২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যাকে বুকে টেনে নেন তাকে দূরে ঠেলে দিতে মন কাঁদে না তাঁর

যাকে বুকে টেনে নেন তাকে দূরে ঠেলে দিতে মন কাঁদে না তাঁর
  • বহিষ্কার বহিষ্কার খেলায় বরাবরই হেরেছেন এরশাদ

রাজন ভট্টাচার্য ॥ সহজেই কারও মন ভাঙ্গতে পারেন তিনি। আবার গলাতেও সময় লাগে না। যাকে বুকে টেনে নেন তাকে দূরে ঠেলে দিতে কখনও মন কাঁদে না। হয়ত সহনশীল হৃদয়। সবই সয়ে যায়। পারেনও। এ সব কারণেই হয়ত আলোচিত ব্যক্তি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সাম্প্রতিক সময়ে ঠুনকো নানা অভিযোগে দলের নেতাকর্মীদের বহিষ্কার ও ফের ফিরিয়ে এনে রেকর্ড করেছেন সাবেক এই স্বৈরশাসক। যা কোন রাজনৈতিক দলের মধ্যেই সচরাচর দেখা যায় না। অর্থাৎ নেতাকর্মীদের যখন তখন বহিষ্কার ও অল্প সময়ের মধ্যে আবারও দলে ঠাঁই দেয়ার রেকর্ড তাঁরই বেশি। গত প্রায় দুই বছরে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এ রেকর্ড প্রায় শতাধিক ছাড়িয়ে। তৃণমূলে সহস্রাধিক। ব্যক্তিস্বার্থে বা প্রয়োজনে নিজের ভাই এমনকি স্ত্রীকেও দল থেকে বাদ দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। তবে এ বহিষ্কার বহিষ্কার খেলায় বরাবরই হেরেছেন সাবেক এই সেনাপ্রধান। নানা কৌশলে বহিষ্কৃত অধিকাংশ বিত্তশালী নেতাই দলে ফিরেছেন সগৌরবে। পুরনো ইমেজে। পার্টির প্রধানের ক্ষমতা ও দলের গঠনতন্ত্রের ৩৯ ধারাই দল থেকে বহিষ্কারের মূল অস্ত্র। এ সব ইস্যুতে আবারও দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে এরশাদ বন্দনা।

দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, এরশাদ ও রওশনের দ্বন্দ্বের কারণে জাপা কার্যত দু’ধারায় বিভক্ত। এর মধ্যে কিছু সুবিধাবাদী নেতা এরশাদকে জিম্মি করে নিজেদের মতো করে দল পরিচালনা করতে চান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সুবিধাবাদী নেতাদের পরামর্শেই চলেন এরশাদ। রাজনৈতিক কোন ইস্যুতে বনিবনা না হলেও তারা ওই নেতাকে দল থেকে বহিষ্কারের পরামর্শ দেন। কিছুদিন পর আবারও তাকে দলে ফিরিয়ে আনা হয়! কিভাবে দলে ঠাঁই মিলে বহিষ্কৃত নেতাদের; এ নিয়েও আছে বিস্তর আলোচনা।

সর্বশেষ নিজের উপদেষ্টা হিসেবে আবারও ফিরিয়ে আনলেন ধনকুবের হিসেবে খ্যাত প্রিন্স মুসা বিন শমসেরের পুত্র ববি হাজ্জাজকে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে উত্তর সিটির মেয়র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন ববি। অথচ দলের পক্ষ থেকে দুই সিটিতে দু’জনকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন এরশাদ। তাঁর সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় উপদেষ্টার পদ থেকে বহিষ্কৃত হতে হয় ববিকে। কিছু দিনের মধ্যেই এরশাদের অভিমানের বরফ গলে যায়। চলতি মাসের মাঝামাঝিতে দলের পক্ষ থেকে জাপা চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব শুনীল শুভ রায় স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘জনাব ববি হাজ্জাজকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের বিশেষ উপদেষ্টা পদে পুনর্বহাল করা হয়েছে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পার্টির গঠনতন্ত্রের ৩৯ ধারা মোতাবেক এই নিয়োগ প্রদান করেছেন। এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে।’

গেল বছরের ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গাকে বহিষ্কার করেন পার্টির চেয়ারম্যান। সেই সঙ্গে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য মশিউর রহমান রাঙ্গাকে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যের পাশাপাশি রংপুর মহানগর কমিটি ও তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে কুড়িগ্রাম জেলা কমিটি থেকেও অব্যাহতি দেয়া হয়। বহিষ্কার আদেশ নিয়ে জাতীয় সংসদে রাঙ্গার সঙ্গে জাপা মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর কথা কাটাকাটি হয়। রাঙ্গা বলেন, আমার টাকায় দল চলে। আবার আমাকে বহিষ্কার করা হয়। এটা হতে পারে না। কার এত বড় সাহস আমাকে বহিষ্কার করে। তবে বেশিদিন তাদের দলের বাইরে থাকতে হয়নি দু’জনের কাউকেই। ১৮ নবেম্বর মশিউর রহমান রাঙ্গা ও ২৩ ফেব্রুয়ারি তাজুল ইসলাম স্বপদে বহাল হন। অথচ এই বহিষ্কারাদেশ কেন্দ্র করে রংপুরে এরশাদ ও রাঙ্গা সমর্থনদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, সামরিক শাসক এরশাদকেও রাজনীতির মাঠে দল থেকে বহিষ্কার হতে হয়েছে। ২০১৩ সালের ২৮ নবেম্বর জাতীয় পার্টি থেকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে বহিষ্কার করেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর। এদিন সকালে সর্বদলীয় সরকারে জাতীয় পার্টির অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তে বিরোধিতা করায় দল থেকে কাজী জাফরকে বহিষ্কার করেন এরশাদ। এরপর আলাদাভাবে দল গঠন করে জাফর।

ঠুনকো অভিযোগে জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুর রহমানকে বহিষ্কার করেন দলটির চেয়ারম্যান। তখন শফিক বলেন, এ তেমন কিছু নয়। দু-একদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। স্যারকে (এরশাদ) ভুল বুঝিয়ে আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আমিও স্যারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। দলীয় গঠনতন্ত্রের ৩৯ ধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সাংগঠনিক কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগে বশির আহমেদ ঝুনুকে জাতীয় পার্টি বরিশাল মহানগর শাখা সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব পদ থেকে অব্যাহতি দেন জাপা প্রধান।

জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এটিএম গোলাম মাওলা চৌধুরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাকুর রহমান মোস্তাককে পার্টির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পদ ও দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এর মধ্যে গোলাম মাওলা চৌধুরীকে একবার দলে ফিরিয়ে এনে আবারও বহিষ্কার করা হয়েছে। ২০১৩ সালের মে মাসে দলের উপদফতর সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কার হন জাহিদ হাসান বিপ্লব। একই বছরের ২৯ জুলাই জাতীয় পার্টির মহাসচিবকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা ও কুশপুতুল দাহ করার অপরাধে পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ প্রেসিডিয়াম পদ থেকে বহিষ্কার করেন চট্টগ্রামের নেতা সোলায়মান আলম শেঠকে। এ বছর ৭ মার্চ তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় জাতীয় পার্টি। এরপরই বিপুল উদ্দীপনা নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সোলায়মান শেঠ।

এর আগে ১৭ জুলাই দল থেকে বহিষ্কৃত হন কুনু মিয়া। এরপর কুনু মিয়া দলে না ভিড়ে প্রায় ১২শ’ জাতীয় পার্টির নেতাকর্মী নিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও প্রেসসচিব শুনীল শুভ রায়কে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফের বহাল করা হয়। তবে প্রেসসচিবের পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। দলের যুগ্ম-দফতর সম্পাদক আবুল হাসান আহমেদ জুয়েলকে সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কার করে আবারও ফিরিয়ে আনা হয়।

জাতীয় পার্টির অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ২৩ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জাতীয় পার্টির সহ-সভাপতি ওয়াহেদুল হক ওয়াহাবকে বহিষ্কার করা হয়। এ বছর ৫ আগস্ট জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুল আলম মাস্টার এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম-আহ্বায়ক আবদুুস সাত্তার রনিকে পার্টির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পদ ও দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সে বছর ৩ অক্টোবর জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের প্রচার সম্পাদক মফিজুর রহমান লিটন। জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতাবলে এ বহিষ্কার করেন।

এরপর ৩০ নবেম্বর অভ্যন্তরীণ বিবাদে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম ও প্রাথমিক সদস্যপদ হারান গোলাম মসীহ। এ নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছিল। সেই গোলাম মসীহকে সগৌরকে দলে ঠাঁই দেয়া হয়েছে। এখন দলীয় পদ ফিরে পেয়ে সৌদি রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত আছেন তিনি। এছাড়া ২০১২ সালের ৭ অক্টোবর দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কৃত হন সাতক্ষীরা-৪ আসনের তৎকালীন এমপি গোলাম রেজা। তারও আগে প্রেসিডিয়াম পদ থেকেও তাকে অব্যাহতি দেন এরশাদ।

২০১২ সালের ২৯ নবেম্বর রংপুর সিটি নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্ত না মানায় জাতীয় পার্টির দুই মেয়রপ্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা ও আবদুর রউফ মানিক বহিষ্কার হন। রাঙ্গা বহিষ্কৃত হওয়ার পর তাদের আবার দলে ফিরিয়ে এনে দায়িত্ব দেয়া হয়। একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জিএম কাদেরকে জাতীয় পার্টি থেকে ২০০৬ সালের ২৬ নবেম্বর বহিষ্কার করা হয়। তখন তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে আওয়ামী লীগের পক্ষ নেয়ায় পার্টি থেকে তাকে এ শাস্তি দেয়া হয়। বহিষ্কারাদেশের কয়েক মাসের মাথায় তা প্রত্যাহার করে নেন এরশাদ। নিজের ভাইকে কতবার বহিষ্কার করেছেন তিনি নিজেই জানেন। এছাড়া এরশাদ প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন বিদিশাকে। এ নিয়ে কাদা ছুঁড়াছুঁড়ির শেষ ছিল না। বিয়ের পর দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তাকে। বিদিশাকে বিয়ের পর ঘর আলোকিত করে আসে এরিখ। প্রথমবারের মতো নিজের সন্তানের মুখ দেখলেন তিনি। তাতে কি। বেশিদিন মধুচন্দ্রিমা টিকেনি এরশাদের। অপমানজনকভাবে বিদিশাকে এরশাদের বাসা প্রেসিডেন্টপার্ক থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। বহু আকাক্সিক্ষত সন্তান এরিখও বাবা-মা’র বন্ধন শেষ পর্যন্ত ঠেকাতে পারেনি। এখন আদালতের নির্দেশে এরিখ কখনও বাবার কাছে কখনও মায়ের কাছে মানুষ হচ্ছে।

গত বছর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারকে জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কার করেন পার্টির চেয়ারম্যান। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের অনেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের চেয়ারম্যান স্যার কান কথা শোনেন। তাই বুঝে না বুঝে যখন-তখন যাকে ইচ্ছা তাকে বহিষ্কার করছেন। আবার হুঁশ ফিরলে দলে নিচ্ছেন। তিনি বলেন, আমার জানা মতে গত দেড় বছরে কমপক্ষে ৭০ জন কেন্দ্রীয় নেতাকে দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তৃণমূলে এ সংখ্যা অগণিত। এছাড়া ক্ষোভে, দুঃখে দল থেকে অব্যাহতি নেয়ার সংখ্যা আরও বেশি। আক্ষেপ করে বলেন, এখন জাতীয় পার্টি চাটুকার আর বহিষ্কার পার্টিতে পরিণত হয়েছে।

জানতে চাইলে জাপা মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু জনকণ্ঠকে বলেন, কেউ যদি দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তাহলে তো তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নিতেই হয়। এই প্রক্রিয়া সব দলের মধ্যেই আছে। তিনি বলেন, বহিস্কারের পর কেউ যদি অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয় ও আবারও দলে ফিরে আসতে চায় তাহলে বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।