজযাত্রীর পাসপোর্ট হজ অফিস থেকে দূতাবাসে পাঠানো হয় ১৭ আগস্ট। এর মধ্যে মাত্র একজনকে ভিসা দেয়া হয়েছে। বাকিদের কোন খবর নেই। এ জন্য সবাইকে বসিয়ে রাখা হচ্ছে। হজযাত্রীদের চাপের মুখেও সান্ত¡নাস্বরূপ কিছুই বলা যাচ্ছে না। কবে নাগাদ ভিসা হবে কিংবা কেন হচ্ছে না সেটাও হজ অফিসার জানাতে পারছেন না। তার কাছে বার বার ধর্ণা দিয়েও কোন লাভ হচ্ছে না। মন্ত্রণালয়েরও কেউ কোন খোঁজ খবর নিচ্ছে না। এমন এক অসহায় পরিস্থিতিতে হজ অফিসে কাটছে প্রতিটি মুহূর্ত। কেউ আমাদের সমস্যা শুনছে না, কেউ দেখছে না।

এসব ভুক্তভোগী কথা বলার এক পর্যায়ে হুমকি দেন- শনিবার রাতের মধ্যে ফয়সালা না হলে হজ অফিসারকে ঘেরাও করা হবে।

এ সময় তারা ভিসা আনতে দূতাবাসের দিকে রওনা হওয়া হজ অফিসের রফিকুল ইসলামকে ঘেরাও করে তার কাছে জানতে চায় কবে নাগাদ ভিসা হবে। তখন রফিক জবাব দেন, আপনারা হজ অফিসারের কাছে যান আমার কাছে কেন।

এ সব বিষয়ে কথা বলার জন্য শনিবার সকাল এগারোটার দিকে হজ অফিসারের রুমে গিয়ে দেখা যায়, তিনি তখনও আসেননি।

তবে এ সময় সহকারী হজ অফিসার আবদুল মালেক জনকণ্ঠকে বলেন, ভিসার বিষয়টি দূতাবাসের ওপর নির্ভর করছে। আমরা এখানে কোন গাফিলতি করছি না। যিনি যখন ডিও নিতে আসেন, আমরা তখনই দিয়ে দিই এবং দূতাবাসে পাঠাই। প্রথম দিকের কিছু পাসপোর্টে ছবি সংক্রান্ত জটিলতায় ভিসা হয়নি। পরে সেগুলোও ঠিক হয়েছে। কিন্তুুু এদেরগুলো কেন হচ্ছে না সেটা বলতে পারব না।

আইটি বিভাগের হয়রানি ॥ চট্টগ্রামের চৌধুরী হজ এজেন্সির প্রতিনিধি দিদার গত শুক্রবার রাতে হজ ক্যাম্পে চিৎকার করে প্রতিবাদ করে বলছিলেন, কেন আমাদের এত হয়রানি করা হচ্ছে। সকালে হজ অফিসার সুস্পষ্ট করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আইটি বিভাগকে। তারপরও ওই অফিসের কবির সে আদেশ অমান্য করে অজুহাত দেখান এ লেখা ঠিক হয়নি। এভাবে না ওভাবে লিখতে হবে। এই নিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শুধু আইটি ক্যাম্পেই ধর্ণা দিতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত হজ অফিসারকে বিষয়টি জানালে তিনি আইটি ইনচার্জ কবির আল মামুনকে ডেকে জানতে চান কেন এভাবে মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। এরপর রাতে তিনি ফাইলের কাজ সারেন।

এ ধরনের হয়রানি শুধু দিদার নয়, এমন শত শত এজেন্সি মালিক সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। হজ রিপ্লেসমেন্ট ফাইলে হজ অফিসার সুস্পষ্টভাবে অনুমতি দেয়ার পরও আইটি সেকশন সে নিয়ে নানা অজুহাতে হয়রানি করছে। এ নিয়ে বার বার অভিযোগের পরও আইটি সেকশনের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এ জন্য এজেন্সি মালিকরা সহজে ভিসা পাচ্ছে না ।

উল্লেখ্য, হজ অফিস থেকে ভিসার জন্য দূতাবাসে ডিও পাঠানোর আগে আইটি সেকশনের মাধ্যমে ডাটা এন্ট্রি ও যাচাই বাছাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। বিজনেস অটোমেশন নামক একটি বেসরকারী আইটি ফার্মকে এই কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়। গত কয়েক বছর ধরে হজ ক্যাম্পে আলাদা অফিস নিয়ে বিজনেস অটোমেশন এই কাজটি করছে। প্রথম প্রথম সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলেও এ বছর আইটি সেকশনের বিরুদ্ধে হজযাত্রীদের হয়রানি ও অবহেলার অভিযোগ উঠতে থাকে। এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিজনেস অটোমেশনের পরিচালক মিথুন দোষ চাপান হজ অফিসের ওপর। বলেন, ওই অফিস থেকে যদি সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয়া না হয় তাহলে আইটি সেকশনের করার কি আছে। এ রকম চারটি আবেদনে অস্পষ্ট থাকায় তা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। এ ছাড়া বাকিগুলো মোটামুটি ঠিকই হয়েছে।

জামানতের টাকা নিয়েও টালবাহানা ॥ ইতোমধ্যে যারা সব যাত্রী পাঠিয়ে দিয়েছেন, যাদের আর কোন রিপ্লেসমেন্টও নেই- এমন এজেন্সির জামানতের টাকা ফেরত দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে অনেক আগেই। তারপরও অনেক এজেন্সি জামানতের টাকা ফেরতের জন্য আবেদন করে এখনও পাচ্ছেন না। হজ অফিসার ডক্টর আবু সালেহ মোস্তফা কামালের টেবিলে গত এক সপ্তাহ ধরে এমন বেশ কিছু ফাইল পড়ে থাকলেও তিনি তা ফেরত দিচ্ছে না। গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, যাদের রিপ্লেসমেন্ট নেই, তাদের টাকা ফেরত দেয়া হবে।

রিপ্লেসমেন্ট নিয়েও বাণিজ্য ॥ টাকা জমা দিলেও একজনের পরিবর্তে আরেকজন হজ করার সুযোগ দেয়াকে বলা হয় রিপ্লেসমেন্ট। তবে এই রিপ্লেসমেন্ট নিয়ে প্রতিবছরই আদম পাচারের অভিযোগ ওঠে। সেজন্য এ বার খুব কড়াকড়ি করা হয়। এটা কমিশনের শতকরা ৫ জন করা হয়। অর্থাৎ যে এজেন্সির কমপক্ষে এক শ’ হজযাত্রী আছে তিনি একজনকে রিপ্লেসমেন্টের সুযোগ পাবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এমন অনেক এজেন্সির রিপ্লেসমেন্ট ফাইল পড়ে আছে হজ অফিসে তাদের দেয়া হচ্ছে না। আবার হজ অফিসের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের পছন্দের এজেন্সিগুলোকেই এ সুযোগ দেয়া হচ্ছে।

আদমপাচারকারীরা সক্রিয় ॥ গত বছর ওমরাহর নামে যারা আদম পাচার করেছিলেন সে সব হাব নেতারাই এবারের হজেও ফের সক্রিয়। তারা রাতের অন্ধকারে হজ অফিসারের রুমে গিয়ে দরজা মেরে নিজের পছন্দের এজেন্সিকে দ্রুত ভিসা, রিপ্লেসমেন্ট সুবিধা ও বারকোড বাণিজ্য করছেন। এতে সাধারণ ও ক্ষতিগ্রস্ত এজেন্সিগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে গত মঙ্গলবার গভীর রাতে হাব সভাপতি ইব্রাহিম বাহার ও মহাসচিব শেখ আবদুল্লাহকে লাঞ্ছিত করে। এ সময় সাধারণ এজেন্সির ক’জনের অভিযোগ এ সব হাব নেতাই নিজেদের সুবিধার জন্য হজ ম্যান্জেমেন্টের সর্বনাশ করছেন। এরা রাতের অন্ধকারে কি করতে হজ অফিসে আসেন। তারা তো সাধারণ হজ এজেন্সির কল্যাণে কোন কাজ করেন না। তারা টিকেট নিয়ে কালোবাজারি করেন, ভিসা নিয়েও কারসাজি করেন। এদের শাস্তি হওয়া দরকার।

জানতে চাইলে হাব সভাপতি এ সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, লাঞ্ছিত হওয়ার বিষয়টি ঠিক নয়। তারা এখানে তাদের স্বার্থ নিয়ে দাবি জানাতে এসে আমাদের ঘেরাও করে।

এ সময় শেখ আব্দুল্লাহ চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যারা এখানে এসে এই গ-গোল করেছে আমাদের গায়ে হাত দিয়েছে তাদেরকে চিহ্নিত করে উচিত শিক্ষা দেয়া হবে।

বয়স্কদেরও হাঁটতে বাধ্য করা ॥ ব্যালটি হজযাত্রীদের হজ অফিসেই ইমিগ্রেশনের কাজ সেরে বিমানের ব্যবস্থাপনায় রাখা বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় শাহ্জালাল এয়ারপোর্টে। এ জন্য বিআরবি কেবল নামের একটি প্রতিষ্ঠান বিমানকে পাঁচটি বাস সৌজন্যমূলক বরাদ্দ দিয়েছে। সেগুলো দিয়ে হজযাত্রী নেয়া হয় বিমানবন্দরে। কিন্তু নন ব্যালটি হজযাত্রীরা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের এজেন্সির মালিকরা হজ ক্যাম্প থেকে বৃষ্টির মধ্যে এয়ারপোর্টে হেঁটে যেতে বাধ্য করে। এজেন্সিগুলোর চরম অবহেলার শিকার এ সব যাত্রী এ নিয়ে কিছুই বলতে পারছেন না। কারণ তাদের বলা হয়, হজে রওনা দেয়ার পর কোন কিছুই বলা বা অভিযোগ করা যাবে না। যেভাবেই পাঠানো হোক তাই মানতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আকবরী হজ গ্রুপের মালিক আকবর হোসেন মঞ্জু বলেন, যাত্রীদের হজ অফিস থেকে এয়ারপোর্টে নেয়ার দায়িত্ব তো সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের। কিন্তু সৌদিয়া যদি বাস না দেয় তাহলে আমরা করব কি? এটা তো আমাদের দায়িত্ব নয়।

এ সম্পর্কে হজ অফিসার ডক্টর আবু সালেহ মোস্তফা কামাল বলেন, সৌদিয়া যদি না নেয় তাহলে এজেন্সিকেই এর দায় নিতে হবে। তাদেরকেই পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে হাঁটিয়ে এয়ারপোর্ট নেয়া আদৌ সমীচীন নয়।

তাহলে হজ অফিসার হিসেবে আপনি তাদের এ নিয়ম মানতে বাধ্য করছেন না কেন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কত ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে দেখতেই তো পাচ্ছেন।

প্রতারণা ঠেকানো যাচ্ছে না ॥ এজেন্সি মালিকদের প্রতারণার কারণে বাংলাদেশীদের জন্য ওমরা ভিসা বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। তবুও ঠেকানো যাচ্ছে না তাদের প্রতারণা। এ বছর হজ পালনে আগ্রহী ২০ হাজারের বেশি ব্যক্তি নিবন্ধনের সুযোগ না পেলেও ঠিকই হজযাত্রীর নামে হাজার হাজার ভুয়া নিবন্ধন করেছে এ সব এজেন্সি। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত যাচাই-বাছাই কমিটি প্রায় ৪শ’ এজেন্সির কমপক্ষে সাড়ে ৩ হাজার হজযাত্রীর নাম ‘ভুয়া’ বলে শনাক্ত করেছে। সঠিক যাচাই হলে বাকি এজেন্সির আরও ১৫ থেকে ২০ হাজার ভুয়া নাম পাওয়া যাবে বলে কমিটির ধারণা।

যাচাই কমিটির সদস্য ও ক্ষতিগ্রস্ত হজ এজেন্সির প্রতিনিধি ফজলুর রহমান জানান, এ বছর হজ কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী ৭৮৭ এজেন্সির তথ্য যাচাই করে দেখা যায় এ সময় প্রায় ৭ হাজার ব্যক্তির তথ্য ভুয়া বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিটি এজেন্সির ৪ থেকে ১০ জনের তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে। আবার কোন কোন এজেন্সি ৮০ ভাগই ভুয়া নিবন্ধন করেছে। যেসব এজেন্সির বেশিসংখ্যক ভুয়া নাম নিবন্ধন করা হয়েছে, তারা এখনও তথ্য দেয়নি।

এ সম্পর্কে হাব সভাপতি ইব্রাহিম বাহার জনকণ্ঠকে বলেন, কিছু অসাধু এজেন্সি মালিক হজে যেতে ভুয়া নিবন্ধন করে। এ নিয়ে যাচাই-বাছাইও হয়। গুটিকয়েক এজেন্সির খারাপ কাজে গোটা হজ এজেন্সি ব্যবসায়ীদের বদনাম হয়। ব্যাপারটি দুঃখজনক।

কোটাবঞ্চিতদের অভিযোগ ॥ এদিকে হজ ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির কারণে যারা প্রকৃত হাজি তারা হজ পালনে যেতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন কোটাবঞ্চিত হজ এজেন্সির মালিকরা। গত শুক্রবার আশকোনা এলাকায় হজ ক্যাম্পের সামনে এক বিক্ষোভ সমাবেশ তারা এ অভিযোগ করেন। এ সময় হাব নেতাদের ‘দুর্নীতিবাজ ও মানবপাচারকারী’ আখ্যা দিয়ে কোটাবঞ্চিত হজ এজেন্সির মালিকরা বলেন, হাবের নেতারা হজ পালনে হাজিদের পাঠানোর ক্ষেত্রে দুর্নীতি করছেন।

এ সময় বিক্ষোভ সমাবেশে কোটাবঞ্চিত এজেন্সির সমন্বয়কারী রুহুল আমিন মিন্টু জনকণ্ঠকে বলেন, চলতি বছরে হজ পালনের জন্য হাজিদের পাঠানোর ক্ষেত্রে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। মূলত তারাই এখানে দুর্নীতিগ্রস্ত। এবার হজযাত্রীদের নাম দু’বার এন্ট্রি করা হয়েছে। এখন সেগুলো আবার রিপ্লেসমেন্ট করে নাম পরিবর্তন করে অনেক হাজি পাঠানো হচ্ছে।

‘কর্মকর্তাদের দিনের বেলাতে অফিসে পাওয়া যায় না। কিন্তু সারা রাত ক্যাম্প কার্যালয়ে বসে এ সব দুর্নীতি করছে।’ এবার মোট সাড়ে ৩শ’ এজেন্সির মধ্যে ৬০ এজেন্সি কোটাবঞ্চিত। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন কোটাবঞ্চিত হজ এজেন্সি মালিকরা।

গত কয়েকদিন পর পর হজ ক্যাম্প পরিদর্শন করে দেখা যায়, কোটাবঞ্চিত দুই শতাধিক এজেন্সি মালিক প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত আশকোনা হজ অফিসে গিয়ে অবস্থান করছেন। সর্বশেষ ভুয়া হজযাত্রীর নাম শনাক্তকরণে যাচাই-বাছাই শেষে প্রায় ১০ হাজার ভুয়া নাম বের হয়ে আসার খবরে আশাবাদী হয়েই তারা প্রতিদিন হজ অফিসে গিয়ে ধরনা দিচ্ছেন। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এই প্রত্যাশায় যে তাদের হয়তো শেষ মুুহূর্তে সুযোগ দেয়া হবে। তবে যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কমিটি রিপোর্ট চূড়ান্ত না করায় এবং কোটা পুনর্বণ্টনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় ক্রমেই তারা উদ্বিগ্ন। গত ২১ জুলাই থেকে কোটা পাওয়া ৭৮৭ এজেন্সির পাসপোর্টের সঙ্গে ব্যাংক তালিকা, পুলিশ ভেরিফিকেশনের রিপোর্ট ইত্যাদি যাচাই-বাছাই করার কাজ শুরু হয়।

এদিকে চূড়ান্ত হজযাত্রীর তালিকা থেকে পাওয়া ভুয়া নামগুলো কোটাবঞ্চিতদের বণ্টন না করে আবারও ভুয়া নাম এন্ট্রিকারীদের রিপ্লেস করার সুযোগ করে দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করছেন অপেক্ষায় থাকা কোটাবঞ্চিত এজেন্সি মালিকেরা। তারা বলছেন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ে রিপ্লেসের জন্য কয়েক হাজার আবেদন জমা পড়লেও তা নিয়ে লুকোচুরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া পরিস্থিতি বুঝে অনেক এজেন্সি রিপ্লেসের আবেদনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছেন বলেও অভিযোগকারীরা তাদের নিজস্ব সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে বলছেন। কোটাবঞ্চিত এজেন্সি মালিকেরা বলছেন, কয়েক ক্যাটাগরিতে খালি হওয়া হজযাত্রীদের নামের স্থলে কোটাবঞ্চিতদের হজযাত্রীদের কোটা বণ্টন করে দিলে অন্তত মোয়াল্লেম ফি জমা দেয়া হয়েছে এমন ১০ হাজারের মতো হজযাত্রীকে এবার হজে পাঠানোর একটা ব্যবস্থা হতে পারে।

কোটাবঞ্চিত একটি হজ এজেন্সির মালিক মঈন উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা দুই শতাধিক এজেন্সি মালিক সকাল দশটা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কয়েক দিন ধরে হজ অফিসে অবস্থান করে আসছি। আশায় আছি আমাদের খালি হওয়া কোটা বণ্টন করে দেবে। ৪৫টির মতো এজেন্সির একজনও হজযাত্রীর নির্ধারিত এক লাখ এক হাজার ৭৫৮ জনের কোটায় স্থান পায়নি। এই এজেন্সি মালিকেরা হজযাত্রীদের কোন জবাব দিতে পারছেন না। এ ছাড়া আরও কয়েক শ’ এজেন্সির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হজযাত্রী কোটায় স্থান পায়নি। আমাদের দাবির মুখে সরকার শেষ পর্যন্ত তালিকা যাচাই করেছে। তাতে আমাদের দাবির সত্যতাও প্রমাণিত হয়েছে। এখন কেন তালিকা প্রকাশ এবং কোটা বণ্টন নিয়ে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে তা আমাদের বুঝে আসছে না। আমরা এ নিয়ে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছি।

ক্ষতিগ্রস্ত হজ এজেন্সিগুলোর আহ্বায়ক ও যাচাই-বাছাই কমিটির অন্যতম সদস্য মাওলানা ফজলুর রহমান বলেন, আমাদের শত শত এজেন্সি মালিক হজ অফিসে অবস্থান করে কোটা পাওয়ার আশায় প্রহর গুনছেন। আশা করছি সরকার কমিটির রিপোর্টের আলোকে কোটাবঞ্চিত এজেন্সিগুলোর হজযাত্রীদের পাঠানোর দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।