১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঘরে ঘরে ডাক পাঠাও তৈরি হও জোট বাঁধ...

ঘরে ঘরে ডাক পাঠাও তৈরি হও জোট বাঁধ...
  • গানে কবিতায় চলমান অন্যায়ের প্রতিবাদ

মোরসালিন মিজান ॥ হঠাৎ করেই অচেনা মনে হচ্ছে সময়টাকে। কেমন যেন বদলে যাচ্ছে সমাজ। না, এই পরিবর্তন ইতিবাচক নয় মোটেও। একটার পর একটা অঘটন। ঘটেই চলেছে। মানবিক মানুষের আকাল। মূল্যবোধের সঙ্কট। হঠাৎই যেন তীব্র হয়ে ওঠেছে। মুক্তবুদ্ধির চর্চায় নির্মম নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করা হচ্ছে। নারীরা যখন তখন নির্যাতিত। অবোধ শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। এ অবস্থায় উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বাড়ছে। আর সংস্কৃতিকর্মীদের কথাতো বলাই বাহুল্য, সমাজের এ অংশটি অনুভূতিপ্রবণ। আবেগ দ্বারা বিশেষভাবে তাড়িত। ফলে অনেকদিন মন খারাপ। ভারাক্রান্ত। একইসঙ্গে প্রতিবাদী। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে টানা কর্মসূচী চলছিল। শনিবার এ প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আর মূল আয়োজনটি ছিল রাজধানী ঢাকায়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিকেলে সমবেত হয়েছিলেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন সংগঠনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা। কথা কবিতা গানে সংস্কৃতিকর্মীরা স্বপ্নের সমাজটি ফেরত চেয়েছেন।

আগেই বলা হয়েছে, সময়টা অচেনা ঠেকছে। অন্ধকারের শক্তি সকল সুন্দর অর্জনকে গ্রাস করতে মরিয়া। এ অবস্থায় ক্ষুব্ধ বেদনাহতই শোনালো বিশিষ্টজনদের কণ্ঠ। এদিন প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডাঃ সারওয়ার আলী বলেন, আমরা বাংলাদেশে একটা মানবিক সমাজ চেয়েছি, যে সমাজে সব ধর্মের মানুষ সম অধিকারের ভিত্তিতে বেঁচে থাকবে। নারীরা সমঅধিকার পাবে। শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু গত কয়েক মাসের দুষ্ককর্মগুলো দেখে মনে হচ্ছে না এটা সভ্য কোন দেশ। ব্লগার হত্যার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মুক্তমন নিয়ে কেউ কিছু বললে লিখলে সেটা সহ্য করা হচ্ছে না। তালিকা তৈরি করে তাঁদের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করে দেয়া হচ্ছে। প্রকাশ্যে সে রায় কার্যকর করা হচ্ছে। এমন বর্বর হত্যাকাণ্ড কোন সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না। একইভাবে তিনি সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে হেনস্তা করার প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যাঁর পরিবারের ১৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে, যিনি স্বাধীনতাবিরোধী জঙ্গীগোষ্ঠী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে একটি পা হারিয়েছেন, তাঁকে আইনের সব বিধি-বিধান উপেক্ষা করে হাতকড়া পরানো হয়েছে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এমনকি মাতৃগর্ভের শিশু গুলিবিদ্ধ হচ্ছে, ভাবা যায়! অথচ এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের সরকার। সরকারকে কঠোর অবস্থান নেয়ার পাশাপাশি সকলে সমবেতভাবে দুর্যোগ মোকাবেলার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রায় একই দুঃখ-ক্ষোভ-হতাশা ছিল রামেন্দু মজুমদারের কণ্ঠে। বহুকাল রাজপথে থাকা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বলেন, আমাদেরকে অনেকেই সব সময়ের বিরোধী দল বলে থাকেন। আসলেইতো! মানুষের অধিকার যখন ক্ষুণœ হয় তখন আমরা বসে থাকতে পারি না। প্রতিবাদ করি। বর্তমান সময়টিকে ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, একাত্তরে পরাজিত অপশক্তি সুযোগ খুঁজেছে। সুযোগ পেয়ে গেলে কাজে লাগাচ্ছে। একদিকে দেশ উন্নতি করছে, অন্যদিকে দেখছি নৈতিক অবক্ষয়। একের পর বর্বর হত্যাকা- ঘটে চলেছে। অথচ আশপাশে কেউ স্বোচ্চার হচ্ছে না। এ অংশটিকে জোর দিয়েই ধিক্কার জানান তিনি। বলেন, সামাজিক প্রতিরোধ এখন জরুরী। এমনকি শুধু শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করলেও কিছু হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ আরও একটু পেছন থেকে শুরু করেন। বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শিশু হত্যা হয়েছে। গর্ভবতী নারীকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে সংস্কৃতির শক্তিকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি। বলেন, সংস্কৃতির উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত না হলে পিছিয়ে পড়তে হবে আমাদেরকে। আয়োজক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ বর্তমান অবস্থাটিকে গভীরভাবে ভেবে দেখার পরামর্শ দেন। মান্নান হীরা, ঝুনা চৌধুরীসহ অন্য বক্তারাও একই আহ্বান জানান।

নাতিদীর্ঘ আলোচনা পর্ব শেষে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান বহ্নিশিখার শিল্পীরা। সমবেত কণ্ঠে স্বপ্নের বাংলাদেশের কথা বলেনÑ বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ,/বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার মুসলমান,/ আমরা সবাই বাঙালী...। একই গানে চলে আসে সকল অন্ধকারের শক্তির সঙ্গে লড়াইয়ের মূল অনুপ্রেরণা মুজিব। শিল্পীরা গেয়ে যানÑ এই বাংলার কথা বলতে গিয়ে/ বিশ্বটাকে কাঁপিয়ে দিল কার সে কণ্ঠস্বর,/ মুজিবর, সে যে মুজিবর,/ ‘জয় বাংলা’ বল রে ভাই...। পরের গানে জোট বাঁধার আহ্বান। সলিল চৌধুরীর সেই কালজয়ী গানে শিল্পীরা বলেনÑ গ্রাম নগর- মাঠ পাথার বন্দরে তৈরী হও/ কার ঘরে জ্বলেনি দীপ, চির আঁধার তৈরী হও।/ কার বাছার জোটেনি দুধ শুকনো মুখ, তৈরী হও,/ ঘরে ঘরে ডাক পাঠাও, তৈরী হও, জোট বাঁধ,/ মাঠে কিষাণ, কলে মজুর, নওজোয়ান জোট বাঁধ...।

কবিতার ভাষায়ও চলে প্রতিবাদ। এদিন চমৎকার বক্তৃতার পর সুন্দর আবৃত্তিও করেন হাসান আরিফ। এভাবে বিভিন্ন শিল্পী ও সংঠনের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় প্রতিবাদ।