২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জঙ্গী অর্থায়নে বিদেশী রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা স্পষ্ট

  • র‌্যাব বলছে, তিন আইনজীবীকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলছে

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ বিদেশী কয়েকটি রাষ্ট্রের অর্থ যোগানে দেশে জঙ্গী সংগঠনগুলোর অস্ত্র কেনা, প্রশিক্ষণ ও সশস্ত্র সন্ত্রাসের ঘটনাগুলো ঘটে আসছে। ইতোপূর্বে যেসব জঙ্গী সংগঠনের নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হয়েছে তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিষয়টি পরিষ্কার। এদের মধ্যে কথিত সশস্ত্র বিপ্লবের নামে যারা এদেশকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্নে বিভোর তার অন্যতম ‘শহীদ হামজা ব্রিগেড’। বাংলাদেশে বৈধ ও অবৈধভাবে থাকা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের অবৈধ পথে অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে পাকিস্তানের করাচির নাগরিক মোহাম্মদ আলম ও সৌদি বংশোদ্ভূত বাংলাদেশী নাগরিক আবদুল মজিদের বিরুদ্ধে। গ্রেফতারকৃত তিন আইনজীবীর মাধ্যমে অর্থ যোগানে নাম এসেছে দুবাইয়ের নাগরিক আল্লামা লিবদির। এ তিন বিদেশী একাধিকার বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছেন। আরএসওসহ হেফাজতের নায়েবে আমীর ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের প্রধান গ্রেফতারকৃত মুফতি ইজাহারুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গেও এসব বিদেশী নাগরিকের যোগাযোগের তথ্য রয়েছে।

দেশে বর্তমান সরকারের জঙ্গী তৎপরতাবিরোধী যে এ্যাকশন কার্যক্রম চলছে তার বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে আছে বিভিন্ন মৌলবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ সংগঠন ছাড়াও জঙ্গী সংগঠনগুলো। বিরোধীদল বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গেও জঙ্গী সংগঠনের নেতাদের যোগাযোগ ও সখ্যের বিষয়টি বহু আগে থেকেই প্রমাণিত। হুজি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ গোপন অবস্থানে থেকে যেসব জঙ্গী সংগঠন অস্ত্রবাজি, বোমাবাজি, প্রগতিমনা বুদ্ধিজীবীদের হত্যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাদের সঙ্গে চট্টগ্রামভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন হামলায় ব্রিগেডের লক্ষ্য উদ্দেশ্য, আদর্শ ও কার্যক্রম একইসূত্রে গাঁথা বলে র‌্যাবের বিভিন্ন সূত্রে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

তবে জঙ্গী অর্থায়নে সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা তার দুই সহকারীকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট হওয়ার বিষয়টি নতুনভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। যেহেতু শাকিলা ফারজানা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের যুগ্ম সম্পাদক ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সেক্ষেত্রে হামজা ব্রিগেডের নেতাদের এ্যাকাউন্টে অর্থ যোগানের বিষয়টি একদিকে যেমন চাঞ্চল্যকর, অন্যদিকে উদ্বেগেরও। এক্ষেত্রে শাকিলা ফারজানার দল তাকে এ কাজে সম্পৃক্ত করিয়ে জঙ্গীসংগঠনসমূহের তৎপরতাকে এগিয়ে নিতে সাহস ও পথ দেখিয়েছে কিনা তা তদন্তে খুঁজে দেখা হচ্ছে।

এদিকে, শহীদ হামজা ব্রিগেডের এ পর্যন্ত ২৮ নেতাকর্মী যেমন গ্রেফতার হয়েছে তেমনি এদের আস্তানা থেকে গ্রেফতার হয়েছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র। সর্বশেষ গ্রেফতারকৃত সুপ্রীমকোর্টের এক ব্যারিস্টারসহ তিন আইনজীবী গ্রেফতার হওয়ার মাধ্যমে র‌্যাব উদঘাটন করেছে এ জঙ্গী সংগঠনকে ব্যাংকিং চ্যানেলে মোটা অঙ্কের অর্থায়নের বিষয়টি। গত মঙ্গলবার ঢাকার ধানম-ি এলাকা থেকে এ তিন আইনজীবী গ্রেফতার হওয়ার পর বুধবার থেকে এদের চারদিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। শনিবার র‌্যাব সূত্রে বিস্তারিত কিছু না বলা হলেও শুধু জানানো হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে অগ্রগতি রয়েছে। গ্রেফতারকৃত তিন আইনজীবীর মধ্যে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা স্বীকার করেছেন বেসরকারী একটি ব্যাংকের মাধ্যমে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা তিনি ও তার অপর দুই সহযোগী (গ্রেফতারকৃত) শহীদ হামজা ব্রিগেডের তিনটি সামরিক উইংয়ের এক নেতা মনিরুজ্জামান ওরফে ডনের এ্যাকাউন্টে জমা দিয়েছেন। তবে তা জঙ্গী অর্থায়নের কাজে নয়।

এদিকে, র‌্যাবের তদন্তে পাকিস্তান, দুবাই ও সৌদি আরবের তিন নাগরিকের পক্ষে বাংলাদেশে জঙ্গী অর্থায়নের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ছ’টি ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেলেও একটি ব্যাংকেই ১ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার টাকার হিসাব পাওয়া গেছে। যারমধ্যে ১ কোটি ৮ লাখই আইনজীবী ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, এ্যাডভোকেট হাসানুজ্জামান লিটন ও এ্যাডভোকেট মাহফুজ বাপনের মাধ্যমে বেসরকারী ওই ব্যাংকের হিসাবে জমা হয়েছে। এছাড়া মোট ৬ ব্যাংকের মাধ্যমে জঙ্গী অর্থায়নের ঘটনা ঘটেছে। এসব ব্যাংকের বিভিন্ন এ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করছে র‌্যাবের তদন্ত টিম। র‌্যাবের পক্ষ থেকে বেসরকারী ওইসব ব্যাংকের নাম এখনও প্রকাশ করা হয়নি। শহীদ হামজা ব্রিগেডের শীর্ষ নেতা যাকে ‘বড় ভাই’ হিসেবে ডাকা হয়ে থাকে, তার নামও প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে র‌্যাব তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছে। হামজা ব্রিগেডের আত্মপ্রকাশের পর প্রথম দফায় এদের মধ্যে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে ওই ঘটনার পর থেকে ওই বড় ভাই গা-ঢাকা দিয়েছে।

‘লাভ ফর রোহিঙ্গা’ নামে এনজিও গঠন করতে গিয়ে এরা ব্যর্থ হয়। ধারণা করা হচ্ছে মিয়ানমারের আরএসও (রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন) শীর্ষ নেতা কক্সবাজারের জঙ্গী হিসেবে চিহ্নিত ছালামত উল্লাহ আর শহীদ হামজা ব্রিগেডের অপতৎপরতা একই সূত্রে গাঁথা। র‌্যাবের পক্ষ থেকে পাকিস্তানী নাগরিক সৌদি প্রবাসী মোঃ আলম দুবাইয়ের নাগরিক আল্লামা লিবদি সৌদি বংশোদ্ভূত বাংলাদেশী নাগরিক আবদুল মজিদের মাধ্যমে হামজা ব্রিগেডসহ দেশে বিভিন্ন নামে গড়ে উঠা জঙ্গী সংগঠনসহ বিভিন্ন চ্যানেলে নিয়মিত মোটা অঙ্কের অর্থ পাচ্ছে। কক্সবাজারের জঙ্গী নেতা ছালামত উল্লাহ, পাকিস্তানী নাগরিক মোহাম্মদ আলম ও সৌদি বংশোদ্ভূত বাংলাদেশী নাগরিক আবদুল মজিদ ইতোমধ্যে গ্রেফতার হলেও তারা জামিন নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছে। এসব বিদেশী নাগরিক ছাড়াও এ ধরনের আরও অনেকের সম্পৃক্ততা রয়েছে জঙ্গী অর্থায়নে। বিশেষ করে হুন্ডির মাধ্যমে অধিকাংশ অর্থ আসছে বলে র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ধারণা। বর্তমানে হামজা ব্রিগেডের ২৯ জনের সুনির্দিষ্ট যে তালিকা পাওয়া গেছে তন্মধ্যে ২৮ জনই জেলে রয়েছে। হামজা ব্রিগেডের হোয়াইট, গ্রীন ও ব্লু নামের তিনটি সামরিক উইং ছাড়াও দাওয়া এবং একটি মিডিয়া উইংও রয়েছে। সামরিক উইং হোয়াইটের প্রধান খালেদ হাসান ওরফে রাকিব, ব্লু উইংয়ের প্রধান আজিজ ওরফে তারেক এবং গ্রিন উইংয়ের প্রধান মনিরুজ্জামান ওরফে ডন। এছাড়া দাওয়া উইংয়ের প্রধান নাসিম ও মিডিয়া উইংয়ের প্রধান আবদুল্লাহ বলে জানা গেছে। সামরিক উইংয়ের দুই প্রধান গ্রীনের মনিরুজ্জামান ডন ও ব্লু উইংয়ের আজিজ ওরফে তারেক ধরা পড়েছে বহু আগে। গ্রেফতারকৃত হামজা ব্রিগেডের এসব শীর্ষ দেশের তথ্যের ভিত্তিতে এ ব্রিগেডের তিনটি আস্তানা হাটহাজারীর আল মাদ্রাসাতুল আবু বকর, হালিশহরের বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ৫ নম্বর সড়কের বিএস নামের ভবনের একটি ফ্ল্যাটে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির কারখানা, বাঁশখালির সাধনপুরের লটমনি পাহাড়ের গহীন এলাকা নিয়ে পোল্ট্রি ও ডেইরি ফার্মের আদলে গড়ে তোলা জঙ্গী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আবিষ্কার করে র‌্যাব। বাঁশখালির জঙ্গী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের পাশাপাশি ১৩৬ জোড়া প্রশিক্ষণ জুতা উদ্ধার হলেও গ্রেফতার হয়েছিল ৫ জন। অবশিষ্ট ১৩১ জোড়া জুতা ব্যবহারকারী জঙ্গী পালিয়ে রয়েছে। বাঁশখালির এ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে ভারি অস্ত্রসহ যে পরিমাণ গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার হয়েছে টাকার অঙ্কে ব্যাংক লেনদেনের অর্থের চেয়ে বহু বেশি। সঙ্গত কারণে তদন্তে খোঁজ নেয়া হচ্ছে সন্ধান পাওয়া ১ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার টাকার বাইরেও আরও অর্থ বিভিন্ন চ্যানেলে এ জঙ্গী সংগঠনের কাছে পৌঁছেছে কিনা। উল্লেখ্য, চট্টগ্রামভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেড আত্মপ্রকাশ করে ২০১৩ সালের নবেম্বরে। এ সংগঠনের তিন সামরিক শাখার নেতার সকলেই সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। হাটহাজারী আল মাদ্রাসাতুল আবু বকর ছিল এদের তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। হালিশহরের একটি আবাসিক ফ্ল্যাট ছিল বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির আস্তানা এবং বাঁশখালির সাধনপুরের লটমনি পাহাড়ের অরণ্যঘেরা এলাকা ছিল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

শনিবার পর্যন্ত গ্রেফতারকৃত তিন আইনজীবীর রিমান্ডের তিনদিন শেষ হয়েছে। রবিবার বিকেলনাগাদ এদের পুনরায় বাঁশখালি আদালতে সোপর্দ করার কথা। কিন্তু র‌্যাবের পক্ষ থেকে এদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও পুনরায় রিমান্ড চাওয়া হচ্ছে কিনা তা নিয়ে এখনও কোন বক্তব্য দেয়া হয়নি। তবে জানানো হয়েছে, সব তথ্য রিমান্ড শেষে জানানো হবে। তিন আইনজীবীর রিমান্ড শেষে আজ বাঁশখালি আদালতে সোপর্দ করা হবে এবং এদের পক্ষ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে র‌্যাবের একটি সূত্রে জানানো হয়েছে।